নির্বাচনি ব্যয়সীমা শুভঙ্করের ফাঁকি

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৫:২৭, নভেম্বর ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৯, নভেম্বর ১৯, ২০১৮

মোস্তফা হোসেইননির্বাচনি আইনের দুর্বলতার কারণে প্রার্থীদের আইন লঙ্ঘন করতে হয় প্রকাশ্যে। নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো এটা জানার পরও আইন পরিবর্তনে কোনও ভূমিকা নেয় না। নির্বাচন কমিশনও এ ব্যাপারে অনেকটা নিস্পৃহ। বলছি নির্বাচনি ব্যয় প্রসঙ্গে।
এবার নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে জানিয়েছে, ভোটার প্রতি ১০ টাকা হারে নির্বাচনি ব্যয় করতে পারবেন একজন প্রার্থী। তবে শর্ত থাকে যে, ভোটার সংখ্যা যতই হোক না কেন, একজন প্রার্থী নির্বাচনের জন্য ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে পারবেন না। এই ব্যয়সীমা মেনে কোনও প্রার্থী কি নির্বাচনে অংশ নেবেন? নির্বাচন কমিশনের কাছেও এটা স্পষ্ট, কেউ এটা মানবে না। কারও যদি এই ব্যয়সীমার কম খরচ হয়, তাহলে নিশ্চিত বলা যায়, ওই প্রার্থীর আর্থিক সঙ্গতি নেই। কিংবা তিনি বুঝতে পারেন এই ব্যয় তার জলে যাবে।
আমাদের দেশে একজন প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় কত হয়, তাও নির্বাচন কমিশনের অজানা নয়। তারপরও আইন অমান্য করার এই আইনকে কীভাবে আখ্যায়িত করা হবে?  ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনে কোটি টাকাও ব্যয় হয়ে থাকে। সেখানেও নিম্নতম ব্যয়ের সীমা মানা হয় না। এটা যে কেউ জানে, পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটারপিছু মাত্র ১০ টাকা ব্যয় করে কেউ নির্বাচন করতে পারে না।

দ্রব্যমূল্য ও বাজার অবস্থা বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন ২০১৪ সালের নির্বাচনি ব্যয়সীমা থেকে মাত্র দুই টাকা হারে বৃদ্ধি করেছে। ওই সময় মাথাপিছু ব্যয়সীমা ছিল আট টাকা। এটা কি বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে কি এই হারে ব্যয় বেড়েছে? ২০০৮ সালে এই ব্যয়সীমা ছিল ভোটারপিছু ৫ টাকা। এখন যে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানেও হিসাব মেলানো কঠিন। দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪২ লাখ। সেই হিসাবে গড়ে প্রতি আসনে ভোটার হয়, ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৩০১ জন। প্রতি ভোটার হারে ১০ টাকা ব্যয় ধরলে নিম্নতম ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ লাখ টাকারও বেশি। এক কাপ চায়ের দাম যেখানে ৫ টাকা সেখানে ভোটার প্রতি ১০ টাকা ব্যয় নির্ধারণ হাস্যকর নয় কি?

দ্রব্যমূল্য ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বিবেচনায় যেমন এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, তেমনি গড় হিসাবও যথাযথ নয়। একটি নির্বাচনি এলাকায় হয়তো ৫ লাখ ভোটার আছে, অন্যটিতে হয়তো দেড় লাখ। ৫ লাখ ভোটারের এলাকার প্রার্থী যদি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করেন, তাহলে তিনি ভোটার প্রতি ৫ টাকার বেশি ব্যয় করতে পারবেন না। আবার যেখানে দেড় লাখ ভোটার আছে সেখানে একজন প্রার্থী সহজেই ভোটার প্রতি প্রায় ১৭ টাকা খরচ করতে পারবেন। এটা কি একই যাত্রায় দুই ফল নয়?

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নির্বাচনি ব্যয় নিয়ে বৈপরিত্য আছে। বাম রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ব্যয়সীমা কমিয়ে আনার পক্ষে সবসময়ই বলে থাকে। গত বছর অক্টোবরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপকালে বাসদ জানিয়েছে, প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয় ১০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনতে হবে। তাদের যুক্তি, এতে করে অধিকসংখ্যক অংশগ্রহণকারী সুযোগ পাবে। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সম্প্রতি টেলিভিশনে একটি টকশোতে বলেছেন, দেশের অধিকাংশ জনগণকে নির্বাচনের সুযোগ দিতে হলে জামানতের অংকটা এমন পর্যায়ে আনা দরকার, যেন একজন গার্মেন্ট কর্মীও নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। তার বক্তব্য হচ্ছে–বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সুযোগ বঞ্চিত করাকে অন্যায্য বলতে দ্বিধা নেই।

