স্বাস্থ্য খাতের কালো বেড়ালের খোঁজে

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৮:৩০, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০১:৩৮, জুলাই ১৭, ২০২০

প্রভাষ আমিনস্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতি রীতিমতো রূপকথার মতো। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর হাজার কোটি টাকা—এই গল্প তো রূপকথার বইয়েই পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের আবজাল সেই রূপকথাকে বাস্তব করেছেন। তবে স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবজাল একজন নয়, সেখানে আবজালদের ছড়াছড়ি, আবজালদেরই রাজত্ব। হয়তো কোনও কারণে এক আবজাল ধরা খেয়ে গেছে। তবে ধরা খেয়েও তো কানাডায় আয়েশেই আছে। এখন আবার মিঠু সিন্ডিকেটের নাম শুনছি। স্বাস্থ্য অধিদফতরে যেহেতু কেনাকাটা বেশি, তাই দুর্নীতিও বেশি। অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, বেশি দামে কেনা, এক জিনিস দেওয়ার কথা বলে আরেক জিনিস গছিয়ে দেওয়া—দুর্নীতির হরেকরকমের মাত্রা আছে স্বাস্থ্য অধিদফতরে। বিভিন্ন হাসপাতালে এমন সব জিনিস কেনা হয়, যা কোনোদিন খোলাই হয় না। দেখা গেলো কোনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমআরআই মেশিন আছে, কিন্তু অপারেটর নেই। ৯ লাখ টাকার জিনিস কেনা হয় ৯০ লাখ টাকায়। বিল করা হয় আমেরিকান পণ্যের, সরবরাহ করা হয় চাইনিজ। ঠিকাদারদের দায়িত্ব গছিয়ে দেওয়া। টেবিলের দুই প্রান্তের মানুষের মধ্যে সমঝোতা থাকলে ‘গছাগছি’তে সমস্যা হয় না। দুই প্রান্তে সমঝোতা থাকলে লেনদেন টেবিলের ওপর দিয়েই হতে পারে, পণ্যের মান বা প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক। টেবিলের অপর প্রান্তে যদি আবজালরা থাকে, তাহলে এই প্রান্তে তো মিঠুরা থাকতেই পারে। তবে এই প্রান্তের মানুষদের নিয়ে যত কথা হয়, ওই প্রান্ত নিয়ে ততটা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবজালরা আড়ালেই থাকেন। যেমন, এখন জেএমআইয়ের রাজ্জাক, রিজেন্টের সাহেদ, জেকেজির আরিফ বা ডা. সাবরিনাদের যতটা আলোচনা, ওই প্রান্তের আবজালদের নিয়ে ততটা তো নয়ই, বলা ভালো আলোচনাই নেই।

ভাসা ভাসা প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধীকে চিহ্নিত করা হয়নি, ধরা তো অনেক পরের কথা। অথচ জেএমআই বা রিজেন্ট বা জেকেজির ওই প্রান্তের পার্টনার কারা ছিল, তা বের করতে কিন্তু মাসুদ রানা হতে হয় না। কিছু ধাপ ফলো করলে, কিছু দুইয়ে দুইয়ে চার মেলালে আপনি চিনে যাবেন। চলুন তবে ধাপে ধাপে চার মেলাই।

আমি ভেবেছিলাম করোনার সময়টায় স্বাস্থ্য অধিদফতর একটু সংযত থাকবে। ভাবনার পেছনে দুটি কারণ—হতে পারতো বৈশ্বিক মহামারি পরিস্থিতিতে মানবিক বিবেচনায় তারা লুটপাটে রাশ টেনে ধরলো অথবা এই সময়ে সবার নজর থাকবে স্বাস্থ্য খাতে, তাই ভয়েও তারা কিছুটা সংযত থাকতে পারতো। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রমাণ করেছে, তাদের স্বভাব ঢেঁকির মতো। ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। মহামারি যত ভয়ঙ্করই হোক, স্বাস্থ্য অধিদফতরে দুর্নীতি চলছে, চলবে সমানতালে। বরং মহামারিকে পুঁজি করে কীভাবে বড়লোক হওয়া যায়, তারই প্রতিযোগিতায় নেমেছে কেউ কেউ। তবে এবার তারা দুর্নীতির জুয়াটা খেলছেন মানুষের জীবন নিয়ে। জেএমআই ভুয়া এন৯৫ সরবরাহ করে আলোড়ন তুলেছিল। তবে জেকেজি আর রিজেন্ট এসে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্যান্ডোরার বাক্সটি খুলে দিয়েছে। এখন চলছে ‘কামড়াকামড়ি’। দায় চাপানোর পুরনো খেলা শুরু হয়ে গেছে।

