X
সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪
১০ আষাঢ় ১৪৩১

হেনরি কিসিঞ্জার: ভূ- রাজনৈতিক পরিবর্তনকারী কূটনীতিক

স্বদেশ রায়
০৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১৬:৪৮আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ২১:০৩

হেনরি কিসিঞ্জার মারা গেলেন ১০০ বছর বয়সে। তার এই ১০০ বছর বেঁচে থাকাতে মানুষ তাকে বেশি মনে রেখেছে। কারণ, মৃত মানুষের থেকে জীবিত মানুষই বেশি আলোচিত থাকেন। এ কারণে, বিশ্ব কূটনীতিতে তার কাজগুলো সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবদ্দশায় নতুন করে বা বিস্তারিত মূল্যায়িত হবার সুযোগ পেয়েছে।

বাস্তবে পৃথিবীর দীর্ঘ কূটনীতির ইতিহাসে, যে ক’জন কূটনীতিক তার সময়ের ভূ- রাজনৈতিক অর্ডার তার চাহিদার সপক্ষে পরিবর্তন করতে পেরেছেন, হেনরি কিসিঞ্জার তাদের একজন। ষাট ও সত্তরের দশকে যে সময়ে পৃথিবী দুই পরাশক্তির নামে দুটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অর্ডারে বিভক্ত ছিল, ওই সময়ে এক পরাশক্তির অন্যতম কূটনীতিক ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার।
 
যদিও ষাট ও সত্তরের দশক আজ ইতিহাসের পাতায়। তারপরও সেই পাতা উল্টালে আজকের প্রজন্ম জানতে পারবে, ওই সময়ে কিসিঞ্জার যে দেশের অন্যতম কূটনীতিক ওই আমেরিকাসহ গোটা পৃথিবীর তরুণরা জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের নামে এক অন্ধ উগ্র আবেগে উন্মত্ত। জাতীয়তাবাদকে উগ্র আবেগ বলাতে অনেকে অপছন্দ করতে পারেন, তবে এটা ইতিহাসের সত্য, উনবিংশ শতাব্দী থেকে যে রাষ্ট্র বা ভূখণ্ড-কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ জেগে উঠেছিল তাতে ওই ভূখণ্ডের নরগোষ্ঠীর সংস্কৃতি অন্তঃরসের থেকে ভূখণ্ড কেন্দ্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টির এক হ্যামিলনের বাঁশির সুরই ছিল বেশি। অন্যদিকে আজ এ সত্য প্রমাণিত, সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের নামে শেষ অবধি পৃথিবী যে তথাকথিত বিপ্লব বা রাষ্ট্র সৃষ্টি দেখেছে তা ছিল মূলত তারুণ্যকে এক অন্ধ আবেগে সশস্ত্র করে তুলে রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণের একটি নিষ্ঠুর পথ।

তবে এই ‘নিষ্ঠুর’ শব্দটি এখানে শুধু সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের সঙ্গে ব্যবহার হলেও পৃথিবীর ইতিহাসে সব কালেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথটি সবসময়ই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে গলা ধরাধরি করে চলে।

যাহোক, মূল কথায় আসা যাক, হেনরি কিসিঞ্জার সত্তরের দশকে সমাজতন্ত্রের নামে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চায়না পরিচালিত ডিক্টেটর শাসিত বিশ্বের বিপরীতে গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা আমেরিকার অন্যতম কূটনীতিক। হেনরি কিসিঞ্জারই আপাতদৃষ্টিতে প্রথম কূটনীতিক, যিনি ওই সময়ে এই দুই পরাশক্তির যুদ্ধে হার্ড পাওয়ারের বিপরীতে সফট পাওয়ারকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিলেন। তার আগ অবধি দেখা যাচ্ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক নায়কদের মাধ্যমে অস্ত্রের দ্বারা দুটো সামরিক নায়কের সমাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন পৃথিবীতে সৃষ্টি করে তো গণতান্ত্রিক আমেরিকা চারটা না পারে তো তিনটা সামরিক শাসক সৃষ্টি করেছে গণতন্ত্রের নামে। এছাড়া দুই পরাশক্তি কেবলই একে অপরকে পরাজিত করার জন্যে সমরশক্তি বাড়ানোরা কাজে ব্যস্ত ছিল।

এই সমরশক্তি বৃদ্ধি ও  সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের নামে এই সামরিক অভ্যুত্থান ও  তার পাশাপাশি তরুণদের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যে সশস্ত্র হয়ে ওঠার এমনকি নিরস্ত্র অবস্থায় জীবন দেওয়ার পালাই ছিল পৃথিবীর ওই সময়ের রাজনীতির মূল বিষয়। যা সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল পৃথিবীর আর্থিক উন্নয়নকে।

