আগামী ১৪ দিন আপনার জীবন বাঁচাতে পারে

Send
ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ
প্রকাশিত : ১৮:৩৪, মার্চ ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, মার্চ ২৯, ২০২০

ডা. মালিহা মান্নান আহমেদসাধারণ হাত ধোয়া আর সামাজিক শিষ্টাচার মেনে চলার মধ্য দিয়েই কোভিড-১৯ ভাইরাসের মহামারি ঠেকানো যেতে পারে।
বাংলাদেশে গত ৭ মার্চ প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এই প্রবন্ধ লেখার সময় সরকারি হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ জন, আর মৃতের সংখ্যা পাঁচ জন।
বাংলাদেশকে খানিকটা ভাগ্যবানই বলতে হবে, অন্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক পরে এই ভাইরাসটি এখানে প্রবেশ করেছে। ফলে আমরা প্রস্তুতি নেওয়ার অনেক বেশি সময় পেয়েছি। অন্যদের কঠোর অভিজ্ঞতা থেকেও লাভবান হওয়ার সুযোগ পেয়েছি আমরা। এই সন্ধিক্ষণে যেটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, প্রথম আক্রান্ত শনাক্ত থেকে ভাইরাসের সংক্রমণের সংখ্যা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে।
বাংলাদেশে আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি অথবা শেষেরদিকে আমরা অনেক বেশি আক্রান্ত দেখতে পাওয়ার আশঙ্কা করছি। তবে মনে রাখা দরকার, আমরা একটি সীমিত সম্পদের দেশ, অল্প কয়েক হাজার আক্রান্ত রোগীও আমাদের স্বাস্থ্য সেবার চূড়ান্ত পরীক্ষায় ফেলতে পারে।

আর সে কারণে আক্রান্তের সংখ্যা সীমিত রাখা আমাদের জন্য খুবই জরুরি; হাত ধোয়া এবং সামাজিক শিষ্টাচার বজায় রাখার ক্ষেত্রে আর একটুও দেরি নয়। এই ভাইরাস মোকাবিলায় এই দুটিই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। এমনকি দেশব্যাপী কোয়ারেন্টিনের সময়সীমা এক বা দুই সপ্তাহের জন্য বাড়ানোর দরকার পড়তে পারে। (আশা তো করতেই পারি, এর চেয়ে বেশি নয়।)

ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন (self-quarantine) থাকা আমাদের দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ আড্ডাপ্রিয়। খুবই স্বাভাবিক যে কোনও বিদেশফেরত ব্যক্তি তার আত্মীয়, বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাতে উদগ্রীব থাকবেন। এমনকি পৌঁছানোর পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুরো গ্রামের সঙ্গে সাক্ষাতে উদগ্রীব থাকেন তিনি। দুর্ভাগ্যক্রমে এখন তা করার সময় নয়।   

সরকার দশ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সামাজিক মেলামেশার জন্য নয়, শিষ্টাচার মেনে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য। পূর্ববর্তী সংক্রমণ, প্রতিষেধক এবং টিকা না থাকায় কোভিড-১৯ ভাইরাস আমাদের জন্য খুবই স্পর্শকাতর। শুধু অপরের সংস্পর্শে আসা থেকেই এটা সংক্রমিত হতে পারে।

চীন ছাড়া অন্য দেশগুলোতে ভাইরাস একজন নিয়ে গেছে, আর তার মাধ্যমেই স্থানীয়দের কাছে ছড়িয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে রোগটি স্থানীয় পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়েছে। অন্য দেশগুলোর পরিসংখ্যানগত প্রমাণে দেখা গেছে, ওই মুহূর্তে সামাজিক শিষ্টাচার (social distancing) প্রয়োগ করা গেলে সম্ভাব্য আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

আগামী দুই বা তিন সপ্তাহ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক শিষ্টাচার (social distancing) পূর্ণাঙ্গভাবে মেনে চলা সম্ভব হলে আমরা হয়তো আরেকটি ইতালি বা ইরানের মতো পরিস্থিতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো। মারাত্মক ছোঁয়াচে এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এই মুহূর্তে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ লকডাউনে রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করা এবং ভাইরাসটি গতিপথ বন্ধ করা আমাদের কর্তব্য।

কোনও রোগের মহামারি রোধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এর ‘গতিপথ পাল্টে দেওয়া’। এর অর্থ কী আর কীভাবে তা অর্জন করা যায়?

