দুই বছরেরও কিছু কম সময়ের মধ্যে বিস্ময়করভাবে অনেক ঘটনা ঘটে গেলো। প্রথম হচ্ছে টানা তিন মেয়াদে বাংলাদেশে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী দুঃশাসন চালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলো। তিনি পালাতে বাধ্য হলেন। সেখানে একটা অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এর অন্তর্নিহিত বিষয় ছিল— জনগণের বিরাট বিক্ষোভের প্রকাশ, আর অনেক আশার ফুল। এ রকম চাই না। এ রকম নির্বাচন কেড়ে নেওয়া, গণতন্ত্র হত্যা করা, মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া, মানুষকে হত্যা করা, মানুষকে মানুষ মনে না করা, লুটপাট ইত্যাদি।
তবে নতুন একটা কিছু চাই। সবার মূল লক্ষ্য নতুন বাংলাদেশ বানাতে হবে। আমি মনে করি, ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটের মূল স্পিরিটটাই ছিল এই পরিবর্তন। নতুন কিছু মানে গুণগতভাবে ভালো কিছু। অবশ্য এটা সবারই বোঝা উচিত যে মানুষ যে পরিবর্তন চায়, যার জন্য তারা জানবাজি রেখে লড়াই করে, জীবনকে তুচ্ছ গণ্য করে, সে আরও বড় একটা জীবন পাওয়ার জন্যই। আরও সুন্দর জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র পাওয়ার প্রত্যাশায়। সব আন্দোলনের পেছনেই আবারও আমরা ওই গুণগত রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষায় থাকি। আবার সব অভ্যুত্থানই গুণগত পরিবর্তন করে না। সব অভ্যুত্থানকে তাই বিপ্লব বলা যায় না। বিপ্লবের সঙ্গে একটা গুণগত রূপান্তরের প্রশ্নই জড়িত আছে। যেমন- আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো এত বড় ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে হয়নি। আর ভবিষ্যতেই যে বা কী হবে, আমি তো এরকম এখনই দেখি না।
তবে এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের এই আকাঙ্ক্ষার একটা ভাব জাগ্রত হয়েছিল। এইবারও এমনটা হয়েছিল। অনেক সময় আমরা আশাহত হয়েছি। এবার নানা শঙ্কার পরও আশাবাদী হতে চাই।
সব অভ্যুত্থানই বিপ্লব নয় এই জন্যে যে সব অভ্যুত্থানই গুণগত রূপান্তর ঘটায় না। আর গুণগত রূপান্তর ছাড়া সাধারণত আমরা তাকে বিপ্লব বলি না। এই অভ্যুত্থানের একটা ত্রুটির দিক ছিল—যারা একটা পরিবর্তন চেয়েছে, সরকারের উক্ত পরিবর্তন সাধন করেছে। কিন্তু তারপরে কে আসবে, কারা আসবে, কীভাবে আসবে, এই জিনিসটা স্পষ্ট ছিল না।
এগুলো তো তখনকার তরুণ শিক্ষার্থীসহ সিনিয়র যারা ছিলেন, তাদের কথায় বোঝা গেছে। শেখ হাসিনার সরকার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে যে কতগুলো বড় প্রশ্ন ছিল, সেগুলো আগে ভাবা হয়েছে কিনা, সেগুলোকে প্রপারলি অ্যাড্রেস করা গেছে কিনা।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের যে ইচ্ছা ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে আসা। তিনিও এসেছিলেন। অর্থাৎ ড. ইউনূস কোনও বিপ্লবী মানুষ ছিলেন না। উনি আপাদমস্তক একজন পশ্চিমা গণতন্ত্রের লোক। ওই চিন্তা নিয়েই চলেন। তার সরকার একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের একটা সাংবিধানিক পদ্ধতির মধ্যে নিতে চেয়েছেন।