হেনরি কিসিঞ্জারই ওই সময়ের প্রথম কূটনীতিক, যিনি তার বিপরীত পরাশক্তিকে দুর্বল করার বা সমাজতন্ত্রের নামে ভয়াবহ একনায়কতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাবার সঠিক সূচনাটি করেন সফট পাওয়ারকে কাজে লাগিয়ে অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের একটি অংশকে তিনি কূটনৈতিক শক্তি কাজে লাগিয়ে আরেক অংশের থেকে পৃথক করার পথে হাঁটেন। এবং সকলেই জানেন, এই কাজটি তিনি করেছিলেন, অতি ছোট্ট একটি দেশকে কাজে লাগিয়ে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান হয়ে চীন গিয়ে গোপনে চীন ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজটি শুরু করেন। হেনরি কিসিঞ্জার যখন এই কাজের শুরু অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে এসেছিলেন সে সময়ে আমাদের বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। যে কারণে ওই সময়ে আমেরিকার সিনেট ও জনগণ এক অবস্থানে অর্থাৎ বাংলাদেশের পক্ষে থাকে- অন্যদিকে প্রশাসনের একটি অংশকে ভিন্ন অবস্থানে থাকতে হয়েছিল।

আমেরিকার দিক থেকে ওই মুহূর্তে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তির ধ্বংসের সূচনা করা। হেনরি কিসিঞ্জার সে কাজটি করেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। আর বলা যেতে পারে, ১৯৯১ সালে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলো, এর মূল কারিগর হেনরি কিসিঞ্জার। কারণ, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন যতই সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হোক না কেন, সামাজিকভাবে অনেক বেশি দৃঢ় চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মিলেই ছিল মূলত শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব।

এই শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব আমেরিকার জন্য হুমকি ছিল। আবার দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় ওই সময়ে যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কারণে সামাজিক অস্থিরতা চলছিল, তার ফলে এই এলাকাগুলোতে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনও সূচনাই হচ্ছিল না।

অন্যদিকে সত্তরের দশক থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ইউরোপ বা আমেরিকা তাদের উন্নয়নের অনেক ক্ষেত্রে অপটিমাম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাছাড়া অব্যবহৃত সম্পদ ও দ্রুত বিকাশমান জনগোষ্ঠীর তরুণ শ্রম অংশ নিয়ে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি বড় অংশ গড়ে উঠবে এশিয়াকে ঘিরে। কিন্তু সত্তরের দশকে এটাও স্পষ্ট হয়েছিল যে এশিয়ার এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্যে চীন, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিবর্তন দরকার। কারণ, ভৌগোলিকভাবে জাপানের সহায়তায় সার্বিক অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটতে পারে শুধু পূর্ব এশিয়ার অল্প কিছু এলাকায়। এছাড়া দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশ ভৌগোলিকভাবে ও নৃতাত্ত্বিকভাবে অনেক বেশি নির্ভর করছিল চীনের অর্থনৈতিক চিন্তা ধারার ওপর। একইভাবে সাউথ এশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশ নির্ভর করছিল ভারতের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা পরিবর্তনের ওপর। অন্যদিকে সেন্ট্রাল এশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশ নির্ভর করছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের লৌহ কপাট থেকে দেশগুলোর বেরিয়ে আসার ওপর।

হেনরি কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক সাফল্যের ফলে সত্তরের দশক থেকে চীনে ওপেন-আপ শুরু হলে শুধু চীন নয়, এর সুফল পড়তে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে। অন্যদিকে চীনের ওপেন- আপ এবং চীন-আমেরিকা সম্পর্ক পরোক্ষভাবে সাউথ ইস্ট এশিয়ার পরিবর্তন শুরু হতে সহায়তা করে। যার ফলে দ্রুত শেষ হয় চীন, সোভিয়েত ও আমেরিকা সমর্থিত সাউথইস্ট এশিয়ার অনেক দেশের তথাকথিত রাষ্ট্র-বিপ্লবগুলো। এবং যার কোনও লেশমাত্র চিহ্ন এখন আর ওই দেশগুলোতে খুঁজেও পাওয়া যায় না। বরং সবখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা চেষ্টা চলছে।

