আনন্দ যখন মানুষের মুখ

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:১০, আগস্ট ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, আগস্ট ০২, ২০২০

রেজানুর রহমানগরুর চামড়ার দাম শুনে মেজাজ বিগড়ে গেলো সোবহান সাহেবের। এই লোক বলে কী? এত বড় একটা গরুর চামড়ার দাম মাত্র দেড়শ টাকা? লোকটা ইয়ার্কি করছে না তো? কিন্তু তার সাথে তো ইয়ার্কির সম্পর্ক নয়। এলাকার পরিচিত লোক। সিজনাল ব্যবসায়ী। যখন যে জিনিসের চাহিদা বেশি থাকে সেটা নিয়েই ব্যবসা করে। গত ঈদে সেমাই বিক্রির পাশাপাশি মাছের ব্যবসা ধরেছে। মাছের ব্যবসাটা নাকি টিকে আছে। সোবহান সাহেব ভেবে অবাক হন– মাছের ব্যবসা একসময় বড়ই অচ্ছুৎ ছিল। সহজে কেউ এই ব্যবসাটা করতে চাইতো না। আর এখন এই ব্যবসাই অনেক জনপ্রিয়। অনেক শিক্ষিত তরুণ এই ব্যবসা ধরেছে। অনলাইনে অর্ডার দিলেই বাড়ি বাড়ি মাছ পৌঁছে দেয়। কয়েকদিন আগে চামড়া ব্যবসায়ী এলাকার এই লোকের কাছে ইলিশ মাছ কিনেছেন সোবহান সাহেব। মাছ ভালোই ছিল। নিজেই মাছ ডেলিভারি দিতে এসেছিল লোকটি। সুযোগ বুঝে ইনফরমেশটা দিয়ে দেয়– আংকেল কোরবানি দিচ্ছেন তো নাকি?

– হ্যাঁ, নিয়ত তো করেছি।

– গরু কিনেছেন?

– এখনও কিনিনি...

– দায়িত্বটা আমাদেরকে দিতে পারেন।

– মানে?

অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন সোবহান সাহেব। মাস্ক অর্থাৎ মুখোশ পরা লোকটি মৃদু হেসে বলে, কোরবানির গরুর কথা বলছিলাম। আপনি যদি দায়িত্ব দেন তাহলে আমরাই গরু কিনে ঈদের দিন জবাই করে, মাংস কেটে ধুয়ে আপনার বাসায় দিয়ে আসবো। আপনাকে কিছুই করতে হবে না। আপনি অর্ডার দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবেন। আমরা কোরবানি বিষয়ক আপনার সব কাজ করে দেবো।

সোবহান সাহেব ভেবেছিলেন লোকটি বোধকরি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গরু কোরবানির ব্যাপারে সহায়তা করতে চাইছে। পরে যখন বুঝলেন যে কীসের স্বেচ্ছাশ্রম? এটা তো এক ধরনের ব্যবসা। তখন আর আগ্রহ দেখাননি। তবে লোকটিকে কথা দিয়েছিলেন গরুর চামড়া তার কাছেই বিক্রি করবেন। কিন্তু চামড়া দরদাম নিয়ে বড়ই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে লোকটি। একে তো দু’কথা শুনিয়ে দিতে হয়।

রেগে উঠলেন সোবহান সাহেব। ধমকের সুরে লোকটিকে বললেন, এই যে, আপনি কি আমার সাথে ইয়ার্কি করতেছেন? লাখ টাকা দামের গরুর চামড়ার দাম মাত্র দেড়শ টাকা? আপনার কাছে চামড়া বিক্রি করবো না। আপনি যান তো.... যান এখান থাইক্যা...।

লোকটি এতটুকু বিব্রত হলো না। বরং সোবহান সাহেবের কথা শুনে হাসতে হাসতে বললেন, আংকেল সেই দিন তো আর নাই’। গরুর এই চামড়াই একসময় দেড় হাজার, দুই হাজার দিয়ে কিনেছি। এবার চামড়ার বাজার বেশ নাজুক। সরকারই তো চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। যান সরকারের নির্ধারণ করা দাম অনুযায়ী আপনাকে আরও ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেবো। তাহলে চামড়ার দাম দাঁড়ালো ২০০ টাকা। বলেই চামড়া হাতে তুলে নিতে এগিয়ে যাচ্ছিলো লোকটি। সোবহান সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, এত কম দামে চামড়া বিক্রি করবো না। তার চেয়ে মাদ্রাসা অথবা এতিমখানায় দান করে দেবো। আপনি এখন যান...।

