আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড: জেএমবি’র নতুন-পুরনো ধারা

Send
দীপু সারোয়ার
প্রকাশিত : ১৫:০৩, জুন ০১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৯, জুন ০১, ২০১৭

দীপু সারোয়ার২ মার্চ, ২০০৬। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল সোয়া ৭টা। স্থান: পূর্ব শাপলাবাগ, টিলাগড়, সিলেট। শাপলাবাগের একটি বাড়ির নাম ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’। একতলা ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া নিষিদ্ধ জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমান বেরিয়ে এলো। শায়খ আবদুর রহমানকে বিষন্ন, বিপর্যস্ত লাগছিল এ সময়।
আমরা গণমাধ্যম কর্মীরা ঘুমহীন ছিলাম। টানটান উত্তেজনা। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। এক সেকেন্ডের জন্যও সূর্যদীঘল বাড়ি থেকে চোখ সরেনি কারও। পাউরুটি, কলা ছাড়া অন্য কোনও খাবার খাওয়ার সময় পাচ্ছিলাম না আমরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাত থেকে ‘বিগ ফিশ’ শায়খ আবদুর রহমানকে ধরতে সিলেটে চলে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান-র‌্যাবের অভিযান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের বিপুল সংখ্যক সদস্যদের পাশাপাশি ওই অভিযানে র‌্যাবকে সহযোগিতা করে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’র ছাদ ফুটো করে ‘হান্টিং গ্লাস’র মাধ্যমে শায়খ রহমান, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগিদের অবস্থান শনাক্ত করেন। ভেতরে থাকা বিস্ফোরক ও দেশীয় অস্ত্রের বিষয়েও র‌্যাবকে ধারণা দেন তারা। আমি তখন একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টার।
শায়খ আবদুর রহমান সাদামাদা আত্মসমর্পণ করবে এ আমাদের ধারণার বাইরে ছিল। রক্তপাত আর প্রাণহানির আশঙ্কা শুধু গণমাধ্যম কর্মীরা না, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান-র‌্যাবও করেছিল। দেশবাসীর ধারণাও এমনই ছিল। শায়খ আবদুর রহমান হুঙ্কার দিয়েছিলো-‘জীবিত ধরা দেবে না। তাগুত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে শহীদ হবে সে। প্রয়োজনে নিজেকে উড়িয়ে দেবে। অভিযানের সাথে জড়িতদের নির্মম মৃত্যু হবে।’ শেষ পর্যন্ত এসব বুলি ফাঁকা বুলি হিসেবে প্রমাণ হলো। আত্মসমর্পণ করলো শায়খ আবদুর রহমান।
শায়খ আবদুর রহমান প্রতিষ্ঠিত জেএমবিই এদেশে আত্মঘাতী হামলা শুরু করে। কিন্তু ‘গুরু’ শায়খ রহমান নিজে আত্মঘাতী হওয়ার সাহস দেখায়নি। তার অসহায় আত্মসমর্পণে স্ত্রী নূরজাহান বেগম রুপাও বিস্মিত হয়েছিল। বলেছিল- ‘উনি না শহীদ হতে চেয়েছিলেন! কই হলেন না যে!’ রুপা ২০০৬ সালে ২ মার্চ শায়খ আবদুর রহমানের সাথেই গ্রেফতার হয়। পরে জামিনে ছাড়া পায় সে। ঝালকাঠির দুই বিচারক হত্যা মামলায় রহমানের ফাঁসির রায় কার্যকর হয় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ। 

২০০৪ সালে বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে শায়খ রহমান ও তার অপারেশনাল কমান্ডার সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইয়ের সাথে একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে আমার। তখন শায়খ রহমান ‘শহীদ মৃত্যু’র কথা বলতো। তার বক্তব্যে আগুন ঝরতো। রক্ত ছাড়া কিছুই দেখতো না সে।  

যে শায়খ রহমানের কণ্ঠে জিহাদ আর শহীদী মৃত্যু ছাড়া কিছু শুনি নাই; সেই শায়খ রহমান যখন অসহায় আত্মসমর্পণ করে তখন বোঝা যায় শহীদী মৃত্যু নয়, জীবিত থাকাতেই বেশি আনন্দ ছিল তার। তবে নিজে সাহস না দেখালেও আত্মঘাতী হওয়ার যে শিক্ষা অনুসারিদের মধ্যে রেখে গেছে সে, এর শেষ কোথায় জানা নেই আমাদের। 

এবার শায়খ আবদুর রহমানের জেএমবি’র আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের দিকে আলোকপাত করি। ইসলামী ছাত্র শিবির ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা শায়খ রহমান ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে জেএমবি প্রতিষ্ঠাতা করে। 

