বাংলাদেশেই অসম্ভবকে সম্ভব করা সম্ভব!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৩:২৭, জুন ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৯, জুন ০২, ২০২০

প্রভাষ আমিনপুরো বিমানে যাত্রী মাত্র দুইজন—মি. মোরশেদ খান এবং মিসেস মোরশেদ খান। তারা গেছেন লন্ডনে। ব্যাপারটা বেশ রোমান্টিক লাগছে আমার কাছে। ঘণ্টা চুক্তিতে রিকশা ভাড়া করে বউ বা বান্ধবী নিয়ে ঘোরার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। কিন্তু পুরো বিমান ভাড়া করে বউ নিয়ে লন্ডন যাওয়া বেশ থ্রিলিং। আমার কাছে বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। আমার খালি সদ্য প্রয়াত বলিউড নায়ক ঋষি কাপুরের ‘ববি’ ছবির সেই ঐতিহাসিক গানের আধুনিক ভার্সন মনে পড়ছে—‘হাম তুম এক বিমান মে বন্ধ হো, অর পাইলট খো জায়ে...’। অবশ্য আধুনিক বিমান অটো পাইলটেও চলে। করোনাকালে অনেকেই হোম অফিস করছেন। হোম অফিস নিয়ে অনেক ট্রলও হয়েছে। একটা ট্রলে দেখা যাচ্ছে, বিমান টেক অফ করার জন্য তৈরি, যাত্রীরা অপেক্ষা করছেন। পাইলটের শেষ ঘোষণা আসছে, ‘আপনাদের স্বাগত। আপনাদের যাত্রা শুভ হোক। আমি হোম অফিস করছি।’
মোরশেদ খানকে আশা করি সবাই চেনেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে সিটিসেল দিয়ে একতরফা মোবাইল ব্যবসায় যে টাকা কামিয়েছেন, সকাল-বিকাল বউকে নিয়ে বিমান ভাড়া করে হাওয়া খেতে গেলেও সেই টাকা ফুরাবে না। ঘুরতে গিয়ে তারা গাইতে পারেন, হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরে লাল দোপাট্টা...। দোপাট্টার মতো টাকা ওড়ালেই এক জীবনে মোরশেদ খানের টাকা শেষ হবে না। মোরশেদ খান কেন বিমান ভাড়া করে লন্ডন গেলেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনও কারণ কোনও পত্রিকায় পাইনি। তবে ৮০ বছর বয়সী মোরশেদ খান আগে থেকেই নানান রোগব্যাধিতে আক্রান্ত। তার হার্টে রিং পরানো আছে। এছাড়া পারকিন্সন্স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগও বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। ধারণা করি, বাংলাদেশের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখে উন্নত চিকিৎসার আশায় তিনি লন্ডনে উড়াল দিয়েছেন।

কিন্তু বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অবরুদ্ধকালে কীভাবে দেশ ছাড়লেন? এই নিয়ে কৌতূহল শেষ হয় না। খোঁজ নিয়ে জানলাম দুর্নীতি দমন কমিশনে তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। গত বছরের জুনে তার বিদেশযাত্রার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল দুদক। তাহলে গেলেন কীভাবে? পরে জানলাম আদালতের অনুমতি নিয়ে বৈধভাবেই দেশ ছেড়েছেন এম মোরশেদ খান। কিন্তু আমার খটকা তখনও যায়নি। আদালতই বা এই অবরুদ্ধ সময়ে বিএনপি নেতার ব্যাপারে এত উদার হলো কেন? এবার মনে পড়লো, গত নভেম্বরে মোরশেদ খান বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এবার সব ফকফকা। গত বৃহস্পতিবার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যিনি চার্টার্ড বিমানে খান লন্ডন গেছেন, তিনি বিএনপি নেতা নন, সাবেক বিএনপি নেতা। সাবেক বিএনপি নেতাদের সাত খুন মাফ।

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেলো। এক কট্টর বামপন্থী মৃত্যুশয্যায়। তার স্বজন ও অনুসারীদের বললেন, আমি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে পদত্যাগ করে জামায়াতে যোগ দেবো। সবাইকে জানিয়ে দাও। শুনে তো সবাই অবাক। মৃত্যুর আগে এ কোন ভীমরতি। মৃত্যুপথযাত্রী কমিউনিস্ট হেসে বললেন, আমি জানি আমার মৃত্যু অনিবার্য। চাই আমার মৃত্যুতে দেশে একজন জামায়াত কমুক। 

মোরশেদ খানের রোমান্টিকতার কথা বলছিলাম। কিন্তু জানতাম না করোনার মতো রোমান্টিকতাও সংক্রামক। তিনি উড়াল দেওয়ার ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর সেই লন্ডনেই গেলেন বেক্সিমকোর চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানও।  তিনিও একই কায়দায় বিমান ভাড়া করে বউকে নিয়ে গেছেন। তবে সোহেল এফ রহমানের অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে লন্ডনে থাকেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেয়ের পাশে থাকতেই তারা লন্ডনে গেছেন। মেয়েদের এমন গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি বাবা-মা বিশেষ করে মায়েরা তাদের পাশে থাকতে চান। এটা সব মায়েরই চাওয়া। সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মেয়ের পাশে দাঁড়ান। সোহেল এফ রহমান দম্পতির সামর্থ্য আছে বিমান ভাড়া করে যাওয়ার। এবার সব বোঝা গেলো? তবে আমার একটা খটকা কিছুতেই যাচ্ছে না। মোরশেদ খান আর সোহেল এফ রহমান দম্পতি তো চাইলে একই বিমানে যেতে পারতেন, যেহেতু তাদের তাদের গন্তব্য এক। বিমানে অন্তত চারটি আসন নিশ্চয়ই ছিল। হতে পারে সামাজিক সূত্রে আত্মীয় বলেই তারা করোনা সতর্কতার অংশ হিসেবে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বড় কস্টলি সামাজিক দূরত্ব, আমজনতার পক্ষে সম্ভব নয় এটা। তারা বাসেই ওঠেন একজনের ঘাড়ে আরেকজন হয়ে। 

