সংকট থেকে উত্তরণে ডাকসুর স্বাধীনতা অনিবার্য

Send
ব্যারিস্টার সৈয়দ রুম্মান
প্রকাশিত : ১৩:৪৭, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫২, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯

ব্যারিস্টার সৈয়দ রুম্মানবাংলাদেশে অসংখ্য ইস্যু, ভালো খারাপ খবরের ভিড়ে ছাত্র রাজনীতির বিষয়টি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছাত্রদের দ্বারা তৈরি যেকোনও সংকটে ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি সাধারণ মানুষ, সাধারণ ছাত্র ও তাদের পরিবার কিংবা খোদ সরকারের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিব্রত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির এই লেজুড়বৃত্তির শুরুটা যেখান থেকেই হোক না কেন, প্রশ্ন হচ্ছে এই লেজুড়বৃত্তির পরিবর্তনটা কি সময়ের দাবি নয়? যেকোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করায় ছাত্র রাজনীতির ভূমিকাটা অস্বীকার করার কোনও স্থান নেই—সে হোক এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা আফ্রিকায়। এই ছাত্ররাই সংকট মুহূর্তে দেশকে দেখাতে পারে সঠিক পথ, কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত যদি সে জাতির ভাবী কর্ণধার তরুণ ছাত্রদের ভবিষ্যৎকে সংকটের সম্মুখীন করে, তখন এই ছাত্রদের শ্রেণিকক্ষের কণ্ঠই হয়ে ওঠে রাজপথের প্রতিবাদী ওঙ্কার। সেটি দেখেছি সম্প্রতি তাহরির স্কয়ারে, সেটি দেখছি বঙ্গভঙ্গের সময়ে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন, নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতন কিংবা রাজাকারের বিচারের দাবিতে শাহবাগের আন্দোলন। এমনকি এই ব্রিটেনেও ২০১২ সালে আমাদের সফল আন্দোলনের কারণে খোদ ব্রিটিশ সরকার তাদের ইউকে বর্ডার এজেন্সির (ইউকেবিএ) কাঠামো পরিবর্তন করে ইউকে ভিসাস অ্যান্ড ইমিগ্রেশন (ইউকেভিআই) নামে চালু করে—আর এর নেতৃত্বে ছিলাম আমরা বাংলাদেশি ছাত্ররাই। তাই ছাত্রদের মেধা বিকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটানোর অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতিতে মৌলিক কিছু বিষয়ে এখনও পরিবর্তন না আসার কারণে ছাত্র রাজনীতির ভালো দিকটি সাধারণ মানুষ কিংবা অনেক শিক্ষিত সমাজেরও দৃষ্টিগোচর হয় না।

ডাকসু ভিপি কিংবা সাধারণ ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ কিংবা ছাত্রলীগের বিরোধের মূল কারণই হচ্ছে ছাত্র রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি। ডাকসু নির্বাচনের দীর্ঘ আট মাস পরেও আজ পর্যন্ত ভিপি নুরসহ নির্বাচিত ছাত্রসংসদের কারও মুখেই শোনা যায়নি খোদ ডাকসুকে কীভাবে স্বাধীন একটি ছাত্রসংসদে রূপান্তর করা যায়, কীভাবে স্বাধীন একটি অর্গানাইজেশন হিসেবে ডাকসুকে প্রতিষ্ঠা করা যায় যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রসংসদের আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক এবং প্রশাসনিক রূপ থাকবে এবং ছাত্রদের অধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠায় একটি হবে আরেকটির সহায়ক।

আমার কাছে যে বিষয়টি প্রথমেই যুক্তিযুক্ত লাগে না সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কোন পদাধিকারে ডাকসুর প্রেসিডেন্ট হন, যার ‘হুকুম’ আর সভাপতিত্ব ছাড়া ডাকসুর কার্যনির্বাহী কমিটির কোনও মিটিংও হওয়া সম্ভব না। আবার বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেই ছাত্রসংসদকে ভেঙে দিতে পারে কিংবা করতে পারে স্থগিত। এটি একেবারেই সাংঘর্ষিক, আর একারণে ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘পুতুল অর্গানাইজেশন’ হিসেবে কাজ করছে। পরাধীন ডাকসু ছাত্রদের অধিকার আদায়ে কী করে তবে স্বাধীনভাবে কথা বলবে?

