‘সেই তো নথ খসালি…’

Send
মাসুদ কামাল
প্রকাশিত : ১৮:১২, মে ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৭, মে ০১, ২০১৯

 

মাসুদ কামালবিএনপি’র হয়ে নির্বাচিতরা যে শেষ পর্যন্ত শপথ নেবেন সেটা নির্বাচিত ওই ছয়জন অনেক আগে থেকেই জানতেন। দেশের রাজনীতির টুকটাক খবরাখবর যারা রাখেন, তারাও বেশ ভালো করেই ধারণা করতেন। হয়তো সরকারি দলের নেতারাও আশা করতেন। জানতেন না কেবল বিএনপি হাইকমান্ড। তারা এতটাই অসচেতন ছিলেন যে, শপথগ্রহণের পরও স্থায়ী কমিটি নামে দলের সর্বোচ্চ বডির এক সদস্যকে বলতে শোনা গেলো বিষয়টি তার জানা ছিল না!
চারজন একসঙ্গে শপথগ্রহণের পর এক এমপি বললেন, দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমানের নির্দেশেই তারা শপথ নিয়েছেন। তিনি যে অসত্য বলেননি সেটা টের পাওয়া গেলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলো সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর সঙ্গে। তিনিও জানালেন কথা সত্য। সঙ্গে সঙ্গে দু’টি প্রশ্ন অবধারিত হয়ে দেখে দিলো।
প্রথম প্রশ্ন, তাহলে চারজনের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেই কেন? তারেক রহমানের নির্দেশ কি মহাসচিবের কাছে পৌঁছেনি? লন্ডন থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন কি দলের মহাসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি? নাকি মহাসচিব অবাধ্য হয়েছেন?

আর দ্বিতীয় প্রশ্ন, এখন জাহিদুর রহমানের কী হবে? যে অপরাধে তাকে মাত্র একদিন আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হলো, সেই একই অপরাধ করার জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডন থেকে নির্দেশ কী করে দেন বাকি পাঁচজনকে?

বিএনপি নেতারা তো বটেই, এমনকি কর্মী-সমর্থকরাও মনে করে থাকেন তাদের দলটি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।  গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকে এমনও বলেছেন, নির্বাচন যদি ৫০ শতাংশ সুষ্ঠু হয় তাহলেও তাদের দল ৫০ শতাংশের বেশি আসন পেয়ে যাবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে, আগের রাতে সরকারি দল ভোট কেটে নিয়ে গিয়েছিল বলে তাদের এমন ভরাডুবি হয়েছে। তাদের এসব কথা ও চিন্তা যদি ৫০ শতাংশও সঠিক হয়, তাহলে বোধকরি এখন তাদের চিন্তা করার সময় এসেছে দলের নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে। এত ‘বড়’ একটা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কি এমন দ্বিধা মানায়? ২৪ ঘণ্টা আগেও দলটির সর্বোচ্চ বডি সিদ্ধান্ত নিলো দলের টিকিটে নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবেন না, সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ শপথ নিলে তার বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই ব্যবস্থা কতটা চরম হতে পারে তার প্রমাণও দিলেন তারা, দল থেকে বহিষ্কার করলেন চারদিন আগে শপথ নেওয়া জাহিদুর রহমানকে। এমনকি প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও বহিষ্কার করা হলো। অথচ স্থায়ী কমিটির নেওয়া এমন কঠিনতম সিদ্ধান্ত পাল্টে গেলো মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। ধারণা করা যায়, জাহিদুরের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে এখন আবার তাকে উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করা হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অভিযোগ প্রায়ই উচ্চারিত হয়, এখানকার শীর্ষ নেতানেত্রীরা দলের কর্মী সমর্থকদের মনোভাব বুঝতে চান না, বুঝতে পারেন না। তারা যে কেবল জনগণের কথাই বুঝতে পারেন না তা নয়, এমনকি দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশাটাও উপলব্ধি করতে পারেন না। এরকম বিচ্ছিন্নতার চরমতম একটা নমুনা এবার দেখাতে সমর্থ হলো বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। জনগণ, মাঠ পর্যায়ের নেতা, সমর্থকদের কথা তো নয়ই, এমনকি তারা দলের জনপ্রিয়তম (যেহেতু তারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাই জনপ্রিয় তো বলাই যায়) প্রতিনিধিদের মনের ভাবও বুঝতে পারছিলেন না। এটা খুবই হতাশাজনক একটা তথ্য। নির্বাচন শেষ হয়েছে সেই চার মাস আগে। ভরাডুবির পর থেকেই শীর্ষ নেতৃত্ব বলে আসছেন তারা সংসদে যাবেন না। যদি কেউ সংসদে যায় তাহলে সে ক্ষমা চাওয়ারও সুযোগ পাবেন না- এমন হুমকিও এসেছে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে। চার মাসের এই দীর্ঘ সময়ে, নির্বাচনে ফেল মারা এই কেন্দ্রীয় নেতারা সংসদে না যাওয়ার জন্য হাজারো যুক্তি ও হুমকি দিলেও নির্বাচিতরা কিন্তু কেউ একবারের জন্যও প্রকাশ্যে তেমন কিছু বলেননি (এখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরতে হবে। কারণ, মহাসচিব হওয়ার কারণে তাকে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে থাকতে হয়)। নির্বাচিতদের এই যে নীরবতা, তা থেকেও কেন কেন্দ্রীয় নেতারা কিছু বুঝতে পারলেন না, অথবা বুঝতে চাইলেন না- সেটাই এক রহস্য।

