X
বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

তালেবানের আফগানিস্তান পুনর্দখল ও নতুন আতঙ্ক

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২১, ১৭:১১
আবদুল মান্নান দীর্ঘ কুড়ি বছর পর আফগানিস্তানের শাসনভার আবার হাতবদল হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তালেবানদের মধ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ কাতারে স্বাক্ষরিত এক সমঝোতার বলে মার্কিন ও ন্যাটো সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানের শাসনভার তালেবানদের হাতে ছেড়ে দিয়ে এই মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে চলে যাওয়ার কথা আছে। বিশ্ব দেখছে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর একটি বড় ধরনের পরাজয়, যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বলছে আরও রক্তপাত বন্ধ করার জন্য তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, আফগানিস্তান হচ্ছে বিশ্বের সাম্রাজ্যের  সমাধি ক্ষেত্র (Graveyard of Empires)। তেমনটা চলছে ১২১৯ সাল থেকে যখন মঙ্গোলীয়রা আফগানিস্তান দখল করে মাত্র দুই বছর সেখানে টিকতে পেরেছিল। ব্রিটিশরা তিনবার দেশটি দখল করতে গিয়ে ভয়াবহভাবে মার খেয়েছিল। সম্প্রতি দেশটি কুড়ি বছর দখলে রেখে চরম অপমানকর অবস্থার মধ্যে দিয়ে মার্কিন ন্যাটো বাহিনীকে চলে যেতে হলো। রেখে যত হলো বিরাট এক আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার, যা অনেক দেশেরই নেই। তালেবানরা প্রমাণ করলো সঠিক যুদ্ধ কৌশলের কাছে অস্ত্র সব সময় পরাজিত হয়েছে।

আফগানিস্তান নিয়ে সবচেয়ে চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী সম্রাট জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০)। বাবর তৈমুর আর চেঙ্গিস খানের বংশোদ্ভূত ছিলেন। ঘাঁটি গেড়েছিলেন আফগানিস্তানে। তাঁর রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘বাবরনামা’কে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম সেরা নির্মোহ আত্মজীবনী। তিনি আফগানিস্তান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আফগানিস্তানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা, যা পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে স্বজনদের যে কেউ করতে পারে। কেউ নিজ অবস্থান থেকে অন্য কোনও স্থানে গেলে হারাতে পারেন তার ক্ষমতা বা অবস্থান’। বাবর আফগানিস্তানের আবহাওয়া আর ফুলের বাগানের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, বিশ্বে অন্য কোনও স্থানে এত সুন্দর জায়গা আছে কিনা তা তিনি জানেন না। দেশটিতে আরও আছে সব দুর্ভেদ্য দুর্গ আর উর্বর শস্যক্ষেত্র।  সম্রাট বাবর আফগানিস্তানের এমন প্রেমে পড়েছিলেন যে তিনি ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করে আফগানিস্তানে ফেরত গিয়েছিলেন এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।। কাবুলেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১৯৯২ সালে সম্রাট বাবরের কবর ধ্বংস করে রক্তপিপাসু তালেবানরা। পরে আগাখান ট্রাস্ট তা পুনর্নির্মাণ করে দেয়।

