আজ আনন্দদিন

Send
আরিফা রহমান রুমা
প্রকাশিত : ১৩:০০, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৬, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

আরিফা রহমান রুমাসেদিন ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭।  তখন ভুল তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার উত্তাল পরবর্তীক্ষণ। এমনই উন্মাতাল সময়ে তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহাকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে তরুণ ছাত্রনেতা বাবা শেখ মুজিবুর রহমান আর মা ফজিলাতুন্নেছার ঘর আলোয় ভাসিয়ে জন্ম নিলেন বাবার প্রিয় ‘হাচুমনি’ এবং আমাদের বাতিঘর শেখ হাসিনা। তিনি যখন পৃথিবীর মুখ দেখলেন, পিতা মুজিব তখন কলকাতায় ভারত ভাগের পরবর্তী পরিস্থিতি, দাঙ্গা প্রতিরোধ আর পড়ােশানা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। 

সাত বছর বয়স পর্যন্ত টুঙ্গিপাড়ার আলো বাতাস গায়ে মেখে ১৯৫৪ সালে মায়ের ছায়াসঙ্গী হয়ে ঢাকায় আসা। শৈশব কৈশোর আর তারুণ্যের পুরোটা সময় উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে ছিলেন বলে আলাদা করে তাকে আর রাজনীতির পাঠ নিতে হয়নি। বাবা জেলে থাকাকালীন মা’ই ছিলেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ঘরের পরিবেশই তাঁকে দেশের প্রয়োজনে ঘর ছাড়তে শিখিয়েছিল। 

স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির উজ্জ্বল মুখ ছিলেন তিনি। স্কুলে থাকতে ফলাফল খারাপ হবে জেনেও পাঠ্য বইয়ে সরকারের মিথ্যা গুণকীর্তনের অধ্যায় বাদ দিয়ে উত্তর করতেন তিনি।  ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৬-৬৭ সালে ছাত্রলীগ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী সংসদের সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ৬৮ তে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে।  মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় মা, ছোট বোন এবং ছোট ভাই শেখ রাসেলসহ বন্দি থেকেছেন। ভাগ্যের সহায়তায় হয়তো দেশ বাঁচাতে, দেশের মানুষকে তাদের স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছাতে ৭৫’র কালরাত্রিতে বেঁচে থাকেন তিনি। শেষ বারের মতোও দেখতে পারেননি প্রিয়জনের মুখ। অবিকল মানুষের মতো দেখতে সেই খুনি আর তার দোসরেরা তাঁকে দেশে ঢুকতে দেয়নি। তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক আশ্রয়ে দিল্লিতে থাকতে শুরু করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের দলীয় সম্মেলনে তাঁকে দলীয় প্রধান নির্বাচিত করা হয়। ছয় বছরের কষ্টকর প্রবাস জীবন শেষে ওই বছরের ১৭ মে তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে আসেন।

মূলত এরপর থেকেই বাংলাদেশ আবার সামনে এগোবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এবং সে স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে এ দেশের আপামর জনতা তাঁর নেতৃত্বে আজকের বাংলাদেশের পথে হাঁটতে শুরু করে।  ক্ষমতাকে আঁকড়ে রাখতে একের পর এক ক্যু, হত্যা, গুম, খুনের বিরুদ্ধে শুরু করা আন্দোলনের মাধ্যমেই রাজনীতির অমসৃণ পথে দ্বিতীয়বারের মতো যাত্রা শুরু করেন শেখ হাসিনা। 

জনগণের প্রতিটি অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি ছিলেন অনড়। দীর্ঘ ২১ বছর ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তে ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকা বাংলাদেশকে তার সঠিক রাস্তা চেনানো, তার গন্তব্যে টেনে নিয়ে চলা সহজ ছিল না মোটেও। মনগড়া ইতিহাস আর অপপ্রচারে তরুণ সমাজের একটি অংশও ছিল বিভ্রান্ত। চলার পথের প্রতিটা বাঁকেই ছিল মৃত্যুঝুঁকি।  মোট ২১বার হত্যার চেষ্টা করা হয় তাঁকে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিএনপি জামায়াত সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে করা হত্যা চেষ্টায় ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে বাঁচান। হত্যার পরিবর্তে শান্তি  স্থাপনে বিশ্বাসী তিনি। আর তাই বিএনপি নেত্রীর পুত্রের মৃত্যুর খবর শুনেও সহমর্মিতা জানাতে ছুটে যান।