নাকি তারা সব বুঝেও না বোঝার ভান করেছেন? আচ্ছা, না হয় মানলাম তা-ই হয়েছে, তারা সবাই না বোঝার ভান করেছেন, তাহলেও কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই ভানটি কি তাদের জন্য আত্মঘাতী হয়ে গেলো না? এখন কি আর কেউ বলবেন, ‘বৃহত্তম’ এই রাজনৈতিক দলটির মধ্যে কোনও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা অবশিষ্ট আছে? তারা এখন কী বলবেন? কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন নিজেদের গত চার মাসের দৃঢ়তার সঙ্গে বর্তমানের আপসকে? তবে রিজভী সাহেবের মতো ‘বুদ্ধিজীবী’ যখন একজন আছেন, ব্যাখ্যা সম্ভবত একটা বের হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষে সে ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে কী করবে না, তা নিয়ে তাদের যেহেতু তেমন কোনও তোয়াক্কা আগে দেখা যায়নি, তাই ধারণা করা যায় আগামী কয়েকদিন হাসিমুখে তারা সেই ব্যাখ্যা প্রচার করতে থাকবেন।

অনেকে বলছেন, দলকে নিশ্চিত ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতেই তারেক রহমান শেষ মুহূর্তে ছয়জনের শপথের বিষয়ে আর অনড় থাকেননি। এই ধারণার সঙ্গে আমি খুবই একমত। আসলে তা-ই হতো। দল অনুমতি না দিলেও তারা ঠিকই শপথ নিতো। তবে এই লোকগুলোর ভদ্রতার প্রশংসা কিন্তু করতেই হয়। একটি দুটি দিন নয়, তারা পুরো চারটি মাস অপেক্ষা করেছেন দলের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের জন্য। একেবারে শুরুতে শপথ নিলে এই চার মাস তারা এমপি হিসাবে কত আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা পেতেন! কেন্দ্রীয় নেতাদের গোয়ার্তুমির কারণে তারা সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই অপ্রাপ্তির পরও তারা যে নেতাদের স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে মুখ খোলেনি, এজন্যই তারা ধন্যবাদ পেতে পারেন।

আমি একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারি না, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা কি করে আশা করেছিলেন নির্বাচিতদের শেষ পর্যন্ত সংসদে যাওয়া থেকে তারা বিরত রাখতে পারবেন? এমপি হতে যেয়ে, মনোনয়ন প্রাপ্তি থেকে শুরু করে প্রচারণা চালানো ইত্যাদি বাবদ একজনকে কত বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়- সেটা তাদের অজানা থাকার কথা নয়। এসবই তো এই দেশের প্রেক্ষিতে এক ধরনের বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠান বছরখানেক আগে এক সমীক্ষা করেছিল, তাতে দেখা গেছে বাংলাদেশে একজন সংসদ সদস্য যদি কোনও দুর্নীতির সঙ্গে নাও জড়ান, তারপরও প্রতি বছর তার প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো আয় হয়। পাঁচ বছরে সাড়ে সাত থেকে আট কোটি টাকা। আর যদি একটু ডানে বামে তাকান, উন্নয়ন কাজগুলো থেকে অল্পস্বল্প কমিশনও নেন, সে আয় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে- তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এমন নিশ্চিত আয় ওই ছয়জন কেন ছাড়তে চাইবেন? তাছাড়া এমন কোনও গ্যারান্টি তো নেই যে, ওনারা শপথ না নিলে এই সরকারের পতন ঘটবে, খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন, তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারবেন, আগামীতে তারা আবার এমপি হতে পারবেন, এমনকি আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন পাবেন। তাহলে কেন তারা ঝুঁকি নেবেন? এই বিষয়গুলো বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা কেন বুঝতে পারলেন না- সেটাই বুঝি না। তত্ত্বের কথা যদি বাদও দিই, গণফোরামের উদাহরণটাও তারা বিবেচনায় নিতে পারতেন। সুলতান মনসুরকে তৎক্ষণাত বহিষ্কার করে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু হয়তো সাময়িক একটা আমোদ অনুভব করেছেন। কিন্তু সেটা যে মোটেই বাস্তবসম্মত ছিল না, সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে মোকাব্বির খানের অর্থের দাপটের কাছে। মোকাব্বের খান কেবল শপথই নেননি, পরে দলের শীর্ষ পর্যায়ের মিটিংয়ে উপস্থিতও থেকেছেন। মন্টুই বরং সেখানে অপাংক্তেয় হয়ে পড়েছিলেন। আর এখন বিএনপির পাঁচজনের শপথের পর ওই বিপ্লবী নেতার অবস্থা কী দাঁড়াবে- ভাবতেই কৌতুক অনুভব হয়। সেই একই পরিস্থিতিতে কি উপনীত হননি বিএনপি নেতারাও? কী বলবেন তারা, যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন- ‘সেই তো নথ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?’       

লেখক: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলা ভিশন

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