লোকটি নাছোড় বান্দার মতো মিটমিটে চোখে হাসছে, আংকেল এর বেশি দাম কোথাও পাবেন না। চামড়াটা আমাকে দিয়ে দেন। যান আপনার অনারে আরও ৫০ টাকা দেবো। তাহলে সাকুল্যে দাম গিয়া দাঁড়ালো আড়াইশ‘ টাকা। এবার আর না বলবেন না। এই নেন টাকা...।

সোবহান সাহেব আগের মতোই বিরক্ত মুখে বললেন, তোমার কাছে চামড়া বিক্রি করবো না। মাদ্রাসা অথবা এতিমখানায় দান করে দেবো।

সোবহান সাহেবের কথা শুনে লোকটি তার মুখের মাক্স খুলে নিশ্বাস নেওয়ার ভঙ্গি করে আবার মুখে মাস্ক পরতে পরতে বললো, মাদ্রাসা অথবা এতিমখানায় দান করতে হলে আপনাকে অথবা আপনার কোনও লোককে সেখানে যেতে হবে। এবার মাদ্রাসার ছাত্রদের পাবেন না। করোনার ভয়ে তারা বের হয়নি। চামড়াটা আমাকে দিয়ে দেন। আমিই কোনও মাদ্রাসা অথবা এতিমখানায় পৌঁছে দেবো।

লোকটির কথা মন:পূত হলো সোবহান সাহেবের। প্রতি বছর কোরবানির ঈদে একাধিক মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে লোকজন যোগাযোগ করে। এবার কেউই যোগাযোগ করে নাই। কাজেই এই লোকের হাতেই চামড়া দিয়ে দেওয়া ভালো। কিন্তু পরক্ষণেই মনের ভেতর সন্দেহ দানা বাঁধলো। মাদ্রাসা অথবা এতিমখানায় দেওয়ার কথা বলে এই যে লোকটি গরুর চামড়া নিয়ে যাবে. ঠিক জায়গায় দেবে তো! নাকি...? সিদ্ধান্ত পাল্টালেন সোবহান সাহেব। লোকটিকে বললেন, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমার লোকজনই হয় মাদ্রাস না হয় এতিমখানায় চামড়াটা দিয়ে আসবে।

লোকটি হতাশ হয়ে চলে যাওয়ার সময় সোবহান সাহেবকে বলল, আংকেল এইবার সত্যি সত্যি কোরবানির চামড়ায় ব্যবসা হবে না। পশুর চামড়া নিয়া আমরা একসময় যে অহংকার করতাম সেটা এখন আর নাই। আমাদের পাটের ঐতিহ্য শেষ হয়ে গেছে। এবার পশুর চামড়ার ঐতিহ্যও শেষ হয়ে যাবে।

লোকটি চলে যাওয়ার পর গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন সোবহান সাহেব। লোকটি তো যথার্থই বলেছে। দেশের পাটের কদর তো আর আগের মতো নাই। পাঠ্যবইয়ে একসময় পাটকে স্বর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। সেই পাট এখন গুরুত্বহীন কৃষিপণ্য। পশুর চামড়া রফতানি বাণিজ্যের আলো ছিল একসময়। সেই আলো এখন নিভু নিভু, ম্রিয়মাণ...।

কোরবানির গরু কাটা শেষ। মাংস তিন ভাগ করলেন সোবহান সাহেব। কোরবানির নিয়ম অনুযায়ী তিন ভাগের এক ভাগ মাংস অসহায় গরিব, মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হয়। সেটা করতে গিয়ে চরম এক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে গেলেন। বাড়ির সামনে শত শত মানুষ ভিড় করেছে। বাড়ির কাজের ছেলেটি ভিড় দেখে এগিয়ে এসে বললো, খালুজান আমার একলার পক্ষে এই ভিড় সামলানো কঠিন হবে। কী করি বলেন তো?

