‘গাড়িবান্ধব’ ঈদ ও প্রেমের মড়া করোনায় ডোবে না!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৫:৫৬, মে ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, মে ২৬, ২০২০

আহসান কবির‘করোনা ছুঁয়েছে আমায়
এখন আর তোমাকে ছোঁবে না
প্রেমের মড়া করোনায় ডোবে না!
‘প্রেমের মড়া করোনায় ডোবে না ভাসে’– সেটা কিছুক্ষণ ভুলে থাকি! পরে ভাবা যাবে আবার। অন্তরীণের এই দুঃসময়ে ঈদ ফিরেছে সময়ের ধারাবাহিকতায়, কিন্তু করোনা এখনও ফিরে যায়নি! বরং পৃথিবীজুড়ে প্রতিষেধকের অভাবে কিংবা মানুষ ও সরকারের সামষ্টিক অসচেতনতার কারণে করোনা জাঁকিয়ে বসেছে আমাদের জীবনে! সরকারের পক্ষ থেকে একবার বলা হয়েছিল, নাগরিকরা যে যেখানে আছে সেখানেই থাকবে! কেউ কোথাও যেতে পারবে না। আইন শিথিল করা হলো। লক্ষ মানুষ ঢুকলো দেশের অন্যান্য জেলা থেকে ঢাকায়। আবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, ঢাকাতে ঢোকা বা ঢাকা থেকে আর বের হওয়া নয়! পুলিশকে কঠিন করে নামানো হলো রাস্তায়। ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হলো। কিন্তু আবারও শিথিল করা হলো নিয়ম। নিজের গাড়ি (গাড়িবান্ধব ঈদ এবার) বা মাইক্রোবাসে করে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হলো। আগের মতোই লাখ মানুষ ‘বাদুড়ঝোলা’ হয়ে ফিরে গেলো নিজ নিজ বাড়িতে। সবচেয়ে বেশি করোনায় আক্রান্ত ঢাকার মানুষ ছড়িয়ে গেলো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। ফলাফল?
ফলাফল জানি না আমরা কেউ। বরং নিয়তি নির্ভর হয়ে প্রার্থনা করি করোনা যেন ফিরে যায়। ঈদের এই ছুটিতে বরং বদলে যাওয়া ঈদ নিয়ে ভাবি।
করোনার কারণে কী এবার বদলে গেলো ঈদ? তাহলে এই ঈদের আগে ও পরে কী কী করতে পারেন?
শূন্য: কোয়ারেন্টিনে কী কী বেড়েছে আপনার, কোন অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি হয়েছে? বাসায় কাজ করার যোগ্যতা বা ধৈর্য বেড়েছে? যদি না বাড়ে তাহলে এখনই চাল আর ডাল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এরপর আলাদা করতে থাকুন। শেষে স্ট্যাটাস দিন- এক কেজি চাল মানে ১০২০২টা চাল আর এক কেজি ডাল মানে ১৩২১৩টা ডাল! ধন্যবাদ করোনা আমাকে এই ধৈর্য শেখানোর জন্য।
এছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদ কোলাকুলির নতুন কৌশল নিয়ে ভাবতে পারেন। মাইলকে মাইল দূরত্ব বজায় রেখেও অনলাইনে কীভাবে কোলাকুলি, হ্যান্ডশেক আর বাচ্চাদের চুমুর ব্যবস্থা রাখা যায় সেটা গবেষণা করে বের করতে পারেন। আর সরকারকে বলে প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য চুমু বা বাড়তি কিছুও নিষিদ্ধ করে রাখা যায়। এই ঈদে নিজ গাড়িতে বাড়ি ফেরার মতো সরকার কখনও-সখনও এই রোমান্টিক অধিকার বজায় রাখার আইনও শিথিল করতে পারে।
