হায় বধ্যভূমি, কত অবহেলায় তুমি!

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:৫৯, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৩, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামমুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বধ্যভূমি— এই শব্দগুলো কী এক অপার মহিমাময়!
কী এক শ্রদ্ধার! কী এক শক্তি! চেতনাকে নাড়া দিয়ে যায়!
পুরোজাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে শব্দগুলোর পেছনের কারিগরদের। যারা মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি প্রতিবাদের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে নিজেদের অস্তিত্বের টানে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। সেজেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তির জন্য যুদ্ধে অংশ নেওয়াই ছিল তাদের সব ধ্যান-জ্ঞান। সেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শত্রুকে মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে অকাতরে কত তরুণ-তরুণী-কিশোর-নারী-পুরুষ। তাঁদের লাশ পড়েছিল যেসব স্থানে, সেই স্থানগুলোকে পবিত্রতা দেওয়ার জন্য বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার।
শত্রুরা যখন একাত্তরের ডিসেম্বরের শুরুতে বুঝতে পেরেছিল তাদের পরাজয় নিশ্চিত, তখনই তারা ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য কাজটি শুরু করে। জাতির স্তম্ভ একেকজন বুদ্ধিজীবীকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে। জাতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ থেকে বিরত করার এরচেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় পাকিস্তানিদের কাছে আর কিছু ছিল না বোধহয়।

সেই বুদ্ধিজীবীসহ লাখ লাখ সোনার সন্তানদের স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য বধ্যভূমি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বিভিন্ন সময়। বিশেষ করে স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন তো অবশ্যই এটা হয়েছে, পাশাপাশি অন্যসময়ও লোকদেখানো তরিকায় বধ্যভূমি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সেগুলোকে সংরক্ষণে আর তেমনভাবে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া হয়নি, সেই সরকারের জোটে থাকা শরিকদের পরোক্ষ মদদে। তাই তো অনেক বধ্যভূমি পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে।

কিন্তু বর্তমানে টানা তৃতীয়বারের মতো স্বাধীনতার স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকার পরেও কেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিজাগানিয়া বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না?

প্রশ্নটা সাধারণ মানুষের।

বধ্যভূমি নিয়ে আমরা প্রতিবছর মার্চ এবং ডিসেম্বর মাস এলেই সচেতন হই। পত্রপত্রিকা রেডিও-টেলিভিশনে বধ্যভূমির হাল-হকিকত নিয়ে নানা রকমের সংবাদ পরিবেশন করা হয়, এই সময়টায়। নানা রকমের ত্রুটি তুলে ধরা হয়। পবিত্র এসব স্থানে কীভাবে মাদকাসক্তদের আখড়া গড়ে উঠেছে, বা গরু চারণের সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তা তুলে ধরে সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করা হয়। প্রশাসন বেশ তৎপরতা দেখায় এ সময়। আবার যখন এই মাস চলে যায়— তখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারাও আবার নিরুত্তাপ হয়ে যাই। দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যা-ই বলি না কেন, সব আবার যেন সাপের শীতনিদ্রার মতো হয়ে যায়।

তা হলে কি আমাদের সবকিছুতেই ভান বা লোকদেখানো সংস্কৃতি ঢুকে গেছে? আমাদের ভেতর থেকে মায়া মমতা শ্রদ্ধা কমে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা যেমন মাঝে মাঝে বলে থাকেন, সে রকমই কি এই যে দেশের সূর্যসন্তানদের স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য স্মৃতিসৌধ বা বধ্যভূমি শনাক্তকরণের উদ্যোগ দেখা যায়—সেগুলো কি তা হলে সবই ভান, লোকদেখানো?

তাই যদি না হয়, তা হলে কেন পত্রিকায় আমাদের পড়তে হয়— মুক্তিযুদ্ধের ২৭১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য দেড়বছর আগে ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, কিন্তু আজ পর্যন্ত ওই প্রকল্পের অধীন কোথাও একটা ইটও লাগানো হয়নি।

ভান সংস্কৃতির এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অতিউৎসাহী কিছু মানুষ সরকারপ্রধানকে খুশি করার জন্য কোনও প্রকার যাচাই-বাছাই না করেই প্রকল্প তৈরি করে টাকাও পাস করিয়ে নেয়। ব্যাপক কাজ হচ্ছে বধ্যভূমি আর স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে— এরকম একটা পরিবেশ তৈরি করে রাখে। কিন্তু বাস্তবে পুরোটাই ফাঁপা।

স্বয়ং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার স্মৃতিকে তুলে ধরতেই আমরা এ প্রকল্প নিয়েছি। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও প্রকল্পটির ধীরগতি আমাদের ব্যর্থতা।

এই যদি হয় অবস্থা, তা হলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তো উঠতেই পারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাজটা কী?

দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক বধ্যভূমি শনাক্ত করা হলেও সেগুলোর পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে মন্ত্রণালয়?

এমন অনেক বধ্যভূমি আছে যেগুলোতে স্থানীয়ভাবে সচেতন মানুষ স্মৃতিফলক নির্মাণ করলেও রাতের আঁধারে কে বা কারা সেগুলো খুলে নিয়ে গেছে, কেউ জানে না। স্থানীয়ভাবে কিছু সংস্কৃতিবান মানুষের উদ্যোগে বধ্যভূমির সংরক্ষণের কাজ করা হলেও সরকারি তৎপরতা না থাকায়, এর অবস্থা মৃত প্রায়। কোনও কোনও বধ্যভূমির জায়গা দখল করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায় পত্রিকা মারফত। রাজধানী মিরপুরের এক নম্বরে রয়েছে বেশ কিছু বধ্যভূমি। সেগুলোর অস্তিত্বও বিলুপ্তির পথে।

মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং বধ্যভূমি— এই তিন শব্দ আমাদের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। আমাদের নতুন প্রজন্ম এসব শব্দ বুকে ধারণ করতে পারলেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে পারবে। বধ্যভূমির মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন জানতে পারবে আমাদের একটা একাত্তর ছিল, আমাদের একটা মুক্তিযুদ্ধের মতো গর্বের ইতিহাস আছে, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, তখন চোখ বন্ধ করে নিজেদের অজান্তেই বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে স্যালুট জানাতে প্রেরণা পাবে।

নতুন প্রজন্মের জন্য হলেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বধ্যভূমি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের সূর্যসন্তানদের ত্যাগের কথা প্রতিটি বধ্যভূমির স্মৃতিফলকে লিখিত আকারে প্রকাশ করতে হবে সংক্ষিপ্তভাবে। যেসব বধ্যভূমি বেদখল হয়ে গেছে সেগুলোকে উদ্ধার করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

তা হলেই আমাদের নতুন প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারবে— আমাদেরও একটি মুক্তিযুদ্ধের গর্বের ইতিহাস আছে। আমরাও যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি।

৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া সেই স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই ম্লান হতে দেওয়া যাবে না।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

 

 

/এসএএস/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