এই জন্য কীভাবে সরকার গঠিত হবে সেটা সরকারের অনুপস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়েছে। তারপর শপথ নিয়েছেন সেটাও সংবিধান রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়ে। অথচ দেশ একটা গুণগত রূপান্তর চাচ্ছে। সেই গুণগত রূপান্তর সব কিছুই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কি হবে? নাকি অনেক কিছুই পুরোনো ও খারাপ জিনিস ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে, যেটা সংবিধান বলে না। নতুন জিনিস গড়ে তুলতে হবে। যেটা সংবিধানে হয়তো প্রবেশ হয়নি। এই বিতর্কটা পরে দেখা গেছে। আমার এই ভূমিকাটা বলবার পেছনের কারণ হলো যে বিশাল আশা নিয়ে এত বড় একটা কালজয়ী অভ্যুত্থানের মতো বিষয় ঘটলো—যা সমগ্র বিশ্বকে চোখ ভেঙে দেওয়ার মতো। সেটার পরিণতি নিয়ে এখন আমরা আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছি।
এরপরে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন আমি এরকম বলি— আমার দল এরকম করে বলি আমরা। নির্বাচনে ভোটগ্রহণটা ভালো হয়েছে। কিন্তু গণনা এবং ঘোষণা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক এখনও চলছে। অথচ যে স্পিড নিয়ে, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই লড়াইটা করা হয়েছে, সেখানে কিন্তু এইরকম দ্বিধা প্রশ্ন বা বিতর্কের অবকাশ ছিল না।
কয়েকটা আসনে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মামলা হয়েছে। ফলাফল নিয়ে যাই হোক, তারপরও সংসদ বসলো।
এই সংসদ বসবার দিনেই আমরা দেখলাম যে জাতীয় ঐক্য নিয়ে এত বড় বড় কথাবার্তা হলো, সেই জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে বিরাট একটা গ্যাপ আছে। আমি তখন থেকেই বলছি, আজও বলছি, আপনি সংসদীয় গণতন্ত্র করবেন, আবার জাতীয় ঐক্য মানে সব ব্যাপারে ঐক্য হয়ে যাবে, এরকম ভাববেন, তাহলে হবে না।
সেই মুহূর্তেও আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, তাও যে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, এমনও হয়তো না। এরকম পরিবর্তন বহু হয়েছে। এ জন্য এত বড় ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব, তার ফার্স্ট রেভ্যুলেশন, সেকেন্ড রেভ্যুলেশন, থার্ড রেভ্যুলেশন এরকম হয়েছে—অর্থাৎ ফার্স্ট রিপাবলিক, সেকেন্ড রিপাবলিক, থার্ড, ফিফথ পর্যন্ত হয়েছে। এখানেও এই ধরনের ট্রেন্ডটা আসছে।
কত বিতর্ক হয়েছে। তারপরও এই সংসদ শুরু হলো। শুরুতেই একটা ওয়াক আউট হলো। সেই ওয়াক আউট বা হইচইয়ের মধ্যেই একটা অভিযোগ উঠলো যে জাতীয় সংগীতের অবমাননা করা হয়েছে। দাঁড়িয়ে সম্মান দেওয়া হয়নি। আবার জুলাই আন্দোলন যারা করেছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, তারা যে জাতীয় সংগীতের অবমাননা করতে চায় বা মানতে চায় না, এটা আমার কখনও মনে হয়নি।
দেখলাম, তাদের এক নেতা সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন। আমি পাঠকদের ভেবে দেখার অনুরোধ করছি, কতগুলো মীমাংসিত ইস্যু নিয়ে বিতর্ক শুরু করা হয়েছে।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ভূমিকা নিয়ে অভিযুক্ত। তাদের বিচার ও সাজা হয়েছে। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন করেছে। আর তারা জাতীয় সংগীত মানে না—এ রকম যদি হয়, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক। অবশ্য এ ব্যাপারে জামায়াতের কোনও বক্তব্য আমাদের চোখে পড়েনি। তাদের ব্যাপারে আমি মন্তব্য করছি না।
কিন্তু যারা এনসিপি করেন, তারা জাতীয় সংগীত মানবে না, ভাবলে কেমন হয়? এই অভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকার সময় তো এমনটি মনে হয়নি।
এখন তারা কী এমন যে সেই সময় তারা মনে মনে আমাদের স্বাধীনতা ও জাতীয় সংগীতের বিরোধী ছিল? সেই জন্যই সম্মান দেয়নি। সে রকম তো তাদের বর্তমান কথা শুনে মনে হয় না।
