কারাবন্দিদের কথা একটু ভাববো কি আমরা?

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৮:২১, এপ্রিল ১৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৩, এপ্রিল ১৯, ২০২০

রুমিন ফারহানাআইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব বর্তমান প্রেক্ষাপটে বোধ করি সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দগুচ্ছ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার দুটি মাত্র উপায়। এক পরীক্ষা, পরীক্ষা এবং পরীক্ষা আর দুই হলো সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলা। পর্যাপ্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা মূলত সরকারের দায়িত্ব হলেও, যথাযথ সামাজিক দূরত্ব রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু অনেকটাই নাগরিকের। করোনায় সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো অনেক সময়ই আক্রান্তের শরীরে করোনার লক্ষণ প্রকাশিত হয় না, কিন্তু সে রোগ ছড়িয়ে যায় ঠিকই। এমন অবস্থায় বারবার বলা হচ্ছে জনসমাগম বা ভিড় এড়িয়ে চলার কথা। বলা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কথা। এই দূরত্ব নিশ্চিতের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস আদালত বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও ধর্মীয় উপাসনালয়, শিল্প-কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়নি, তবে তা বন্ধ রাখার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বা স্বল্প পরিসরে চালু রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অবাধ যাতায়াত ও জনসমাগম রোধ করার জন্য পরিবার থেকে শুরু করে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা লকডাউন করা হচ্ছে। এমনকি ত্রাণও দেওয়ার চেষ্টা চলছে সামাজিক দূরত্ব মেনে। উদ্দেশ্য একটাই; সংক্রমণ প্রতিরোধ করা। কিন্তু এমন কিছু স্থান আছে যেখানে চাইলেও সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব নয়, সেখানে একসঙ্গে অনেক লোকের বাস। সেখানে একবার যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে ভাবলেই আতঙ্কিত হতে হয়।   

দেশের কারাগারগুলো তেমনই একটি স্থান। এই বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি আছে। যেখানে কারাগারে বন্দি ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার ৯৪৪ জন, সেখানে বর্তমানে কারাবন্দির সংখ্যা ৮৮ হাজার ৮৪ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের জেলা কারাগার। এই কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় ৯ গুণ বেশি বন্দি আছে। মানসম্মত খাবার না দেওয়া, অপর্যাপ্ত খাবার, সুপেয় পানির অভাব, স্থান সংকুলান না হওয়ায় বন্দিদের গাদাগাদি করে রাখা, চিকিৎসক স্বল্পতা, কারা হাসপাতালগুলোতে কোনও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বা ওষুধ না থাকা ইত্যাদি নানান সমস্যায় কারাগারগুলো আগে থেকেই জর্জরিত। এর মধ্যে নতুন করে করোনার আক্রমণ বন্দিদের সরাসরি মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলবে। সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো করোনা এতটাই সংক্রামক যে, একজন যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে মুহূর্তে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে হাজার মানুষের শরীরে।

কারা অধিদফতর যদিও বলছে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় তা কতটুকু পর্যাপ্ত এবং বন্দিরা তাতে কতটা নিরাপদ, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারা অধিদফতরের সূত্র মতে, সারা দেশে সাতটি আইসোলেশন কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে সরকার, একই সঙ্গে একটি কারাগারকে পুরোপুরি কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি কারাগারে আসা নতুন বন্দিদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মুশকিল হলো কারাগারে কেবল বন্দিরাই থাকেন না। সেখানে থাকেন কারা পরিদর্শক, কারারক্ষীসহ অসংখ্য মানুষ। কারারক্ষীরা সাধারণ বন্দিদের কাছে যেমন যান, তেমনি আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনেও দায়িত্ব পালন করবেন তারাই। বাংলাদেশ জেলের অধীনে বর্তমানে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৫৫টি জেলা কারাগার আছে। এই কারাগারগুলোতে যেখানে মোট চিকিৎসক থাকার কথা ১৪১ জন, সেখানে আছেন মাত্র ১০ জন। লাখো বন্দিকে চিকিৎসা দেন এই ১০ জন চিকিৎসক। অর্থাৎ প্রতি ১০ হাজার বন্দির জন্য মাত্র ১ জন চিকিৎসক আছেন এই কারাগারগুলোতে। কারা হাসপাতালগুলোর বেহাল অবস্থা নিয়ে নতুন করে বলার আর কিছু নাই। ডাক্তার, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট পুরো কারাগারের পরিবেশকে করে তুলেছে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসক সংকটের কথা জানিয়ে গত ৪ বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অসংখ্যবার চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পদায়ন করলেও চিকিৎসকরা কারাগারে যেতে চান না, অনেক চিকিৎসক আবার যোগ দিয়েই চলে আসেন। এমন অবস্থায় পুরো দেশ যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে কারাগারগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়।