সোবহান সাহেব কোনও উত্তর খুঁজে পেলেন না। প্রতি ঈদে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছেলেমেয়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসে। ঈদের খুশিতে গোটা বাড়ি হইচই আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে। সোবহান সাহেবের তিন ছেলে দুই মেয়ে। তিন ছেলের দুই জন ঢাকায় থাকে। অন্যজন থাকে চট্টগ্রামে। মেয়েদের একজন থাকে ঢাকায়। অন্যজন থাকে রাজশাহীতে। ৫ ছেলেমেয়ের সন্তান সংখ্যা ১৭ জন। গত বছর কোরবানির ঈদে সবাই গ্রামে বেড়াতে এসেছিল। বাড়িটা হইচই আনন্দে মেতে উঠেছিল। দুটি গরু, একটি ছাগল কোরবানি দিয়েছিলেন। সেবারও বাড়ির সামনে এমন ভিড় করেছিল মানুষ। কিন্তু লোকবল বেশি থাকায় কোরবানির মাংস বিতরণ করতে গিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু এবার লোক বলতে কাজের ছেলেটি আর কসাই হিসেবে আসা তিন জন মানুষ। মাংস কাটাকাটির পর কসাই তিন জন ‘যাই যাই’ শুরু করেছে। তাদের আরও একটি গরু কাটার বায়না আছে। সেজন্য তাড়া দেখাচ্ছিল। ওদেরই একজনকে আটকে রাখলেন সোবহান সাহেব এবং সাহস করে কোরবানির মাংস বিতরণ শুরু করলেন। কিন্তু ভিড় সামলানো যাচ্ছে না। কাজের ছেলেটি ভয়ার্ত মুখে বলল, খালুজান এভাবে হবে না। দেখতেছেন না সবাই গেট ভাইঙা ভেতরে আসতে চাইতেছে।

সোবহান সাহেব হঠাৎ একটা বুদ্ধি বের করলেন। কোরবানির মাংস নিতে আসা মানুষগুলোর উদ্দেশে বললেন, মাংস নিতে হলে মুখে মাস্ক পরে আসতে হবে। আপনারা যারা মাস্ক পরেন নাই তারা মাস্ক পরে আসেন। তা না হলে মাংস পাবেন না।

সবাই মাস্ক আনার জন্য ছুটলো। প্রায় ত্রিশ মিনিটের মধ্যে মাস্ক পরে এলো মানুষগুলো। কিন্তু এবার মাস্ক পরে থাকা মানুষগুলোকে অচেনা মনে হচ্ছে। যেন ভিন গ্রহের কোনও মানুষ।

মাংস বিতরণ নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হলো। প্রথমে নিয়ম অনুযায়ী তিন ভাগের একভাগ মাংস বিতরণ করতে চেয়েছিলেন সোবহান সাহেব। কিন্তু দুস্থ মানুষের ভিড় বেশি হওয়ায় সব মাংসই বিলি করে দিলেন। তবু কেন যেন তৃপ্তি পাচ্ছেন না। মনের ভেতরটায় খচ খচ করছে। কেন করছে? ভাবতে গিয়ে মনে হলো– মাংস বিতরণের সময় মানুষগুলোর মুখ ভালো করে দেখতে পাননি বলে এক ধরনের অস্থিরতা বাড়ছে।

সোবহান সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন আর কাউকে মাস্ক পরতে বলবেন না। মানুষের মুখ না দেখলে তার কেমন যেন অস্থির লাগে। কিন্তু জীবনঘাতী ভাইরাস করোনা তো মানুষের মুখ ঢেকে দিয়েছে। মানুষের চোখ, নাক, মুখই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে একজন মানুষ ঘণ্টায় গড়ে ২৭ বার হাত দিয়ে চোখ, নাক মুখ স্পর্শ করে। এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রথচ নিজের হাতেই নিজের নাক, চোখ, মুখ স্পর্শ করতে এখন মানা।

ঢাকা থেকে বড় ছেলে ফোনে ভিডিও কল করেছে। বাসায় বসে ফোনে কথা বলছে। তবু মুখে মাস্ক। সোবহান সাহেব প্রশ্ন করলেন, তোরা কি ঘরের ভিতরেও মাস্ক ব্যবহার করিস!