এক. ব্যক্তিগত গাড়ি যদি থাকে অথবা মাইক্রোবাস ভাড়া করে বাড়ি যাওয়ার সামর্থ্য থাকলে আপনি বাড়ি যেতে পারেন। ফেরিঘাট ছাড়া আর কোথাও ‘জ্যাম’ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যেতে যেতে করোনাকে ধন্যবাদ দিন। জ্যামমুক্ত জার্নি আর ধুলাবালি নাই রাস্তায়। যেতে যেতে গান শুনুন- ‘গাছটা বন্ধু সবুজ (গাছের পাতারা গত পঞ্চাশ বছরেও এমন সবুজ ছিল না!) আর ফুলটা বন্ধু লাল। তোমার আমার ভালোবাসা থাকবে চিরকাল।’
দুই. ‘সীমিত’ আকারে মার্কেট খোলার পর ‘সীমিত আকারে’ ঈদের পোশাক কিনেছেন? যদি এসব পোশাক পরে কোথাও না যেতে পারেন তাহলে ‘সীমিত আকারে’ সেজেগুজে ঈদের পোশাক পরে লাইভে আসুন। এখন লাইভে আসাই ফ্যাশান। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডকে লাইভে এনগেজড রাখুন।
তিন. ঈদ যদি চাঁদনির্ভর হয় তাহলে সৌদি আরবের একদিন পর সাধারণত বাংলাদেশে ঈদ হয় কেন? সৌদির আকাশ থেকে বাংলার আকাশে আসতে কি চাঁদের একদিন লাগে? এ ব্যাপারে লাইভ টকশোর আয়োজন করতে পারেন। সৌদির সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের যে যে অঞ্চলের মানুষ একইদিন ঈদ পালন করেন তাদের বক্তব্য শুনতে পারেন।
চার. সীমিত আকারে খুলে দেওয়া হলেও যারা চুল দাড়ি কাঁটার কাজ করেন তাদের আয়-উপার্জন বাড়তে পারে। চুল ও দাড়ি না কাটলে অনেকে চাকরি হারাতে পারেন। কারণ, আপনার অফিসের লোকজন আপনাকে অন্তরীণের সময়ে গজিয়ে ওঠা চুল দাড়িতে নাও চিনতে পারে।
পাঁচ. ঈদের পোশাকের বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষকে মাস্ক, হাতমোজা বা পিপিই উপহার দিতে পারেন। নিয়ম না মেনে বাইরে বের হওয়া বা উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরার কারণে যাদের জরিমানা করা হয়েছিল সেসব জরিমানাতে কত টাকা উঠেছে? পরামর্শ দিতে পারেন যে জরিমানার টাকার সঙ্গে আরও কিছু মিলিয়ে ছোট ছোট চিকিৎসাকেন্দ্র কি স্থাপন করা সম্ভব?
ছয়. পত্রিকা বা কাগজের টাকার নোটে কি করোনা ছড়ায়? প্রয়োজনে গুজব ছড়িয়ে দিন। পত্রিকা ছাপা হবে না আর কলকারখানা বা অফিসের নগদ বেতনও বন্ধ রাখা যাবে। সরকার কিংবা মালিকদের সেক্ষেত্রে উপকার করা হবে। আর আপনাকে ঈদ সালামিও দিতে হবে না।
সাত. যারা ভেবেছিলেন করোনাকে কন্ট্রোল করা যাবে তারা ভাবুন যে করোনা হচ্ছে স্ত্রীর মতো। বাসর রাত বা হানিমুনে গিয়ে মনে হতেই পারে যে স্ত্রীকে একসময়ে না একসময়ে কন্ট্রোল করা যাবে। কিন্তু না। সুখী পরিবার মানে হচ্ছে স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা করে চলা। সুতরাং করোনা ও স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা করে ঈদ করুন। এই দুইয়ের সঙ্গে বিদ্রোহ করে অশান্তি ডেকে আনবেন না।
আট. যারা বাপের হোটেলে ব্যাচেলর জীবন কাটাতেন করোনা তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে এনেছে। তাদের আর খোটা শুনতে হবে না! তবে করোনা শেষে অনেকের অফিসে গিয়ে শুনতে হতে পারে তাদের আর চাকরি নেই। কেউ কেউ কোয়ারেন্টিনে অভ্যস্ত হয়ে ভাবতে পারেন তারা কখনও কী চাকরি করতেন?
