বাংলাদেশে আসলে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কত?

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:৪৭, জুন ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫১, জুন ০৮, ২০২০

রুমিন ফারহানাপ্রথমে ছিল উহানে, এরপর চীনের প্রাচীর পেরিয়ে ছড়িয়ে গেলো ইউরোপ, আমেরিকার মতো পশ্চিমা দেশগুলোতে। তখনও আমরা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারিনি এর ভয়াবহতা। কিংবা কে জানে হয়তো বুঝেও চোখ বুজে অস্বীকার করে গেছি আর ভেবেছি আমাদের দেশে হবে না এসব বিদেশি অসুখ। মুখে বলেছি বিশ্বায়নের কথা, বিপদে বাঁচার আশা রেখেছি নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভেবে। ৮ মার্চের আগ পর্যন্ত নীতিনির্ধারকরা ভালো মতোই ভুগেছেন ‘ডিনায়েল সিন্ড্রোমে’। না বুঝেই বলেছেন সব প্রস্তুতি আছে আমাদের, আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী, ভাইরাসকে ‘পাক হানাদার বাহিনী’ ধরে নিয়ে করোনাকে তুলনা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। কেউ বলেছেন করোনা কোনও মারাত্মক রোগ নয়, এটি সাধারণ সর্দি কাশির মতো কিংবা করোনা আসার আগেই ঘোষণা দিয়েছি আমরা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছি।
এই কথাগুলো সরকারের যেসব অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছিলেন তারা গত ১০ বছর এই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে ছিলেন সম্পর্ক শূন্য। অতি সাধারণ সর্দি কাশিতেও তারা উড়ে গেছেন ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, লন্ডন বা আমেরিকা। এই প্রথম দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হতে হচ্ছে তাদের। লাগছে আইসিইউ, ভেন্টিলেশনের মতো চিকিৎসা সুবিধা। হয়তো এই প্রথম উপলব্ধি করছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যখাতে কমপক্ষে জিডিপি’র ৫% বরাদ্দের কথা বললেও .৮৯% বরাদ্দ শুধু যে অপ্রতুল তাই না অমানবিকও বটে। এই বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়াতেও সর্বনিম্ন। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপে যথাক্রমে এই বরাদ্দ জিডিপি’র ২%, ২.৩%, ২.৫%, ২.৬% এবং ১০.৮%। আফগানিস্তানের মতো দেশেও এই ব্যয় জিডিপি’র ২.৯%।

শ্রীলঙ্কায় করোনায় আক্রান্ত ১৮০১ জন, মৃত্যুবরণ করেছেন ১১ জন আর সুস্থ হয়েছেন ৮৯১ জন, নেপালে আক্রান্ত ৩২৩৫ জন, মৃত্যুবরণ করেছেন ১৩ জন আর সুস্থ হয়েছেন ৩৬৫ জন, ভুটানে আক্রান্ত ৪৮ জন, মৃত্যুবরণ করেন নাই ১ জনও। মালদ্বীপে আক্রান্ত ১৮৮৩ জন আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৭ জন। এমনকি আফগানিস্তানে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯৫৫১ জন আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৩২০ জন। আমাদের ৮ মার্চ প্রথম আক্রান্ত ধরা পড়ার পর ৫৮ দিন সময় লেগেছিল আক্রান্তের সংখ্যা সরকারিভাবে ১০ হাজার অতিক্রম করতে, এরপর মাত্র ১১ দিনে ২০ হাজার, ৭ দিনে ৩০ হাজার, ৬ দিনে ৪০ হাজার, ৫ দিনে ৫০ হাজার এবং ৩ দিনে ৬০ হাজার অতিক্রম করলো। অর্থাৎ সংখ্যাটি বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এর মধ্যেই এসেছে একটির পর একটি সমন্বয়হীন সিদ্ধান্ত। ‘সীমিত পরিসরে’ খোলা হয়েছে কলকারখানা, গার্মেন্ট, দোকানপাট, মার্কেট চালু হয়েছে গণপরিবহন অর্থাৎ জীবিকা বাঁচানোর নামে জীবনকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে ভয়াবহ হুমকির মুখে। 

এখন প্রতিদিনই শুনছি পরিচিত মানুষের আক্রান্ত আর মৃত্যুর খবর। শুনছি টেস্টের অভাবে করোনার লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুর খবর, শুনছি হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে ভর্তি হতে না পেরে মৃত্যুবরণ করা মানুষের স্বজনদের হাহাকার। করোনায় মৃতের সংখ্যাকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে করোনার লক্ষণ নিয়ে মৃত্যুবরণ করা মানুষের সংখ্যা। এর মধ্যেই ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদন সবার দৃষ্টি কেড়েছে, যেখানে বলা হয়েছে শুধু ঢাকাতেই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখের বেশি যেখানে সরকারি হিসাব সারা দেশে ৬৩ হাজারের মতো। ব্রিটিশ এই সাময়িকী বলছে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে জারিকৃত লকডাউনের বিধি-নিষেধের বেশির ভাগই গত সপ্তাহ থেকে তুলে নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত। ১৭০ কোটি মানুষকে মুক্ত করে দেওয়ায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির এই অঞ্চলের এক পঞ্চমাংশ স্বস্তিতে ফিরবে, কিন্তু লকডাউন তুলে নেওয়ায় সংক্রমণ বাড়বে দ্রুতগতিতে।