উপরের গ্রাফটি হলো সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমিত সাধ্যের মধ্যে ধরে রাখার মূলনীতি। খাড়াভাবে বৃদ্ধি পাওয়া কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা দেখে বোঝা যায়, তা দেশগুলোর বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামর্থ্যকে অতিক্রম করে গেছে। ইতালিতে এই খাড়া বৃদ্ধির সময়কালে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ হাজার আক্রান্ত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রতিদিন এই সংখ্যাটি ১১ থেকে ১৭ হাজারে ওঠানামা করছে; চীনে সবচেয়ে খারাপ দিনে ১৪ হাজার ১০৮ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে পরে লকডাউন কার্যকর করা হলে সংক্রমণের সংখ্যা কমতে শুরু করে।

গ্রাফের সমতল ঢাল নির্দেশ করছে একই সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হবে কিন্তু ধীর গতিতে। তাতে করে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিজেদের ওপর চাপ না নিয়ে এবং সীমিত সরঞ্জামের মাধ্যমে সব রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ রোধকারী পদক্ষেপ নিয়ে সংক্রমণের গতি কমানো যায়। তাতে করে মৃত্যুহার কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং হংকং ‘গতিপথ পাল্টে দেওয়া’য় সফলতা পেয়েছে।  

আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কোয়ারেন্টিনে রাখা, স্কুল বন্ধ করে দেওয়া এবং তাৎক্ষণিকভাবে দুই সপ্তাহ কর্মস্থল থেকে দূরে রাখার সমন্বিত ব্যবস্থা দেশজুড়ে বাস্তবায়ন করা একটি আদর্শ পদক্ষেপ। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য আরও দরকার পড়ে রোগীদের বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক নেগেটিভ প্রেসার রুম, বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স, লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া ও না পাওয়া রোগীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় টেস্ট কিট এবং স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই)।  

বাংলাদেশের পরিস্থিতি আদর্শ নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য আছে কেবলমাত্র ৫.২৬ জন ডাক্তার এবং ৩.০৬ জন নার্স। দেশের আরেক সূচক অনুযায়ী প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য আছে হাসাপাতালের আটটি বিছানা। নিবিড় পরিচর্যার শয্যা, ভেন্টিলেটর এবং অন্য চিকিৎসা সামগ্রীর সরবরাহও সন্তোষজনক অবস্থার চেয়ে অনেক কম।

ইতালির সঙ্গে তুলনা করা গেলে দেখা যাবে দেশটিতে চিকিৎসক-নাগরিকদের অনুপাত প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৩.৮ জন আর নার্স ৬.১ জন। থাইল্যান্ডে প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ২.২৮ জন ও নার্স ২.২৮ জন। বাংলাদেশে আমাদের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি হঠাৎ করে সংক্রমণ বেড়ে যায়, তাহলে কী ধরনের বিপর্যয় দেখতে হতে পারে? আর আমাদের সম্মুখভাগের কর্মীরা যদি সুরক্ষা সামগ্রীর অভাবে নিজেরাই আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের চিকিৎসা দেবে কে?

সামাজিক শিষ্টাচার (social distancing) অর্জনে সরকারের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপ সত্যিকার অর্থে কাজে আসতে পারে যদি মানুষ নিজেদের আচরণের বিষয়ে পূর্ণ সচেতন থাকে। ইতালি, যুক্তরাজ্য, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড এবং অন্য অনেক করোনা কবলিত দেশ থেকে বহু সংখ্যক বাংলাদেশি ফিরে এসেছেন। কর্তৃপক্ষ তাদের ১৪ দিন স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ হলো তাদের অবশ্যই নিজ বাড়িতে থাকতে হবে এবং ওই ১৪ দিনের মধ্যে তারা বাড়ির বাইরে বের হতে পারবেন না।

এই ১৪ দিনের গুরুত্ব কী?