শুরুতে সংগঠনটির কর্মকাণ্ড দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা এবং বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে কট্টর বামপন্থী গোপন সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি’র সদস্যদের হত্যা করে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে আলোচিত হয় জেএমবি। ওই অঞ্চলের আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও বাসদ নেতাদেরও টার্গেট করেছিল সংগঠনটি। 

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ৬৪টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর সর্বত্র ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয় জেএমবি। ১৭ আগস্টের বোমা হামলা জেএমবি’র কর্মীদের সাহস বাড়ায়। ২০০৫ সালের অক্টোবরেই শুরু হয় জেএমবি’র আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড।  

হালে নব্য জেএমবি’র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার চেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মঘাতী হওয়াই শ্রেয় মনে করছে। মূলধারার জেএমবি পরিচালিত আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে সেরকম ঘটনা চোখে পড়বে মাত্র একটি। ঘটনাটি ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ কুমিল্লায় সংঘটিত হয়।  

চলতি বছরের মার্চে মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরপুরে ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ ও ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ অভিযান পরিচালনা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নাসিরপুর জঙ্গি আস্তানায় যে সাতজন নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে চারজন শিশু ছিল। তিনজন জঙ্গি শিশুদের মাঝখানে বসিয়ে আত্মঘাতী হওয়ায় শিশুরা নিহত হয়েছে। অর্থাৎ জঙ্গিদের কাছ থেকে তাদের শিশু সন্তানরাও নিরাপদ নয়।’

মূলধারার জেএমবি ও নব্য জেএমবি’র আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলামের বক্তব্যের তাৎপর্য বোঝা যাবে। আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে মূলধারার জেএমবি’র চেয়ে নব্য জেএমবি অনেক বেশি সফল তা-ও জানা যাবে। 

মূলধারার জেএমবি’র আত্মঘাতি কর্মকাণ্ডের সময়কাল ছিল প্রায় ৬ মাস। ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর শুরু হয়ে শেষ হয় ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথিপত্র বলছে, নব্য জেএমবি’র আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর। এর শেষ কবে হবে তা বলতে পারছেন না কেউই।  

মূলধারার জেএমবি’র আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড:

মূলধারার জেএমবি’র প্রথম আত্মঘাতী হামলাটি হয় ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামে। তবে ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এ ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ে জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের এক সদস্য। প্রথম হামলার লক্ষ্য ছিল দুই বিচারক, আইনজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও বিচারপ্রার্থী মানুষ। এরপর ওই বছরেই ঝালকাঠি, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনায় আরও ৫টি আত্মঘাতী হামলা হয়। এসব হামলায় দুই বিচারক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য, ৫ আইনজীবীসহ নিহত হয় ২২ জন। এর মধ্যে ৩টি হামলায় জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের ৩ সদস্য নিহত হয়। আর অপর ২টি হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ধরা পড়ে ২ আত্মঘাতী। এসব আত্মঘাতী হামলার বাইরেও জেএমবি’র আরও একটি আত্মঘাতী ঘটনা রয়েছে। তবে সেটি হামলা নয়। সেটি হলো আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর অভিযানের মুখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শীর্ষ জেএমবি নেতার আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা। 

২০০৫ সালে ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম আদালতের দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন এবং মহানগর হাকিম আকরাম হোসেনের এজলাসে আত্মঘাতী হামলা চালায় জেএমবি জঙ্গি শাহাদাত আলী ওরফে লাল্টু। বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে রাখা বোমা ১০ মিনিটের ব্যবধানে দু’জন বিচারকের এজলাসে ছুড়ে মারে সে। ছুড়ে মারা বোমা দু’টি বিচারকদের টেবিলের ওপর পড়ে। তবে বিস্ফোরিত না হওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। 

ওইদিন বেলা ১২টার দিকে মহানগর হাকিম আকরাম হোসেনের এজলাসে বোমা ছুড়ে মারার ১০ মিনিট পর বিচারক আবু সৈয়দ দিলজার হোসেন এজলাসে ঢোকার চেষ্টা করে জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য শাহাদাত। পরে বাঁধা পেয়ে বিচারককে লক্ষ্য করে ‘বই বোমা’ নিক্ষেপ করে সে। এ সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ ও আইনজীবীদের ধাওয়ায় ধরা পড়ে শাহাদাত। এটিই ছিল জেএমবি’র প্রথম আত্মঘাতী হামলা। 