আবার অন্যচিত্রও চোখে পড়ে। কিছু রাজনৈতিক দল মনে করে, নির্বাচনি ব্যয়কে এত কমিয়ে রাখার যুক্তি নেই। কারণ সবাই নির্ধারিত ব্যয়ের অনেক বেশি ব্যয় করেন। আর নির্বাচন কমিশন তা জেনেও চুপ করে থাকে। কিংবা তাদের দেখার সেই সক্ষমতাও নেই। প্রার্থীদের ব্যয় নিরীক্ষা করার মতো জনবল সক্ষমতা তাদের নেই। এটাই সত্য।

অনেক রাজনীতিবিদই মনে করেন, আসলে কোনও রাজনৈতিক দলই নির্দিষ্ট করে দেওয়া খরচে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। নির্বাচনকাজে এমন বিষয় থাকে যা হঠাৎ উদ্ভূত। কিছু আছে যা পূর্ব নির্ধারিত। কিন্তু কোনোটাই বাজেট করে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কিংবা সর্বনিম্ন মাত্রা ঠিক করে দিয়ে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

যদি বলা হয়, রাজনীতির গতি পথ আর নির্বাচন কমিশনের চিন্তায় ফারাক বেশি হওয়ার কারণে এই ব্যয়ের ধারাটি বিতর্কিত হয়ে পড়েছে; তাও উড়িয়ে দেওয়ার নয়। রাজনীতি এখন রাজনীতিবিদদের হাত থেকে সরে গিয়ে বিত্তশালী ব্যবসায়ীদের করায়ত্তে চলে গেছে। এটা তো সবাই স্বীকার করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো এখন পয়সাওয়ালাদের মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছে। পয়সাওয়ালা ব্যবসায়ী শ্রেণির মানুষ তার ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনা করে নির্বাচনকে মূলত বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে থাকে। যার পরিণামে–নির্বাচনে ব্যয়বৃদ্ধি ঘটেছে অস্বাভাবিক। তাদের কারণে যেনতেনভাবে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। টিআইবির প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রথম সংসদে ব্যবসায়ী এমপি ছিলেন ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর এখন সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯ শতাংশে। সঙ্গত কারণেই মনে করা যায়–টাকাওয়ালাদের নিয়ন্ত্রণেই এখন সংসদ চলে। তারা কার স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন, সেই আলোচনায় না গিয়ে এটা বলা যায়, নির্বাচনে ব্যয়বৃদ্ধিতে এই ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় নামবেন, এটাই স্বাভাবিক।

নির্বাচন কমিশন বলেছে, নির্বাচনি আইন অমান্য করলে প্রার্থীকে আইনানুগ শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু বাস্তবটা কি আমাদের অজানা নয়। প্রার্থী যদি ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে ব্যয়সীমাকে নিয়ন্ত্রিত দেখানোর চেষ্টা করেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন তেমন কিছু করতে পারবে না। আবার বিচার ব্যবস্থাও এমন যে এসব বিচার করারও উদাহরণ খুবই কম। এই প্রসঙ্গে দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর একটা মামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ্য। সাঈদী নির্বাচনে ভুয়া ভাউচার দেখিয়েছেন এবং তিনি সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘন করেছেন এই অভিযোগে মামলা হয়েছিল। কিন্তু মামলা যখন শেষ হলো ততদিনে সাঈদীর এমপি পদের মেয়াদও শেষ।

অথচ যেসব দেশে নির্বাচনি ব্যয় বিষয়ক কড়া আইন রয়েছে, সেখানে এদিক-সেদিক করার সুযোগ নেই। যেমন কানাডার একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যায়। ওখানকার ডিন ডেল মাস্ত্রো এমপি উপ-নির্বাচনে নির্ধারিত অঙ্কের অর্থব্যয় করেছিলেন। আদালত তাকে একমাসের জেল দেন। সঙ্গে ১০ হাজার ডলার জরিমানাও হয়েছিল তার।

আমাদের দেশে কি সেটা সম্ভব?

বাংলাদেশে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা এবং সততা প্রতিষ্ঠিত না হলে এসব আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সব রাজনৈতিক দলই এখন নির্বাচনকে তথা রাজনীতিকে নিছক রাজনীতি হিসেবে মনে করে না। তারা মনোনয়ন বাণিজ্য দিয়ে শুরু করে আর মোটা অঙ্কের দলীয় তহবিল গঠন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত প্রাপ্তিযোগকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এটা বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে সর্বোচ্চ ব্যয়ের কড়াকড়ি করার ভাবনাটা বোকামো।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক।

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