করোনাভাইরাসের বংশবিস্তারে সময় লাগে ৫.৫ দিন। আক্রান্ত হওয়ার ১২ দিনের মধ্যে মানুষের শরীরে এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। লক্ষণ দেখা যাক বা না যাক আক্রান্ত মানুষ ভাইরাসটির বিস্তার ঘটাতে সক্ষম। এর অর্থ হলো আক্রান্ত হওয়া থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি সংক্রমণের বিস্তার ঘটাতে পারে।

সেকারণে কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের শরীরে ১৪ দিনের মধ্যে সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাদের মধ্যে যদি লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগে তাদের অবশ্যই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে।

জ্বর ও কাশির মতো অন্য লক্ষণগুলো সেরে যাওয়ার পর এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুইবার করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেই কেবল তারা বিচ্ছিন্নতা থেকে ছাড়া পেতে পারেন। স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন থাকা কোনও ব্যক্তির লক্ষণ প্রকাশ পেলে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে।

১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের সময়সীমা মানা না হলে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে তো আক্রান্ত কেউ যতটা পথ তিনি বিমানে, বিমানবন্দরে, গাড়িতে বা বাড়িতে পাড়ি দিয়েছেন, তার মধ্যেই তিনি অনেককেই আক্রান্ত করে ফেলেছেন।

আরেকটু খতিয়ে দেখা যাক। কোনও মহামারিতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সরাসরি কতজন আক্রান্ত হতে পারে তা বেসিক রিপ্রোডাকশন নাম্বার বা আর.ও. (RO) নামে পরিচিত। কোভিড-১৯ এর মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এই আর.ও. বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই নতুন ধারার সংক্রামক রোগ সবাইকে সন্দেহভাজনের তালিকায় ফেলেছে।   

আর.ও. একের চেয়ে বেশি হলে এর বিস্তার ঘটতে শুরু করে এবং মহামারির কারণ হতে পারে। আর আর.ও. একের চেয়ে কম হলে রোগের বিস্তার কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে শেষ হয়ে যায়। জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী কোভিড-১৯ এর আর.ও. ২.৪৯ থেকে ২.৬৩ পর্যন্ত হতে পারে। এর অর্থ হলো একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ২.৫ জনেরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে।

কখনও কখনও এমনও হতে পারে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি দশজন বা একশ’জনের মধ্যেও রোগটি ছড়িয়ে দিতে পারে। তাদের চরম সংক্রামক বলা হয়ে থাকে। চীন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে এরকম চরম সংক্রামক থাকার প্রমাণ মিলেছে। তবে আরও পরিবেশগত পরিস্থিতি; আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর আচরণ এবং চূড়ান্তভাবে জনগোষ্ঠীর কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, তার ওপরও নির্ভর করে।

সিডিসি’র আরেক গবেষণায় কোভিড-১৯ এর সিরিয়াল ইন্টারভাল উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সময় ও দ্বিতীয় আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সময়ের মধ্যে ব্যবধান ৩.৯৬ দিন।

এবার স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন থাকার প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বিদেশফেরতদের কতজন আক্রান্ত, কতজন নন, কতজনের লক্ষণ আছে বা কতজনের নেই বা কতজন চরম সংক্রামক, তা কেউ জানে না। এসব জানতে হলে পৌঁছানোর দিন থেকে তাদের ১৪ দিন পর্যন্ত সময় দিতে হবে।

 ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা কেন দরকার?

এই ভাইরাসটি মারাত্মক ছোঁয়াচে এবং নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ একে পরাজিত করতে সাহায্য করতে পারে। সার্স-কোভ-২ ভাইরাস তিন ধরনের উপাদান দিয়ে গঠিত−আরএনএ, প্রোটিন এবং লিপিড। প্রোটিনের মাধ্যমে ভাইরাসটি মানবদেহের কোষের সঙ্গে মিশে যায়, আর এর বিস্তার ঘটায়।

আরএনএ’তে থাকে জেনেটিক উপাদান। আর এটি মানুষের কোষে হানা দিয়ে কোষকে অক্ষম করে দিয়ে নিজের আরএনএ এবং ভাইরাসটি যেসব প্রোটিনের সমন্বয়ে গঠিত, তা প্রতিস্থাপন করে। আর লিপিড হলো দুই স্তরের পর্দা। ভাইরাসের চারদিকে তা রক্ষাকবচ হিসেবে থাকে এবং ছড়াতে ও কোষে বিস্তার পেতে সহায়তা করে। ভাইরাসটির নিজস্ব গঠন প্রোটিন, আরএনএ এবং লিপিডের ‘অসমযোজী’ দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

