আপা

Send
মুন্নী সাহা
প্রকাশিত : ২৩:২২, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৫, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৯

মুন্নী সাহাতখনও আপা। মানে একবারও নামের আগে প্রধানমন্ত্রী পরিচয়টি লিখিনি। সময়টা ৯৪/৯৫ সাল হবে। আমি ভোরের কাগজের ছোটদের পাতা ইষ্টিকুটুমের দায়িত্বে। রিপোর্টিংয়ে সুযোগ পাইনি।শিশু একাডেমিতে ‘শিশুদের মেলা’ নামে একটি অনুষ্ঠানে রিপোর্টার হিসেবে প্রথম সুযোগ পেলাম। ক্যামেরাপারসন ইউসুফ সাদ মোটরসাইকেলে করে নিয়ে গেলেন, বসিয়ে দিলেন ডাকসাইটে সব সংবাদকর্মীর সারিতে। কিছুক্ষণ বাদে মঞ্চে এলেন প্রধান অতিথি ও তার সহকর্মীরা। বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা।
তাকে মোটামুটি কাছ থেকে অনেকবারই দেখেছি—গণআদালতের মঞ্চে, একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে, বাংলা একাডেমির মঞ্চে। আমি তো তখনও রিপোর্টার হতে পারিনি। ফলে, রাজনীতির মাঠ চষে বেড়ানো আপাকে আমার দুই হাত দূরের কাছ থেকে দেখা হয়নি। আমার সঙ্গে আপার কখনো চোখাচোখি হয়নি। সেদিন শিশু একাডেমির মঞ্চে আলোচনা চলছিল, নোট নিচ্ছি মনোযোগ দিয়ে। জিল্লুর রহমান, আবদুল জলিল, মোহাম্মদ হানিফসহ অনেকেই বক্তৃতা করছেন। লাল শার্ট সবুজ স্কার্টের ইউনিফর্মের সমবেত শিশু-কিশোর দর্শকদের কিচিরমিচির থামে না। মানে শিশুদের জন্য বোরিং বক্তৃতা। মঞ্চের মধ্যমণি ঠোঁটের ওপর আঙুল তুলে শিশুদের থামানো চেষ্টা করছিলেন, থামছে না দেখে তিনি হেসেই কুটিকুটি! হঠাৎ আমার চোখে চোখ পড়লো। তিনি হাতের ইশারায় ডাকছেন। আমি এদিক-ওদিক তাকাই! আমাকে? আমাকে কেন মঞ্চে ওঠার সিঁড়ি ইশারায় দেখিয়ে দিচ্ছেন। পাশে বয়োজ্যেষ্ঠরা আমাকে ধমকের সুরে বললেন, ‘অই মাইয়া তোমারে নেত্রী ডাকতাছে, দেহোনা? বেদ্দপ!’

আমি সাদ্ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে পারমিশন নিয়ে মঞ্চে উঠে মধ্যমণির ঘাড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। মাইকে দরাজ গলায় কেউ শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তৃতা করে যাচ্ছেন। আমার দিকে শেখ হাসিনা তার বাম হাতটা বাড়ালেন। নোট-কলমসহ তার হাতে ধরা দিলাম। বেণীটা ধরে বললেন, দুইটা বেণী? আমি মাথা নেড়ে দুই বেণী এক দুলুনিতে দেখালাম। ‘বাহ্ নাম কী তোমার?’ জিজ্ঞেস করতে করতে দুই বেণীর উৎসমুখটা টিপে টিপে একটু ঢিলা করার চেষ্টা করছিলেন। আমি জবাব দিলাম, ‘মুন্নী সাহা।’ শেখ হাসিনা একটু ঠাট্টার মতো বললেন, ‘সাংঘাতিক! সাংঘাতিক? রিপুটার রিপুটার?’

