আওয়ামী লীগের স্বচ্ছ নেতৃত্বের বার্তা যেন হতাশাব্যঞ্জক না হয়

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:২২, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৮, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

আনিস আলমগীরচলতি ডিসেম্বর মাসের ২০ ও ২১ তারিখ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলটি সারাদেশে একনাগাড়ে সম্মেলন করে যাচ্ছে। এতদিন করেছে অঙ্গসংগঠনগুলোর জাতীয় সম্মেলন। ৩০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ দুই শাখার সম্মেলন হলো। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে একে শুধু আওয়ামী লীগ রাখা হয়। জন্মের পর থেকেই সম্মেলন অনুষ্ঠান নিয়ে নেতাদের কেউ দলের সঙ্গে ফাঁকিবাজি করেননি। দলের প্রয়োজনে যখন যা করার তখনই তা করা হয়েছে গুরুত্ব সহকারে। সে কারণে কখনও দলটি নিষ্প্রাণ হয়নি।
আসলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই দলটি জন্ম নিয়েছিল মুসলিম লীগের বিপরীতে বিরোধী দল হিসেবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদের পরিশ্রমে দলটি গড়ে উঠেছে। যে কারণে আওয়ামী লীগ কখনও কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্যুত হয়নি। জন্মদাতারা বিশ্বাস করতেন ক্ষমতায় যেতে হলে সংগঠন দরকার। তারা কখনও ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করতেন না।

আওয়ামী লীগ অনেক সময় সামরিক স্বৈরশাসককেও পরোক্ষভাবে দল গঠনের প্রেরণা জুগিয়েছে। আইয়ুব খান কনভেনশন মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন আওয়ামী লীগসহ শক্তিশালী অন্যান্য বিরোধী দলকে মোকাবিলার জন্য। যদিও বা আইয়ুব খানের সময়ে মুখ্য বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল এনডিএফ। আর এনডিএফের ভেতরে প্রধান ভূমিকায় ছিল আওয়ামী লীগ। অন্য যারা ছিলেন তাদের কোনও দল ছিল না। তারা ছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন নুরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী, পীর দুদু মিয়া প্রমুখ। আওয়ামী লীগ যখন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর এনডিএফ থেকে বের হয়ে গেলো তখন এনডিএফের মৃত্যু হাওয়ায় প্রমাণ হয় এটি ব্যক্তিনির্ভর জোট ছিল।

পাকিস্তানের সময় আওয়ামী লীগ ছাড়া সরকারবিরোধী কোনও পুষ্টধারা গড়ে ওঠেনি। তখন আওয়ামী লীগের কোনও সহযোগী সংগঠন ছিল না। শুধু ছিল ছাত্রলীগ। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা প্রদানের পর ছাত্রলীগেও হাওয়া লাগে। আর ছাত্রলীগও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। শ্রমিক সংগঠন তখনও গড়ে ওঠেনি।

আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক ছিলেন চট্টগ্রামের প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা জহুর আহমদ চৌধুরী। তিনি নিজেই ৫০-৫২টি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। কর্ণফুলী পেপার মিলস, চট্টগ্রাম বন্দর, বার্মা ইস্টার্ন, পাকিস্তান টোব্যাকো, পাক বে কোম্পানি ইউনিয়নগুলোর তিনি ছিলেন সভাপতি। শ্রমিক সংগঠন কোনও রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করুক তা জহুর আহমদ চৌধুরীর বিশ্বাস না করলেও সংগঠনগুলোর ওপর আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল। তিনি ছাড়াও যারা ওই সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব দিতেন তারা আওয়ামী লীগের কাজ করতেন।

রেলওয়ে শ্রমিক নেতা মরহুম রহমত উল্লাহ চৌধুরী তো একসময় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। শ্রমিক নেতা জামশেদ আহমেদ চৌধুরী, মকবুল আহমদ সরাসরি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৬৯ সালের শ্রমিক লীগ গড়ে উঠলে জহুর আহমদ চৌধুরীকে সভাপতি করার প্রস্তাব করলেও তিনি কিন্তু ওই পদ গ্রহণ করেননি।