নয়. ‘সীমিত আকারে’ মার্কেট খুলে দেওয়ার পর বউ বায়না ধরলো ঈদ উপহার কিনে দেবার। স্বামী বললো, চাকরি নেই, বেতনও নেই, তাই কেনাকাটাও নেই। আসো অন্তরীণই থাকি!
দশ. করোনার সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখুন। করোনার কারণে পুলিশরা এখন খুবই টেনশনে আছে। দয়া করে পুলিশকে ঘাঁটাবেন না। করোনার এই সময়ে এক মেয়ে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে অভিযোগ করলো এক ছেলে প্রতিদিন ইভটিজিং করে তাকে। সে প্রতিদিন এসে তাদের  (মেয়ের) বাসার সামনে চিৎকার করে বলে- ‘আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ।’ পুলিশ ছেলেটাকে ধরে এনে হালকা পিট্টি দেওয়ার পর ছেলেটা জানালো- ‘স্যার আমি করোনার সময়ে লেবু বিক্রি করি। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটি আর জোরে জোরে বলি- অ্যাই লে ব্যুব্যুব্যু। অ্যাই লে ব্যুব্যুব্যু...’।
করোনা আক্রান্ত বদলে যাওয়া এই সময়ে ভালো কাটুক আপনার ঈদ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আপনিও নিজেকে বদলে নিন। গাড়ি না থাকলে গাড়ি ভাড়া করে প্রয়োজনে প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ করে আসুন। আড্ডাতে গিয়ে বলুন- আয় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখি! মাস্ক পরতে পরতে মুখমণ্ডলে ছাপ তৈরি করে ফেলুন প্রয়োজনে। কখনও মাস্ক পরতে ভুলে গেলে নিচের কৌতুকটা শুনুন-
সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে এক যুবক। পুলিশ তার পথ আটকালো। যুবক জানতে চাইলো- আমার অপরাধ? পুলিশ বললো মাস্ক  না পরে বাইরে বেরিয়েছো কেন? মাস্ক না পরলে করোনাকে আটকাবে কীভাবে? যুবক বললো, আমরা তো বহু বছর ধরে আন্ডারওয়্যার পরি। জনসংখ্যা কী আটকে রাখতে পেরেছি?
যাদের এই কৌতুকে আপত্তি তারা নিচের কবিতাটা আবৃত্তি করতে পারেন—
গান পারি না গলার জন্য চেপে বসে শোক
শুনতে পাই করোনারও গলার দিকে ঝোঁক
পাঁজর খুলে তোমায় পেয়ে চেপে বসে বুকে
শ্বাস-কষ্ট কাশি নিয়ে কেউ মরে যায় ধুঁকে!
তোমার জন্য বেঁচে থাকি তোমার জন্য যুদ্ধ
করোনা কী বাধ্য হয়ে প্রেমকে করে শুদ্ধ?
ফতোয়া দেই- প্রেমই আসল! প্রেম আগলে রাখো!
করোনা এলে চুপটি করে কবিতাকেই ডাকো
কবিতার ভয়ে করোনা তোমাকে ছোঁবে না!
মনে রেখো প্রেমের মড়া করোনায় ডোবে না!
প্রেমই আসল। মানুষের প্রতি প্রেম বাড়ুক মানুষের! প্লেগ, ম্যালেরিয়া বা স্মল পক্সের মতো করোনার ঠাঁই হোক স্মৃতির আস্তাকুঁড়ে!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