আজকে আবার দেখলাম, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা বলছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা না ডাকলে তারা রাজপথে নামবেন ও আন্দোলন করবেন। এটাও একটা মুশকিলের বিষয়। সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে আমরা তখনও একমত হয়েছি।
কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের আলাদা অস্তিত্ব ও তার আলাদা শপথ এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়নি। ফলে এখন যেরকম করে ক্ষমতাসীন দল প্রশ্ন করছে যে যেহেতু এটা সংবিধানে নেই, তাই এরকম শপথ দেবে না। তারা শপথ দেবে তখনই, যদি এটা সংবিধানের অন্তর্গত হয়। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি কি রাজপথে যাবে? যদি যায়, তাহলে যে আশা আমরা করেছি, সবাই মিলে একটা কিছু করবো, এরকম তো আমি সুযোগ দেখছি না।
এখন যারা ক্ষমতায় গেছেন, তাদের সঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছর প্রায় একসাথে আন্দোলন করেছি, দেখেছি, চিনেছি। অনেক দূরত্বে ছিল জামায়াতে ইসলামী। তাদের সঙ্গেও তুলনামূলক কাছাকাছি যেতে হয়েছে। এখন আমি বা আমরা, আমার দল, আমাদের দল, আমরা এইটার মধ্যে কোথাও নেই। আমরা আপাতত সংসদেও নেই। আপনারা যারা সংসদে আছেন, তাদের কাছে আশা করি—এ বিষয়টাকে যাতে তারা assimilate করেন ও accommodate করে সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কখনও যদি বিতর্কটা এমন হয় যে রাজপথে গড়ালো, একটা পজিশন নেবার প্রশ্ন আছে, তখন সেটা ভাববো। কিন্তু তার আগের পর্যন্ত আমি দেখছি, সরকারি দল যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাকেসহ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ accommodative আচরণ লক্ষ করা গেছে। তারা যে ধরনের কথাবার্তা বলছেন তাতে মনে হয়, তারা সমঝোতার মাধ্যমে সংসদটা চালানোর চেষ্টা করছেন। অথচ এই জায়গাতে একটা ঝামেলা হয়ে গেলো শুরুতেই। সংস্কার কি হবে? সংস্কারের ব্যাখ্যাটা কী? এখন মনে হয়, আমরা সবাই মিলে জুলাই সনদে সই করলেও জুলাই সনদকে একই রকম করে ব্যাখ্যা করছি না।
জুলাই সনদের ব্যাখ্যায় এখন সরকারি দল, বিরোধীদল আলাদা আলাদা কথা বলবে। তার মানে শুধু সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক হলো স্বার্থগত। বস্তুগত বিতর্ক ওই জায়গাতে হবে। মানে গণতন্ত্রায়ণের যুদ্ধে সংবিধান, প্রশাসন, সরকার ও পার্লামেন্ট চলার প্রক্রিয়া পদ্ধতিটিতে যেসব প্রস্তাব এসেছে, যেগুলো আমরা সই করেছি, সেই ব্যাপারগুলোতেও বিতর্ক দেখছি। এগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে তা জানি না। যেমন বিরোধী দল থেকে স্পিকার হওয়ার ব্যাপারে ডিফারেন্সটা তো খুব ক্লিয়ার হয়ে গেছে। অলরেডি হিসাব মিলাতে পারছি না। এক ব্যক্তির তিনটি পোস্ট এক জায়গায় থাকবে না। এ ব্যাপারে বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়নি। এখনও যে হবে সেটাও বলা যাচ্ছে না। এসব সংস্কারের ব্যাপারে এখনই সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তার মানে লক্ষ্য হিসেবে যা ছিল, সেটা এখন দ্বিধা অথবা আরও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। আর একটা কথা আমি তখন থেকেই বলছি, এখন আবার বলি—এর মধ্যে এই যে ১৩৩টা অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, সেগুলোর কী হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি হয়েছে, সে চুক্তি বলছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব রাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো নয়, সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে হলে আমেরিকার অনুমোদন অনুমোদন নিতে হবে।