বড় ছেলে বলল, হ্যাঁ বাবা। তুমি মাস্ক পরো নাই কেন? সোবহান সাহেব বললেন, বাড়িতে বসে আছি তো তাই...।

বড় ছেলে সতর্ক করার ভঙ্গিতে বললো, বাবা হেলাফেলা করবেন না। আজ বাসায় অনেক মানুষ আসবে। আপনি মাস্ক পরে থাকবেন।

সোবহান সাহেব বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। তোর ছেলেমেয়েদের একটু ডাক তো। কথা বলি।

বড় ছেলের সন্তানেরা, সাথে তার স্ত্রীও ভিডিও কলে যুক্ত হলো। সবার মুখে মাস্ক। ফলে কেন যেন চিনতে কষ্ট হচ্ছে। ছেলের বউ বললো, বাবা ঈদ মোবারক। কেমন আছেন?

ভালো আছি মা।

আপনার মুখে মাস্ক কই?

সোবহান সাহেব বললেন, বাড়িতে আছি তো তাই...।

ছেলের বউ সতর্ক করার ভঙ্গিতে বলল, বাবা প্লিজ এটা করবেন না। আজ অনেকেই আপনার সাথে দেখা করতে আসবে। কার শরীরে কী জীবাণু আছে আপনি তো বলতে পারবেন না। কাজেই মাস্ক পরে থাকবেন।

আচ্ছা, বলেই সোবহান সাহেব ফোন কেটে দিলেন। সাথে সাথেই রাজশাহী থেকে ছোট মেয়ের ভিডিও কল এলো। ছোট মেয়েও মুখে মাস্ক পরেছে। বাবা ঈদ মোবারক!

সোবহান সাহেব বললেন, ঈদ মোবারক।

বাবা গরু কাটা শেষ?

হ্যাঁ।

তাহলে তো আপনি এখন ফ্রি।

হ্যাঁ।

সারা দিনে কী করবেন?

কিছু না। একটু পরে তোর মায়ের কবর জিয়ারত করতে যাবো।

যাবার সময় মুখে মাস্ক পরে যাবেন কিন্তু...।

আচ্ছা... তোর ছেলেমেয়েরা কোথায়? জামাই বাবাজি...।

ভিডিও কলে সবাই যুক্ত হলো। মাস্ক মুখে কাউকেই ভালো করে চিনতে পারছেন না সোবহান সাহেব। মেয়েকে ওই একই প্রশ্ন করলেন সোবহান সাহেব। তোরা কি বাসাতেও মাস্ক পরে থাকিস?

মেয়ে বলল, বাবা ঈদের দিনতো। নানান কিসিমের লোকজন বাসায় আসছে। তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা আর কী?

ফোন কেটে দিলেন সোবহান সাহেব। মন চাইছে ছেলেমেয়েদের মাস্কবিহীন মুখগুলো দেখতে। মানুষের চোখ, নাক,মুখ ভালো করে না দেখলে কি মানুষকে চেনা সম্ভব? প্রিয়জনকে তো তখন অচেনা মনে হয়। এই যেমন আজ পরিবারের মানুষগুলোকে অচেনা মনে হচ্ছে।

চট্টগ্রামে ছোট ছেলের কছে নিজেই ভিডিও কল করলেন সোবহান সাহেব। ছেলের বউ ফোন রিসিভ করেছে। মাস্ক ঢাকা মুখে বলল, বাবা ঈদ মোবারক।

সোবহান সাহেব বললেন, ঈদ মোবারক। এবার ছেলের বউ নিজে থেকেই বলল, বাবা আপনার ছেলে একটু বাইরে গেছে। ও এলেই আমি আপনাকে আবার ফোন করবো। ফোন কেটে দিতে যাচ্ছিলো ছোট ছেলের বউ। সোবহান সাহেব বললেন, তোমরাও কি বাসায় মাস্ক ব্যবহার করো?

