ক্ষমতার লড়াই অবসানে ইরানকে সময় দিলেন ট্রাম্প?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:১১আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ২০:১৪

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিবদমান পক্ষগুলোকে একটি সমন্বিত পাল্টা প্রস্তাবের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য সংক্ষিপ্ত সময়সীমা দিয়েছেন। মার্কিন তিন জন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে তা না হলে মঙ্গলবার তিনি যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়েছেন, তা শেষ হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে ব্রিফিং পাওয়া এক মার্কিন সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছে, ‘ইরানিরা যাতে নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারে, সেজন্য ট্রাম্প আরও তিন থেকে পাঁচ দিনের যুদ্ধবিরতি দিতে রাজি আছেন। এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য হবে না।’

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকারীরা মনে করেন, যুদ্ধ শেষ করার এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশ নিয়ে একটি চুক্তি এখনও সম্ভব। তবে তারা উদ্বিগ্ন যে তেহরানে এমন কেউ নেই যিনি (চুক্তিতে) সম্মতির ক্ষমতা রাখেন।

সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি খুব কমই যোগাযোগ করছেন। বর্তমানে দেশটির নিয়ন্ত্রণে থাকা আইআরজিসির জেনারেলরা এবং ইরানের বেসামরিক মধ্যস্থতাকারীরা কৌশল নিয়ে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দেখেছি ইরানের ভেতরে সমঝোতাকারী ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে চরম ভাঙন ধরেছে। উভয়পক্ষেরই সর্বোচ্চ নেতার কাছে প্রবেশাধিকার নেই, তিনি কোনও সাড়া দিচ্ছেন না।’

মোজতবা খামেনি। ফাইল ছবি: এপি

নেপথ্যের ঘটনা

ইসলামাবাদের আলোচনার প্রথম পর্বের পর থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা এই বিভাজন লক্ষ করতে শুরু করেন। তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আইআরজিসির কমান্ডার জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদি এবং তার ডেপুটিরা ইরানের নিজস্ব মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার বিষয়বস্তুর বড় অংশই প্রত্যাখ্যান করেছেন।

গত শুক্রবার এই বিভেদ প্রকাশ্যে আসে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেন, তখন আইআরজিসি তা কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং জনসমক্ষে তাকে আক্রমণ করতে শুরু করে।

এরপরের দিনগুলোতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের কোনও জোরালো সাড়া দেয়নি এবং পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসার প্রতিশ্রুতি দিতেও অস্বীকৃতি জানায়।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত আলী লারিজানি। ফাইল ছবি: এপি

ষড়যন্ত্র?

এই ভাঙনের পেছনে অন্যতম কারণ হলো গত মার্চে ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সচিব আলী লারিজানির হত্যাকাণ্ড।

লারিজানির ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মতো কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। তার উত্তরসূরি মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর, যার কাজ হলো আইআরজিসি, বেসামরিক নেতৃত্ব এবং সর্বোচ্চ নেতার মধ্যে সমন্বয় করা। কিন্তু তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সংবাদের কেন্দ্রে

গত ৪৮ ঘণ্টা হোয়াইট হাউজের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল। বিশেষ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের জন্য। দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে তিনি ইসলামাবাদের জন্য ব্যাগ গুছিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাকে অপেক্ষা করতে হয় ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইআরজিসির জেনারেলদের জন্য, যাতে তারা পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং আরাঘচিকে তার সঙ্গে দেখা করতে পাকিস্তানে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

আব্বাস আরাঘচি। ফাইল ছবি: এপি

সোমবার সন্ধ্যায় মনে হয়েছিল ইরানিরা পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনার সবুজ সংকেত দিয়েছে। মঙ্গলবার সকাল নাগাদ সেই ইঙ্গিত ম্লান হয়ে যায় এবং তার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজের টারমাকে এয়ারফোর্স টু ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। যাত্রা শুরুর জন্য প্রস্তুত বিমানটি অবশেষে বুঝতে পারে যে সফরটি আর হচ্ছে না। হোয়াইট হাউজের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের মিয়ামি থেকে ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের উদ্দেশে সরকারি বিমানে ওঠেন।

মঙ্গলবার বিকালে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভ্যান্স, উইটকফ, কুশনার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ, জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা।

বৈঠকে প্রবেশের আগে ট্রাম্পের নিজস্ব উপদেষ্টাদের কেউ কেউ জানতেন না তিনি কোনদিকে ঝুঁকছেন। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের হামলা, নাকি কূটনীতির জন্য আরও সময় দেওয়া। শেষ পর্যন্ত তিনি কূটনীতির পথই বেছে নেন।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিগত কয়েক দিনে ভাঙনের মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে। প্রশ্ন ছিল, এমন পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ যাওয়া কি যুক্তিসঙ্গত হবে? তাই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও কিছুটা সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