বালিশ খেলার মতো, কেউ বালিশটাই ছুঁতে চান না। তবে দায় চাপানোর এ খেলায় আমাদের মতো আমদর্শকদের সুবিধা হলো, দায় চাপাচাপি করতে গিয়ে অনেক নোংরা বাইরে চলে আসবে, অনেকের মুখোশ খুলে যাবে, উড়ে যাবে। এই সুযোগে আমরাও চিনে নিতে পারবো, দুর্নীতিবাজদের।

রিজেন্ট আর জেকেজি কেলেঙ্কারিতে অনেকের নামই সামনে আসছে, অনেককে ধরাও হয়েছে। জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরীর পর ধরা হয়েছে চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকেও। বোরকা পরে নৌকায় করে পালানোর সময় সাতক্ষীরা থেকে ধরা হয়েছে রিজেন্ট সাহেদকেও।

আগেই বলেছি, টেবিলের ওই প্রান্তের লোক কারা, তা বের করা কোনও কঠিন নয়। একদম শুরুর দিকে একমাত্র বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল রিজেন্টের উত্তরা ও মিরপুরের দুটি শাখা। এমনিতে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়।

হাইফ্লো অক্সিজেনের সরবরাহ থাকতে হয়, আইসিইউ’র ভালো ব্যবস্থা থাকতে হয়। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, বিশেষ ব্যবস্থা তো দূরের কথা, রিজেন্ট আসলে সেই অর্থে কোনও হাসপাতালই না। অথচ কোভিড-১৯ চিকিৎসার সুযোগ তারা পেয়ে গেছে একদম শুরুতেই। কোনও রিকশাওয়ালাকে ঢাকার ৫০টি বেসরকারি হাসপাতালের নাম জিজ্ঞাসা করলেও তিনি রিজেন্ট হাসপাতালের নাম বলবেন না। তেমন একটি হাসপাতাল কীভাবে এত বড় সুযোগ পেলো? এই প্রশ্নের জবাব পেলেই টেবিলের ওই প্রান্তের মানুষগুলোর চেহারা পরিষ্কার হয়ে যাবে। গত ১১ জুলাই পাঠানো স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘মার্চ মাসে আকস্মিকভাবে দেশে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। কোনও বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড রোগী ভর্তি করতে চাইছিল না। অথচ অনেক রোগীর পছন্দ থাকতো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক। এমন সময় রিজেন্ট হাসপাতাল ঢাকার উত্তরা ও মিরপুরের দুটি ক্লিনিককে কোভিড হাসপাতাল হিসেবে ডেডিকেটেড করার আগ্রহ প্রকাশ করে।’

এখানেই অনেক প্রশ্ন। কোনও বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড রোগী ভর্তি করতে চাইছিল না, স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই দাবি পুরোপুরি সত্যি নয়। আমি নিজে শুনেছি, একদম শুরুর দিকেই ল্যাবএইড হাসপাতালের মালিক ডা. শামীম টেলিভিশন টকশোতে বলেছিলেন, ডেঙ্গুর মতো করোনা মোকাবিলায়ও তারা সরকারের সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু তখন কোনও বেসরকারি হাসপাতালকেই টেস্ট বা চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়নি, রিজেন্ট ছাড়া।

যদি স্বাস্থ্য অধিদফতরের দাবি সত্যি হয় যে কোনও বেসরকারি হাসপাতালই কোভিড রোগী ভর্তি করতে চাইছিল না, তাহলে সেটাও কিন্তু অধিদফতরের ব্যর্থতা হিসেবেই পরিগণিত হবে। এখানে আমার অনেক প্রশ্ন— স্বাস্থ্য অধিদফতর কি সুনির্দিষ্টভাবে কোনও বেসরকারি হাসপাতালকে প্রস্তাব দিয়েছিল? কেউ কি প্রত্যাখ্যান করেছে? প্রত্যাখ্যানের কোনও লিখিত বা মৌখিক প্রমাণ আছে?

