X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রধানমন্ত্রী কি সত্য তথ্য পাচ্ছেন?

নাদীম কাদির
০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২০:৩৬আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২০:৩৬

করোনা মহামারিতে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে গেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে আমাদের, আমরা যারা মানুষ বলে পরিচিত। আমি জানি না এটি কি নতুন নাকি এতদিনের সুপ্ত থাকা কোনও রূপ। দেখছি অনেক ভালো মানুষ আর অন্যদিকে ‘নতুন রূপী’ কিছু মানুষ।

কিন্তু পরিবর্তন দেখছি বেশ কিছু। অনেকের রাজনৈতিক পরিচয় একটু পরিবর্তনের পথে। কারণ, ভয় পাচ্ছেন সরকার পরিবর্তন হলে যেন নতুন ভাষায় কথা বলতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা যেন নতুন করে সরকার বা ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।

গত ১৫ বছর ধরে দেখছি– কত মানুষের কত ধরনের ভেলকিবাজি। পুরো দেশটি যেন শুধু আওয়ামী লীগ মনোভাবের মানুষ। অনেকেই বিএনপির খুব ঘনিষ্ঠ। তারপরও গত ১৫ বছরে নিজেদের আওয়ামী লীগ চিন্তাধারার মানুষ হিসেবে পুরনো আওয়ামী লীগের মানুষদের সরিয়ে স্থান করে নিয়েছে।

তাদের কী দোষ। তারা তো চেষ্টা করেই আমদানি করা ‘তেল’ না খাঁটি ‘বাঙালি তেল’ ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ হয়েছে। আবার অনেকেই টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগ হয়েছেন বলে প্রায়ই শোনা যায়।

এক আমলা যিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে আপত্তিকর কথা বলেছেন। তিনি সিনিয়র সচিব হওয়ার পরও আরও গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার দখল করে রেখেছেন দেশের বাইরে। আরেকজন যাদের পুরো পরিবার পাকিস্তানিদের দোসর ছিল এবং বিএনপিপন্থি, তিনি অনেক অপরাধ করে ওএসডি হন। বর্তমানে তিনিও এখন গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে গেছেন। কী করে সম্ভব এভাবে খাল কেটে কুমির আনা? তৃতীয় জন বিএনপি ক্ষমতায় আসে ২০০১ সালে তখন বঙ্গবন্ধুর ছবি জোর করে নামিয়ে ফেলেন। গত কয়েক বছর আগে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং হাস্যকর হলেও সত্যি তিনি ক্ষমতাসীন দলের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে বিদেশ যান।

আজকে বিএনপি যে হুংকার দিচ্ছে তাদের বড় শক্তিটা হলো সুবিধাবাদীদের জন্য। সরকার বেশ কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছেন। এতে হীতে বিপরীত হচ্ছে বলে আমি মনে করি। তাদের বিষয়ে সরকার কোনও কিছু ব্যাখ্যা না দিয়েই সিদ্ধান্ত কার্যকর করছেন।

এতে তারা মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছেন। আর সরকার পরিবর্তন হলে আবার সুবিধাজনক পদে আসীন হবেন। আমি মনে করি তাদের ওএসডি করে রাখা যেতো এবং এটা নিয়ে কোনও আলোচনা হতো না।

দেশি-বিদেশি অনেকে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ। কারণ, রাজনীতি ‘গুণ্ডামি’ না বলে তারা মন্তব্য করেছেন। ‘ক্ষমতার গরম’ ভালো না বলেছেন অনেকেই। আমি মনে করি ভদ্র ভাষা যা শান্তির রাজনীতির বাতাস আসার সুযোগ করে দেবে সেসব শব্দ ব্যবহার করাই ভালো।

সাংবাদিক হিসেবে আজও আমি রাস্তার পাশে চায়ের টংঘরে বসে শুনি সাধারণ মানুষ কী বলছেন। রিকশাওয়ালার সঙ্গে বা সিএনজি অথবা উবার চালকদের সঙ্গে আলাপ করি তাদের ভাবনা জানতে এবং তাদেরও এই হুংকার পছন্দ না।

তারা মনে করেন বিএনপি আর আওয়ামী লীগ মার্জিত ভাষায় কথা বলবেন, যা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করবে। নেতারা কঠোর ভাষায় কথা বললে তাদের কর্মীরা অতি উত্তেজিত হয়ে ‘রক্তারক্তি খেলা’ শুরু হতে পারে।

আগামী ১০ ডিসেম্বর নিয়ে মানুষের মনে আতঙ্ক। এর মূল কারণ নেতাদের আক্রমণাত্মক ভাষণ। যেখানে তারা শান্তিপূর্ণ রাজনীতির কোনও আভাস পাচ্ছে না। পাচ্ছেন আরেক দফা রক্তাক্ত রাজনীতির প্রতিধ্বনি।

আওয়ামী লীগকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, দলটি প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। এতে ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি ধীরে ধীরে তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। মানুষ সহজেই গুজব বা ব্যাপক দুর্নীতির মতো ঘটনা বিশ্বাস করছে। জনসভার মাঠ নিয়ে বিতর্কের প্রয়োজন ছিল না।