বললাম, নাহ! ইষ্টিকুটুমে লিখি। বাচ্চাদের পাতার এডিটর।

‘হুম। পড়ি আমি ইষ্টিকুটুম। ভিজা চুলটা বানছো কেন? ঠান্ডা লাগবে তো। তোমার এডিটর মতি ভাইকে বইলো, আপা জিজ্ঞেস করেছেন তিনি কেমন আছেন।’

আমি ভ্যবলাকান্ত। এই বাক্যে বুঝি নাই। ‘জি’ সূচক মাথা নেড়ে বললাম, কোন আপা?

আমার বোকামিতে তিনি হেসে মাথাটায় একটু আদর দিয়ে বললেন, ‘আমি আমিই। আমি তোমার আপা হই না?’ বলতে বলতে স্টেজ থেকে নিজের জায়গায় ফেরত যাওয়ার ইশারা করে পিঠে একটা আলতো শাবাশ চাটি দিলেন। আমি ভোঁ-দৌড়ে আবার সাংবাদিকদের আসনে।
একজন শেখ হাসিনা, একজন রাজনীতিবিদের সঙ্গ একজন সাধারণ নাগরিক বা একটি বালিকার সম্পর্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়, ‘আপা’।

রাজনীতির চড়াই-উৎরাইয়ে আমার ‘আপা’ বিরোধীদলীয় নেতা থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ৯৬ থেকে ২০০১ সাল। এরই মাঝে আমি পুরোদস্তুর কাগজের রিপোর্টার। পলিটিক্স, ক্রাইম, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু—সব বিষয় নিয়েই রিপোর্ট করি। আমার আপা-প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অনুষ্ঠান কাভার করেছি, অডিটোরিয়ামে বা জনসভায়। কিন্তু আর কাছ থেকে দেখা হয়নি।
একুশে টিভির সাংবাদিক হিসেবে মাইক্রোফোনটা কাছে গিয়ে রাখতে প্রধানমন্ত্রীর নিশ্বাসের উষ্ণতাটা পাই। চোখে চোখে শ্রদ্ধা ভালোবাসা বিনিময়। প্রধানমন্ত্রীর খোলস থেকে বেরিয়ে, ‘আপা’ তার সহজাত ভঙ্গিতে ‘অ্যাই কেমন আছো? খুব ভালো লাগে তোমাদের দৌড়ঝাঁপ দেখতে। মাহমুদ সাহেব অনেক সময় নিলেন একুশে টিভিটা করতে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো ভালো করছে।’ (বলতে বলতে তাকালেন পাশে বসা তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদের দিকে। ২০০০ সালের কথা বলছি)।

unnamed

প্রধানমন্ত্রীর বিট্ কাভার করা নিয়ে সব নিউজরুমেই সিনিয়রদের একটু চালাকি থাকে। বিদেশ সফরের সুযোগ সিনিয়ররা ছাড়তে চান না। একুশে টিভিতে মাত্র দেড় বছর সময়ে বিদেশ অ্যাসাইনমেন্ট মোস্তফা ফিরোজই পেয়েছেন। আমি দেশে, প্রধানমন্ত্রী বিট-টু। পুরনো ফুটেজ দেখতে গিয়ে সেদিন দেখছিলাম, কত কতবার প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হাঁটার পেছনে মাইক্রোফোন নিয়ে দৌড়াচ্ছি, তিনি দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। চোখেমুখে তার বাৎসল্য, যেন আমি সেই কিশোরী!

২০০১-এর পর পাল্টে যাওয়া রাজনীতিতে যেটুকু পাওয়া, তা হলো আমার বিট্—শেখ হাসিনা-আওয়ামী লীগ ফলো। এটিএন বাংলায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, ক্ষমতাসীন দলের সব খবরের পরে, আমার সারা দিনের পরিশ্রমের দেড় মিনিট হয়তো দিতে পারতাম। প্রায় প্রতিদিনই, আগের দিনের রিপোর্টের প্রশংসা করতেন আপা। ধানমন্ডি ৩/এ, সুধা সদন বা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর অফিস। লাল চায়ের সঙ্গে সিঙ্গারা বা সন্দেশ খেয়ে যাওয়ার নির্দেশের সঙ্গে আপার কমেন্ট, ‘সন্দেশটা খেও, মুক্তাগাছার। খেলে গলায় জোর পাবা। কালকে রিপোর্টিংয়ে গলায় জোর কম ছিল।’