বাবরের দেখা আফগানিস্তান এখন শুধু ইতিহাস। লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তাঁর অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনি ‘দেশে বিদেশে’। তাতে বর্ণনা আছে কাবুলের সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনযাত্রার। সে সময় আফগানিস্তানের শাসক ছিলেন বাদশা আমানুল্লাহ্। তিনি চেয়েছিলেন আফগানিস্তানের গোত্রতন্ত্র পরিবর্তন করে দেশটিকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। মেয়েদের শিক্ষাকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি খুব বেশি দিন থাকেনি। কিছু দিনের মধ্যে বাচ্চা সাকাও (হাবিবুল্লাহ কালাকানি) নামক একজন সেনাবাহিনীর জেনারেল তাকে শিরশ্ছেদ করে ক্ষমতা দখল করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর ছোট গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’। সুদূর কাবুল থেকে এসেছিলেন কলকাতায়। খেজুর, কিশমিশ বিক্রি করতে আসতো এই কাবুলিওয়ালারা। অবিভক্ত বাংলায় আর এক ধরনের কাবুলিওয়ালা ছিল, যারা চড়া সুদে টাকা ধার দিতো। তারা গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত চষে বেড়াতো তাদের ব্যবসার খোঁজে। সময় মতো সুদের টাকা দিতে না পারলে তারা দেনাদারদের বউ-ঝি নিয়ে টানাটানি করতেও কসুর করতো না। এখন বিশ্বকবির বা সৈয়দ মুজতবা আলীর অথবা বাংলায় আসা সুদের ব্যবসায়ী কাবুলিওয়ালার আর দেখা পাওয়া যায় না। এখন কাবুলিওয়ালারা কাবুল বা আফগানিস্তানের অন্যান্য শহরে আধুনিক অস্ত্র হাতে ঘুরছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। বলছে তারা নতুন ঘরানার তালেবান। ইচ্ছা করলে যেকোনও সময় যে কাউকে গুলি করতে পারে। মেয়েদের হুকুম দিয়েছে বাড়ির বাইরে যেন দেখা না যায়। স্কুলসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। পড়ালেখার কী দরকার? সংগীত সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। হুকুম দিয়েছে দাড়ি কাটা যাবে না, আর চুল কাটাতে হলে তাদের ফ্যাশন অনুসরণ করতে হবে। আগের তালেবান আর বর্তমান তালেবানের মধ্যে তফাৎ কি তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। কেমন করে হলো বাবর বা সৈয়দ মুজতবা আলীর আফগানিস্তানের বা কাবুলের এই দশা? তা জানতে হলে ফিরতে হবে সত্তরের দশকে।

মধ্যপন্থী আফগান প্রেসিডেন্ট সর্দার দাউদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে ক্ষমতা দখল করলেন বামপন্থী বলে পরিচিত নূর মোহাম্মদ তারাকি। পাশে ছিল সেনাবাহিনী। ছিল না জনগণের তেমন একটা সমর্থন। তাকে বাঁচাতে ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে প্রবেশ করলো সোভিয়েত সেনাবাহিনী। সঙ্গে ট্যাংক আর ৩০ হাজার সোভিয়েত সৈন্য। তারাকি সমাজে কিছু সংস্কার আনার চেষ্টা করলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর তা সহ্য হয় না। প্রচার চালালো এমনটা চলতে থাকলে আফগানিস্তান থেকে ইসলাম নির্বাসিত হবে। গঠিত হলো তারাকিবিরোধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মুজাহিদিন। অর্থ আর অস্ত্র জোগান দিলো পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিছু দিন না যেতেই তারাকিকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন হাফিজুল্লাহ আমিন। গুজব রটলো তিনি মার্কিনপন্থী। স্বল্প সময়ে তাঁকে সরিয়ে সোভিয়েত সমর্থনে ক্ষমতা দখল করলেন বাবরাক কারমাল। তাতে আফগানিস্তানের অশান্তি আরও বেড়ে গেলো। সোভিয়েত বাহিনী শহর দখল নিলে কী হবে, বাইরের সব এলাকা তো মুজাহিদিনদের দখলে। এদের নির্মূল করার জন্য সোভিয়েত বাহিনী নির্বিচারে বোমাবর্ষণ শুরু করে মুজাহিদ বাহিনী অধ্যুষিত এলাকায়। এর তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে দলে দলে আফগানরা নিজ দেশ ছেড়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নিতে শুরু করলো। ১৯৮২ সাল নাগাদ ২৮ লক্ষ আফগান পাকিস্তানে গেলো। দেড় লক্ষ গেলো ইরানে। কিন্তু মুজাহিদরা যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহকৃত অস্ত্র দ্বারা সোভিয়েতদের বেশ সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। মুজাহিদদের অস্ত্র জোগানের সহায়ক হলো পাকিস্তান, সঙ্গে প্রশিক্ষণও। অর্থ আর অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের। যাচ্ছে পাকিস্তান হয়ে আফগান মুজাহিদদের হাতে। লড়াই হচ্ছে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর সঙ্গে। আর সাধারণ হাজার হাজার আফগানরা নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় খুঁজছে। ভিন দেশে এসে মারা পড়লো ১৫ হাজার সোভিয়েত সৈন্য। অবস্থা বেগতিক দেখে ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েতরা মাথা নিচু করে ফেরত গেলো নিজ দেশে। সোভিয়েতরা নিজ দেশে ফিরে গেলে কী হবে? শান্তি তো আর আফগানিস্তানে ফিরে না। বুঝতে হবে আফগানিস্তানে কমপক্ষে কুড়িটা গোত্র বা নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী আছে। কেউ কারও কথা মানে না, বশ্যতা স্বীকার করে না। সবাই নিজ এলাকায় নিজেই রাজা। সুবিধা নিলো যুক্তরাষ্ট্র।