এটি নিয়ে সিভিল সোসাইটিসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে বিরোধিতা করতেই দেখেছি। প্রধান বিরোধী দল ইতোমধ্যে বলেছে, তারা চুক্তি সম্পর্কে আগে থেকে জানতো না। আবার ক্ষমতাসীন দল রাশিয়া থেকে গ্যাস আনা যাবে কিনা এটা অনুমোদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছে।
এক ধরনের চুক্তি হয়ে গেলে চট করে বের হওয়া সম্ভব না। কিছুটা জটিল পরিস্থিতি আছে।
একই জায়গায় যখন জাতীয় স্বার্থ জড়িত, তখন জাতীয় ঐক্য বেশি দরকার। পাশাপাশি কথা বলা ও নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করা জরুরি। যখন জাতীয় স্বার্থ জড়িত, তখন জাতীয় ঐক্য বেশি দরকার। পাশাপাশি কথা বলা ও নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করা জরুরি।
আমি জানি না আমার কথার মধ্যে একটু শঙ্কার দিক বেশি আসছে কিনা? কিন্তু আমি মনে করি বলা উচিত। যাতে সবাই সতর্ক থাকেন। সেটা শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতা নন, সচেতন নাগরিক মাত্রই এটা জানা দরকার বলেই বললাম।
আমি আশাবাদী হতে চাই, এত বড় অভ্যুত্থানের পর এত বিশাল জয়-পরাজয় উভয় দিক থেকেই। ক্ষমতাসীন দল বিশাল বিজয় অর্জন করেছে। আবার বিরোধী দলও বিশাল বিজয় অর্জন করেছে।
তাই উভয় পক্ষকেই এই বিজয়ের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমঝোতার পথে যেতে হবে। এটাকে ইতিবাচকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সে বিষয়ে আমি বলবো যে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। দায়িত্ব বেশি হলো ক্ষমতাসীন দলের। যেহেতু তারা সরকার।
এ কিন্তু এখন যে একটা ভয় ও শঙ্কা কাজ করে, সে বিষয়ে সতর্কতা দিয়েই শেষ করবো। আমাদের যাত্রাটা খারাপ হয়নি। ভালোই হয়েছে। যাত্রাপথে যেটুকু শঙ্কার কথা বললাম, এটাও খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এটাকে কতটা যোগ্যতার সঙ্গে উৎরে যেতে পারবো, সেটা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
লেখক: রাজনীতিবিদ, সভাপতি- নাগরিক ঐক্য
তবে নতুন একটা কিছু চাই। সবার মূল লক্ষ্য নতুন বাংলাদেশ বানাতে হবে। আমি মনে করি, ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটের মূল স্পিরিটটাই ছিল এই পরিবর্তন। নতুন কিছু মানে গুণগতভাবে ভালো কিছু। অবশ্য এটা সবারই বোঝা উচিত যে মানুষ যে পরিবর্তন চায়, যার জন্য তারা জানবাজি রেখে লড়াই করে, জীবনকে তুচ্ছ গণ্য করে, সে আরও বড় একটা জীবন পাওয়ার জন্যই। আরও সুন্দর জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র পাওয়ার প্রত্যাশায়। সব আন্দোলনের পেছনেই আবারও আমরা ওই গুণগত রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষায় থাকি। আবার সব অভ্যুত্থানই গুণগত পরিবর্তন করে না। সব অভ্যুত্থানকে তাই বিপ্লব বলা যায় না। বিপ্লবের সঙ্গে একটা গুণগত রূপান্তরের প্রশ্নই জড়িত আছে। যেমন- আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মতো এত বড় ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে হয়নি। আর ভবিষ্যতেই যে বা কী হবে, আমি তো এরকম এখনই দেখি না।
তবে এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের এই আকাঙ্ক্ষার একটা ভাব জাগ্রত হয়েছিল। এইবারও এমনটা হয়েছিল। অনেক সময় আমরা আশাহত হয়েছি। এবার নানা শঙ্কার পরও আশাবাদী হতে চাই।
