সেকশনস

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:৫৪

দাউদ হায়দার আড্ডা দিলে, কথা শুনলে অবিশ্বাস্য। অনুচ্চ কণ্ঠ। নরমভাষী। সহজ। সরল। মুক্তিযুদ্ধে প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন, সশস্ত্র যোদ্ধা, তিনিই প্রথম, ১৬ ডিসেম্বরে (১৯৭১) রেডিও পাকিস্তানের (ঢাকায়) ছাদে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এতটাই সাহসী, ভয়হীন, নিচে পাক সৈন্য পাহারাদার, হাতে মর্টার। টের পায়নি। যখন পেয়েছে, মাথামোটা পাক সেনারা গোলাবারুদ ছুড়ে বাহাদুরি দেখায়। তাঁর আগেই শাহাবুদ্দিন ছাদের ওপর শুয়ে, গড়িয়ে, অলক্ষে নিচে নেমে আবার যোদ্ধা। কী করে বেঁচে যান, অভিজ্ঞতা লিখেছেন নিজেই। বলেছেন বহু অনুষ্ঠানে। মিডিয়ায়।
আমরা জানি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও বিস্তর কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক রণাঙ্গনে সরাসরি যোদ্ধা। মারা গিয়েছেন অনেকে। যাঁরা বেঁচে গিয়েছেন, কেউ কেউ স্মৃতিকথা লিখেছেন। উপন্যাস, কবিতা, গল্প লিখেছেন। ছবি এঁকেছেন চিত্রশিল্পী। নানা অঙ্কনে। রঙেরেখায়। প্রতীকে। কখনও খোলামেলা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও বহু কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী যোগ দিয়েছেন। যুদ্ধের মাঠে ময়দানে-বনবাদাড়ে শত্রুর মোকাবিলায় অকুতোভয়। শিল্পী শাহাবুদ্দিন তো ছিলেনই। কবি রফিক আজাদ, কবি মাহবুব সাদিক। প্রমুখ। নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুও। মুক্তিযোদ্ধা।
অভিযোগ শুনেছি, অভিযোগকারী সমালোচক, সহশিল্পী, ‘শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ তেমন বিশালত্বে গুরুত্ব পায়নি।’ ধন্দ লাগে এই অভিযোগে। সমালোচনায়।
মনে রাখি, শাহাবুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন বয়স যখন মাত্র কুড়ি। যুদ্ধফেরত শাহাবুদ্দিন চারুকলা কলেজের ছাত্র, পাস করে বিদেশে (প্যারিসে)। শিখেছেন বৈশ্বিক কলাচাতুর্য। চিত্র তথা ছবির অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বলয়। আঁকছেন জীবননির্ভর ছবি। আঁকছেন মানুষের সবল, গতিময়, চলমান, ভাঙাচোরা চেহারার ছবি। মানুষই উৎস তাঁর। এবং এই মানুষ বিশ্বের সব দেশের, সব প্রান্তের। আঁকছেন বিপ্লব সংগ্রাম, যুদ্ধের ছবিও। ছবিতে মানুষের আত্মবিদারণ, মর্মান্তিক পতন। সমবেত জাগরণ।
আঁকছেন কবে? হ্যাঁ, বাংলাদেশের দুই-তিন দশক পরে। মনে রাখি, কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী ‘তক্ষনি ঘটমান’ বিষয় রূপায়িত করেন না। স্মৃতি ও ইতিহাস সংযোজনই মিলনবিন্দুর পূর্ণতা। যাঁরা ঘটমানে তাৎক্ষণিক (লেখায়-শিল্পে), দলিল নিশ্চয়, ইতিহাসও, সমকালীনতায় দেশীয় এবং বিশ্বময়, কিন্তু ‘পূর্ণশশী’র কথাও বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। অর্থাৎ অপেক্ষার। এও ঠিক যে, রবীন্দ্রনাথই, ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গের সময়কালে ‘পূর্ণশশীর’ আগেই ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ গান লিখেছেন। ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।। ‘ও আমার দেশের মাটি’ও হতে পারতো। ‘যদি তোর ডাক শুনে’ আজও  বিপ্লবীদের আহ্বান। তা হলে, সময়চিত্র ব্যতিরেকেও দেশকালের প্রয়োজনে, অনিবার্যতায় হোমাগ্নি।
যেমন, ১৯৫২ সালে লেখা আবদুল গাফফার চৌধুরীর একটি পদ্য, নিছকই পদ্য, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, আলতাফ মাহমুদের সুরারোপে, একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই আবালবৃদ্ধবনিতার কণ্ঠে গীত।
সময় এখানে ইতিহাস (ওই গানের আত্মজাগরণে)।
শাহাবুদ্দিনের কয়েকটি ছবি, সময়কালের চিত্রণ। বিপ্লব-সংগ্রাম-আন্দোলনের। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছবিগুলো দেখেন (শাহাবুদ্দিনের স্টুডিওতে) ‘বিশ্বের সব দেশের। সমকালীন।’ সমকালীনতাই শাহাবুদ্দিনের শিল্প। অতীতের ইতিহাসে মিশ্রিত এ কালের বহু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ছবি, গান্ধীকে হত্যার ছবি যে-অঙ্কনরেখায় চিত্রিত, ঘটনাবলিও। এখানেই শিল্পী ক্রান্তদর্শী। শাহাবুদ্দিন সবার্থে।
শাহাবুদ্দিন মুক্তিযোদ্ধা। শিল্পেও যোদ্ধা। যুদ্ধ করেন মানুষের জন্যে। মানুষের তরঙ্গিত জীবনই তাঁর ছবির সাম্প্রতিকতা।
মানুষের সামগ্রিক চিত্ররূপ খুব সহজ নয়। মানবস্রোতে শামিল করতে হয় নিজেকে। শাহাবুদ্দিন করেছেন। ছেঁকে আনেন নানা মানুষ। চিত্রে। শাহাবুদ্দিন কিংবদন্তি। ওঁকে নিয়ে, ওঁর শত্রুকুল যতই অসভ্য হোক, প্রশ্ন করতেই পারি, বিদেশে থেকেও যেসব শিল্পী (এবং দেশীয়) বড় বড় কথা বলেন, দেশে হ্যান করেছি ত্যান করেছি, কতজন বিদেশে মান্য? নাম বলছি না। শাহাবুদ্দিনের মান্যতা দেশে বিদেশেও। দেশ-বিদেশ একাকার করেছেন বোধ-মননে। চাট্টিখানি কথা নয়। একজন শিল্পী সারা প্রহরের। শাহাবুদ্দিনও।
আজ শাহাবুদ্দিনের জন্মদিন, ১১ সেপ্টেম্বর। সত্তর বছরের শুরু। কিংবদন্তি ও ইতিহাস তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের রাগী, যোদ্ধা নন। কিন্তু যোদ্ধা। ছবিতে।
শাহাবুদ্দিন স্ত্রী আনা ইসলাম (সুলেখিকা), কন্যা চিত্র ও চর্যাকে নিয়ে সুখী। বলেন, ‘ওঁরাই আমার চিত্রাঙ্কনের সমালোচক।’ সাংসারিক এই প্রেমে চিরনবীন, চিরযৌবনে মানবিক। দেশ-বিদেশের প্রেক্ষিতে। তাঁর প্রেক্ষিতায় সৃষ্টির (ছবি) আলো ও আলোক।