২০০৪ সালের একুশে আগস্টের বোমা হামলার পর আপা সুধা সদনের দোতলা থেকে নিচে নামছেন। সিঁড়ির গোড়ায় আমরা কয়েকজন। প্রায় সবাইকে আপা মাথায় হাত বোলালেন, বুকে জড়িয়ে ধরলেন কাঁদতে কাদঁতে। মাটিতে বসে আপার সামনে মাইক্রোফোনটা ধরি। আমার ডান হাতটা চেপে ধরে রেখেছেন শেখ হাসিনা, মাত্র দুদিন আগে মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার অনুভব নিয়ে। স্পর্শটা সেদিন অনেক কথাই বলছিল। আমি বলেছি কেবল, ‘আপা’।

২০০৮ সালের নির্বাচনের জয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলন। শেরাটন হোটেলে। বড় স্টেজ। পারিষদসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তর দিচ্ছেন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের। হাত তুলে মনোযোগ নিলাম। মিষ্টি হাসি, দুই ভ্রূ কপালে তুলে, চোখে জিজ্ঞাসার এক্সপ্রেশন। আমরা নিউজরুমে এই এক্সপ্রেশনের নাম দিয়েছিলাম ‘লাই’। মানে তোমাকে স্নেহই করি।

সেই ‘লাই’ এক্সপ্রেশনে প্রধানমন্ত্রী বললেন, বলো। আমি শুরু করলাম, ‘আপা...আপা...আপনি বলেছেন বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করবেন না, তাহলে বিএনপি নেত্রীকে কি কোনও প্রস্তাব দেবেন?’

সুন্দর করে এই প্রশ্নের জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী। নিউজরুমে ফিরে ধমকের সুর শুনলাম মনজুরুল আহসান বুলবুলের—‘দেখেন মুন্নী, তিনি আপনার আপা না। ফর্মাল প্রেস কনফারেন্সে আপনার মতো একজন সিনিয়র রিপোর্টার কীভাবে প্রধানমন্ত্রীকে আপা আপা বলেন? ভেরি ব্যাড!’

আমার মতো বাংলাদেশের আমজনতা, যারা শেখ হাসিনার ‘আপাত্ম’ একটু পেয়েছেন, আমাদের সবারই একই যুক্তি, দোষটা যতটা না আমাদের, এর চেয়ে বেশি তার ক্যারিশমার। তার কাছে গেলে ভুলে যাই সব। এক মিনিটেই ভুলিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রিত্বের বুকিশ কাঠখোট্টা অহংয়ের দূরত্ব।

২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত। সাংবাদিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা আমার সে অর্থে কম হয়। ওই যে বলেছি, আগে নিউজরুমে সিনিয়রদের পলিটিক্স ছিল, পরে সেটা নেতা সাংবাদিকদের পকেটে। আপার কাছ থেকে তাদের কেউ প্রধানমন্ত্রীর সাপোর্ট হিসেবে কাজ পেয়েছেন, তারা কাঁটা তাক করে ঘিরে আছেন। তাতে কী? আপা কাছে টেনে জানতে চান, কোন ইস্যু কোন অবস্থায় কাভার করেছি। আপাই ফোনে বকা দেন, যুদ্ধাবস্থায় যেন লিবিয়ায় না ঢুকি।

