অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা কোন পথে?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৭:২৯, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩১, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৮

প্রভাষ আমিনএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন দোরগোড়ায়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কথা সত্যি বলে ধরে নিলে নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১১১ দিন, মানে চার মাসেরও কম। যদিও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার কোনও এখতিয়ার অর্থমন্ত্রীর নেই, এটা একান্তই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। তবু অর্থমন্ত্রী বুধবার (৫ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মুখ ফসকে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২৭ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হতে পারে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী না বললেও একটু রাজনীতি সচেতন হলে আপনিও এ তারিখটি বের করতে পারতেন। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভোটগ্রহণ হবে, এমন কথা নির্বাচন কমিশন থেকে আগেই বলা হয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত ভোটগ্রহণ হয় সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন, মানে বৃহস্পতিবার। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ২৭ তারিখ। সে হিসেবে আমি ধরে নিচ্ছি, অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত তারিখটিই আসলে চূড়ান্ত। নিজেদের গোপন কথাটি ফাঁস করে দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করবে কিনা বা করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য তাদের আছে কিনা, জানি না। তবে এখন জাতীয় নির্বাচনকেই নির্বাচন কমিশনের পাখির চোখ করা উচিত। নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য মিটিয়ে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। শেষ মুহূর্তে আরপিও সংশোধন করে আগামী নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে মাথা গলিয়েছিল। তবে ইভিএম নিয়ে তাড়াহুড়ো না করতে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের পরদিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগামী নির্বাচনেই ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে এসেছেন। তবে আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত অল্প কিছু কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের কাজ হলো সময়মতো একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা, সেটা আসলে রাজনৈতিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনের কাছে নেই।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে পরে আলোচনা করছি। কারণ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা, তা নির্ভর করছে নির্বাচনকালীন সরকারের ওপর। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলে আসছিল। তবে সংবিধান আবার সংশোধন না হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আর সম্ভব নয়। বিএনপি এটাও বুঝে গেছে, জোর করে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদায় করার সামর্থ্য তাদের নেই। বাস্তবতা বুঝে ঘোষণা না দিয়েই বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছে। অনেকদিন ধরেই তারা নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলে আসছিল। খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা দিতে চেয়েছিলেন। তবে অনেকদিন বাইরে থাকলেও সে রূপরেখা তিনি দেননি। এখন আর সেটা দেওয়ার সুযোগ নেই। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি কারাগারে। নির্বাচনের আগে তিনি মুক্তি পাবেন কিনা, সেটা এখন আদালতের এখতিয়ার। দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজা পাওয়ায় আগামী নির্বাচনের খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণেরও সুযোগ নেই। একই অবস্থা তার ছেলে তারেক রহমানেরও। তিনিও দণ্ড মাথায় নিয়ে লন্ডনে পালিয়ে আছেন। তারেক রহমানেরও আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের একের পর এক আক্রমণে দিশেহারা বিএনপির নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবিও হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি করলেও, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপির সর্বশেষ শর্ত খালেদা জিয়ার মুক্তি। তবে সে দাবি আদায়ের সামর্থ্য তাদের নেই; না মাঠে, না আদালতে।

বিএনপি নানা রকম দাবি তুললেও সরকার তা কানে না নিয়ে নিজেদের মতো নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বুধবার জানিয়েছেন, ২০ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। তার মানে, এ মাসের শেষ দিকেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বেশ কয়েকদিন ধরে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলে আসছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। সরকারি দলের নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকারের মতো নির্বাচনকালীন সরকারেও দশম সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অংশগ্রহণেই গঠিত হবে নতুন সরকার। তার মানে বর্তমান সরকারের একটা ছোট ভার্সন হবে নির্বাচনকালীন সরকার। সরকারি দলের নেতারা বারবার বলছেন, যেহেতু দশম সংসদে বিএনপি ছিল না, তাই নির্বাচনকালীন সরকারেও তাদের রাখার সুযোগ নেই। এটা আসলে রাখতে চাইছেন না বলে বলছেন। চাইলে টেকনোক্র্যাট কোটায় বিএনপি কেন যুক্তফ্রন্টকেও সরকারে রাখা সম্ভব। কথা হচ্ছে সেই চাওয়াটা আছে কিনা।

আওয়ামী লীগ আর বিএনপি—বাংলাদেশে দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি হলো আওয়ামী লীগ বনাম এন্টি আওয়ামী লীগ। ৭৫’র আগে এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব ছিল জাসদের হাতে, পরে সেটা নিয়েছে বিএনপি। তো এই বিএনপিকে না চাওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বিশেষ করে শেখ হাসিনার বেশকিছু যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের কথা জিয়া জেনেও চুপ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল বেনিফিশিয়ারি জিয়া, তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুনর্বাসিত করেছিলেন এবং তাদের বিচারের পথ রুদ্ধ করে রেখেছিলেন। ২১ বছর পর খালেদা জিয়া ঘটা করে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রেনেড মেরে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। এতকিছুর পরও খালেদা জিয়াকে ফোন করেছেন শেখ হাসিনা, কিন্তু যথাযথ জবাব পাননি। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে কোকোর মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা গুলশান ছুটে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে গেট থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার উদাহরণ টেনে শেখ হাসিনা সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে আর কোনও আলোচনা নয়। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা না করতে আওয়ামী লীগের সব কারণই যৌক্তিক। তবু রাজনীতিতে যেমন শেষ কথা বলে কিছু নেই, তেমনি নেই আলোচনার বিকল্পও। গণতন্ত্রের স্বার্থেই আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সব আলোচনা যে শেখ হাসিনাকেই করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে বা অন্য কোনও পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। দুই দলের শুভাকাঙ্ক্ষী পেশাজীবীরা আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারেন। আলোচনা হতে পারে অনানুষ্ঠানিকভাবে, পর্দার আড়ালেও। আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণটা জরুরি। এই স্বার্থটা শুধু বিএনপির না, আওয়ামী লীগেরও, দেশের জন্যও জরুরি। এটা ঠিক, কোনও দল নির্বাচনে অংশ নেবে, কোন দল নেবে না; সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু তবু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই মুহূর্তে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সুশীল সমাজ, নাক গলানো ডিপ্লোম্যাট থেকে শুরু করে সবাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথাই বলছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি একতরফা নির্বাচন গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। পরপর দুটি নির্বাচন বয়কট করলে বিএনপির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। আর পরপর দুটি একতরফা নির্বাচনের কলঙ্ক আওয়ামী লীগের কপালে বড্ড বেমানান। আর বিএনপি ছাড়া নিবন্ধিত বাকি সবগুলো দল অংশ নিলেও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। আবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ নিলেই দেশের বেশিরভাগ জনগণের মতো তাতে প্রতিফলিত হবে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত হলে নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে সেটিকে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।

আমরা অনেকদিন ধরেই আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা শুনে আসছি। এমনকি শেখ হাসিনা একাধিকবার দলের নেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, আগামী নির্বাচন গত নির্বাচনের মতো হবে না। ইদানিং তিনি অনেকবার বলেছেন, জনগণ ভোট দিলে ক্ষমতায় যাবো, নইলে নয়। শেখ হাসিনার মুখে গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের এই আকাঙ্ক্ষা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমরা আশাবাদী হই, একাদশ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের নতুন ধাপে উন্নীত হবে। স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়ন হয় না আবার কার্যকর ও অর্থবহ গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়নও অর্থহীন।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X