ল্যাবএইড হাসপাতাল চাওয়ার পরও তাদের সুযোগ দেওয়া হলো না কেন? বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কি নিজেদের ইচ্ছামতো রোগী ভর্তি করতে চাওয়া না চাওয়ার অধিকার আছে বা থাকা উচিত? কোন কোন হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদফতর বলার পরও রোগী ভর্তি করতে চায়নি? যারা স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুরোধ সত্ত্বেও কোভিড রোগী ভর্তি করতে রাজি হয়নি, তাদের কার কার বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরও তো জানা। স্বাস্থ্য অধিদফতর তখন, রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য ‘উতালা’ ছিল। এতকিছু দেখার সময় ছিল না তাদের। আচ্ছা স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরিচালক (হাসপাতাল) বলে একটি পদ আছে। সেই পদের ব্যক্তিটি কি এখনও আছেন? নাকি কোনও বেসরকারি হাসপাতালকে রাজি করাতে না পারার দায়ে তাকে অপসারণ করা হয়েছে বা লজ্জায় তিনি নিজেই সরে গেছেন? নাকি রিজেন্ট হাসপাতালকে বাগে আনতে পারায় তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে? স্বাস্থ্য অধিদফতরের বহুল আলোচিত ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, ‘সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতারণার বিষয়ে কিছু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. সাহেদ করিমের বিভিন্ন প্রতারণার খবরও বেরিয়ে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর তার বিষয়ে আগে অবহিত ছিল না।’ কী ভয়ঙ্কর কথা! একটা লোক সম্পর্কে কিছু না জেনেই তাকে এত বড় ও স্পর্শকাতর দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হলো! ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, ‘পরিদর্শনের সময় চিকিৎসার পরিবেশ উপযুক্ত দেখতে পেলেও ক্লিনিক দুটির লাইসেন্স নবায়ন ছিল না। বেসরকারি পর্যায়ে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা সৃষ্টির মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অপর বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে লাইসেন্স নবায়নের শর্ত দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে স্বাস্থ্য অধিদফতর।’