সব অভ্যুত্থানই বিপ্লব নয় এই জন্যে যে সব অভ্যুত্থানই গুণগত রূপান্তর ঘটায় না। আর গুণগত রূপান্তর ছাড়া সাধারণত আমরা তাকে বিপ্লব বলি না। এই অভ্যুত্থানের একটা ত্রুটির দিক ছিল—যারা একটা পরিবর্তন চেয়েছে, সরকারের উক্ত পরিবর্তন সাধন করেছে। কিন্তু তারপরে কে আসবে, কারা আসবে, কীভাবে আসবে, এই জিনিসটা স্পষ্ট ছিল না।
এগুলো তো তখনকার তরুণ শিক্ষার্থীসহ সিনিয়র যারা ছিলেন, তাদের কথায় বোঝা গেছে। শেখ হাসিনার সরকার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে যে কতগুলো বড় প্রশ্ন ছিল, সেগুলো আগে ভাবা হয়েছে কিনা, সেগুলোকে প্রপারলি অ্যাড্রেস করা গেছে কিনা।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের যে ইচ্ছা ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে আসা। তিনিও এসেছিলেন। অর্থাৎ ড. ইউনূস কোনও বিপ্লবী মানুষ ছিলেন না। উনি আপাদমস্তক একজন পশ্চিমা গণতন্ত্রের লোক। ওই চিন্তা নিয়েই চলেন। তার সরকার একটা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে আমাদের একটা সাংবিধানিক পদ্ধতির মধ্যে নিতে চেয়েছেন।
এই জন্য কীভাবে সরকার গঠিত হবে সেটা সরকারের অনুপস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়েছে। তারপর শপথ নিয়েছেন সেটাও সংবিধান রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়ে। অথচ দেশ একটা গুণগত রূপান্তর চাচ্ছে। সেই গুণগত রূপান্তর সব কিছুই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কি হবে? নাকি অনেক কিছুই পুরোনো ও খারাপ জিনিস ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে, যেটা সংবিধান বলে না। নতুন জিনিস গড়ে তুলতে হবে। যেটা সংবিধানে হয়তো প্রবেশ হয়নি। এই বিতর্কটা পরে দেখা গেছে। আমার এই ভূমিকাটা বলবার পেছনের কারণ হলো যে বিশাল আশা নিয়ে এত বড় একটা কালজয়ী অভ্যুত্থানের মতো বিষয় ঘটলো—যা সমগ্র বিশ্বকে চোখ ভেঙে দেওয়ার মতো। সেটার পরিণতি নিয়ে এখন আমরা আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছি।
এরপরে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন আমি এরকম বলি— আমার দল এরকম করে বলি আমরা। নির্বাচনে ভোটগ্রহণটা ভালো হয়েছে। কিন্তু গণনা এবং ঘোষণা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক এখনও চলছে। অথচ যে স্পিড নিয়ে, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই লড়াইটা করা হয়েছে, সেখানে কিন্তু এইরকম দ্বিধা প্রশ্ন বা বিতর্কের অবকাশ ছিল না।
কয়েকটা আসনে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মামলা হয়েছে। ফলাফল নিয়ে যাই হোক, তারপরও সংসদ বসলো।
এই সংসদ বসবার দিনেই আমরা দেখলাম যে জাতীয় ঐক্য নিয়ে এত বড় বড় কথাবার্তা হলো, সেই জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে বিরাট একটা গ্যাপ আছে। আমি তখন থেকেই বলছি, আজও বলছি, আপনি সংসদীয় গণতন্ত্র করবেন, আবার জাতীয় ঐক্য মানে সব ব্যাপারে ঐক্য হয়ে যাবে, এরকম ভাববেন, তাহলে হবে না।
সেই মুহূর্তেও আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, তাও যে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, এমনও হয়তো না। এরকম পরিবর্তন বহু হয়েছে। এ জন্য এত বড় ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব, তার ফার্স্ট রেভ্যুলেশন, সেকেন্ড রেভ্যুলেশন, থার্ড রেভ্যুলেশন এরকম হয়েছে—অর্থাৎ ফার্স্ট রিপাবলিক, সেকেন্ড রিপাবলিক, থার্ড, ফিফথ পর্যন্ত হয়েছে। এখানেও এই ধরনের ট্রেন্ডটা আসছে।