চট্টগ্রামে বিচারক হত্যায় ব্যর্থ হলেও ঝালকাঠিতে সফল হয় জেএমবি। ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠির আদালতে বোমা হামলা চালায় জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন। ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ এবং বরিশালের শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় আরেক সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাড়েঁর। তবে প্রাণে বেঁচে যায় আত্মঘাতী ইফতেখার। দুই বিচারক হত্যা মামলায় ইফতেখারের ফাঁসির রায় কার্যকর হয় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ। 

২০০৫ সালের ২৯ নভেম্বর সকালের দিকে গাজীপুর আইনজীবী সমিতি কার্যালয়ে জেএমবি’র আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেনসহ ৯ জন। বোমা হামলাকারী নিজেও নিহত হয় এ ঘটনায়। তার নাম শরিয়ত উল্লাহ ওরফে আসাদুল ইসলাম। 

একই দিন সকাল ৯টা ৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের পুলিশ চেক পোস্টের সামনে হামলা চালায় জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য আবুল বাশার। এ ঘটনায় নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল রাজীব বড়ুয়া ও ফুটবলার শাহাবুদ্দীন। ঘাতক আবুল বাশার নিজেও নিহত হয় এ ঘটনায়।

২০০৫ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে গাজীপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে হামলা চালায় জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য আব্দুর রাজ্জাক। এ ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তাসহ দু’জন নিহত হন। আর গুরুতর আহত অবস্থায় ধরা পড়ে রাজ্জাক। তাকে প্রথমে গাজীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও পরে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। গাজীপুর ও ঢাকার হাসপাতালে আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে এই লেখকের কথা হয়। চাপাইনবাবগঞ্জে বাড়ি তার। ওই সময় অনেক কথাই বলেছিল সে। ২০ বছর বয়সের রাজ্জাক অনুতপ্ত ছিল না। সে আমাকে সরাসরি বলে, ‘আমি আল্লাহর নির্দেশে বোমা হামলা করেছি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ছিল আমার টার্গেট। কিন্তু ‘তাগুত বাহিনী’র (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) কারণে পারলাম না। আমি শহীদ হতে চাই।’ রাজ্জাকের সাথে আরও অনেক কথাই হয়েছিল। তার কাছ থেকেই জানতে পারি গাজীপুরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ‘পিসকোর’ সদস্যদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল জেএমবি।

২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেত্রকোনা জেলা সংসদ কার্যালয়ের সামনে হামলা চালায় জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য আব্দুল্লাহ আল কাফি। এতে উদীচীর সাধারণ সম্পাদক খাজা হায়দার হোসেনসহ নিহত হন ৭ জন। ঘাতক কাফিও নিহত হয় এ সময়। 

মূলধারার জেএমবির ভিন্নমাত্রার আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড:

শায়খ আবদুর রহমান ২০০৬ সালের ২ মার্চ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে শীর্ষ নেতাদের অবস্থান সম্পর্কে অনেক তথ্য দেয়। সেরকমই এক তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ র‌্যাবের তিন শতাধিক সদস্য কুমিল্লার কালিয়াজুড়ি এলাকায় অভিযান চালান। অভিযান চলে কালিয়াজুড়ি এলাকার ‘জান্নাতুল শাফি’ ভবনে। দোতালা ওই ভবনেই বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় জেএমবি’র তৎকালীন সামরিক শাখার প্রধান শাকিল আহমেদ ওরফে মোল্লা ওমর, তার স্ত্রী সাঈদা নাঈম সুমাইয়া এবং তাদের শিশুকন্যা সাঈদা ও মিম। এর আগে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে পরিচিত ছিল না বাংলাদেশ। 

নব্য জেএমবির আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড:

মূলধারার জেএমবি’র মতো নব্য জেএমবি’র আত্মঘাতী তৎপরতাও শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকেই। সংগঠনটি ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট-আইএসপন্থী হিসেবে পরিচিত। নব্য জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য মান্নান ও রমজান ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুপুরে নৌবাহিনীর বানৌজা ঈশা খান ঘাঁটির দুই মসজিদে ১০ মিনিটের ব্যবধানে গ্রেনেড ও বোমা হামলা চালায়। এ ঘটনায় আহত হন ২৪ জন। ঘটনার দিন আত্মঘাতী জ্যাকেট পরে দুই মসজিদে যায় জঙ্গিরা। গ্রেনেড ও হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলেও বুকে জড়ানো আত্মঘাতী জ্যাকেটের বৈদ্যুতিক সুইচ কাজ না করায় তাতে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি তারা। ছদ্মবেশ ধারণ করে নৌবাহিনীতে অস্থায়ী বেসামরিক চাকরি নেওয়া এই দু’জনকে চাকরি পাইয়ে দেয় নৌসদস্য এম সাখাওয়াত। ঘটনার পর থেকেই পলাতক সে। ঘটনার ৯ মাস পর গত বছরের (২০১৬) ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগরীরর ইপিজেড থানায় সন্ত্রাস দমন এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করে নৌবাহিনী। 

