মুখ দেখা

Send
শবনম ফেরদৌসী
প্রকাশিত : ১৫:৫৫, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০০, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

শবনম ফেরদৌসীআমি দেখি—কী দেখি! সবচেয়ে বেশি কী দেখতে চেয়েছি বা দেখতে হয়েছে! মানুষ আর তার মুখ। হরেকরকম তার আদল। কবি বলেন, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি।’ আমি বলি, ‘মানুষের মুখ আমি দেখিয়াছি।’ কতরকমের মুখই না দেখা হলো এ যাপিত জীবনে! এঁড়ে মুখ-বকনা মুখ, হেঁড়ে মুখ-চিকনি মুখ, সুডোউল-লম্বাটে, ভোঁতা-তীক্ষ্ণ, গোবেচারা-সেয়ানা, সৎ-অসৎ, মলিন-অমলিন...সেসব মুখসকল আমার নিউরনে থরেথরে কত রকম আমোদে সেজে বসে আছে। মাঝে মাঝে মানুষের মুখের ভারে আমি নুইয়ে পড়ি। মুখের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে আমার নিজেরই মুখ। সেই ভার ঠেলে হয়তো ঝলকে উঠলো এমন এক মুখ, যে আনমনে হেসে উঠলাম আমি।
একজন মানুষ তার এক জনমে আসলে কত কত মুখের সাক্ষাৎ লাভ করে? ভাবলেশহীন মুখ করে আমি তা ভাবি। আর যত যত মুখের সে দর্শন লাভ করলো, তার সকলকে কি তার চেনা হলো? জানা হলো? নাকি সব আদতে শুধুই ছুঁয়ে-ছেনে দেখা মাত্র? নাকি কিছু মুখ নিয়তির কারণে দেখে যেতে হলো? যাদের সঙ্গে আমাদের জীবন কাটাতে হয়, তাদের মুখই কি আমাদের সব থেকে প্রিয়? নাকি অভ্যেস বলে দেয়, ‘নাও, আজ থেকে এই মুখ তোমার প্রিয় মুখ। একেই তোমায় আজীবন ভালোবাসতে হবে। এই মুখ দেখেই তোমার বুকে মমতা আছড়ে পড়বে। এ মুখের বেদনায় তোমার চোখে জল আসবে। এই মুখের আনন্দের ছটা বিকিরণ ঘটাবে তোমার মুখে।’

কখন আর সেই একদা প্রিয়মুখ ভালো লাগে না? ক্রমশ অপ্রিয় হয়ে ওঠে এক সময়ের ভালোবাসার মুখ। কোমল চোখ হয়ে ওঠে ক্রূর। আকাঙ্ক্ষা হয়ে ওঠে অনাগ্রহ। মানুষ বড় অসহায় এই বোধের কাছে। কাঙ্ক্ষিত মুখ যখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাকে টেনে বয়ে বেড়াতে হয়। মানুষের রূপান্তর বুঝি এটাই! মন বদলের সঙ্গে সঙ্গে মুখ বদলে যায়।

তবে কি স্মৃতি আর অভ্যাস আমাদের মুখ রপ্ত করতে শেখায়? এই জন্যে কি অচেনা মুখ দেখলে আমরা চমকে উঠি? সেই মুখ ক্রমশ চেনা হয়ে গেলে, আবার তাকেই অভ্যেসের ওড়না দিয়ে মুড়িয়ে ফেলি? আমাদের চোখ সয়ে যায়। মন মেনে নেয়। দাবি করি, প্রিয় মুখ। সবচেয়ে কোন মুখটা মনে গেঁথে যায়? মায়াময়? বিষণ্ন? বেদনাহত? নাকি হাস্য-লাস্য মুখ? মানুষই আমাকে জানান দিয়েছে, হাসিমুখ আমাদের মমত্ব কাড়ে না। হাসিমুখ আমরা শুধু দেখতে ভালোবাসি। মানুষের মনে গভীর হয়ে দাগ কাটে মানুষেরই অসহায় মুখ। কেন? মানুষ কি তবে নিজের প্রতিচ্ছায়া খোঁজে? নিজের ঘা খাওয়া রূপ অন্যের মুখে দেখে তুষ্ট হয়?  