হ্যাঁ বাবা, না করে তো উপায় নাই। আজ ঈদের দিন। বাসায় অনেক মানুষ আসবে। বলাতো যায় না, কার শরীরে কি আছে... কার নিশ্বাসে কি ছড়ায়। সতর্কতা আর কী! বাবা আপনার মুখে তো মাস্ক দেখছি না। প্লিজ মাস্ক ব্যবহার করেন। বলাতো যায় না...।

ফোন কেটে দিলেন সোবহান সাহেব। মাস্ক ছাড়াই প্রিয়জনের মুখগুলো দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তাতো সম্ভব হচ্ছে না। বরং কাজের ছেলেটির অব্যাহত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেও ঈদের দিন মাস্ক পরেই অতিথিদের সাথে সৌজন্য বিনিময় করলেন সোবহান সাহেব। রাতে মাস্ক পরার আসল ঘটনাটা জানতে পারেন সোবহান সাহেব। ঢাকার বাইরে থেকে ছেলেমেয়েরা বারবার ফোন করে কাজের ছেলেটিকে বুঝিয়েছে, সে যেন সোবহান সাহেবকে মাস্ক পরার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে।

সোবহান সাহেব ভেবেছিলেন, যেহেতু করোনাকালীন দুর্যোগের কারণে ছেলেমেয়েরা গ্রামে ঈদ করতে আসেনি তাই আত্মীয়স্বজনও হয়তো এবার আসবে না। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। বিকেলের দিকে অনেক আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এলো। ড্রয়িং রুমে জম্পেশ একটা আড্ডাও জমে গেলো। সঙ্গত কারণেই আড্ডার মূল বিষয় বস্তু হয়ে উঠেছিল প্রতারক সাহেদ এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতি। করোনার পাশাপাশি বন্যাদুর্গত মানুষের কথাও উঠে এলো। কোরবানির পশুর হাট নিয়েও কথা উঠলো। গুরুত্ব পেলো কোরবানির পশুর চামড়ার দামের বিপর্যয়ও। অনেকেই কোরবানির চামড়ার দাম বির্পযয়ে দারুণ ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করলেন। প্রসঙ্গক্রমে পাট শিল্পের বিপর্যয়ও বাদ গেল না। স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না খোলা নিয়েও জোর বির্তক হলো। বির্তক শেষে সকলে একমত হলেন যে, করোনাকালীন এই দুঃসময়ে ধারণা করা হয়েছিল মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষের পাশেই থাকবে। কিন্তু তা তো হচ্ছেই না। বরং মানুষই এখন মানুষের জন্য ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থার উন্নয়নে মানুষকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়নায় নিজের মুখে মাস্ক দেখে চমকে উঠলেন সোবহান সাহেব। কাজের ছেলেটির কথায় শেষ পর্যন্ত বাসাতেও মাস্ক পরেছিলেন তিনি। আয়নায় নিজেকে অচেনা লাগছে। মুখ থেকে মাস্ক খুলে ফেললেন। আহ! কী যে শান্তি লাগছে। প্রতিদিন ডায়েরি লেখার অভ্যাস সোবহান সাহেবের। আজও ঈদের দিনের অভিজ্ঞতা লিখবেন বলে কলম ও ডায়েরি হাতে তুলে নিলেন।

আজ ১ আগস্ট ২০২০। রোজ শনিবার। সারা দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত হলো। এ এক অন্যরকম ঈদ। কোলাকুলি নেই, গলাগলি নেই, হাতে হাত মিলানো হলো না। মাঠে নয়, মসজিদে ঈদের জামায়াত হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। সবার মুখে মাস্ক, মুখোশ মানুষেরা ঈদ উদযাপন করলো অন্যরকমভাবে।

মানুষের চোখ, নাক, মুখই হলো আসল। অথচ মুখোশের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে চোখ, নাক, মুখ। প্রিয়জনের মুখোশবিহীন মুখগুলো দেখার খুব ইচ্ছে। কবে দেখতে পারব? কবে?

প্রিয় পাঠক, হঠাৎ সোবহান সাহেবের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী থেকে তিন ছেলে দুই মেয়ে ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছে। কারও মুখে এখন মাস্ক নেই। সবাই বাবা-বাবা... বলে কী যে আদুরে ডাক দিচ্ছে। ছেলেমেয়েদের মুখ দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠলেন সোবহান সাহেব। মানুষের মুখ এত সুন্দর। আহা! কী সুখ মানুষের মুখ...।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