নব্য জেএমবি’র দ্বিতীয় আত্মঘাতী হামলার ঘটনাটি ঘটে রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে। ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ওই হামলা চালায় জেএমবি’র আত্মঘাতী দলের সদস্য তারেক আজিজ। এ ঘটনায় ১০ মুসল্লি আহত হন। আর নিহত হয় আত্মঘাতী তারেক আজিজ। 

২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে ধরা না দিয়ে আত্মঘাতী হয় নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতা তানভীর কাদেরী। তানভীর তার স্ত্রী ও এক সন্তানকেও আত্মঘাতী হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু আত্মঘাতী হওয়ার আগেই কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে ধরা পড়ে তারা। 

একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর আশকোনায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে ধরা না দিয়ে শরীরে থাকা বিস্ফোরক বন্ধনীর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় নব্য জেএমবি’র নারী সদস্য শাকিরা। এ সময় শাকিরার শিশুকন্যা সাবিনা আহত হয়। তাকে নিয়েই আত্মঘাতী হতে চেয়েছিল শাকিরা। আশকোনায় আরও একজন আত্মঘাতী হয়। সে হলো তানভীর কাদেরীর ছেলে আফিফ কাদেরী। 

চলতি বছরের ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানা ‘ছায়ানীড়’ ভবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নারীসহ চারজন নিহত হয়। 

১৭ মার্চ হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর সংলগ্ন প্রস্তাবিত র‌্যাব সদর দফতরের অস্থায়ী ব্যারাকে দেওয়াল টপকে ঢুকে পড়ে এক জঙ্গি। এ সময় তাকে চ্যালেঞ্জ করা হলে শরীরে থাকা বিস্ফোরক বন্ধনীর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় সে।  

২৪ মার্চ হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকার গোলচত্বরে পুলিশ চেকপোস্টের সামনে শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক বন্ধনীর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় এক জঙ্গি।

২৩ মার্চ বৃহষ্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে সিলেটের শিববাড়িতে জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহল’ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২৪ মার্চ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করেন। ২৫ মার্চ শুরু হয় সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযান ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’। এটিই স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ জঙ্গিবিরোধী অভিযান। ২৮ মার্চ এই অভিযানের সমাপ্তি টানে সেনাবাহিনী। দেশে বিদেশে বহুল আলোচিত এই অভিযানের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক নারীসহ ৪ জঙ্গি নিহত হয়। 

২৮ মার্চ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে মৌলভীবাজারের বড়হাটে একটি দোতালা বাড়ি জঙ্গি আস্তানা হিসেবে শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২৯ মার্চ ভোরে বড়হাট থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নাসিরপুরে আরও একটি জঙ্গি আস্তানা শনাক্ত হয়। ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ নাম দিয়ে সেখানে অভিযান চালায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। অভিযান চলে ৩০ মার্চ পর্যন্ত। সেখানে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয় নব্য জেএমবির অন্যতম শীর্ষ নেতা দিনাজপুরের লোকমান হোসেন, তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার এবং তাদের পাঁচ মেয়ে। এদের মধ্যে ৪ জন শিশু ছিল। 

৩১ মার্চ বড়হাটের জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ শুরু করে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ১ এপ্রিল এই অভিযানের সমাপ্তি টেনে জানানো হয়, অভিযানের সময় জঙ্গিদের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুই পূরুষ ও এক নারী নিহত হয়েছে। 

২৭ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানায় অপারেশন ‘ইগল হান্টে’ ৪ জঙ্গি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে দুই জঙ্গি আত্মঘাতী হয় বলে দাবি পুলিশের। ২৬ এপ্রিল ওই আস্তানা ঘিরে অভিযান শুরু করেছিল পুলিশ। অভিযান চলাকালে এক নারী ও এক শিশুকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।

৭ মে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়োবাড়ীয়া ইউনিয়নের লেবুতলা গ্রামের এক বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ওই অভিযানে নব্য জেএমবি’র দুই সদস্য নিহত হয়। পুলিশের দাবি এদের একজন আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়।