কত বিতর্ক হয়েছে। তারপরও এই সংসদ শুরু হলো। শুরুতেই একটা ওয়াক আউট হলো। সেই ওয়াক আউট বা হইচইয়ের মধ্যেই একটা অভিযোগ উঠলো যে জাতীয় সংগীতের অবমাননা করা হয়েছে। দাঁড়িয়ে সম্মান দেওয়া হয়নি। আবার জুলাই আন্দোলন যারা করেছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, তারা যে জাতীয় সংগীতের অবমাননা করতে চায় বা মানতে চায় না, এটা আমার কখনও মনে হয়নি।
দেখলাম, তাদের এক নেতা সে ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছেন। আমি পাঠকদের ভেবে দেখার অনুরোধ করছি, কতগুলো মীমাংসিত ইস্যু নিয়ে বিতর্ক শুরু করা হয়েছে।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ভূমিকা নিয়ে অভিযুক্ত। তাদের বিচার ও সাজা হয়েছে। তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন করেছে। আর তারা জাতীয় সংগীত মানে না—এ রকম যদি হয়, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক। অবশ্য এ ব্যাপারে জামায়াতের কোনও বক্তব্য আমাদের চোখে পড়েনি। তাদের ব্যাপারে আমি মন্তব্য করছি না।
কিন্তু যারা এনসিপি করেন, তারা জাতীয় সংগীত মানবে না, ভাবলে কেমন হয়? এই অভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকার সময় তো এমনটি মনে হয়নি।
এখন তারা কী এমন যে সেই সময় তারা মনে মনে আমাদের স্বাধীনতা ও জাতীয় সংগীতের বিরোধী ছিল? সেই জন্যই সম্মান দেয়নি। সে রকম তো তাদের বর্তমান কথা শুনে মনে হয় না।
আজকে আবার দেখলাম, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা বলছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা না ডাকলে তারা রাজপথে নামবেন ও আন্দোলন করবেন। এটাও একটা মুশকিলের বিষয়। সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে আমরা তখনও একমত হয়েছি।
কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের আলাদা অস্তিত্ব ও তার আলাদা শপথ এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়নি। ফলে এখন যেরকম করে ক্ষমতাসীন দল প্রশ্ন করছে যে যেহেতু এটা সংবিধানে নেই, তাই এরকম শপথ দেবে না। তারা শপথ দেবে তখনই, যদি এটা সংবিধানের অন্তর্গত হয়। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি কি রাজপথে যাবে? যদি যায়, তাহলে যে আশা আমরা করেছি, সবাই মিলে একটা কিছু করবো, এরকম তো আমি সুযোগ দেখছি না।
এখন যারা ক্ষমতায় গেছেন, তাদের সঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছর প্রায় একসাথে আন্দোলন করেছি, দেখেছি, চিনেছি। অনেক দূরত্বে ছিল জামায়াতে ইসলামী। তাদের সঙ্গেও তুলনামূলক কাছাকাছি যেতে হয়েছে। এখন আমি বা আমরা, আমার দল, আমাদের দল, আমরা এইটার মধ্যে কোথাও নেই। আমরা আপাতত সংসদেও নেই। আপনারা যারা সংসদে আছেন, তাদের কাছে আশা করি—এ বিষয়টাকে যাতে তারা assimilate করেন ও accommodate করে সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কখনও যদি বিতর্কটা এমন হয় যে রাজপথে গড়ালো, একটা পজিশন নেবার প্রশ্ন আছে, তখন সেটা ভাববো। কিন্তু তার আগের পর্যন্ত আমি দেখছি, সরকারি দল যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাকেসহ সরকারের পক্ষ থেকে বেশ accommodative আচরণ লক্ষ করা গেছে। তারা যে ধরনের কথাবার্তা বলছেন তাতে মনে হয়, তারা সমঝোতার মাধ্যমে সংসদটা চালানোর চেষ্টা করছেন। অথচ এই জায়গাতে একটা ঝামেলা হয়ে গেলো শুরুতেই। সংস্কার কি হবে? সংস্কারের ব্যাখ্যাটা কী? এখন মনে হয়, আমরা সবাই মিলে জুলাই সনদে সই করলেও জুলাই সনদকে একই রকম করে ব্যাখ্যা করছি না।