পাকিস্তানে এসে আফগান উদ্বাস্তুরা ভর্তি হলো খারেজি বা কওমি মাদ্রাসায়। পাকিস্তানে তখন ক্ষমতায় জিয়াউল হক। পণ করেছেন তিনি পাকিস্তানকে একটি কট্টর ‘ইসলামি’ রাষ্ট্র বানাবেন। পাশে একই মতাদর্শী আফগানিস্তান থাকলে আরও ভালো। মাদ্রাসাগুলোতেও প্রশিক্ষণ শুরু হলো শিক্ষার্থীদের মানুষ মারার বিদ্যায়। বিরামহীনভাবে অর্থ আর অস্ত্র আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মাঝখানে তত্ত্বাবধানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। অন্যদিকে সিআইএ’র সঙ্গে জোট বাঁধলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই । মুজাহিদদের নাম বদলে হয়ে গেলো ‘তালেবান’, মানে পড়ুয়া। মার্কিন অস্ত্রে এই ‘পড়ুয়ারা’ প্রশিক্ষণ পেলো মানুষ হত্যার। এই সত্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট কমিটি হিয়ারিংয়ে অকপটে স্বীকার করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এককালের পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিনটন। তিনি অকপটে বললেন, ‘আমরা তালেবানদের অস্ত্র আর প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কাজ শেষে পাকিস্তানকে পরিত্যাগ করেছি।’ এর পূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর একজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের বিখ্যাত উক্তি সত্য প্রমাণিত হলো। বলা হয়, তিনি বলেছিলেন,  ‘যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু হওয়া বিপজ্জনক কিন্তু বন্ধু হওয়া আত্মঘাতী।’

সোভিয়েতরা ফেরত যাওয়ার পর দেশটিতে কয়েক বছর চললো গোষ্ঠীগত হানাহানি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও ভেঙে গেলো। কাবুল ততদিন অনেকটা অভিভাবকহীন, পরিস্থিতি এমন হলো শক্তি যার মুল্লুক তার। সোভিয়েত আমলে তবু কাবুল অক্ষত ছিল। তারা চলে যাওয়ার পর তালেবানদের হাতে এই শহরটার ধ্বংস হতে বেশি দিন লাগলো না। ততদিন পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মধ্যযুগের ধ্যান-ধারণা নিয়ে পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করলো হাজার হাজার ভয়ংকর তালেবান গোষ্ঠী। চালু হলো নানা অজুহাতে মেয়েদের পাথর মেরে হত্যার সংস্কৃতি আর পুরুষদের শিরশ্ছেদ। পাকিস্তান আর যুক্তরাষ্ট্র বললো ‘চালিয়ে যাও আমরা আছি’। যুক্তরাষ্ট্রের নজর আফগানিস্তানের বিশাল মূল্যবান খনিজ সম্পদ। এদিকে বাংলাদেশে তালেবানদের ‘ভায়রা ভাই’ ধর্ম ব্যবসায়ী দলগুলো স্লোগান তুললো ‘আমরা সবাই তালেবান বাংলা হবে আফগান’। এই ধর্ম ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে জনসমর্থন তিন শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালানোর ক্ষমতা বেশুমার, যা তারা বিএনপি’র সমর্থনে ২০১৩ আর ২০১৪ সালে দেখিয়েছে। সর্বশেষ তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে জনগণ দেখেছেন।  