যাহোক, টানা ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে অঙ্গসংগঠনগুলোতে যেসব কায়েমি স্বার্থ গড়ে উঠেছিল তা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে উচ্ছেদ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাতে দলের সভানেত্রী কতটুকু কামিয়াব হলেন ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। রাজনীতি থেকে যে ন্যূনতম সততা তিরোহিত হয়েছিল তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী যে প্রাণান্ত প্রয়াস চালাচ্ছেন তার শুভ ফল তিনি প্রত্যাশা করতে পারেন। কারণ, তার নিজ জীবন থেকে সততা উচ্ছেদ হয়নি।

মিষ্টি না খাওয়ার উপদেশ দেওয়ার আগে নিজের যদি সে অভ্যাস থাকে তবে তা পরিত্যাগ করতে হয়। শেখ হাসিনার অবশ্য তা পরিত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। তার সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করে না। এখন খুবই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে সংগঠনগুলোর ওপর, যেন কোনও কায়েমি স্বার্থ পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বাইরে থেকে ভূদান আন্দোলনের নেতা আশ্চর্য বিনোবা ভাবে, সর্বোদয় নেতা  জয় প্রকাশ নারায়ণ ভারতীয় রাজনীতি যেন জনকল্যাণের পথে থেকে বিচ্যুত না হয় তার একটা প্রচেষ্টা চালাতেন। এমন কিছু আত্মত্যাগী নেতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজকের দুর্দিনে আবির্ভাব হলে উত্তম হতো। শুধু ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি সততার পথ থেকে যে বিচ্যুত হয়েছে তা নয়, সব দলেই সততার দুর্ভিক্ষ লেগেছে। সততা নির্মাণ করা যায় না। নিজের জীবনে সততা প্রতিষ্ঠা করে তা ছড়িয়ে দিতে হয়।

এখন আমাদের দেশে সর্বত্র সততার খুবই অভাব। আওয়ামী লীগ বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন। আওয়ামী লীগকে সত্যের পথে সততার পথে টেনে আনতে পারলে সর্বত্র সততার সুবাতাস ফিরে আসবে। আওয়ামী লীগ সম্মেলন করে যে কয়টা কমিটি করেছে তাতেও নাকি দুই একজন অসৎ লোক ঢুকেছে। যাদের বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। মূল দলের জাতীয় কাউন্সিল হবে এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। নিশ্চয়ই নবীন-প্রবীণ সমন্বয় হবে কমিটিতে।

আমরা আশা করবো আওয়ামী লীগের জন্য একজন ফুলটাইমার সাধারণ সম্পাদক যেন নির্বাচন করা হয় এই সম্মেলনে। মন্ত্রিত্ব ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকা উচিত নয়। সেই বার্তা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সময় দিয়ে গেছেন। সেই বার্তা অনুসরণ না করে আওয়ামী লীগ বারবার বিচ্যুত হচ্ছে কেন জানি না! দল সম্পর্কে সর্বাধিক অবহিত হচ্ছেন সভানেত্রী। সুতরাং তাকে তেমন কিছু বলা উচিত নয়।

আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, যাদের প্রেসিডিয়াম থেকে উপদেষ্টা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে তাদের পুনরায় প্রেসিডিয়ামে আনা প্রয়োজন বলে আওয়ামী লীগ সমর্থকগোষ্ঠী মনে করে। কারণ, নামিদামি নেতারা সংগঠনে ও মন্ত্রিসভায় না থাকলে সংগঠন বা মন্ত্রিসভা ওজনদার হয় না। আশা করি আওয়ামী লীগ নেত্রী এ বিষয়টি অনুধাবন করবেন। আর শুদ্ধি অভিযান যেন অব্যাহত থাকে।

জনগণ পুনরায় আশান্বিত হয়েছে যে দলের কাজ ছেড়ে আওয়ামী লীগের ছোট-বড় নেতারা যে অসৎ কাজে আত্মমগ্ন হয়েছিল, শুদ্ধি অভিযানের ফলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সম্বিত ফিরে পেয়েছে। মহৎ উদ্দেশ্য কখনও ব্যর্থ হয় না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