আমি স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই ব্যাখ্যা যত পড়ি, তত শিখি, তত কালো বিড়াল দেখি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের আত্মস্বীকৃত অপরাধের ফিরিস্তি দেখেও অবাক হই না। ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, এটি আসলে কোনও হাসপাতালই না। আইসিইউতে বিছানা ছাড়া আর কিছু নেই। একজন ম্যাজিস্ট্রেট যেটা দেখেই বুঝতে পারেন, এটি কোনও হাসপাতালই না; সেখানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিনিধি ‘চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশ’ কীভাবে দেখেছিলেন? কে বা কারা রিজেন্ট হাসপাতাল পরিদর্শন করে সেখানে চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশ দেখতে পেয়েছিল; তাদের খুঁজে বের করা এবং পুলিশের হাতে তুলে দিতে সব মিলিয়ে তিন মিনিট লাগবে। টেবিলের এই প্রান্তের লোকদের ধরা হচ্ছে, ধরা হবে। একবারও তো শুনিনি রিজেন্টকে সার্টিফিকেট দেওয়া সেই লোকগুলোকে ধরা হচ্ছে বা হবে। স্বাস্থ্য  অধিদফতরের ব্যাখ্যাটি তাদের অদক্ষতা, অযোগ্যতা আর দুর্নীতির দলিল। ব্যাখ্যায় স্বীকারই করা হয়েছে, লাইসেন্স নবায়ন ছিল না জেনেও নবায়নের শর্তে তারা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন। যেখানে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন, সেখানে লাইসেন্স নবায়ন নেই জেনেও স্বাস্থ্য অধিদফতর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, ব্যাখ্যায় এই কথাটি লেখার আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সবার পদত্যাগ করার আগে লজ্জায় এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত ছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতর এতটাই অথর্ব, বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কথা শোনাতে না পেরে, তাদের অনুপ্রাণিত করার কৌশল নিয়েছে। কৌশলটা হলো, লাইসেন্সবিহীন একটি হাসপাতালকে অনুমতি দেওয়া। আমি বলছি বটে অযোগ্যতা, অদক্ষতা, অথর্বতা; আসল বিষয় হলো অসততা, মানে লেনদেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইটও নাকি ঘুষ খায়। ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘সমঝোতা স্মারক সই করার আগে পরিচয় থাকা তো দূরের কথা, টকশো ছাড়া কখনও মো. সাহেদ করিমকে দেখেননি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক। তবে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর মো. সাহেদ বেশ কয়েকবার স্বাস্থ্য অধিদফতরে এসেছিলেন। এ সময় মো. সাহেদ তার সঙ্গে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির যোগাযোগ আছে এবং তার ক্লিনিকগুলোতে কোন কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির কোভিড আক্রান্ত আত্মীয় ভর্তি আছেন, সেসব কথা বলার চেষ্টা করতেন।’ ব্যাখ্যার এই অংশটি যদি সত্যি হয়, তাহলে অজানা, অচেনা, একজন ভুঁইফোঁড় লোককে লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়ার অপরাধে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে এখনই গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি। এমন ‘অথর্ব’ লোকের এত বড় দায়িত্বে থাকা বিপজ্জনক। না জানি আবার রাস্তা থেকে ধরে কাকে কোন সুযোগ দিয়ে দেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তারা প্রতারিত হয়েছেন। আসলে অধিদফতর নয়, শুধু গোটা জাতিই প্রতারিত হয়েছে। মজাটা হলো, প্রতারিত যে হয়েছেন, এটা টের পেতে তাদের ১১০ দিন লেগেছে। অথচ দু’জন জুনিয়র ডাক্তারের সেটা বুঝতে একদিনও লাগেনি। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সরকারি ডাক্তারদের রিজেন্টে পাঠানো হয়। ডা. শরীফ সাম্মিরুল আলম সরকারের নির্দেশে ১১ মে রিজেন্টে যোগ দেন। পা দিয়েই বুঝতে পারেন, এটা কোনও হাসপাতালই নয়। অভিযোগ করায় মো. সাহেদ তাকে ভয় দেখায়। ১৫ মে তিনি স্বাস্থ্য সচিব বরাবর এক চিঠিতে রিজেন্টের গোমর ফাঁস করে দেন, এ চিঠিতে অতিরিক্ত সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছিল। তার এক সপ্তাহ পর রিজেন্টে যোগ দেন ডা. আশরাফুল আলম।

তিনিও একই ধরনের অভিযোগ এনে চিঠি লেখেন। খেয়াল করুন, চিঠিটি লেখা হয় ১৫ মে, আর র‌্যাব অভিযান চালায় ৬ জুলাই। মানে হলো চিঠি পাওয়ার পরে ৫২ দিন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে এই দুই চিঠির সূত্র ধরে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানেই কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসে ‘অ্যানাকোন্ডা’। আচ্ছা দুইজন সরকারি ডাক্তার লিখিতভাবে অভিযোগ জানানোর পরও স্বাস্থ্য সচিব ও অতিরিক্ত সচিব যে কিছু করলেন না, এই অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? মনে রাখুন, প্রথম কালো বেড়াল হলো, যিনি পরিদর্শন করে চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছিলেন, আর রিজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েও ৫২ দিন আড়াল করে রাখা সচিব ও অতিরিক্ত সচিব হলেন আরও দুই কালো বেড়াল।

চলুন আরও কিছু বেড়াল খুঁজি। এবার আসি জেকেজি প্রসঙ্গে। মজাটা হলো রিজেন্টের মতো সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় জেকেজিরও লাইসেন্স ছিল না। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই ভালোবাসা সত্যি আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে রিজেন্টের ক্ষেত্রে যেমন, চিনি না, জানি না, দেখিনি বলে এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে; জেকেজির ক্ষেত্রে তা হয়নি। ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘জেকেজির প্রধান সমন্বয়ক আরিফুল চৌধুরী ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামের একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপেরও স্বত্বাধিকারী। ওভাল গ্রুপ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ ২০১৮-এর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করে। কোভিড সংকট শুরু হওয়ার পরই আরিফুল চৌধুরী স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানান, জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সমন্বয়ক। জেকেজি গ্রুপ দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে বাংলাদেশে কিছু বুথ স্থাপন করতে চায়। এসব বুথের মাধ্যমে পিসিআর পরীক্ষা করার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পিসিআর ল্যাবরেটরিগুলোতে সরবরাহ করা হবে। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর বা সরকারকে কোনও অর্থ দিতে হবে না। ধারণাটি ভালো এবং কোভিড পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, এই বিবেচনা থেকে ওভাল গ্রুপের সঙ্গে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় জেকেজি গ্রুপকে অনুমতি দেওয়া যায় বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের মনে হয়।’

