ইসলাম এক বিয়ের পক্ষে

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৮:১৬, জুন ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৩৩, জুন ২৬, ২০১৯

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলিমরা একই সঙ্গে চার জন নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন—এমন মতই বহুল প্রচলিত। একজন মুসলিম একই সঙ্গে চার জন স্ত্রী রাখতে পারবেন বলে যারা মোটাদাগে অভিমত প্রকাশ করেন, তারা সুরা নিসার ৩নং আয়াতের একটি অংশকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। তবে ওই আয়াতের সম্পূর্ণ অংশ ও ওই আয়াত সম্পর্কিত অন্য আয়াত এবং আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট বা শানে নজুলকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হলে প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ধর্মে চারটি নয়, একটি বিয়েই বৈধ এমন মতই যুক্তিযুক্ত।
সুরা নিসার ৩নং আয়াতটি (তোমরা যদি আশঙ্কা করো, ইয়াতিম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না,  তবে বিবাহ করবে নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে দুই, তিন অথবা চার। আর যদি আশঙ্কা করো যে সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে। এতে পক্ষপাতিত্ব না করার সম্ভাবনা অধিকতর।) অবতীর্ণ হয় ওহুদের যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওহুদের যুদ্ধে ৭০ জন মুসলিম সাহাবি শহীদ হন। ওই সাহাবিদের বিধবা স্ত্রী ও সন্তানদের উপলক্ষ করেই মহান আল্লাহ কুরআনের ওই আয়াত নাজিল করেন। যদিও বহু বিবাহের পক্ষে মত প্রকাশকারী অনেক পণ্ডিতই ওই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার শানে নজুলকে গ্রহণ করতে চাননি। তবে ওই আয়াত ও আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে ‘এতিমদের’ কথা উল্লেখ থাকায় এবং ওই আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াত নাজিল হওয়ায় ওহুদ যুদ্ধ পরবর্তী সৃষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে আয়াতটি নাজিল হয়েছে, সেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আর এ থেকে এই বিষয়টিও উপলব্ধি করা যায়, কোরআনে বহু বিবাহের অনুমতি বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রদান করা হয়েছিল। এটি ইসলামের স্বাভাবিক কোনও বিধান নয়। যুদ্ধ অথবা অন্য কোনও কারণে নারীর সংখ্যা অধিক হলে তখন নারীর সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে একজন পুরুষ একই সময়ে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে। ওই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট অন্তত আমাদের সেই বার্তাই দেয়।

আর ৩নং আয়াতের শেষের অংশের সঙ্গে ওই সুরার ১২৯নং আয়াতকে যদি একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়; তবে ইসলাম ধর্মের অবস্থান, একই সময়ে একজন পুরুষ একজন স্ত্রীই গ্রহণ করতে পারবে, এমন মতের পক্ষে সেই বিষয়টিও স্পষ্ট হয়। ৩নং আয়াতের শেষের অংশে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করার পর যদি তাদের প্রতি সুবিচার করা যাবে না এমন আশঙ্কা থাকে, অর্থাৎ প্রত্যেকের সঙ্গে সমান আচরণ করা সম্ভব নয় বলে মনে হয়; তবে একজন স্ত্রী গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১২৯নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা যতই ইচ্ছা করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার কখনোই করতে পারবে না।’ এই দুটি আয়াত একত্রে বিবেচনা করলে ইসলাম যে বহু বিবাহের পক্ষে নয়, সেই বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। কারণ, সুরা নিসার ৩নং আয়াতে একের অধিক বিবাহ করাকে শর্তসাপেক্ষে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ নিজেই বলেছেন, মানুষ যতই চেষ্টা করুক না কেন, সেই শর্ত পূরণ করতে পারবে না। আর যেখানে আশঙ্কা থাকলেই একের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করা যাবে না, সেখানে যখন সমান আচরণ বা সুবিচার করা সম্ভব নয় বলে মহান আল্লাহই বলছেন। সেখানে একের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করার সুযোগ থাকছে কি?

বহু বিবাহের পক্ষে যারা মত প্রকাশ করেন তারা বলেন, যদি একটি বিবাহ করাই ইসলামে বৈধ হতো তবে তা স্পষ্ট করেই বলা হতো, যেমনটি বলা হয়েছে, ‘একই সঙ্গে দুই বোনকে বিবাহ করা যাবে না’–সেই বিষয়ে। কিন্তু আমরা যদি আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগের দিকে দৃষ্টিপাত করি; তবে দেখতে পাবো, তৎকালে পুরুষরা বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অভ্যস্ত ছিল। তারা একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতো। কখনও-সখনও সেই স্ত্রী গ্রহণের সংখ্যা ১০-২০ জনও হতো। বহু নারীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অভ্যস্তদের যদি হঠাৎ করে এক স্ত্রী গ্রহণের বিষয়ে বাধ্য করা হতো; তবে সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতো। ফলে আল্লাহ অন্য অনেক বিষয়ের মতোই বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা গ্রহণ করেছেন এবং শর্তসাপেক্ষে বহু বিবাহের অনুমতি প্রদান এবং পরবর্তী সময়ে সেই শর্ত কোনও মানুষের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়, এমন অভিমত প্রকাশ করার মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম যে এক বিয়ের পক্ষে, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন।

আর একটি কথা বলে রাখা ভালো, একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করা সুরা ইয়াসিনের ৩৬নং আয়াত (‘পবিত্র তিনি (মহান আল্লাহ), যিনি জমিন হতে উৎপন্ন উদ্ভিদকে, তাদেরই মানুষকে এবং যা তারা জানে না, তার প্রত্যেককে জোড়া জোড়া করে পয়দা করেছেন।’) বিরুদ্ধ। বহু বিবাহের মাধ্যমে আল্লাহর এই আয়াতের ব্যত্যয় ঘটে। কারণ, যখন একজন পুরুষ একসঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেন; তখন আর জোড়া থাকে না। তাহলে যেখানে মহান আল্লাহ বলছেন মানুষকেও জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে, সেখানে বহু বিবাহের সুযোগ আছে কি?

পরিশেষে, কোরআনের আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করে এবং ওই আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বলা যায়, ইসলাম ধর্ম একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করাকে অনুমোদন করে না। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থাৎ এমন কোনও মানব সৃষ্ট দুর্যোগ (যেমন যুদ্ধ) অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনও কারণে পুরুষের তুলনায় বিবাহযোগ্য নারীর সংখ্যা যদি বেশি হয় এবং যার ফলে সামাজিক জীবনের শৃঙ্খলা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে পুরুষরা সমাজ জীবনের কল্যাণার্থে এবং নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতির এই বিধানকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে সর্ব সময়ে একই সঙ্গে একাধিক নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বা স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করার বিষয়টি ইসলাম অনুমোদন করে, এমন মত প্রদান করা যুক্তিসিদ্ধ  হবে বলে মনে হয় না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