তালেবানদের ঔরসে জন্ম নিলো আরেক ধর্ম ব্যবসায়ী সন্ত্রাসী দল ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা। ভুললে চলবে না, লাদেন একসময় যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র ছিল। হোয়াইট হাউজে যাওয়ার আমন্ত্রণও পেয়েছেন। অস্ত্র আর অর্থ দিয়ে তাদের সহায়তা করলো পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইও’ । বিপত্তি ঘটলো ৯/১১-এর পর। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে কে বা কারা একটি বিমান নিয়ে হামলা চালালো নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারের ওপর। সে এক ভয়াবহ কাণ্ড। তাসের ঘরের মতো ধসে গেলো একশত তলার ওপর দুটি পাশাপাশি ভবন। ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক। সঠিক কোনও প্রমাণ ছাড়া বুশ প্রশাসন বললো এটা আল কায়েদার কাজ। তারা আফগানিস্তানে ডেরা গেড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও একটা দেশে হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্র কোনও যৌক্তিক কারণের তেমন একটা ধার ধারে না। একটা অজুহাত হলেই হলো। সেটা ভিয়েতনাম, লাউস, কম্বোডিয়া, ইরাক, সিরিয়া, মিসর, লিবিয়া, নিকারাগুয়া, কিউবা, কোরিয়া, সুদান, গুয়েতেমালা, গ্রানাডা, হাইতি প্রভৃতি দেশের বেলায় ঘটেছে। হামলা করার জন্য একটা অজুহাত যদিও প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দেশটিতে প্রাকৃতিক সম্পদ আছে কিনা তা জানা। সমাজতন্ত্রের জুজু’র ভয় তো আছেই। টুইন টাওয়ারে হামলা করার পর বুশ প্রশাসন এই উপসংহারে পৌঁছালো, হামলাকারীদের মদতদাতারা লুকিয়ে আছে আফগানিস্তানের তোরাবোরা পাহাড়ে। চললো সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিমান হামলা। ফলাফল শূন্য। আল-কায়েদা তো আর সেখানে বসে নেই। বুশ বেশ জোর গলায় মিত্রদের বললো, এই সন্ত্রাসবিরোধী হামলায় ‘হয় তোমরা আমাদের সঙ্গে আছো নয়তো ওদের সাথে’। এরপর তার সাথী হলো ন্যাটো বাহিনী।

তোরাবোরা পাহাড়ে বিমান হামলা চালিয়ে বসে থাকলো না মার্কিন বাহিনী। এবার সরাসরি মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানের ভূমিতে নামলো । এলো সব আধুনিক সমরাস্ত্র। দখল নিলো আফগানিস্তানের শহর এলাকাগুলো। মার্কিনিদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা তাদের দেশের বাইরের বিশ্বটা সম্পর্কে তেমন কোনও ধারণা রাখে না। বিশ্ব ইতিহাস সম্পর্কে তাদের জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোটায়। নিজ ভূমিতে কখনও যুদ্ধ দেখেনি বলে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদের তেমন কোনও ধারণা নেই। অর্ধেকের বেশি মার্কিনির কোনও পাসপোর্ট নেই। প্রায় ৮০ ভাগ মার্কিনি নিজ দেশের বাইরে কখনও ভ্রমণ করেননি। বড় জোর কানাডা বা মেক্সিকো। অনেকে জানেন না তাদের রাজধানী কোথায় বা তাদের প্রেসিডেন্টই বা কে। আফগানিস্তানের শহরগুলোকে দখল করে একদিন জুনিয়র জর্জ বুশ বেশ ফিল্মি কায়দায় প্যারাসুট দিয়ে নৌবাহিনীর জাহাজের ওপর নেমে ঘোষণা করলেন আফগানিস্তানে তাদের ‘বিজয়ের’ কথা। মার্কিনিরা বললো ‘বাঘের বাচ্চা’ বটে। মার্কিনিরা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসালো প্রথমে হামিদ কারজাই, তারপর আশরাফ গনি নামক দুই তাঁবেদারকে।  