দারিদ্র্য আর শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে বাবার মতো নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছেন, আর তাই এক সময়কার মঙ্গাপীড়িত দেশ আজ খাদ্য সমৃদ্ধ দেশ।  কুচক্রীদের মুখে ছাই দিয়ে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু, চলছে  মেট্রো রেলের কাজ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, নিজস্ব কক্ষপথে ঘুরছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, উন্নয়নের ছাপ প্রতিটি ঘরে। নারীর ক্ষমতায়নের বাধাসমূহ দূর করা, হিজড়াদের যৌক্তিক তৃতীয় লিঙ্গের মর্যাদা প্রদান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা ছাড়াও অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের সবগুলো সূচকেই বাংলাদেশ বিস্ময়কর রকমের এগিয়ে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে পৌঁছে গেছে উন্নয়নশীল দেশে।  শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলা বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘের বক্তব্যে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃত।  অপরদিকে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্ব দরবারে দেশকে নিয়ে গেছেন মানবতার অনন্য উচ্চতায়।  তিনি বিশেষায়িত হয়েছেন ‘মানবতার’ মা হিসেবে। 

তবে আমার শৈশব, কৈশোরে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আমি পেয়েছিলাম একেবারে ভিন্ন আরেক রূপে, যে কোনও বয়স বা যোগ্যতার মানুষকে সহজে আপন করে নেওয়ার বৈশিষ্ট্যর জন্যই তিনি আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। সেই শেখ হাসিনা আমার সঙ্গে খেলতে পারছেন না বলে, আমার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারতেন না বলে মন খারাপ করে চিঠি লিখতেন আমাকে। ওই নয়-দশ বছরের আমি তাই অনায়াসে তাঁকে আমার বন্ধুর আসনে বসিয়েছিলাম।  নিজে সব হারিয়ে কেবল অধিকার হারা মানুষের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্রত নিয়ে এবং সন্তানদের বুকে জড়িয়ে রাখার সুখ বিসর্জন দিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অনবরত ছুটে বেড়ানো সেদিনের শেখ হাসিনা নামটিও তাই আমার শিশুমনে আদর্শ মানুষের জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন।  গণভবনের দোলনায় বসা ক্ষুদে দর্শনার্থীদের দোলনা ঠেলে দোল দেওয়া বা ইফতার মাহফিলে আসা এতিম শিশুটিকে পরম যত্নে ভাত মেখে খাইয়ে দেওয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিন্ন এই রূপ আমার তাই খুব চেনা। বই পড়ার মতো তাঁর আরেকটা অভ্যাসও সেই কৈশোরে দেখেছি আমি। ১৯৯১ এর সংসদ নির্বাচনের পর তিনি টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন শুনে বাবার সঙ্গে আমিও জলিরপার গেলাম দেখা করতে। উনি আমাকে সাথে করে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে গেলেন, দোতলায় তাঁর শোবার ঘরে বসতে না বসতেই দেখি গাড়িতে থাকা লাগেজের একটাতে কেবল বই আর বই। চুরি করে আমি তখন উপন্যাস পড়তে শুরু করেছি, আমার প্রিয় লেখকের বইও দেখেছিলাম সেখানে।  অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তাঁর এমন মিষ্টি মধুর হাজারো স্মৃতি। সমসাময়িক কালের বাংলাদেশের আর কোনও রাজনীতিবিদ গণমানুষের এত কাছে আসতে চেয়েছেন বা আসতে পেরেছেন? এই বাবা-মেয়ের বাইরে কে কবে আমাদের এতটা ভালোবেসেছিলেন?

তাঁর একক প্রচেষ্টায় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বাংলাদেশ আজ মর্যাদার আসনে আসীন। দেশে তাই যতই ঝড়ঝঞ্জা আসুক খুব বেশি বিচলিত হই না, জানি সতেরো কোটি মানুষের জন্য কেউ একজন পরম মমতায় দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি পণ করেছেন আমাদের সবাইকে ভালো রাখার, তাঁর এই মমতা, বুদ্ধিমত্তা আর সৎ সাহসের জোরে তিনি বাংলাদেশকে পৌঁছে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায়। তাঁর জন্মদিন তাই আনন্দদিন। আনন্দদিনে কেবল তাঁর মঙ্গল কামনা। ২৮ সেপ্টেম্বর তাই আনন্দদিন।

শুভ জন্মদিন প্রিয় নেত্রী। 

আপনি আমাদের আশার বাতিঘর,

পথ দেখিয়ে চলেছেন তাই নিশ্চিত, নির্ভার।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

/এফএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