X
মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

ডোনাল্ড লু’র ঝটিকা সফর: বাংলাদেশের লজ্জা!

নাদীম কাদির
২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৯:৩১আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১৯:৩১

মার্কিন শীর্ষ কূটনৈতিক ডোনাল্ড লু ঝটিকা সফরে ঢাকা এসেছিলেন। তার চলে যাওয়ার পর নানা ধরনের বিতর্ক চলছে। প্রায় সব বিষয়ে বাংলাদেশ বিতর্কের দেশে পরিণত হচ্ছে। আর বিতর্কের বিষয় যখন হয় রাজনীতি অথবা কোনও পক্ষের সুনাম নিয়ে– তখন তো সেটা নতুন মাত্রা পায়। আমরা ভালোকে ভালো বলা আর খারাপকে খারাপ বলা যেন ভুলেই গেছি। যেমন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদেরকে বিদ্যুৎ দিয়েছেন কিন্তু অনেকেই ধন্যবাদ না দিয়ে তার যত নেতিবাচক দিক আছে তা বলেই চলেছেন। সমালোচনাকারীরা পদ্মা সেতু নির্মাণকেও খারাপ চোখে দেখছেন। আর শুধু ‘দুর্নীতি দুর্নীতি’ বলে গান গাইছেন।

আবার আরেক পক্ষ বিরোধীদের কিছুই ভালো দেখতে চান না। সাধুবাদও জানাতে চান না। তবুও তাদেরও ভালো কিছু নিশ্চয়ই আছে। সত্যি বলতে কী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সংক্ষিপ্ত শাসনামলে আমাদের সংবিধান দিয়েছেন, দেশের রাস্তা-ঘাট, সেতু, বিমান বন্দর ও নৌ বন্দর দ্রুত চালু করেছিলেন। তখনই যদি এসব ঠিক মতো না হতো তাহলে দেশ সামনে এগুতে পারতো না।

এক খাল কাটা ছাড়া জেনারেল জিয়াউর রহমান কিছু করতে পারেননি। কারণ তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকার ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত ছিলেন। বলা হয়, বিশটির বেশি সামরিক ক্যু হয় তার আমলে। আর শেষ ক্যু’য়ে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। এরপর ক্ষমতায় আসলেন জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এবং নয় বছর কঠোর হাতে দেশ শাসন করেন। তার আমলে দেশের কিছু অবকাঠামো উন্নতি হয়েছে। তার আমলে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ হয় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।

তিনি শিল্পীদের কাজের সম্মান করতেন এবং তার কারণে তাদের সম্মানীও অনেক বৃদ্ধি পায়। উল্লেখযোগ্যদের হলেন প্রয়াত এস এম সুলতান। এরশাদ সাহেব শৈল্পিকমনা ছিলেন। নিজেকে কবি ভাবতেও পছন্দ করতেন। আরেকটা বিষয় তিনি রজনীগন্ধা উপহার দিয়ে ফুলের কদর বাড়িয়ে দেন। যা আজকে একটি বিরাট বাজারে পরিণত হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের রক্তাক্ত ও নিষ্ঠুর শাসনের পরে, এরশাদ সাহেবের শাসন যেন কিছুটা সুবাতাস ছিল। মানুষ স্বস্তি পেয়েছিল। রাজনীতি ছিল শুধু আলাপচারিতার মধ্যে কারণ ক্ষমতায় তখন আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ছিল না। এজন্য ছিল না বিদ্বেষের রাজনীতি।

শেখ হাসিনা গত ১৫ বছর দেশের সার্বিক যে উন্নতি করেছেন একটি পরিকল্পনা অনুযায়ী যার কোনও তুলনা নেই। আমার গ্রামের বাড়ি রংপুর যেতে লাগতো ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়িতে, কিন্তু তা এখন ৫-৬ ঘণ্টায় যাওয়া যায়। সম্পূর্ণ হাইওয়ে বা এক্সপ্রেসওয়ে শেষ হলে সময় আরও কমবে কারণ তখন রাস্তায় যানজট হবে না।

এখন পেছনে ফিরে দেখলে মনে হয়, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি যে দ্বন্দ্ব তা তখনই মীমাংসা করে ফেললে আজ হিংসা-বিদ্বেষে ভরা রাজনীতি হতো না। ক্ষমতার জন্য শুধু লড়াই হতো না। দেশের দুই বড় দলের সম্পর্ক পানি আর তেলের মতো যা কোনোদিন শেষ হবে বলে মনে হয় না। দুই দলই দুইটা পরিবার দিয়ে চালিত।

এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি অন্তর্দ্বন্দ্বে মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি আজও। তাদের অবস্থা জনসম্মুখে একটি আওয়ামী লীগের লেজুড় তুল্য। যদি তারা শক্তিশালী দল হতে পারতো তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির আমূল পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই দলকে নিয়ে তাই কেউ ভাবে না।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে গৃহবধু থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। আবার বিরোধী দলের নেতৃত্বেও ছিলেন আরেক নারী। তিনি শেখ হাসিনা। এসব কিছু বিশ্বে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও আমাদের দুই নেত্রী যাত্রা শুরু করেন, কিন্তু ক্ষমতার লোভ জন্ম দিল ভোট ডাকাতির। তা হলো মাগুরা উপ-নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে জন্ম নিলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। অনেক চড়াই উৎরাই করে সৃষ্টি হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাও ধ্বংস করে দিলো বিএনপি। এখন আবার তারাই উল্টো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলছেন।