যে অসহায় মুখ দেখে আপনার মন দ্রবীভূত হয়, আপনার হৃদয়ে ভালোবাসা জন্ম নেয়, ঠিক সেই মুখ একদিন আপনার অসহায়ত্ব নিয়ে খেলা করে। যার অসহায়ে একদিন আপনি সহায় হয়েছিলেন, সেই আপনাকে ভয়ঙ্কর অসহায় করে দিয়ে চলে যাবে। অসহায় মুখটি হয়ে উঠবে নিষ্ঠুর ক্রূর।

মুখ কি আর মনের কথা বলে এ যুগে? নইলে কেন সন্তের মতো মুখের আড়ালে দেখি লোভ! বিশাল নয়নের অধিকারীর চক্ষে দেখি ক্ষুদ্রতা! আবার ক্লিষ্ট কোন মুখের বুকে দেখি সযতনে রাখা আছে বিশালত্বের প্রলেপ। অনেক মায়াময় মুখের মনে দেখেছি তীব্র নিষ্ঠুরতা। অনেক পাষণ্ড মুখের ভেতর বয়ে যেতে দেখেছি মমতার নহর। দ্বিধাময় এ সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে মুখেরাও সব দ্বিধাগ্রস্ত। থৈ পাওয়া দুষ্কর কোনটা কার মুখ। চেনা চেনা মুখটিকে কিছুতেই আর চিনে উঠতে পারি না আমরা। এসব তো আর ভ্রম নয়, জিনে-ভূতে এসে দেখাচ্ছে না। মানুষই দেখিয়েছে নানা ছলে, নানা বলে, নানা কৌশলে। আমার কাজ দেখে যাওয়া। দেখে গেছি।

এক মুখে দেখেছি অনেক মুখ। সে মুখ সকালে এক, তো বিকালে আরেক। আমার সঙ্গে অন্য, তো আপনার সঙ্গে ভিন্ন। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের সঙ্গেই সেই মুখ নানা রূপে অস্তিত্বমান। কোনটা তার আসল সে নিজেও তা জানে না। সারাক্ষণ নানারূপের সঙ্গে আপস করা, যুদ্ধ করা। হ্যাঁ, আপসকামী—এ সময়ের আরেক মুখ। জীবনে টিকে থাকার জন্য একধরনের ভাষা আছে সে মুখের। কখনও তা ধূর্ত, কখনও বা লুপ্ত। জীবনের সঙ্গে আপস, নিজের সঙ্গে আপস। আপসে আপসে পোষ্য মুখে কিলবিল করছে চারপাশ। সেইসঙ্গে দেখি সুবিধাবাদী মুখ, অজস্র। নুইয়ে পড়া, ঝুঁকে পড়া, হেলে পড়া, ঢলে পড়া সব মুখেরা মুখর। 

ফিল্ম বানাবার সুবাদে কত মুখের সঙ্গে পরিচয় ঘটলো কত উপলক্ষে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা কি আশীর্বাদ না অভিশাপ? খুব কী দরকার ছিল এত মানুষের ভিড় বাড়াবার একটা মনে! এত এত রাশ ফুটেজ রাখার মতো র‍্যাম কই আমার মগজে! আনন্দের চেয়ে কশাঘাত যখন সেসব মুখের প্রতিনিধিত্ব করে বেশি। নিজের বেদনার চাইতে পরের দুঃখের বোঝা টানতেই তো এক জীবন পার হয়ে গেলো। বিহ্বল, ত্রস্ত, ম্রিয়মাণ, আহত, মৃতপ্রায়, লুপ্তপ্রায়, জর্জরিত, মর্মরিত নানা মুখের ভাষা আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখলো। নাকি আমিই শুধু দেখলাম সেসকল মুখের রূপ? 

অমলকান্তি আর ক’জনের দেখেছি এদেশে! তাদের সব চেহারা যে ফ্রেমে বন্দি করা হয়েছে তাও তো নয়। চলন্ত গাড়ি থেকেও দেখেছি থমকে থাকা জীবনের মুখ। রেসের ঘোড়ার মতো ছুটে চলা গমগমে সন্ধ্যায় দেখেছি স্তব্ধ কোন নদী। ছুটন্ত বাসের জানালায় জীর্ণ মুখসকল। কেউবা আমারই মতো হতবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছে আমার মুখের দিকে। যেন পরস্পর দেখে নিতে চাইছি নিজেদের ভেতরটা। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, কে কাকে দেখছে! 

মানুষের মুখ নিয়ে লিখতে গিয়ে কেন আজ বারবার একটা মুখ ভেসে আসছে সাইক্লিক্যাল অর্ডারে! এর আগেও এসেছে বহুবার। কেন! এবং তার ব্যাখ্যা আমি খুঁজে পাই না। প্রায় ১৮ বছর আগে দেখা এক মলিন মুখ। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে বাসায় ফিরছি। মেঘলা আকাশ, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সকালে পথের ধারে এক হোটেলের সামনে এক ছোট্ট ছেলে তার শরীরের চেয়েও অনেক বড় এক লোহার কড়াই মাজছে ছাই দিয়ে। ক্ষুদে দুই হাতে শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঘষা এক শিশু। মুখের দিকে তাকাতেই আমি কেঁপে উঠলাম। এক নির্মল ব্যথিত মুখ ব্যাধের মতো ব্যথা হয়ে আমার মনে বিঁধে গেলো। আমার তাকিয়ে থাকা বুঝতে পেরেই কিনা আনমনে কড়াই মাজা সে শিশু মুখ তুলে তাকালো। বেদনাঘন চোখ সলজ্জ হলো এবার। কিন্তু তাকিয়ে রইলো। কেন? কেন এই মুখ ফ্ল্যাশ ব্যাকের মতো আমার মাথায় ঘুরে ঘুরে আসে! কোথায় আঘাত করেছিল আমায়? সে আমার সন্তানের সমবয়েসী ছিল বলে? অগোচরে তার জায়গায় নিজের ছেলেকে কল্পনা করে? এক মানুষের ছায়া আরেক মানুষের মুখে? এইজন্যে কি ঈশ্বর মানুষের মুখকে একটা চেহারা দিয়েছেন? 