শাহাবুদ্দিনের ৭০তম জন্মদিনে আনন্দিত শুভেচ্ছা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

ইউরোপ: করোনা ও শীত

ইউরোপ: করোনা ও শীত

বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা আকর্ষণ

বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা আকর্ষণ

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

পুলুদার ‘শালা’

পুলুদার ‘শালা’

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

১৫ আগস্টের স্মৃতি

১৫ আগস্টের স্মৃতি

আমরা কোন তিমিরে

আমরা কোন তিমিরে

আই কান্ট ব্রিদ

আই কান্ট ব্রিদ

গির্জার ধর্মীয় বোধ, বাঙালির ঈদ

গির্জার ধর্মীয় বোধ, বাঙালির ঈদ

আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

সর্বশেষ

লেখক মুশতাক আহমেদের দাফন সম্পন্ন

লেখক মুশতাক আহমেদের দাফন সম্পন্ন

ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে বাসচালকসহ গ্রেফতার ২

ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে বাসচালকসহ গ্রেফতার ২

ভারতে ফেসবুক ইউটিউব টুইটারকে যেসব শর্ত মানতে হবে

ভারতে ফেসবুক ইউটিউব টুইটারকে যেসব শর্ত মানতে হবে

ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ

ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ

প্রেমের টানে সংসার ছাড়া স্বামীকে ঘরে ফেরালো পুলিশ!

প্রেমের টানে সংসার ছাড়া স্বামীকে ঘরে ফেরালো পুলিশ!

রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এক কেজি ধান-চালও কেনা যায়নি!

রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এক কেজি ধান-চালও কেনা যায়নি!

করোনায় হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৫ কোটি

করোনায় হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৫ কোটি

দেবিদ্বারে গণসংযোগে হামলা, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৫

দেবিদ্বারে গণসংযোগে হামলা, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৫

কুমিল্লায় ওরশের মেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জনকে ছুরিকাঘাত

কুমিল্লায় ওরশের মেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জনকে ছুরিকাঘাত

পঞ্চম ধাপে ২৯ পৌরসভায় ভোট রবিবার

পঞ্চম ধাপে ২৯ পৌরসভায় ভোট রবিবার

লেখক মুশতাকের মৃত্যুতে ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

লেখক মুশতাকের মৃত্যুতে ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.