নতুন ভাইরাসের প্রতিলিপি মানুষের কোষে ধারাবাহিকভাবে বেশি হয়ে যায়, আর পরে সেটি মারা যায় বা বিস্ফোরিত হয়ে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে, পরে আরও বেশি কোষ আক্রমণ করে। ভাইরাসটি ফুসফুসের বাতাস নির্গমন পথ এবং মিউকাস পর্দায় গিয়ে পৌঁছায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশির ফোঁটা বা সর্দির মাধ্যমে এটি ৩০ ফুট পর্যন্ত উড়তে পারে।

কাশির বড় ফোঁটাগুলোই করোনাভাইরাসের মূল বাহক, আর এগুলো সাত ফুট পর্যন্ত যেতে পারে। সেকারণে কোনও ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা জরুরি।

ভাইরাসটি বিভিন্ন পৃষ্ঠের ওপর বেঁচে থাকতে পারে। খোলা বাতাসে এটা তিন ঘণ্টা পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়, তামার ওপর চার ঘণ্টা, কার্ডবোর্ডের ওপর ২৪ ঘণ্টা এবং প্লাস্টিক ও স্টেইনলেস স্টিলের ওপর ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। কাঠ, কাপড়, কার্ডবোর্ড বা চামড়ার মতো অর্গানিক পৃষ্ঠের সঙ্গে এটা অনেক বেশি জোরালোভাবে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে।

স্টিল, চীনামাটি ও প্লাস্টিক মসৃণ হওয়ায় এগুলোর ওপর ভাইরাসটি অতটা জোরালোভাবে লেগে থাকতে পারে না, আর এসব পৃষ্ঠ ছুঁয়ে দিয়ে সহজেই তা হাতে চলে আসতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, কেউ আক্রান্ত এসব জিনিস ধরলেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন।

সংক্রমণের জন্য কোনও পৃষ্ঠের ওপর ভাইরাসটির ঘনত্বের মাত্রা এবং এর জীবনের অর্ধেক সময় বাকি থাকাও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আর কত ঘনত্ব থাকলে একজন আক্রান্ত হতে পারেন, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন।

যাই হোক, আক্রান্ত পৃষ্ঠ ছোঁয়ার পর আমাদের নাক, মুখ বা চোখে হাত দেওয়ার মাধ্যমেও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

ভাইরাসটি লিপিড কোটিংয়ে হাইড্রোফোবিক এবং হাইড্রোফিলিক প্রান্ত রয়েছে। চর্বিসদৃশ উপাদান সমৃদ্ধ সাবানের গঠনও প্রায় এক। গঠনগত দিক দিয়ে ভাইরাসটির মেমব্রেনের মতোই সাবানের গঠন। আমরা যখন সাবান দিয়ে হাত ধুই, তখন সাবানের অণুগুলো ভাইরাসটির মেমব্রেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে।

সাবান এবং পানি ভাইরাসটি এবং চামড়ার মধ্যকার আঠার মতো বন্ধনটি আলগা করে দেয়, ভাইরাসের লিপিড মেমব্রেনে টান দেয় এবং বন্ধনগুলো ভেঙে দেয়, আর সেগুলো ধুয়ে নিয়ে যায়। ত্বক রুক্ষ এবং কুচকানো হলেও যথেষ্ট পরিমাণ কচলানোর মধ্য দিয়ে ভাইরাস লুকিয়ে থাকতে পারার সম্ভাব্য প্রতিটি কোনায় সাবান পৌঁছানো নিশ্চিত করা যেতে পারে।   

সাবান ও পানি না থাকলে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল থাকা হ্যান্ড স্যানিটাইজার সমৃদ্ধ অ্যালকোহলও লিপিড মেমব্রেন নষ্ট করে দিয়ে ভাইরাসটি ধ্বংস করতে পারে।