বহু মানুষ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে আমাকে বলছেন, তারা শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ রাস্তা, ব্রিজ, বিশেষ করে পদ্মা ব্রিজ উপহার দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কোভিড-১৯-এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। এর ওপর দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি তাদের জীবনকে কষ্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই তারা আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষিপ্ত।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নামে চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করেছেন। জনগণের ভেতর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা অনেকেই তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। আমার এলাকার এমপি সাহেব অনেক অন্যায় করাতে আর এলাকার মানুষের জন্য তেমন কিছু না করায় তার এবার নির্বাচিত হওয়া খুবই কঠিন।

আমি ঘুরে ঘুরে মানুষের মতামত নিয়েছি। প্রায় সবাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। “ডিজিটাল বাংলাদেশ” ব্রিজ, রাস্তা করা এবং ভূমিহীনদের ঘর করে দেওয়া অন্যতম।  অর্থনীতি এবং বিদ্যুৎ খাতে যে অবদান রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তা ম্লান হয়ে গেছে ব্যাংক ডাকাতি, বিদেশে টাকা পাচার হওয়া এবং কিছু দিন জ্বালানি সংকটের কারণে।

সাধারণ মানুষ করোনার প্রভাব, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বোঝে না। আর বিদ্যুৎ কেলেঙ্কারি কেন হলো তা অজানায় থেকে গেলো। জনগণ মনে করছে এটা সরকারের গাফিলতি।

বিএনপি আর তাদের সব দল অনলাইনে প্রচার করে যাচ্ছে নিয়মিত। যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে আর সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে তা বিশ্বাস করছে না। বিরোধীরা ভুল তথ্য দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের পক্ষে কোনও ক্যাম্পেইন আমার চোখে পড়েনি। টেলিভিশন টকশোতে ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিরা বারবার পুরনো ইতিহাস টেনে আনছেন, যা সাধারণ মানুষ পছন্দ করে না। সাধারণ ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলে বিরোধীদের মোকাবিলা করতে তারা অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন।

মানুষের কাছে ২০১৮-এর নির্বাচনের ব্যাপারে মহা আপত্তি আছে। কারণ, বিরোধী শিবির তাদের ভালোভাবে ব্রেইন ওয়াশ করেছে। অনেকে যারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিতে বিশ্বাস করেন তারাও অসন্তুষ্ট।

এর পেছনে একটা বড় কারণ হলো, মানুষ প্রশ্ন করছে যে– যারা অপরাধ করেছে তাদের কঠোর শাস্তি হচ্ছে না, মানে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবই জানেন এবং বোঝেন, তবু কিছু কথা বলতে চাই।

প্রথমত, জনসভায় লোক সংখ্যা দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। কারণ, আমার অভিজ্ঞতায় জনসভা থেকে জনপ্রিয়তা যাচাই করা যায় না।

দ্বিতীয়ত, কঠিন সময় বড় বিপদ হবে যারা লাভের জন্য বা জান বাঁচানোর জন্য নব্য আওয়ামী লীগ হয়েছেন বা হাইব্রিড। সময় হলেই তারা পুরনো ঘরে ফিরে যাবেন আর অস্থায়ী ঘরে হানা দেবেন।

তৃতীয়ত, আমাদের দেশে “মীর জাফর” আর “অকৃতজ্ঞ” মানুষের অভাব নেই। তাদের ব্যাপারে সাবধান হওয়া দরকার।

আরেকটা ব্যাপার হলো, আমাদের স্মৃতিশক্তি কম। কাজ হয়ে গেলেই আমরা উপকারীর কথা ভুলে যাই। কেউ ভালো করলে আমাদের ভালো লাগে না; বরং তাকে কী করে নামিয়ে ধ্বংস করতে হবে এই সুযোগই খুঁজতে থাকি। আমি ভুক্তভোগী, তাই বিশেষ করে বললাম।

এই ধরনের মানুষ শুধু রাজনীতি না, বরং সব ধরনের পেশাতেই আছেন। সুতরাং সতর্ক হোন।

মুক্তিযুদ্ধ প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়ের কাছের এবং সেই স্নেহ আমার মতো অনেকেই পেয়েছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অনেক বিষয়ে অবহেলায় পরিণত হয়েছে। কেন তার নির্দেশনা উপেক্ষা করা হচ্ছে। এরা কি রাজাকার না পাকিস্তানিদের প্রেতাত্মা? এদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিন। কেউটে সাপের মতো যেকোনও সময় আঘাত হানবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদক, রক্ত ধারা ৭১

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ ডিসিদের
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে প্রতি সপ্তাহে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ ডিসিদের
সীমান্ত সম্মেলনে যোগ দিতে বিএসএফ প্রতিনিধি দল ঢাকায়
সীমান্ত সম্মেলনে যোগ দিতে বিএসএফ প্রতিনিধি দল ঢাকায়
রেলওয়েতে চাকরির সুযোগ, বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
রেলওয়েতে চাকরির সুযোগ, বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ
জনগণ বরই খাবে, মন্ত্রী খাবেন আঙুর-খেজুর: বাংলাদেশ ন্যাপ
জনগণ বরই খাবে, মন্ত্রী খাবেন আঙুর-খেজুর: বাংলাদেশ ন্যাপ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