হোয়াইট হাউসে মিটিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

অন্তর্নিহিত বার্তা

বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং ট্রাম্পের সহযোগীরা একই উপসংহারে পৌঁছেছেন যে প্রেসিডেন্ট মনে করেন, সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যতটুকু অর্জন করার ছিল তা করেছে এবং তিনি ক্রমবর্ধমান জনবিদ্বেষী এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান। অন্যান্য সব বিকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি আর যুদ্ধে জড়াতে চান না।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ একটি মার্কিন সূত্র বলেছে, ‘এটা নিশ্চিত যে ট্রাম্প আর সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে চান না এবং তিনি যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

যদি পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা ট্রাম্পের দেওয়া সময়ের মধ্যে ইরানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে সামরিক বিকল্প আবারও সামনে আসবে।

মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার সঙ্গে পরিচিত আঞ্চলিক সূত্র এবং আলোচনার বিষয়ে জানেন এমন ইসরায়েলি সূত্রের তথ্যমতে, মার্কিন কর্মকর্তা ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা অপেক্ষা করছেন খামেনি এক বা দুই দিনের মধ্যে তার নীরবতা ভেঙে সমঝোতাকারীদের আলোচনায় ফেরার স্পষ্ট নির্দেশনা দেন কিনা।

জেডি ভ্যান্স। ফাইল ছবি: এপি

বর্তমান পরিস্থিতি

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোয় ট্রাম্পের কিছু কৌশলগত সুবিধা কমেছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, তার বহাল রাখা নৌ-অবরোধ সেই ঘাটতি পূরণ করবে। তিনি দাবি করেছেন, ইরান নগদ অর্থের জন্য হাহাকার করছে এবং তাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশকেও বেতন দিতে পারছে না।

মঙ্গলবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, এই অবরোধই তার প্রধান কৌশল। তিনি লিখেছেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখতে চায় না; তারা এটি খোলা রাখতে চায়, যাতে প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলার আয় করতে পারে। তারা শুধু এটি বন্ধ রাখার কথা বলছে, কারণ আমি এটি পুরোপুরি অবরুদ্ধ (বন্ধ!) করে রেখেছি, তাই তারা কেবল সম্মান বাঁচাতে চাইছে।’

ট্রাম্প আরও বলেছেন, “চার দিন আগে লোকজন আমার কাছে এসে বলেছিল, ‘স্যার, ইরান অবিলম্বে প্রণালিটি খুলে দিতে চায়।’ কিন্তু আমরা যদি তা করি, তবে ইরানের সঙ্গে কোনও চুক্তি হতে পারে না—যদি না আমরা তাদের অবশিষ্ট দেশ ও নেতাদের উড়িয়ে দিই!”

/এএ/এমওএফ/
টাইমলাইন: ইরানে ইসরায়েলের হামলা
সম্পর্কিত
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
আসামে ভারতীয় বিমান বাহিনীর পরিবহন বিমান বিধ্বস্ত, ৫ সেনা নিহত
কী, কেন, কীভাবেযুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কি আসলেই চুক্তির দ্বারপ্রান্তে
সর্বশেষ খবর
বৈষম্যের প্রতিবাদে ব্যতিক্রমী কর্মসূচিতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীরা
বৈষম্যের প্রতিবাদে ব্যতিক্রমী কর্মসূচিতে পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীরা
‘স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে অংশীজনদের মতামত নেওয়া জরুরি’
‘স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে অংশীজনদের মতামত নেওয়া জরুরি’
‘পুশইন’ থামেনি, বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা
‘পুশইন’ থামেনি, বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা
শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদেরসহ ১৭৮ জনকে আদালতে হাজির হতে বিজ্ঞপ্তি
শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদেরসহ ১৭৮ জনকে আদালতে হাজির হতে বিজ্ঞপ্তি
সর্বাধিক পঠিত
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সুরাহা চান জামায়াত আমির 
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের সুরাহা চান জামায়াত আমির 
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
আইনজীবী তালিকাভুক্তির এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান, মোট উত্তীর্ণ ৯২০১
ওসি বললেন চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল, একটা কল আসার পর, ‘ভাইয়া বসেন’
ওসি বললেন চোখ নিচে নামিয়ে কথা বল, একটা কল আসার পর, ‘ভাইয়া বসেন’
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না
যে পাঁচটি তথ্য কখনোই এআই চ্যাটবক্সে ইনপুট দেবেন না