ডাকসু স্বাধীন না থাকার কারণেই সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের অপ্রত্যাশিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে বর্তমান ডাকসুর অবস্থা খুবই নাজুক। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ডাকসুর ভিপি তার বিরোধী প্যানেলের ছাত্রদের দ্বারা প্রহৃত হন,তারপর তার সতীর্থরা প্রক্টর ও ভিসির পদত্যাগ দাবি করেন, কিন্তু একটি স্বাধীন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদে তো এরকম হওয়ার কথা ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন কোনও আইনও নেই যেখানে স্বাধীন কিংবা স্বায়ত্তশাসিত ছাত্রসংসদের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

একারণে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ না করে লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। সেজন্য ডাকসুসহ সব ছাত্রসংসদকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাধীন হতে হবে যেখানে ভিসি কোনোভাবেই ছাত্রসংসদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। আর এই কাজটি ডাকসু থেকেই শুরু হওয়া উচিত।

অপরদিকে ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ আরও অনেক দলের সভাপতির ভূমিকায় থাকেন খোদ মূলদলের সভাপতি যিনি নিজে ছাত্র নন। আজকের ছাত্র রাজনীতির সমস্যার শুরু আসলে এ লেজুড়বৃত্তি থেকেই। এই সমস্যা দূর না করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করাটা হবে ছাত্রদের নেতৃত্বের সুযোগকে ধ্বংস করা; যার কারণে দেশ একসময় নেতৃত্বহীনতায় ভুগবে।

এত বছর ধরে ভুল হয়েছে তার মানে এই নয় যে এখন সমস্যা ঠিক করা যাবে না। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, এই ডাকসু বাংলাদেশের অনেক আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, যদিও সাংবিধানিক কাঠামোয় ডাকসু স্বাধীন ছিল না। আমি আশ্চর্যজনকভাবে এতোদিন ধরে খেয়াল করলাম, উপর্যুক্ত মৌলিক সমস্যাগুলোকে এখন পর্যন্ত কেউ চিহ্নিত করে বলতে পারলেন না।

আরও অবাক হলাম, এই বিলেতে বিভিন্নভাবে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার পর অনেকেই এখন বাংলাদেশে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন অথচ কোনও এক অজানা কারণে তারা এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেনি কিংবা বলেন না।

ব্রিটেনে আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে দুইবার ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলাম, হয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নর, ডিরেক্টর ও ট্রাস্টি; ছাত্রদের ইস্যুতে সফলভাবে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে সুযোগ হয়েছিল অনেক ছাত্রসংসদের সংবিধান লেখা ও পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার। কিন্তু কোথাও দেখিনি স্বায়ত্তশাসিত কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিকে ছাত্রসংসদের কার্যনির্বাহী কমিটিতে বসার সুযোগ দেওয়া হয়।

সবচেয়ে অবাক করার কথা,যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়, সেই অক্সফোর্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়নের কাঠামোও কি কখনও কারও নজরে আসেনি? নাকি নিজেদের কোনও স্বার্থেই সবাই এ বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন? কী করে ডাকসু এত বছরেও নিজেদের একটি প্রতিনিধিত্বশীল ও স্বাধীন ছাত্রসংসদের সংবিধান উপহার দিতে পারলো না সেটি আমার বোধগম্যে আসছে না।

এখনও সময় আছে, নিজেদের শুধরে নেওয়া উচিত। একটু সচেতনতা ও দূরদর্শিতা থাকলে সব পরিবর্তনই সম্ভব। আর যদি মনে করেন যারা বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের সহযোগিতা আপনাদের দরকার, তাহলে বলুন, আমার বিশ্বাস সবাই দেশের ডাকে ছুটে আসবেন, সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার সহযোগী হতে পারি।

লেখক: সাবেক ভিপি ও ইউনিভার্সিটি গভর্নর, লন্ডন মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটি

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