মি. বিশ্বাসকে কে খুন করলো?

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১২:১৭, জুন ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৩, জুন ০৪, ২০২০

মামুন রশীদমানুষ হঠাৎ করে খুন হয় বা গায়েব হয়ে যায়। আমাদের মি. বিশ্বাস যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলেন। কে বা কারা অনেকদিন ধরে ধীরলয়ে তাকে খুন করে ফেলেছেন। অথচ থানায় কোনও ডায়েরি হয়নি, ন্যূনতম তদন্ত হয়নি, কোর্টে চার্জশিট দাখিল কিংবা বিচার তো দূরের কথা। আমার মতো পাঠকও নিশ্চয়ই চিন্তিত, গেলো ৪৮ বা ৪৯ বছরে মি. বিশ্বাসকে কে বা কারা গলা টিপে টিপে দমবন্ধ করে মেরে ফেললো? যাক বাবা, খুনিকে বা খুনিদের চিহ্নিত করতে না পারলেও আমরা শেষমেশ জানতে পেরেছি মি. বিশ্বাস খুন হয়েছেন বা তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।
তবে সবাই নিশ্চয়ই চুপ হয়ে নেই। কেউ না কেউ তার খুনের বা অন্তর্ধান নিয়ে চুপেচাপে হলেও কিছু গবেষণা বা নিদেনপক্ষে আলোচনা করছেন। বলতে দ্বিধা নেই, এই লেখকও তাদের একজন। পাকিস্তানিরা আমাদের ১৯৪৭ সাল থেকেই অনেক যন্ত্রণা দিয়ে আসছিল। ১৯৭০-এর নির্বাচনের পর আমরা বেঁকে বসলাম। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবের ভাষণ শোনার পর ভাবলাম ‘এখন আর সময় নেই, তোরা হাতে হাতে ধরগো, সামনে মিলন স্বর্গ’। কিন্তু বললেই তো হবে না। শুরু হয়ে গেলো বিরাট যুদ্ধ, যুদ্ধে বিরাট একটা অংশ যোগ দিলেও পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষেও দাঁড়ালেন কেউ কেউ। তারপরেও বাংলার দামাল ছেলেরা নিয়মানুবর্তিতাশীল সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এই যুদ্ধে জিতে গেলো। কিন্তু জিতে গেলেই তো হয় না? অখণ্ড পাকিস্তানের কাণ্ডারিরা, পাকিস্তান ফেরতরা, যুদ্ধে যায়নি কিন্তু ‘সৈয়দ বংশের শেষ সন্তানেরা’ এমনকি আরও অনেকে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে চাইলেন; উদোম গায়ে, নদী সাঁতরে যুদ্ধ করা গাঁয়ের লোকগুলোকে পিছু হটিয়ে সুবিধার বেশিরভাগ তারাই নিয়ে নিলেন। এই পর্যায়ে গল্পের বাকি অংশ আপনারা মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’ ছবিটিতে দেখে নিতে পারেন। আর যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির বেশিরভাগ লোকের জন্য খান আতাউর রহমান তৈরি করলেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’। আমাদের মি. বিশ্বাস যেন এটি দেখে থমকে দাঁড়ালেন। হতচকিত হলেন। বিস্মিত হলেন এই দেখে যে ‘কার হাসি কে হাসে’। তারমধ্যে একদিন ঘটে গেলো বিরাট এক ঘটনা। যিনি আমাদের জন্য ‘ভোর এনেছিলেন’ তিনি অবিশ্বাস্যভাবে খুন হয়ে গেলেন। তাকে কে খুন করলো ‘তাকে ধরা যায় না, বলা যায় না’ এমন হলেও বিরাট ক্ষতি হলো মি. বিশ্বাসের। তার মধ্যে বিরাট চির ধরে গেলো। বিরাট ক্ষত তৈরি হলো একাত্তরে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যের। সেই ফাটল আর যেন কেউ এখনও এক করতে পারলো না। কেউ বলে সে দায়ী, কেউ বলে ও দায়ী। পুরো বীরের জাতি ভাগ হয়ে গেলো এ পজিটিভ আর বি পজিটিভ রক্তের গ্রুপে। মাঝখানে কেউ কেউ ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েও বাহবা কুড়ালো। আমাদের মি. বিশ্বাসের শ্বাসকষ্টের শুরুটাও এখান থেকেই।

পেশাজীবনের শুরুর দিকে কিছুদিন আমাকে নারায়ণগঞ্জে কাজ করতে হয়েছিল। ঢাকা থেকে যেতাম ‘গেটলক’ আর ‘সিটিং সার্ভিস’ নামের মিনিবাস সার্ভিসে। গেটলক হলেও গাড়ির হেল্পার যাত্রাবাড়ী বা কাচপুরে গিয়ে কিছু লোক তুলতো। যাত্রীরা চেঁচামেচি শুরু করলে কিছুদিন পরে দেখলাম একই রুটে ‘সম্পূর্ণ গেটলক’ বাস সার্ভিস। আমার নারায়ণগঞ্জের দিনগুলো শেষ হওয়ার শেষভাগে প্রায় আশ্চর্য হয়ে দেখলাম একটি বাসে লেখা ‘আল্লাহর কসম গেটলক’। ততদিনে মি. বিশ্বাসের বুকের বামদিকের ব্যথাটা বেশ বেড়ে গিয়েছে। 