তবে এই করোনাকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চাঞ্চল্য আনার কাজটা কিন্তু সোহেল এফ রহমান ও মোরশেদ খান শুরু করেননি, করেছেন দুই ভাই রন হক শিকদার ও দীপু হক শিকদার। শিকদার গ্রুপের অনেক কিছু আছে, আছে ব্যাংকও। তবু তারা এক্সিম ব্যাংকের কাছে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়েছিলেন। ঋণের জন্য বন্ধকি জমির যে দাম তারা ধার্য করেছিলেন, ব্যাংক ধরেছিল তারচেয়ে অনেক কম। তাই ঋণটাও হচ্ছিল না। এই অপরাধে এক্সিম ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়াকে গুলি করেন শিকদার গ্রুপের এমডি। সেটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও ডিএমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে বনানীর শিকদার হাউজে দিনভর আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়, হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং সাদা কাগজে সই রেখে সন্ধ্যায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা গত ৭ মে’র। একটু বিলম্বে হলেও গত ১৯ মে দুই শিকদারের বিরুদ্ধে মামলা করে এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনা জানাজানি হয় ২৬ মে। কিন্তু তার আগেরদিন মানে ২৫ মে দুই ভাই ব্যক্তিগত এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ব্যাংকক চলে গেছেন। এতদিন জানতাম এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বন্ধ, বিদেশের হাসপাতালগুলোকে বাইরের রোগী নেয় না। কিন্তু এখন জানলাম, টাকায় সবই হয়।

বাংলাদেশে আসলেই অসম্ভবকে সম্ভব করা সম্ভব! এই দেশে অন্যায় আবদার মেনে লোন না দিলে ব্যাংকের এমডিকে আটকে রেখে নির্যাতন করা যায়, হত্যার হুমকি দেওয়া যায়। মামলা হলে এই লকডাউনের মধ্যেও প্রাইভেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ব্যাংককে উড়ে যাওয়া যায়। বাংলা সিনেমা তো দূরের কথা হিন্দি সিনেমায়ও এতটা কল্পনা করা যায় না। তামিল সিনেমার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে। আর মিল আছে অনন্ত জলিলের অসম্ভবকে সম্ভব করার সংলাপের সঙ্গে। 

সাংবাদিক কামাল আহমেদ ফেসবুকে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নগুলো আমারও। তাই হুবহু তার স্ট্যাটাসটি উদ্ধৃত করছি, ‘কয়েকজন ব্যবসায়ীর দেশ ছাড়ার খবর  সাংবাদিকতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আবারও তুলে ধরেছে। কিন্তু, এটি খবরের শেষ নয়, শুরু। এখনও জানা প্রয়োজন যাঁরা বিদেশে গেলেন, তাঁরা কোন ধরনের বিমান ভাড়া করেছিলেন? দেশীয় বিমান সংস্থার, নাকি বিদেশি? যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে গন্তব্য হয়ে থাকলে ছোট বিমানে এই যাত্রা অসম্ভব। তাহলে কি বিদেশি কোম্পানির বিমান ভাড়া করা হয়েছে? ভাড়া বিদেশি মুদ্রায় পরিশোধ করা হয়ে থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেজন্যে নিশ্চয়ই অনুমোদন দিয়েছে? বিদেশি মুদ্রা খরচের জন্য তো কারণ দেখাতে হয়, বিশেষ করে যেখানে খরচের পরিমাণ ন্যূনপক্ষে কয়েক লাখ ডলার হবে। এই খরচ তো ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নয় যে কোম্পানির তহবিল থেকে খরচ হবে। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যেখানে সর্বোচ্চ  বৈদেশিক মুদ্রা খরচের আইন আছে, সেখানে একটি সম্ভাব্য মহামন্দার কালে এতো বড় অঙ্কের অনুমোদন কতটা স্বাভাবিক? সিকদার ভ্রাতৃদ্বয়ের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট কি ভুয়া? কোন হাসপাতাল বা চিকিৎসক তা ইস্যু করেছেন? রাজনীতির সঙ্গে টাকার যোগসূত্রগুলো বোঝার জন্য এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।’

টাকা থাকলেও কেউ বিদেশে যেতে পারবে না, এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পাবে না; এই ধারণাটা আমাকে এতদিন একটা স্বস্তি দিয়েছিল। কেউ এটাকে নিষ্ঠুর স্বস্তি ভাববেন না। আমার ধারণা ছিল, বিদেশে যেতে না পারলে বিত্তবানরা সবাই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে মনোযোগ দেবেন, সরকারকে চাপ দেবেন, ভালো হাসপাতাল বানাবেন। আর চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে তার ছিটেফোঁটা নিশ্চয়ই আমরাও পাবো। কিন্তু টাকা থাকলেই উড়ে যাওয়া যায়, এটা দেখে আমার সেই শঙ্কাটা আবার শুরু হয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে তবে আর কেউ ভাববেন তো, নাকি?

বিত্তবানদের দেশের বাইরে যাওয়ার যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা যেন এখনই শেষ হয়। মোটেই যেন এটা কোনও স্রোত শুরু না করে। ধনী-গরিব সবাই মিলেই দেশটাকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে হবে। 

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