জুলাই সনদের ব্যাখ্যায় এখন সরকারি দল, বিরোধীদল আলাদা আলাদা কথা বলবে। তার মানে শুধু সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক হলো স্বার্থগত। বস্তুগত বিতর্ক ওই জায়গাতে হবে। মানে গণতন্ত্রায়ণের যুদ্ধে সংবিধান, প্রশাসন, সরকার ও পার্লামেন্ট চলার প্রক্রিয়া পদ্ধতিটিতে যেসব প্রস্তাব এসেছে, যেগুলো আমরা সই করেছি, সেই ব্যাপারগুলোতেও বিতর্ক দেখছি। এগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হবে তা জানি না। যেমন বিরোধী দল থেকে স্পিকার হওয়ার ব্যাপারে ডিফারেন্সটা তো খুব ক্লিয়ার হয়ে গেছে। অলরেডি হিসাব মিলাতে পারছি না। এক ব্যক্তির তিনটি পোস্ট এক জায়গায় থাকবে না। এ ব্যাপারে বিতর্কের নিষ্পত্তি হয়নি। এখনও যে হবে সেটাও বলা যাচ্ছে না। এসব সংস্কারের ব্যাপারে এখনই সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তার মানে লক্ষ্য হিসেবে যা ছিল, সেটা এখন দ্বিধা অথবা আরও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। আর একটা কথা আমি তখন থেকেই বলছি, এখন আবার বলি—এর মধ্যে এই যে ১৩৩টা অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, সেগুলোর কী হবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি হয়েছে, সে চুক্তি বলছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব রাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো নয়, সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে হলে আমেরিকার অনুমোদন অনুমোদন নিতে হবে।
এটি নিয়ে সিভিল সোসাইটিসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে বিরোধিতা করতেই দেখেছি। প্রধান বিরোধী দল ইতোমধ্যে বলেছে, তারা চুক্তি সম্পর্কে আগে থেকে জানতো না। আবার ক্ষমতাসীন দল রাশিয়া থেকে গ্যাস আনা যাবে কিনা এটা অনুমোদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠিয়েছে।
এক ধরনের চুক্তি হয়ে গেলে চট করে বের হওয়া সম্ভব না। কিছুটা জটিল পরিস্থিতি আছে।
একই জায়গায় যখন জাতীয় স্বার্থ জড়িত, তখন জাতীয় ঐক্য বেশি দরকার। পাশাপাশি কথা বলা ও নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করা জরুরি। যখন জাতীয় স্বার্থ জড়িত, তখন জাতীয় ঐক্য বেশি দরকার। পাশাপাশি কথা বলা ও নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করা জরুরি।
আমি জানি না আমার কথার মধ্যে একটু শঙ্কার দিক বেশি আসছে কিনা? কিন্তু আমি মনে করি বলা উচিত। যাতে সবাই সতর্ক থাকেন। সেটা শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতা নন, সচেতন নাগরিক মাত্রই এটা জানা দরকার বলেই বললাম।
আমি আশাবাদী হতে চাই, এত বড় অভ্যুত্থানের পর এত বিশাল জয়-পরাজয় উভয় দিক থেকেই। ক্ষমতাসীন দল বিশাল বিজয় অর্জন করেছে। আবার বিরোধী দলও বিশাল বিজয় অর্জন করেছে।
তাই উভয় পক্ষকেই এই বিজয়ের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমঝোতার পথে যেতে হবে। এটাকে ইতিবাচকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সে বিষয়ে আমি বলবো যে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। দায়িত্ব বেশি হলো ক্ষমতাসীন দলের। যেহেতু তারা সরকার।
এ কিন্তু এখন যে একটা ভয় ও শঙ্কা কাজ করে, সে বিষয়ে সতর্কতা দিয়েই শেষ করবো। আমাদের যাত্রাটা খারাপ হয়নি। ভালোই হয়েছে। যাত্রাপথে যেটুকু শঙ্কার কথা বললাম, এটাও খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এটাকে কতটা যোগ্যতার সঙ্গে উৎরে যেতে পারবো, সেটা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
লেখক: রাজনীতিবিদ, সভাপতি- নাগরিক ঐক্য