প্রায় একই ধরনের তথ্য দিচ্ছে ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের এমআরসি সেন্টার ফর গ্লোবাল ইনফেকশিয়াস ডিজিজ এনালাইসিস। গত ২ জুন প্রকাশিত এক রিপোর্ট সে পর্যন্ত কতজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং জুনের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি কী হতে পারে তার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। এই রিপোর্ট মতে ২ জুন পর্যন্ত গত ৪ সপ্তাহে বাংলাদেশে মোট ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩২ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন আর সেই হিসাবে প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে ২৬ হাজার ৫৬ জন। শনাক্ত হয়েছে এমন রিপোর্টেড ঘটনার চেয়ে অনুমিত সংক্রমণের সংখ্যা অনেক বেশি। ‘সিচুয়েশন রিপোর্ট ফর কোভিড-১৯: বাংলাদেশ, ২০-০৬-০২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় যদি লকডাউনের মতো পদক্ষেপ বাড়ানো হয় তাহলে ৩০ জুন নাগাদ আক্রান্তের সংখ্যা নেমে দাঁড়াতে পারে দৈনিক ১২৭১৬-তে। আর বর্তমান গৃহীত পদক্ষেপ যদি শতকরা ৫০ ভাগ শিথিল করা হয়, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ জুন পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে ৯ লাখ ১১ হাজার ৬০ জন। ১১ মে থেকে দিনে শনাক্ত হচ্ছিল ১০০০-এর ওপরে। এখন সেই সংখ্যা ৩০০০-এর কাছাকাছি। আইইডিসিআরের একজন উপদেষ্টার মতে রোগীর সংখ্যা শনাক্তের ৪০ গুণ। তার মতে ল্যাব পরীক্ষায় আমরা যে রোগীর সংখ্যা পেয়েছি খুব রক্ষণশীল হিসেবে ১০-১২ গুণ মানুষ এর বাইরে আছে। আর উদার হিসেবে ৩০-৪০ গুণ মানুষ এর বাইরে। একই ধরনের কথা বলেছেন বিজ্ঞানী বিজন শীল। তার মতে দেশের ৩০-৪০ ভাগ মানুষ ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো আক্রান্তের উপসর্গ নেই অর্ধেক রোগীর। তাদের দেহে ভাইরাস আছে কিন্তু কোনও উপসর্গ নেই, নীরবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছেন তারা।

অর্থাৎ সরকারি হিসাব যাই দেখানো হোক না কেন বাস্তবতা দিচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বাস্তব চিত্র পাওয়ার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হলো পরীক্ষা। পরীক্ষার সংখ্যা যত বাড়ানো হবে ততই পরিষ্কার হবে আক্রান্তের সংখ্যা। এই লেখা যেদিন লিখছি সেদিন নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১২৪৯৫টি। ১৬ কোটি মানুষের দেশে শতকরা হিসাবে এটি .০০৭৮ শতাংশ। এই হিসাব অপ্রতুল বললেও কম বলা হয়। যেখানে পরীক্ষার হার যুক্তরাষ্ট্রে ৪%, পর্তুগালে ৬.৫%, রাশিয়ায় ৫.৫%, ইতালিতে ৫.৩% সেখানে বাংলাদেশের এই হার আতঙ্কিত হওয়ার মতোই।

করোনা যে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে এটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। যে মৃত্যু ছিল দূরের মানুষের সেই মৃত্যু এখন অনেক কাছে। আক্রান্ত হচ্ছে কাছের মানুষ, নিকট আত্মীয়, পরিচিত জন। অনেকেই আছেন লক্ষণযুক্ত কিন্তু পরীক্ষার জটিলতায় না গিয়ে ঘরেই আছেন কোয়ারেন্টিনে। অনেকেই হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন। একটা কোভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেটের অভাবে বহু রোগী করোনা না থাকার পরও কোনও হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে রাস্তায় মারা গেছেন। একটা পরীক্ষার রেজাল্ট আসতে সময় লাগে ৭ থেকে ৮ দিন। এর মধ্যে কোনোরকম সাবধানতা না নিয়ে আক্রান্ত অনেকেই সকলের সঙ্গে মিশেছেন, কাজ করেছেন এবং নিজের অজান্তেই রোগ ছড়িয়েছেন। এভাবেই একজন থেকে আক্রান্ত হয়েছেন বহু জন।

পরীক্ষার স্বল্পতা, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা সব কিছুকে ছাপিয়ে করোনায় শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।  করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার কমতে শুরু করায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে আর বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের মধ্যেই সব ধরনের গণপরিবহন এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কলকারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন অর্থনীতি সচল করার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নিলেও এতে সংক্রমণ এবং আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তৈরি হবে বাড়তি চাপ। বারবার একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে যে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেখানে অধিকাংশ মানুষই স্বাস্থ্যবিধি মানতে অভ্যস্ত নয় এবং সরকারি হিসাব মতেই সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী সেখানে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা কত? অপ্রতুল পরীক্ষা, স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা, সামাজিক হেনস্তার ভয়ে রোগ গোপন রাখা, পরীক্ষার আগেই রোগীর মৃত্যু, লক্ষণহীন রোগীর সংখ্যা অনেক হওয়া, মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা, সরকারের সমন্বয়হীনতা ও একটির পর একটি পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঘনবসতি, সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখিতার সময় সাধারণ ছুটি বাতিল করে কলকারখানা, গার্মেন্ট, দোকানপাট, মার্কেট, অফিস, গণপরিবহন খুলে দেওয়া একটি প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে, আর তা হলো প্রকৃত রোগীর সংখ্যা আসলে কত বিশেষ করে একটি কথা যখন বারবারই বলা হচ্ছে যে এই দেশে ভাইরাসটা আগে আগে যাচ্ছে আর বাংলাদেশ পিছে পিছে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