আবার ১৯৯১ সালে যে তাসের ঘরের মতো সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলো, এরও অন্যতম কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের ওই দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার কৃতিত্ব রিগ্যানের পালকে থাকলেও এর সূচনার পালকটি নিঃসন্দেহে হেনরি কিসিঞ্জারের শিরেই থাকবে। আর এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার সুফল আজ দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেকটি দেশই পাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ৮৯’র শেষভাগে ভেঙে যাবার পরে ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতির মূল রূপকার নরসিমা রাও তার দেশের অর্থনীতি ওপেন-আপ করেন। যার পরপরই বাংলাদেশও অর্থনীতি ওপেন-আপ করে। এবং আজ বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে, তার মূলও এখানে। এছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার নামে যে তারুণ্যকে সশস্ত্র করার প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে গেছে, এর মূলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও চীনের কমিউনিজম থেকে সরে আসা। তাই আজকের এই পরিবর্তিত পৃথিবীর সূচনাকারীর অন্যতম ব্যক্তি হেনরি কিসিঞ্জার। ইতিহাসে নন্দিত ও নিন্দিত যেভাবেই তাকে যে যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুক না কেন, বাস্তবতার একটি জায়গাতে তাকে রাখতে হবে– আর সেই বাস্তবতার স্থানটি হলো, তিনি পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক অর্ডার পরিবর্তনকারী একজন কূটনীতিক। যাকে কূটনীতিকদের কূটনীতিক বললেও খুব বেশি বলা হবে না।

আর এ মাপের মানুষেরা পৃথিবীতে সবসময় একসঙ্গে নন্দিত ও নিন্দিত হবেনই। কিসিঞ্জারের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। একাধারে তিনি নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে তিনি যুদ্ধাপরাধী হিসেবেও কথিত হয়েছিলেন। এখানে হেনরি কিসিঞ্জারকে ডিফেন্ড করার জন্যে নয়– বাস্তবতাকে উল্লেখ করার জন্যে বলতে হয় যে বিপ্লবের চেতনার বিরুদ্ধে নরহত্যার মদতের কারণে কিসিঞ্জারকে যুদ্ধাপরাধী বলা হয় ওই চেতনা এখন ভিয়েতনামের কোনও প্রান্তে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাছাড়া পৃথিবীর সব যুদ্ধেরই দুই পক্ষ থাকে। বিজয়ী প্রথমে এক ধরনের রায় দেয়, সেখানে বিজিত’র ওপর সব দোষ পড়ে। কিন্তু ইতিহাস শেষ অবধি জীবিত এক বিষয়। যাকে কোনদিন হত্যা করা যায় না। যেমন এখন যারা Miriam Gebhardt-এর গবেষণা মূলক ইতিহাস “Crimes Unspoken : The rape of German Women at the end of the second world war” পড়েছেন বা পড়বেন তারা নিশ্চয়ই স্ট্যালিনকে তাদের হিসেবের খাতায় যুদ্ধাপরাধীর স্থানেই রাখবেন।

তাই যেকোনও ঘটনার বাস্তবতা বিচারের জন্যে অপেক্ষা ও সময় একটি বড় বিষয়। হেনরি কিসিঞ্জার ১০০ বছর বেঁচে থেকে তার নিজের কীর্তির পঞ্চাশ বছর পরের অবস্থা দেখে গেছেন। তার মৃত্যুকালে চীন ও আমেরিকার সম্পর্ক আবার দুই মেরুতে চলে গেছে ঠিকই, তারপরও চীনের হাতে তিনি যে ক্যাপিটালাইজমের ঝান্ডাটি তুলে দেবার সূচনা করেছিলেন, সেটা এখন চীন তার নিজের মতো করে হলেও বেশ অনেক উঁচুতেই তুলে ধরেছে। সাফল্যগুলোর বিচার তো এভাবেই হয়ে থাকে সবসময়।

 
লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পল্লবীতে শাহিন হত্যা: ৩ বছরেও শুরু হয়নি মামলার বিচার
পল্লবীতে শাহিন হত্যা: ৩ বছরেও শুরু হয়নি মামলার বিচার
ইউজিসিকে ছয় দফা সুপারিশ মহিলা পরিষদের
ইউজিসিকে ছয় দফা সুপারিশ মহিলা পরিষদের
নৈতিকতা শিক্ষাদান: ভিন্ন পদ্ধতির সন্ধানে
নৈতিকতা শিক্ষাদান: ভিন্ন পদ্ধতির সন্ধানে
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা নিয়ে আলোচনা
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা নিয়ে আলোচনা
সর্বশেষসর্বাধিক