আমাদের মতো গরিব দেশে সরকার বা রাষ্ট্রের কাছাকাছি থাকতে পারাটা সর্বদাই আনন্দের। তাই সুশীল সমাজের ভাই বন্ধুরা যেমন ‘আমাদেরও একটি দায়িত্ব আছে’ বলে তিনমাসের জন্য হলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছাকাছি থাকার ব্যাপারে বেশ উদগ্রীব ছিলেন তেমনি সাধারণ লোকও সরকারি চাকরিকে বেশ দাম দিতেন বা দিয়ে থাকেন। মি. বিশ্বাসের এতে কোনও আপত্তি ছিল না। কিন্তু সেখানেও যখন রক্তের গ্রুপ বের করার জন্য বা যুদ্ধে যাওয়ার সেনাপতির খোঁজে ‘ডিএনএ’ টেস্ট শুরু হয়ে গেলো, মি. বিশ্বাস হঠাৎ করেই ‘বাইপাস সার্জারি’তে চলে গেলেন। 

দুঃখজনক হলেও সত্য অনেক দোয়া-দরুদ আর কাঙালিভোজ দিয়েও আমরা মি. বিশ্বাসকে বাঁচাতে পারলাম না।

আজ মি. বিশ্বাস নেই। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে তাকে এখন আর কেউ মনেও করে না। তিনি তো আর রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো গান-কবিতা লিখতে পারেননি!

যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। এখন আর কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। দলের লোক দলের নেতাদের বিশ্বাস করে না। অধস্তনরা ঊর্ধ্বতনদের বিশ্বাস করে না। এক পুলিশ কর্মকর্তা আরেকজনকে বিশ্বাস করে না, মসজিদের মুয়াজ্জিন ইমাম সাহেবকে বিশ্বাস করে না, এমনকি জায়গা-সম্পত্তি নিয়ে ভাই বোনকে বিশ্বাস করে না। সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের কথা শুনে আমরা অবিশ্বাসে মুচকি হাসি। অবিশ্বাসই এখন বেশিরভাগের বিশ্বাস। সেদিন দেখলাম এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ শিক্ষক আর ছাত্র একই ছাত্রীকে নিয়ে মারামারি করছে। ছেলেটা বলছে—স্যার শেষ পর্যন্ত আপনিও? স্যার নাকি ছাত্রীটিকে খাতায় না লেখা সত্ত্বেও পরীক্ষায় উচ্চমানের নম্বর দিয়ে দিয়েছেন।

মি. বিশ্বাসকে নিয়ে গল্পের যেনো শেষ নেই। সেদিন শুনলাম, এমনকি পড়লামও—স্বল্প বা নাই জামানতে ঋণের পরিমাণ বাড়াতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক ব্যবসায়ী পরিবারের দুই সন্তান নাকি এক ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে। আমি কেন, সবাই নিন্দার ঝড় তুললাম। গুরুজনেরা বিরাট সাক্ষাৎকার দিলেন—এটা কাম্য নহে বলে। অনেক লেখালেখি হলো। শুনলাম মোকদ্দমাও হওয়ার পথে। ওই যে বললাম—কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে মি. বিশ্বাসও মারা গিয়েছেন। অন্য একটি পক্ষ বললো এক আশ্চর্য কথা—সেই ব্যাংকের আলোচিত এমডি নাকি ছিলেন ছাত্রশিবিরের রগকাটা বাহিনীর সদস্য। তিনি নাকি সেই সার্টিফিকেট নিয়ে অনেকদিন কাজ করেছেন ইসলামী ব্যাংকে। তারপর এই ব্যাংকে যোগ দিয়ে নাকি জোগাড় করেছেন ইতিহাসের এক সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট। তার নাকি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সম্বর্ধনাও মিলেছে। আমি বলেছি—তার জন্য কি দুষ্টু ঋণগ্রহীতা তাকে গুলি করার ভয় দেখাবে? হাউ ডেয়ার? কিন্তু মি. বিশ্বাসের অনুপস্থিতিতে আমার সূত্র আরও সহাস্যে বললো—সেই ব্যাংকের মালিকের বিরুদ্ধেও নাকি ইদানীং বড় অঙ্কের ঋণ করে টাকা পাচারের খবর অনেক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তারও নাকি সাধারণের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া খুব প্রয়োজন ছিল। এখন কাকে বিশ্বাস করি বলুন। মি. বিশ্বাস নেই আর এই করোনাকালে তো নিশ্বাসেরও বিশ্বাস নেই।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।  

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