আহারে নিরীহ, গোবেচারা স্বাস্থ্য অধিদফতরের জন্য আমার মায়াই লাগছে। তারা খুঁজে খুঁজে লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ দেয়। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানগুলো অধিদফতরের ভালোবাসার মূল্য না দিয়ে খালি প্রতারণা করে। সরকারকে টাকা দিতে হবে না, এটা শুনেই দেশপ্রেমিক স্বাস্থ্য অধিদফতর আগপিছ না ভেবে জেকেজিকে অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। তবে জেকেজির ঘটনায় একটু খুঁজলেই বেড়াল পাবেন। জেকেজির গ্রেফতারকৃত চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ২৪ জুন জেকেজি অফিসে পুলিশের অভিযানের পর ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতর আর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার ল্যাবের অধ্যাপক তুষার স্যার এবং আমার কাছে যে ক’জন সাংবাদিক ভাই ও বোনের নম্বর ছিল তাদের জানিয়ে আমি সরে যাই এখান থেকে।’ পরে এক টিভি সাক্ষাৎকারে ডা. সাবরিনা আরও সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, জেকেজি ছাড়ার আগে তাদের অপকর্মের কথা তিনি ডিজি ও এডিজি ম্যাডামকে জানিয়েছেন। তার মানে ৪ জুন থেকে ডিজি, এডিজি, রেফারেল সেন্টারের তুষার স্যার এবং বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ভাইবোন জেকেজির অপকর্মের কথা জানতেন। আর গোটা পৃথিবী জেনেছে ২৪ জুন। তার মানে মাঝের ২০ দিন এই এতগুলো লোক জেনেশুনে জেকেজিকে অপরাধ করার সুযোগ দিয়েছেন, তাদের অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করছেন। রবি ঠাকুর কী যেন একটা লিখেছিলেন না, অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে...। জেকেজির ঘটনায় টেবিলের এই প্রান্তে থাকা আরিফ-সাবরিনাদের ধরা হয়েছে। কিন্তু ওই প্রান্তের কালো বিড়ালগুলো নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এবার আসুন সবচেয়ে ‘ঊর্ধ্বতন বেড়াল’ ধরার জন্য খোঁজ লাগাই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়’। বাহ এ দেখি সব ফকফকা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই অধিদফতর লাইসেন্সবিহীন রিজেন্টকে মানুষ মারার লাইসেন্স দিয়েছিল। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে অধিদফতরের ডিজি পার পেতে চাইলেও পারছেন না। পরদিনই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডিজির কাছে ‘মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন; তিনদিনের মধ্যে তার ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। অধীনস্থ একটি অধিদফতরের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের এই পাল্টাপাল্টি একটু অভিনবই বটে।

তবে তার আগে চলুন আমরা একটু দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাই—অধিদফতরের কাছে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন মানে অতিরিক্ত সচিব, সচিব এবং মন্ত্রী। এরমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তির ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। মন্ত্রী জানতেন না, ডিজি চিনতেন না। তাহলে বাকি থাকলো সচিব ও অতিরিক্ত সচিব। দুই ডাক্তারের চিঠি পাওয়ার পর এই দুজন ৫২ দিন রিজেন্টকে আড়াল করে রেখেছিলেন। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর মিললেই পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত কালো বেড়ালের দেখা। অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সময় মতো ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ বলতে তিনি সাবেক সচিবকে বুঝিয়েছেন। তাহলে তো আর বেশি খোঁজাখুঁজির দরকার নেই।

টেবিলের এই প্রান্তের আরিফ-সাবরিনা-সাহেদরা গ্রেফতার হয়েছে। তাহলে টেবিলের অপর প্রান্তের যারা রিজেন্ট, জেএমআই আর জেকেজিকে অপরাধ করার সুযোগ দিলো, তাদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? এক হাতে তো তালি বাজেনি নিশ্চয়ই।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X