এই দেশে তিন মাস আগে করোনার আলাপ শুরু হওয়া মাত্র সরকার জানিয়েছিল তাদের সব প্রস্তুতি আছে, অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা গেলো কোনও রকম পরীক্ষা ছাড়াই নির্বিঘ্নে বিদেশ ফেরত মানুষেরা দেশে প্রবেশ করলেন, ঘুরে বেড়ালেন, চারদিকে রোগ ছড়ালেন এবং অবশেষে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হলো। দেখা গেলো সব প্রস্তুতির এই দেশে না আছে যথেষ্ট পরিমাণে মাস্ক, গ্লোবস, না আছে ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পিপিই। একপর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করতে বাধ্য হলেন নিজেদের সমন্বয়হীনতার কথা। বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের মতে, গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। গত ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৯০ জন চিকিৎসক। এছাড়া আরও ৩০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী বর্তমানে হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। আমরা হারিয়েছি ড. মো. মঈন উদ্দিনের মতো ডাক্তারকে। করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে প্রথম সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের কাউকে কাউকে আমরা হারাবো এই বাস্তবতা যদি মেনেও নেই, কিন্তু সেই মৃত্যু যদি হয় চরম অবহেলায়, যথাযথ চিকিৎসা কিংবা ভেন্টিলেশনের অভাবে, ঠিক সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে, তাহলে সেই অব্যবস্থাপনাকে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। দেশে পরীক্ষা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এমন অবস্থায় কারাবন্দিদের নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

পৃথিবীর বহুদেশ এই বৈশ্বিক দুর্যোগে কারাগারগুলো থেকে মুক্তি দিচ্ছেন বন্দিদের। কারাগারে যে কেবল সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা থাকেন তাই নয়, বরং বহু বন্দি আছেন, যাদের ট্রায়াল এখনও শেষ হয়নি। হয়তো ট্রায়াল শেষে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পাবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু মানুষ কোনও অপরাধ না করেই রাজনৈতিক মামলায় জেল খাটছেন। সংখ্যার বিচারে তাদের সংখ্যাও কম নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানে প্রায় ১ লাখ বন্দি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা রাজনৈতিক মামলায় জেল খাটছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এমনকি ভারতেও বন্দিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই নিউ ইয়র্কের কারাগারে বেশ কিছু বন্দি ও কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। কলম্বিয়ায় বন্দিরা জেল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে দাঙ্গায় কমপক্ষে ২৩ জন বন্দি নিহত হন। কলম্বিয়া সরকার বলছে করোনা সংক্রমণের আতঙ্কে দেশটির ১৩টি জেলখানাতেই এ ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ইতোমধ্যেই বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান বলছে, করোনাভাইরাসের কারণে ব্রিটেনের জেলগুলোতে আটশ’র মতো বন্দির মৃত্যু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্যেও কারাগারে এই ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। এছাড়া এই মহামারির বিস্তার রোধে হাজারও কারাবন্দিকে মুক্তি দিতে আইন পাস করেছে তুরস্কের পার্লামেন্ট। নতুন এই আইনে ৪৫ হাজার বন্দিকে স্থায়ীভাবে মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বলে রাখা ভালো তুরস্কেও বিভিন্ন কারাগারে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও আটক বন্দিদের মধ্যে যারা বয়স্ক এবং যাদের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা আছে, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

কারাগারে সাধারণত দুই ধরনের বন্দি থাকে। এক যাদের সাজা হয়ে গেছে আর দুই যাদের ট্রায়াল চলছে, মামলার রায় এখনও হয়নি। যাদের সাজা হয়েছে তাদেরও অধিকাংশের আপিল উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় আছে। তাই কারাগারে থাকা বন্দিদের বড় একটা অংশ নিম্ন আদালতের রায়ে কিংবা উচ্চ আদালত থেকে আপিলে খালাস পেতে পারেন। তাদের সকলের জীবন আজকে হুমকির মুখে। দ্বিগুণের বেশি বন্দি নিয়ে চলা কারাগারগুলো যেন একেকটা মৃত্যুকূপ। মানুষের স্বাভাবিক শোওয়া বা বসার জায়গা যেখানে নেই, সেখানে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব কল্পকাহিনি ছাড়া কিছুই নয়। সে কারণেই এখানকার ঝুঁকি অন্য যে কোনও জায়গার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। তাই মামলার ধরন, কারাবাসের মেয়াদ, বন্দির বয়স, বন্দির স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা, প্যারোল কিংবা সুপ্রিম কোর্টের সুও মটো অর্ডারের মাধ্যমে বন্দিদের মুক্তির কথা এখনই বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ আমরা এমন এক সময় পার করছি, যখন এক মুহূর্তের সমান অসংখ্য জীবন।  

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