একটা বিষয় স্পষ্ট, শ্বাসতন্ত্রে এই ভাইরাস খুবই সাধারণভাবে সংক্রমিত হয় বড় আকারের শ্বাসের ফোঁটার মাধ্যমে। বাতাসের মধ্য দিয়ে সংক্রমিত হতে পারে যখন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগীকে নেবুলাইজার দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার পর সেখানে এই ভাইরাসটির অবশেষ থেকে যেতে পারে। সেকারণে কেবলমাত্র বাড়িতে নিয়ন্ত্রিত ইনহেলার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা প্রত্যেককে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোন কোন বিষয়ের ওপর জোর দিতে বলছেন এবারে তা দেখা যাক:

১. হাঁচি-কাশি বা নাক পরিষ্কারের সময় টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ ঢাকুন।

২. টিস্যুটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সাবান ও পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে নিন বা ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।

৩. দূষণযুক্ত হাত দিয়ে মুখ, নাক বা চোখ স্পর্শ করবেন না।

৪. ব্যক্তিগত পারিবারিক সামগ্রী অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি বন্ধ রাখুন

৫. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা বজায় রাখুন এবং টয়লেট ব্যবহারের পর এবং দৃশ্যমান ময়লা থাকলে হাত ধুয়ে ফেলুন। খাবার খাওয়া, রান্না করার আগে এবং বাইরে থেকে ফেরার পরও হাত ধুয়ে ফেলুন। 

৬. এই মহামারির সময়ে দরজার হাতল বা সব সময় ব্যবহার হচ্ছে এমন স্থান জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন।

৭. আক্রান্ত ব্যক্তি বা তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি এবং প্রতিরোধ অক্ষম ব্যক্তিরা অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন।

৮. মানুষের যেকোনও ভিড় এড়িয়ে চলুন।

বাংলাদেশে কমিউনিটি বিস্তার শুরু হয়েছে। এতে ভাইরাসটি নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ ঘটাচ্ছে, আর মানুষ জানতেও পারছে না তারা কখন এবং কীভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এমন অবস্থায় আমাদের সতর্ক থাকা ছাড়া উপায় নেই।

কেন করবো তা নিয়ে বিতর্ক করার চেয়ে এখন আমাদের সমন্বিতভাবে নিজেদের কাজ করা উচিত এবং বিধিনিষেধ মেনে চলা ও সামাজিক শিষ্টাচার বজায় রাখা জরুরি। লক্ষণ দেখা দিলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। পরস্পরকে সচেতন করতে হবে এবং বয়স্কদের যত্ন নিতে হবে।

কয়েকটি বিষয় বাংলাদেশের পক্ষে আছে। জনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। আর ৮৮ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের কম। এটা তরুণদের দেশ। যদিও ভাইরাসটি শিশুসহ সব বয়সীকে আক্রান্ত করলেও বয়স্ক এবং প্রতিরোধ অক্ষম মানুষদের জন্য এর লক্ষণগুলো বেশি মারাত্মক।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি’র মতে, করোনাভাইরাস সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রা, জোরালো সূর্যের আলো এবং উচ্চ আর্দ্রতায় অপেক্ষাকৃত কম স্থিতিশীল এবং কম সময় বেঁচে থাকতে পারে। সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের ক্ষেত্রে কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই যে কত ডিগ্রি তাপমাত্রায় তা আর বিস্তার ঘটাতে পারবে না। কিন্তু গ্রীষ্ম তীব্র হতে শুরু করলে আমরা নিশ্চিতভাবে আশা করতে পারি এর টিকে থাকাটা তাপমাত্রা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। 

সবশেষে আবার বলি, আগামী ১৪ দিন সামাজিক শিষ্টাচার (social distancing) মেনে চলুন, কিংবা আপনার ফিরে আসার দিন থেকে বা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে আসার দিন থেকে আপনার দিন গণনা শুরু করুন। মনে রাখবেন, ভাইরাসটির বেঁচে থাকার জন্য একটি পোষকের দরকার পড়ে। আর কৌশল হলো এটাকে তা পেতে না দেওয়া।

প্রতিটি জীবনই মূল্যবান, আর আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে তা বাঁচাতে পারি।

লেখক: উদ্যোক্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ

/জেজে/বিএ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