যাইহোক, ১৯৯১ এর নির্বাচনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল, যদিও রাজনৈতিক খাতিরে আওয়ামী লীগের গ্রহণ করতে অসুবিধা হয় তারপরেও মেনে নিতে হয়েছে। দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করে। আমরা যারা বিদেশি গণমাধ্যমে কাজ করতাম, তখন আমাদের ব্যস্ততা প্রচুর বেড়ে যায়। আমাদের সহকর্মীরা ছুটে আসেন বেগম খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিতে। তারা আগ্রহী ছিলেন দুইজন কী করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র শক্তিশালী করবেন- সেটা দেখার। একইসঙ্গে  জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করতে তাদের কী ধরনের কর্মসূচি আছে। এর মধ্যে আমাদের রাজনীতিবীদরা স্যার নিনিয়ান এবং জিমি কার্টারের মধ্যস্থতার সুযোগ করে দেন, যা আমার কাছে খুবই অগ্রহণযোগ্য ছিল। বিদেশি সালিশ লজ্জার ব্যাপার। আবার রাজনীতিবিদরা ‘ঝগড়া’ করে নিয়ে আসলেন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যা ওয়ান ইলেভেন নামে পরিচিত। আবার এখন আসলেন ডোনাল্ড লু।

জনগণের কথা বলে ক্ষমতার লড়াই বারবার হাস্যকর। ডোনাল্ড লু আসবেন আর কী করবেন আমাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে- এসব নিয়ে কিছুদিন খুব সরব ছিল। উনি চলে গেলেন।  বাংলাদেশের রাজনীতি  নিয়ে আমেরিকার অবস্থান নিয়ে তৈরি হলো নতুন আগ্রহ।  চলছে যুক্তিতর্ক কিন্তু তা যুক্তিহীন।

এই বিদেশি হস্তক্ষেপ হলে আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশ হেরে যায়। তার উদ্দেশ্য যাই থাকুক,  স্বাধীন বাংলাদেশ কি এমনটাই চেয়েছিল? আমি তার একটা সাক্ষাৎকার দেখলাম চ্যানেল ২৪ ( টোয়েন্টিফোর)-এ।  র‌্যাবের বিচার বহিঃর্ভূত হত্যাকাণ্ডকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন। তবে রাজনীতি নিয়ে লু যখন বললেন তারা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন চান আর সবার সমান অধিকার থাকতে হবে। সমাবেশ করা ও কথা বলার, তখন আমাদের বুঝতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সবক দিলেন ও কিছুটা সময় দিয়ে গেলেন শুধরানোর জন্য।

ডোনাল্ড লু’র সফরে একটি ভূ-রাজনৈতিক ব্যাপার থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তার কূটনীতির ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত দিনগুলোতে তার দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। দেশকে ভালোবেসে কে কী করে লু'দের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে।  সেটাই দেখার বিষয় এখন। 

বলি, আমরা দেশ চালাই, তাহলে কেন বিদেশিদের এই চাওয়া? কেন এই হস্তক্ষেপ? ডোনাল্ড লু’র মুখ, হাসি আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (আমার চোখে) ‘ডাল মে কুচ কালা হে’ মনে হয়েছে।

এই লজ্জা বাংলাদেশের সবার। জনগণের কেন এই লজ্জা পেতে হবে? বার বার লজ্জা পেতে থাকলে জনগণ, দোষী দলগুলোকে আস্তানায় নিক্ষেপ করবে। কারণ ক্ষমতা না, দেশকে ভালোবাসলে নিনিয়ান, কার্টার বা লু’দের প্রয়োজন হতো না।

ডোনাল্ড লু’কে মনে হলো আমাদের মাস্টার। খুব লজ্জা লাগলো, কিন্তু একেবারে হেরে যেতে চাই না।

আপনারা বাকযুদ্ধ বন্ধ করে, দেশকে ভালোবেসে সমাধান বের করে জনগণকে শান্ত করুন। আপনারা ভালো, দক্ষ, সৎ নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবীদদের কাছে মাঠ ছেড়ে দিন। তারা দ্বন্দ্বের রাজনীতি না, শান্তির রাজনীতি দেশকে উপহার দিতে পারবে।

একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে বিদেশিদের ‘মাস্টার’ মানতে হচ্ছে-  এতে আমি লজ্জিত। একটু কান পেতে জনগণের কথা শুনুন, আর দেখেন কী ভয়ানক সুর শোনা যাচ্ছে। সবাই ভুল করে আর তা মেনে নিয়ে শুধরিয়ে সামনের দিকে যাওয়া যায় সেই এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে হবে আমাদের এখনই। শুধু অন্যদের দিকে আঙ্গুল তুললে দেশ চলবে না বলে আমি মনে করি। একটু স্বস্তি দরকার, কারণ অর্থনৈতিকভাবে সবাই কমবেশি চাপে আছে। আমরা যারা চাপে আছি অর্থনৈতিকভাবে তাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার আপনাদের সময় নেই। আমরা জনগণ তুচ্ছ এবং শুধু নির্বাচনের সময় আমরা ‘ভিআইপি’।

আর হারতে চাই না, আর লজ্জা পেতে চাই না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সভাপতি, ‘রক্ত ধারা ৭১’

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মৌলভীবাজারে পৃথক স্থানে দুজন খুন
মৌলভীবাজারে পৃথক স্থানে দুজন খুন
ফিলিস্তিনের নিহত-নিপীড়িত সাংবাদিকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ
ফিলিস্তিনের নিহত-নিপীড়িত সাংবাদিকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ
অমর্ত্য-ঋদ্ধের বহিষ্কারাদেশ বাতিল না করলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
অমর্ত্য-ঋদ্ধের বহিষ্কারাদেশ বাতিল না করলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
মনজুরুল আহসানকে স্থায়ী অব্যাহতি দিয়েছে সিপিবি
মনজুরুল আহসানকে স্থায়ী অব্যাহতি দিয়েছে সিপিবি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