নেমে আসে যদি অচেনা ঈগল, প্রমিথিউসকে ডেকো!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৫:১৬, এপ্রিল ০৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৩, এপ্রিল ০৬, ২০২০

আহসান কবিরকী চাও বলো? করোনার দিনগুলোতে আর কী কী দরকার?
খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার!
একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েই শুরু করলাম লেখাটা। এ ব্যাপারে অজস্র মন্তব্যের একটা এমন—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনের আগেই কি মানুষকে নিজগৃহে অন্তরীণ করানোর সিদ্ধান্তটা নেওয়া যেত না? তারপরও চমক দেওয়া ও মানুষের দৃষ্টি ফেরাতে এরচেয়ে ভালো আর কী বা হতে পারে? খালেদা জিয়ার ছয় মাসের জন্য মুক্তির সিদ্ধান্তটা একটা অনেক অনেক ভালো সিদ্ধান্ত!
ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েই করোনা প্রতিরোধে দেশের মানুষ যথাসম্ভব নিজেদের অন্তরীণ করেছেন। কিন্তু তাদের সব কার্যক্রম পাওয়া যাচ্ছে ফেসবুকে।

শুরুর দিকে অবশ্য অনেকেই করোনাকে সর্দি কাশির মতো হালকাভাবে নিয়েছিলেন। শেষমেশ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মতো বাংলাদেশেও এসেছে কোয়ারেন্টিন, লকডাউন বা অন্তরীণ অবস্থা। অজানা আতঙ্কে মানুষ নিজেকে অন্তরীণ করেছে। যে দিন আনে দিন খায়, সে কীভাবে বাঁচবে? শুধু বাংলাদেশ না সারা বিশ্বের অনেক দেশেই এই প্রশ্ন উঠেছে জোরেশোরে। মন্দা, খাদ্যাভাব, মহামারির মৃত্যুমুখী রূপ আর অর্থনীতির সর্বকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থাই কি ভবিষ্যতের নিয়তি? যাই ঘটুক, মানুষকে ঘরে রাখার প্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচিত্রা সেন। বলা হচ্ছে সুচিত্রা সেন যদি ত্রিশ বছর নিজ বাড়িতে অন্তরীণ থাকতে পারে আমি আপনি কেন মাত্র ১৪ দিন পারবো না?

দেশ-বিদেশে যথারীতি গুজবও চলমান রয়েছে করোনাকে ঘিরে। দক্ষিণ আফ্রিকায় এক যাজকের উপদেশ মেনে করোনা থেকে রক্ষা পেতে অনেকেই ডেটল খেয়েছিল। ফলাফল ৫৯ জনের মৃত্যু। গুজব ছড়িয়েছিল ছাপা পত্রিকার মাধ্যমে করোনা ছড়ায়। অনেকে এ কারণে দৈনিক পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন! বিপদ বুঝে বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা মালিকদের সংগঠন ‘নোয়াব’ বিবৃতি দিতে বাধ্য হয় যে দৈনিক পত্রিকার কাগজ বা এর বিতরণের মাধ্যমে করোনা ছড়ায় না। গুজবে কান দিতে মানা করা হলেও একটি নতুন ইংরেজি দৈনিক প্রচার চালায় যে তাদের দৈনিকটি পাওয়া যাচ্ছে সুন্দর পলিপ্যাকে! সম্পূর্ণ ভাইরাসমুক্তভাবে! এ ব্যাপারে একজন তার স্ট্যাটাসে জানতে চেয়েছেন, আমপাবলিক কোনটা বিশ্বাস করবে? ভাগ্যিস টাকা নিয়ে খুব বেশি গুজব ছড়ায়নি। শেষমেশ টাকাও কিন্তু কাগজ। কেউ অবশ্য কোনও হুজুর বা মাওলানার বরাত দিয়ে লেখেনি যে, টাকা হাত দিয়ে ধরলে বা গুনলেও করোনা সংক্রমিত হতে পারে!

অন্তরীণ অবস্থাটা যে সবাই মানছেন তেমন না। রাশিয়ায় তাই গুজব স্টাইলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, হয় পনেরো দিন নিজ বাসায় স্বেচ্ছাবন্দি থাকুন কিংবা পাঁচ বছর জেল খাটুন! দারুণ কাজ দিয়েছি নাকি এই প্রচার। মানুষ স্বেচ্ছাবন্দি মেনে নিয়েছে। বাংলাদেশে অন্তরীণ বা কোয়ারেন্টিন জারি করা হলে রেল, বাস ও ট্রেনের টিকিট কাটতে লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে। একসঙ্গে অসংখ্য মানুষের টিকিট কাটার ছবি যেমন ভাইরাল হয়েছে, তেমনি কাঁঠালবাড়ি ফেরিতে হাজারো মানুষের পার হওয়ার দৃশ্যও ভাইরাল হয়েছে। জানি না হাজারো মানুষের ভেতর কোনও করোনাভাইরাসের বাহক ছিলেন কিনা! কেউ কেউ এই ছবির নিচে মন্তব্য করেছেন, বোঝা যাবে ১৪ দিন পরে! যেখানে একজন মানুষ থেকে অন্যজনের নিরাপদ দূরত্বে থাকার কথা, যেখানে যথাসম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলার কথা, সেখানে হাজারো লোকের ভিড় হচ্ছে। হাজার লোক ভিড় করে প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছে যেন করোনা মহামারি হয়ে না আসে। অনেকে সংশয় প্রকাশ করে ফেসবুকে এসব ছবির নিচে যেমন লিখছেন, হায় কী যে হবে, কী যে আছে কপালে, ঠিক তেমনি অন্তরীণ অবস্থায় থেকে একজন স্ট্যাটাস দিয়েছেন, যৌবন ধরে রাখা আর বাচ্চাদের ঘরে রাখা সমান কঠিন! এবার বুঝুন ঠেলা।

লকডাউন বা অন্তরীণ অবস্থা না মেনে বাড়ির বাইরে আসায় রুয়ান্ডায় দুই জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। রুয়ান্ডা থেকে ব্রাজিল, সৌদি আরব থেকে ইতালি বা ফ্রান্স সব দেশেই স্বেচ্ছা অন্তরীণ অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। রুয়ান্ডার ওই দুই যুবক বাইরে বেরিয়ে এলে পুলিশ বাধা দেয়। তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে গুলি ছুড়লে ওই দুই যুবক মারা যায়!