ঘুমন্ত মানুষের মুখ নাকি সবচেয়ে নিষ্পাপ এ জগতে। শিশুর ঘুমন্ত মুখ তো সেরা সেই তালিকায়। যে কোনও ঘুমঘোরে আচ্ছন্ন শিশুর মুখের চোখের পাতার মৃদু কাঁপন মন টলিয়ে দেয় আমাদের। কখনও সে মুখ হাসে, কখনও কান্নায় মুখ বেঁকিয়ে ফেলে। কী স্বপ্ন সে দেখে কে জানে! বড় হতে হতে সে ভুলে যায় স্বপ্ন সকল। বড় হতে হতে চোখ থেকে উধাও হয় স্বাপ্নিক দৃষ্টি তার। এই তো মানব জীবন, তাই নয় কি? নইলে কেন দেখি ঘুমন্ত মানুষের মুখে বেদনার ছাপ! চির হাসিমুখ ঘুমালে কেন ক্রন্দনক্লান্ত দেখায়? প্রসন্ন মুখ হয়ে ওঠে অবসন্ন ভারাক্রান্ত? সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত মুখের পেশি কেন অজানা আঘাতে কেঁপে ওঠে ঘুমঘোরে? মানুষের এইসব মুখের ভাষা পড়তে পড়তে আমরা জীর্ণ হয়ে যাই।

এসব বুক বিদীর্ণ করা মুখ সামাল দিয়ে আমাদের চলতে হয়। হাঁপিয়ে উঠি, খুঁজি প্রাণময় টগবগে মুখ। যা জীবন্ত, যে মুখের প্রতিটি কণা বেঁচে থাকার কথা বলে। জানান দেয়, সত্যিকারের আনন্দ বলে কিছু আছে। হাসি মানে সহজ সুন্দর হাসি, মুখ বাঁকানো নয়। যে চোখ সহজ চোখের তাকিয়ে থাকা। কোটি মানুষের মাঝে আমি খুঁজি-ফিরি একটা সহজ মানুষ, জীবনবোধে ভরপুর এক মুখ। এক কালে শহরের বাইরে গেলে, গ্রামের দিকে কখনও সখনও দেখা মিলতো তেমন মুখ। এখন সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। ক্লান্ত মুখ সব, মেকি আর ছদ্মবেশী। মানুষের মুখের ছায়া যদি মানুষের মনে পড়ে, তবে তো বাকি মানুষও তাই-ই হবে। কোভিড-১৯ রোগের মতো ছোঁয়াচে তার বিস্তার। তাই আর সহজ মুখের দেখা মেলে না। অসুখী মুখে সয়লাব এ শহর। এর বাইরে আছে কিছু দুঃখী মুখ। যা লুকাতে চায় সারাক্ষণ। ফলে তা হয়ে ওঠে মাস্ক পরা মানুষের আরেক রূপ। এসব ক্লেদান্ত মুখের ভিড়ে লোকে কী করে বাঁচবে! যতই মুখে জয়গান টাইপ বুলি আওড়াই না কেন! যতই আপনশক্তির কথা উচ্চারণ করি না কেন! হবে না! এত ফাঁকি দিয়ে মানব জীবন চলে না, হয় না। মানুষের মুখ তাই ফাঁকি দেয় একে অপরকে। 

ফাঁকিটা কোথায়? মানুষে মানুষে ভালোবাসার? বুকে ভালোবাসা থাকলে তা বুদবুদের মতো মুখে প্রসারিত হবে, এই তো? হয়তো। এটাই হয়তো চিরন্তন সত্য, নিয়তির মতো। মানুষ যা যা তার মানব জীবনে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, তা হারিয়ে গেলে অসুখ তো আসবেই মনে-মুখে। তাই হয়তো দেখা মেলে না যে মুখ আমরা জীবনভর ঢুঁড়ে মরি। জীবনানন্দের সেই কবিতার লাইন মনে পড়ে গেলো, ‘যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে/অথচ যার মুখ আমি কোনদিন দেখিনি’…

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