মুক্ত সফটওয়্যার দিবস ও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বাধীনতা

Send
জিশান হাসান
প্রকাশিত : ১৬:০৪, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭

জিশান হাসান১৬ সেপ্টেম্বর, শনিবার মুক্ত সফটওয়্যার স্বাধীনতা দিবস। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি দিবসটি পালন করা হয়। কারণ, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই সময়ে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রতিবছর কয়েক লাখ নতুন কম্পিউটার কিনতে হয়। মুক্ত সফটওয়্যার দিবসে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিভিন্ন সফটওয়্যারের (যেমন লিবরা অফিস ও লিনাক্স) বিষয়ে ধারণা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা যখন নতুন কম্পিউটার কিনছে, তখন মুক্ত সফটওয়্যারের বিষয়ে প্রচারণা চালিয়ে তাদের অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বা  মাইক্রোসফট অফিস-এর মতো সফটওয়্যার পাইরেসি থেকে বিরত রাখা সম্ভব। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই কারণে মুক্ত সফটওয়্যার দিবস পালন করা উচিত। এতে করে বিনামূল্যে যেসব সফটওয়্যার পাওয়া যায়, সেগুলো ডাউনলোড ও ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারবে শিক্ষার্থীরা।
অনেক বাংলাদেশিই মুক্ত সফটওয়্যার দিবস সম্পর্কে জানেই না এবং দিবসটির তাৎপর্য সম্পর্কেও অবগত নয়। যখন কোনও খরচ ছাড়াই মাইক্রোসফট অফিস ও উইন্ডোজের মতো সফটওয়্যার পাইরেসি কপি ইন্সটল করতে পারছে, তখন মুক্ত সফটওয়্যারের বিষয় নিয়ে তাদের কেন মাথা ব্যথা থাকবে?
ঘটনা হলো, বেশির ভাগ বাংলাদেশি কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা পাইরেটেড সফটওয়্যার সম্পর্কে ভুল ধারণা রাখে। মাইক্রোসফট অফিস কিনতে খরচ পড়ে ২০০ ডলার এবং মাইক্রোসফট উইন্ডোজের জন্য প্রয়োজন পড়ে আরও ১০০ ডলার। বাংলাদেশের আইনে সফটওয়্যার পাইরেসি নিষিদ্ধ এবং এই সব সফটওয়্যারের মূল্য আইনত পরিশোধ করা উচিত। প্রতিটি কম্পিউটারের জন্য এমএস অফিস ও উইন্ডোজের জন্য খরচ পড়ে ৩০০ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৪ হাজার টাকা। সফটওয়্যারের এই মূল্য কম্পিউটারের মৌলিক হার্ডওয়্যারের মূল্যের প্রায় কাছাকাছি। কেন লোকজন পাইরেসি করে, তা এখান থেকে ধারণা পাওয়া যায়। পাইরেসির ব্যাপকতার জন্য মাইক্রোসফটের সফটওয়্যার বিনামূল্যে পাওয়া যায় বলে ধারণা বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই অবস্থা অনন্তকাল চলবে না।

বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো আকারে যত বিস্তৃত ও ব্যাপৃত হতে থাকবে, মাইক্রোসফটের আইনজীবীরা এসব কোম্পানির কম্পিউটারগুলোতে ব্যবহৃত এমএস সফটওয়্যারের লাইসেন্স ফি পরিশোধের জন্য আদালতে মামলা দায়ের করতে শুরু করবেন। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গার্মেন্টস পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা দাবি করে আসছে। সঙ্গত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশকে সফটওয়্যার পাইরেসির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে চাপ দেবে। এসব সফটওয়্যারের পাইরেটেড কপি বাজারে ডিভিডিতে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে এমএস অফিস, এমএস আউটলুক এক্সপ্রেস ও এমএস উইন্ডোজের কারণে কম্পিউটারের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। সুখবর হলো, এই মূল্য বৃদ্ধি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য মুক্ত/ওপেন সোর্স সফটওয়্যারগুলোর কল্যাণেই এটি সম্ভব। যেমন- লিবরা অফিস (www.libreoffice.org), থান্ডারবার্ড মেইল (https://www.moziall.org/en-GB/thunderbird/) এবং উবুন্টু লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম (www.ubuntu.com/desktop)। এইসব সফটওয়্যার মাইক্রোসফট সফটওয়্যারগুলোর ফ্রি কপি। কম্পিউটারের প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারগুলোর জন্য মূল্য পরিশোধ স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু মুক্ত/ওপেন সোর্স বিকল্প সফটওয়্যারের কারণে সাধারণভাবে ব্যবহৃত এমএস সফটওয়্যারের জন্য এখন আর টাকা খরচ করতে হবে না।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের একটি হলো সচেতনতা তৈরি। খুব কম লোকই বিকল্প মুক্ত/ওপেন সোর্স সফটওয়্যার সম্পর্কে জানে। যদিও মুক্ত সফটওয়্যারের সুবিধা অনেকেই ভোগ করছে অ্যান্ড্রয়েড ফোন অপারেটিং সিস্টেমের কারণে। (এই অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স নির্ভর এবং এজন্যই আইফোনের চেয়ে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের দাম অনেক কম)।

মুক্ত সফটওয়্যার দিবস আধুনিক অর্থনীতিতে, আধুনিক জীবনে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার যে প্রয়োজনীয় উপাদান, সেটির গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে দিবসটি মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করে। কারণ, মানুষ যদি মুক্ত সফটওয়্যারের ব্যবহার ও অধিকার সম্পর্কে না জানে, তাহলে  মাইক্রোসফটের মতো বিদেশি কোম্পানির ওপর আজীবন নির্ভর করতে হবে।

আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলি, কিন্তু খুব কম সময়েই স্বনির্ভর/স্বাধীন ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের বিষয়ে কথা বলি। ব্যাপক আকারে মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা সত্যিকার অর্থে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে স্বাধীনতা পেতে পারি। এর মধ্যদিয়ে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, এই অর্থ বাংলাদেশের প্রতিটি কম্পিউটারে এমএস সফটওয়্যার ব্যবহারের জন্য চলে যাবে।

দীর্ঘমেয়াদে মুক্ত সফটওয়্যার দিবস ও মুক্ত সফটওয়্যার ব্যবহার বাংলাদেশের মতো দেশকে মৌলিক প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানির নির্ভরতা থেকে স্বাধীনতা দেবে। আমরা যদি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’র ধারণাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করি, তাহলে আমাদের উচিত স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থ কী হবে, সে সম্পর্কে ধারণা থাকা । মুক্ত/ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যাপক আকারে ব্যবহারের মাধ্যমে মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের মতো কোম্পানির কাছ থেকে ডিজিটালভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাবে।

এই সপ্তাহের শেষ দিনে লিবরা অফিস ডাউনলোড করে মুক্ত সফটওয়্যার দিবস উদযাপনে সহযোগিতা করুন এবং মাইক্রোসফট অফিসের পাইরেট সংস্করণ ছুড়ে ফেলুন।

লেখক: পরিচালক, টুএ মিডিয়া লিমিটেড

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