পৃথিবীজুড়ে পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমেছে। ২০২০-এর মার্চে বিদেশের পর্যটন স্পটগুলো মানুষশূন্য হলেও বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলো লোকে লোকারণ্য হতে শুরু করেছিল। সম্মিলিত প্রচারণার ফলে মানুষ ঘরে ফিরেছে, আর গত তিন দশকের ভেতর এবারই প্রথম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ডলফিনের আনাগোনা আর আনন্দ ঝাঁপাঝাঁপি দেখা গেছে। এই সংবাদও ভাইরাল হয়েছে। একজন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, এই কয়দিনে দূষণের মাত্রা কমে গেছে এবং ঢাকার হাতিরঝিলে কুমির ও ডলফিনদের সাঁতার কাটতে দেখা গেছে। আরেকজন এর উত্তরে লিখেছেন, ভাই দিয়াবাড়ির দিকে আসেন। ওখানে ডাইনোসর পাবেন!

মানুষের ঘরে থাকা নিয়েও বিস্তর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড ও সুইডেনের অনেকে প্রচারণায় নেমেছেন। তাদের প্রচারণা এমন—‘করোনা চলে যাক, ভালোবাসাটা থেকে যাক। সন্তানের সংখ্যা বাড়ুক!’ আসলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে বিবাহের হার আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, কমে গেছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও! বাংলাদেশেও এটা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থেমে নেই।

মানুষের মনুষ্যত্ব বড় বিচিত্র। ঢাকার উত্তরার একটা হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হলে এলাকাবাসী মিছিল করে সেটা না করার দাবি তুলেছিল। পুলিশ এসে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনে। অন্যদিকে যারা করোনায় মারা গেছেন, তাদের দাফন করার জন্য খিলগাঁওয়ের একটা কবরস্থানে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার পর ওই কবরস্থানের গেটে একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যার সারমর্ম এই—এখানে যেন করোনায় মৃতদের কবর দেওয়া না হয়! এ ব্যাপারে একজন তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন—হায় আমাদের মানসিকতা এতটাই নোংরা হয়ে গেছে?

বিশেষ দ্রষ্টব্য: স্বেচ্ছা অন্তরীণের এই দিনগুলোতে হয়তো ফেসবুকই একমাত্র সময় কাটানোর ভার্চুয়াল জায়গা। তাই বলা হচ্ছে প্রোফাইল লক করার মতো এবার নিজেকে লক করুন। কেউ কেউ ছড়ায়—(ট্যাগ থেকে যেমন ট্যাগায়, ছড়া থেকে তেমন ছড়ায়!) ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে দেখি তোমার প্রোফাইল লক/আমি ট্রিমেন্ডাসলি শক! এখন নিজ বাসাতে নিজেই থাকো লক! কেউ কেউ বলছেন—উফ বাসায় অন্তরীণ থাকার দিনগুলোতে যদি বউয়ের মুখটা লক থাকতো! একজন স্ট্যাটাস দিয়েছেন—প্লিজ নো বক বক! এখন শুধু লক লক! অবশ্য ফেসবুকে অনেকে বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু মানুষের মুখ লক করতে চেয়েছেন। প্রিয় পাঠক, আপনারাই সিদ্ধান্ত নেন তারা কারা!

করোনাভাইরাসের অনেক কিছুই এখন পর্যন্ত জানে না মানুষ। কলেরা বা ম্যালেরিয়া, স্মল পক্স বা নিউমোনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে মানুষ বিজয়ী হলেও সব ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে এখনও জিততে শেখেনি মানুষ। পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে যেকোনও দুর্যোগ বা মহামারি অতিক্রম করতে শিখেছে মানুষ। দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষই পৌঁছে দেয় মানুষকে। কোনও দৈববাণী কিংবা কার্যক্রম মানুষকে মানবিক করেনি, যতটা মানুষ তার নিজের চেষ্টাতেই মানবিক হয়েছে। হয়তো করোনার হাত ধরে আসতে পারে ভয়াবহ মানবিক বা অর্থনৈতিক মন্দা।

শুধু মানুষই পারে সম্মিলিত চেষ্টায় যেকোনও বিপর্যয় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে! মানুষ জাগুক ফের! ছড়া দিয়ে লেখাটা শুরু হয়েছিল, আর তাই করোনার কালে না থামুক কবিতার অন্তরীণ যাত্রা—

চেনা রোদ্দুর, বিকেলের ছায়া, সন্ধ্যাতারাকে ডেকো
আমার জন্য তোমার মনের জানালাটা খোলা রেখো
আমি হেঁটে যাবো। খোলা জানালায় একটু দাঁড়িয়ে থেকো
আমার জন্য খালি রাস্তায় সেনা ও পুলিশ রেখো!

এই দুর্দিনে না হয় একটু অনলাইনেও থেকো
লাঠিপেটা বা কান ধরাধরির ছবি অ্যালবামে রেখো
কান ধরাধরির ছবি ভাইরাল? আমার কান্না এঁকো
নেমে আসে যদি অচেনা ঈগল, প্রমিথিউসকে ডেকো!

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