১০ মে রাজশাহীর হাবাসপুরে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি বাড়িতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। ‘অপারেশন সান ডেভিল’ নামে ওই অভিযান শেষ হয় ১২ মে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় দুই নারীসহ ৫ জঙ্গির লাশ। এদের মধ্যে দু’জন আত্মঘাতী হয় বলে দাবি পুলিশের। 

নব্য জেএমবি’র ১৪টি আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে প্রায় একই সময়ে নব্য জেএমবি পরিচালিত দু’টি আত্মঘাতী হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। নৌবাহিনীর দু’টি মসজিদে চালানো হামলায় নৌবাহিনীর সদস্যদের হত্যাই ছিল নব্য জেএমবি’র ওই হামলার উদ্দেশ্য। নৌবাহিনীকে কথিত জিহাদের অন্যতম প্রতিপক্ষ মনে করে নব্য জেএমবি। 

২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর নব্য জেএমবি’র দ্বিতীয় আত্মঘাতী হামলার লক্ষ্যও সুনির্দিষ্ট। দ্বিতীয় হামলাটি হয় রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া মসজিদে। ওই হামলায় নব্য জেএমবি’র এক আত্মঘাতী সদস্য নিহত হয়। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম মনে করে নব্য জেএমবি। 

নব্য জেএমবি’র এরপরের ৩টি আত্মঘাতী ঘটনা সংঘটিত হয় যথাক্রমে ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরে, একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার আশকোনায় এবং চলতি বছরের ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। আগের ৩টি আত্মঘাতীয় ঘটনার সাথে এর পার্থক্য স্পষ্ট। কারণ আজিমপুর, আশকোনা ও সীতাকুণ্ডে আত্মঘাতী হামলা নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় আত্মসমর্পণ না করে আত্মঘাতী হয় নব্য জেএমবি’র ৭ সদস্য। নিহতদের মধ্যে জেএমবি’র নারী সদস্যও রয়েছে। এর মধ্যে আজিমপুর ও আশকোনায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়েই আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করে নব্য জেএমবি’র দুই সদস্য।   

চলতি বছরের ১৭ মার্চ ও ২৪ মার্চ নব্য জেএমবি ঢাকায় দু’টি আত্মঘাতী হামলা চালায়। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর সংলগ্ন র‌্যাব সদর দফতরের অস্থায়ী ব্যারাক ও পুলিশ চেকপোস্টে চালানো ওই দু’টি হামলার টার্গেট ছিলেন র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। এ দু’টি হামলা প্রমাণ করে হামলার টার্গেট করে র‌্যাব-পুলিশকে ভয় দেখাতে চায় নব্য জেএমবি। 

চলতি বছরের ২৩ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ সিলেটে, ২৮ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরপুরে, ২৬ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে, ৭ মে ঝিনাইদহের লেবুতলায় এবং ১০ মে থেকে ১২ মে পর্যন্ত রাজশাহীর হাবাসপুরে পুলিশের অভিযানের সময় আত্মসমর্পণ না করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মঘাতী হয় নব্য জেএমবি’র সদস্যরা। এসব অভিযানে নিহত হয় ২৫ জন। এদের মধ্যে ১৯ জনই আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে নিহত হয়। 

আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মূলধারার জেএমবি নেতা মোল্লা ওমর আত্মঘাতী হয় ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনও জঙ্গি নেতার আত্মঘাতী হওয়ার প্রথম ঘটনা এটি। এ ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর আইএসপন্থী নব্য জেএমবি’ও ওই ধরনের আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড আবারও শুরু করেছে। নব্য জেএমবি’র ‘আত্মঘাতী’ কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় তা-ই দেখতি পাচ্ছি আমরা। কথিত জিহাদের নামে পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যদেরও আত্মঘাতী করতে দ্বিধা করছে না সংগঠনটি। 

জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান ধর্মরাষ্ট্র’র দাবি তুলেছিল। এই দাবি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবেই আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড শুরু করেছিল শায়খ আবদুর রহমান ও অনুসারীরা। তাদের মতো যারা বিশ্বাস করতেন না তাদের সবাইকেই ‘তাগুত’ মনে করত সে। শায়খ আবদুর রহমান এখন নেই, তাতে কী। তার মতো আরও ক’জন আছেন, যারা দূরে বহুদূরে বসে কলকাঠি নাড়ছেন। তারা নিজেরা আত্মঘাতী না হলেও, কর্মীদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার মন্ত্র ছড়িয়ে দেওয়ার মাঝেই রয়ে গেছে তাদের স্বার্থকতা। 

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, একুশে টেলিভিশন

 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