গণশুনানি শোনেনি কেউ...

Send
আশরাফ সিদ্দিকী বিটু
প্রকাশিত : ১৮:২৩, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৩, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৯

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয় পেয়েছে। আর বিএনপি-জামায়াত-ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবি হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন। বিশ্বের শ’খানেক রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, সরকারপ্রধান  এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুষ্ঠু নিয়মের মাধ্যমে এই নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে, যা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে নানাভাবে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য প্রদান করেছে, শেষমেশ ড. কামাল হোসেন, জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কামাল সাহেবদের দাবিকে সম্মান জানিয়ে সংলাপে অংশ নিয়েছেন এবং গণভবনে নিমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সকল কথা শুনেছেন। ড. কামাল ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের দাবির কারণে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের তারিখ ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়।

বিএনপি নির্বাচনে তাদের দলীয় প্রার্থিতা বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে। মনোনয়ন দিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে, দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে দলের নেতাকর্মীসহ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন। বিদেশে দূতাবাসে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ফরম জমা দিতে গেছেন এবং মনোনয়ন না পেয়ে দূতাবাসের সামনেই উষ্মা প্রকাশ করেছেন। দণ্ডিত অপরাধী তারেক রহমান বিদেশে বসে স্কাইপের মাধ্যমে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রায় ৯শ’র মতো প্রার্থীকে বিএনপি প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল, পরে অনেকে আবার আদালতের শরণাপন্ন হয়ে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। কারণ হলো, দলের নির্বাচন কমিটি বা নেতৃত্ব ঠিক করে দিতে পারেনি কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলো। নানা নাটকীয়তা জাতি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে দেখেছে। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মূলত জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে চলা বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করে; যেখানে বিশজনের বেশি যুদ্ধাপরাধী বা তাদের বংশধররা বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করে। এ বিষয়ে নৈতিক পরাজয়ের দায় ড. কামাল হোসেনরা এড়াতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। ঐক্যফ্রন্ট জাতির সামনে ভালো কিছু উপস্থাপন করতেই পারেনি বরং দণ্ডিত অপরাধীকে নেতা মেনে নেওয়া, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বংশধরদের মনোনয়ন প্রদান এবং জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের সামনে নানানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন কিন্তু সদুত্তর দিতে পারেনি।

জামায়াত, জঙ্গি মদতদাতা, বিদেশে অর্থপাচারকারী, যুদ্ধাপরাধী, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় দণ্ডিত আসামির আত্মীয়-পরিজনদের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের আবারও এ দেশের রাজনীতিতে সুযোগ করে দেওয়ার ব্যবস্থাই করে দিয়েছে তারা। ড. কামাল হোসেন আর বিএনপির ঐক্য আসলে পরিণত হয় স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, দণ্ডিত আসামি এবং দলছুটদের ঐক্য, যেখানে নীতি কথার আড়ালে অশুভ শক্তির উত্থান ঘটানোই যে ছিল মূল ইচ্ছা। 

বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নানাভাবে চেয়েছে নির্বাচনকে দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে। কিন্তু বিএনপি জামায়াত ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন ঘিরে বহু অপকর্মে লিপ্ত ছিল। অথচ ড. কামাল হোসেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জামায়াতের নেতারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পাবেন জানলে ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিতেন না। এই কথার মধ্য দিয়ে ড. কামাল যে সত্যের কাছে পরাজিত তা স্বীকার করলেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের হারের অনেক কারণ রয়েছে। এই পরাজয় বিএনপির দিশেহারা অবস্থাকে আবারও প্রকাশ করছে। নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে দলের তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের মতানৈক্য অনেক। শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ। নির্বাচনে যে কয়টি মাত্র আসনে বিএনপি জয়লাভ করেছে সেসব প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে আরও অপরিপক্বতার পরিচয় দিচ্ছেন। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলে তাদের সংসদে গিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু সংসদে না গেলে জনগণের কাছে তারা অতীতের মতো প্রত্যাখ্যাত হবে। মূলত দলের ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থার কারণে এই ব্যর্থ-দিশেহারা অবস্থা আরও প্রলম্বিত হবে।

নির্বাচন নিয়ে কয়েক দিন আগে গণশুনানি করেছে ড. কামাল হোসেন সাহেবরা। তেমন তথ্য-উপাত্ত কিন্তু তারা উপস্থাপন করতে পারেনি। নেতাদের বক্তব্যে নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা আমরা দেখেছি গণমাধ্যমে। এটা সত্য যে গত এক দশকে বিএনপি কোনও জনবান্ধব কর্মসূচি দিতে পারেনি। এই নির্বাচনের আগে এবং পরেও পারেনি। নিজে দোষ করে অপরকে দোষারোপ করা যায় না। এই শুনানির ফল কী? ফলশূন্য! জনগণ সঙ্গে না থাকলে বা পক্ষে অবস্থান না নিলে এসব শুনানি কোনও ফল দেবে না। শুনানিতে স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ করা যায়নি।কারণ, সব প্রার্থী অংশ নেয়নি। শুধু বক্তব্য সর্বস্বই হয়েছে এ আয়োজন। যেখানে বিরোধিতার স্বার্থে শুধু বিরোধিতাই করা হয়েছে। নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো কিছু পরিলক্ষিত হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ অনেকে শুনানি আয়োজনে ঘুমিয়ে বিষয়টিকে আরও অর্থহীন করে তুলেছেন।

রাজনীতির মাঠে কেউ কারও জন্য স্থান ছেড়ে দেয় না। নিজেদের অবস্থান শক্ত করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সকল প্রতিকূলতা দূর করতে হয়। নিজেরা ভুল করে বসলে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নেবেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হবে এমন কোনও আভাস কেউ দিতে পারেনি। বরং দেশি-বিদেশি জরিপে আওয়ামী লীগের জয়ের পূর্বাভাস প্রতিবেদনে জানা যায়। কামাল সাহেবদের শুনানির পর কী? এরপর যাই করুক বা যে কর্মসূচি দেওয়া হোক, বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের জন্য আগামী পাঁচ বছর পরবর্তী নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এর বাইরে আর কোনও পথ নেই। সামনের সময় আরও কঠিন, যেখানে ব্যর্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও পঙ্কিল মতাদর্শ এবং অশুভ রাজনীতির চর্চাকে কেউ সাধুবাদ জানাবে না।

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী। কলাম লেখক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