তারেক-মিশুকের মৃত্যু, গণজাগরণ মঞ্চ, মাহফুজ আনাম প্রসঙ্গ নানান কিছু নিয়েই কথা হয়। কথায় কথায় ঠাট্টা করেন। ২০১৩ সালে জাতিসংঘের ভাষণের পরপরই হাডসন রিভারের পাড়ে হাঁটছিলেন শেখ হাসিনা। তার আগের দিন আমি তার হোটেল স্যুটে লম্বা ইন্টারভিউ নিই। ইন্টারভিউর শেষে প্রেস সংক্রান্ত কর্তাব্যক্তিরা টেপটা নিয়ে যান—একটু বাদে দেবেন বলে। কারণ, অন্য সাংবাদিকরা কেউ এক্সক্লুসিভ পাননি। জানেনও না আমি কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছি। ফলে, হইচই, মন কষাকষি হবে। আমি যেন ১ দিন পরে অনএয়ার করি। তাই রেখে দিলেন। সরল বিশ্বাসে আমিও কোনও প্রতিবাদ না করে দিয়ে দেই। ওমা, ১০ মিনিটের মধ্যে প্রথম আলো অনলাইনে মিথ্যা বানোয়াট খবর। প্রথিতযশা সাংবাদিক আমাকে ফোন করার ভদ্রতাটুকুও করেননি। হাস্যকর খবরটা যে হাস্যকর বানোয়াট, তা শেখ হাসিনার চেয়ে আর কেই বা বেশি জানে? পরের দিন তাই দেখা হওয়া মাত্র খুবই ঠাট্টার ভঙ্গিতে আপা বললেন, ‘আমার গোপন ইন্টারভিউর সিডিটা নাকি ইকবাল ভাই নিয়ে নিছেন?’

আমি: আপা সিডি না, ক্যামেরার টেপ...।

আপা: হ্যাঁ, হ্যাঁ... তোমাদের সাংঘাতিকদের টেপ সিডি...কত কী! দেয় নাই? আমি তো পত্রিকায় দেখে অবাক! কীসের গোপন ইন্টারভিউ? কীসের কী? বললাম ওদের কে...আচ্ছা, না দিলে না দিক। আজকে প্রেসকনফারেন্সে সব বলে দিবোনে, গোপনে যা যা প্রশ্ন করছো, আবার কইরো...চলো চলো ছবি তুলি, পেছনে হাডসন রিভার। ক্যামনে জানি বলো তোমরা...মুন্নী সাহা (ভেংচি কেটে), এটিএন, হাডসন রিভার।

(২০১৩ সালের জাতিসংঘের অধিবেশনের পরে আপা সপরিবারে হাডসন রিভারের পাশে ছবি তুলছিলেন, আমরা সাংবাদিকরা পিটিসি দেওয়ার জন্য সেখানেই ছিলাম। হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে মজা করলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, আমাদের ছবি তুলে দিয়েছেন)।

মাহবুবুল হক শাকিল মারা যাওয়ার কিছু দিন আগের ঘটনা। রেহানা আপার ডাকেই গণভবনে। দুপুরে রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে বের হলেন প্রধানমন্ত্রী। ইলিশ পোলাও রান্না করেছেন। শাকিল একটা কাগজ দিতে দোতলায় এসেছিলেন শুনেই প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘আহা, একটু খেয়ে যেতে পারতো, চলো তোমার কপালেই আছে ইলিশ পোলাও।’

খাবার টেবিলে অনেক গল্পের মাঝে হঠাৎ রেহানা আপা জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা তোমাকে দেখে শাকিল রাগ করে চলে গেলো কেন?’

‘আমি জানি না আপা’, উত্তর দিলাম। কথা কেড়ে নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আমি জানি। আমার চারপাশের অনেকেই ওকে পছন্দ করে না, দেখতে পারে না!’

আমি খাবারটা ধরে প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে। খাচ্ছি না, নড়ছিও না। একটু সিনেমাটিক নীরবতার গ্যাপ দিয়ে, পাতে একটা মাছের মাথা তুলে দিতে দিতে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘ধুর বোকা! খাও। আসলে আমি পছন্দ করি তো, এ কারণে তোমারে কেউ দেখতে পারে না! কী করবা কও?’

আপা থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী থেকে আপা—এই সত্তার আলো খেলায়, আমার আপাকে একবারও হারাতে পারেননি আমাদের প্রধানমন্ত্রী।

শুভ জন্মদিন ‘আপা’!

লেখক: প্রধান নির্বাহী সম্পাদক, এটিএন নিউজ 

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