বুশ তার ‘বিজয়ের’ গল্প শেষ না করতেই মুজাহিদিনরা হামলে পড়লো আফগানিস্তানের শহরগুলোর ওপর। সোভিয়েত আমলে কাবুল অনেকটা নিরাপদ ছিল। বুশ জুনিয়রের ঘোষণার পর মুজাহিদরা চারদিক হতে ঢুকে পড়লো কাবুলে। সে এক এলাহী কাণ্ড। মার্কিন আর আফগান সৈন্যরা দিশেহারা। গুলবুদ্দিন হেকমতইয়ারের মুজাহিদ বাহিনী কাবুলকে ধুলায় মিশিয়ে দিলো, যা বলেছি আগে। প্রাণ হারালো প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ। পাকিস্তান থেকে দলে দলে আফগানিস্তানে ঢুকে গেলো তালেবানরাও। তার পরেরটা ভয়াবহ ইতিহাস। এই সুযোগে আফগানিস্তানে ঢুকে পড়লো ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা সন্ত্রাসী বাহিনী। আফগানিস্তান তখন বিদেশিদের জন্য মরণফাঁদ। ঘণ্টায় ঘণ্টায় কাবুল বিমানবন্দর থেকে বিমান ছাড়ছে তালেবান, আল-কায়েদা আর মুজাহিদ বাহিনীর হাতে নিহত মার্কিন সৈন্যদের মৃতদেহ। ঠিক যেন ভিয়েতনামের পুনরাবৃত্তি। বর্তমান প্রজন্মের কাছে ভিয়েতনাম সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে এই সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু জানা যাবে না। বুশের পর এলো বারাক ওবামা। সবাই চিন্তা করলো এবার বুঝি আফগানিস্তানে একটু শান্তি আসবে। ঘটলো ঠিক উল্টোটা। ওবামা শুরু করলো ড্রোন হামলা। মারা পড়লো অনেক নিরীহ মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রে লাশবাহী বিমান আসা বন্ধ হলো না। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ন্যাটো দেশগুলোর অবস্থাও একই। তবে তাদের অংশগ্রহণ যেহেতু সীমিত, সেহেতু তাদের শববাহী বিমান সংখ্যায়ও কম।

গেলো ওবামা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে এলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প আর কিছু না হোক বুঝতে পারলেন এই যুদ্ধে জেতা অসম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস তেমন একটা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা বসে ঠিক করলেন, ২০২১ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে চলে আসবে। এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটলো পালাবদল। ট্রাম্পকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন জো বাইডেন। তার আমলেই শুরু হলো আফগানিস্তান থেকে মার্কিনিদের দেশে ফেরা। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বহুদিন এমন একটা পরাজয় দেখেনি। একদিকে বিশ্বের একটি পরাশক্তি। সঙ্গে তাদের বেশুমার আধুনিক অস্ত্র। অন্যদিকে খালি পায়ে আফগান তালেবান যোদ্ধারা। গায়ে ঢোলা কুর্তা আর শালওয়ার। তা ধোয়া হয়নি কখনও। আফগানরা সাধারণত গোসল করে না, কাপড়ও ধোয় না।  

অস্ত্র বলতে একে-৪৭ রাইফেল আর গ্রেনেড লঞ্চার। কাবুলের পতন আসন্ন আঁচ করতে পেরে রাজকোষ খালি করে পালালো দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি। সর্বশেষ তাকে দেখা গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

তালেবানরা কাবুল দখল করে ঘোষণা দিলো তারা নতুন ‘ব্র্যান্ডের তালেবান’। তারা তাদের পূর্বসূরিদের মতো হিংস্র নয়। তবে মেয়েরা ঘরে থাকবে। একসঙ্গে পড়ালেখা করতে পারবে না। এরইমধ্যে তারা আর এক পরাশক্তি চীনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। আফগানিস্তানের প্রচুর খনিজ সম্পদ আছে। তা উত্তোলন করতে চীন সহায়তা করতে পারবে। এতদিন মার্কিনিরা লুটপাট করেছে। এবার চীনের সুযোগ। এদিকে বেকায়দায় পাকিস্তান ও ভারত। আফগানিস্তান একটি গোত্র অধ্যুষিত দেশ। গোত্র সংস্কৃতিতে একে অন্যের বশ্যতা স্বীকার করতে চায় না। এখানে পাশতুনদের সংখ্যা প্রায় ৪৮ শতাংশ। আরও আছে তাজিক, উজবেক, হাজারা, বালুচসহ প্রায় কুড়িটি গোত্র। সুতরাং আফগানিস্তানে শান্তি সহজে ফিরছে না। তারা পাকিস্তানের পাকতুন খোওয়ায় পাশতুনদের উসকানি দিতে পারে। বালুচিস্তানেও তাদের নজর আছে। অন্যদিকে পাকিস্তান তাদের নানা লোভ দেখিয়ে ভারত শাসিত কাশ্মিরকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে। তবে তা করতে সময় লাগবে। এখনও আফগানিস্তানে সরকার গঠন করতে পারেনি তালেবান। হাজারে হাজারে আফগান দেশ ছাড়ছে। দেশটির অর্থনীতির অবস্থা বেহাল। ব্যাংকে কোনও অর্থ নেই। ইতোমধ্যে আরেক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আইসিস কাবুল বিমানবন্দরের বাইরে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের আগমনী বার্তা দিয়েছে। এই বিস্ফোরণে মারা পড়েছে মার্কিন সৈন্যসহ প্রায় ১৭০ জন।  

বাংলাদেশে তথাকথিত ইসলামি দলগুলো তালেবানদের ‘ভায়রা ভাই’। বিএনপি’র সঙ্গে তাদের গলায় গলায় ভাব। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা করেছিলেন, জামায়াত আর বিএনপি একই মায়ের পেটের ভাই।

সোমবার কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা খবর দিয়েছে, কলকাতায় ২৯ লক্ষ ৯০ হাজার আফগান মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। সেই মুদ্রা ভারতীয় মুদ্রায় বদল করতে গিয়ে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়। অসমর্থিত সূত্রে ধারণা করে হয়েছে, সেই টাকা যাচ্ছিল বাংলাদেশে সন্ত্রাসীদের জন্য। ঘটনাটির তদন্ত চলছে।  ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশকে আগামী দিনগুলোতে সতর্ক থাকতে হবে। তা যদি না হয় তালেবানি সন্ত্রাস একসময় এই অঞ্চলকে গ্রাস করবে। মনে রাখতে হবে, তাদের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা আকাশচুম্বী। যতই বলুক তারা তাদের পূর্বসূরিদের মতো নয়, তারপরও তাদের বিশ্বাস করা বোকামি।

এদিকে বিএনপি ও তার মিত্ররা ঘোষণা দিয়েছে আগামী ডিসেম্বর থেকে নতুন ছকে সরকার পতন আন্দোলন শুরু হবে। মিডিয়া খবর দিয়েছে, ইতোমধ্যে নাকি জামায়াতের কয়েকজন নেতার সঙ্গে বিএনপি’র বৈঠক হয়েছে। আলামত ভালো নয়। এখন থেকেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কাদের হাতে আগামী দিনের বাংলাদেশ?

কাদের হাতে আগামী দিনের বাংলাদেশ?

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া

বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া

আবার ঘণ্টা বাজবে স্কুলে, ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা

আবার ঘণ্টা বাজবে স্কুলে, ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

রাশিয়া ও কানাডা থেকে ৯০ হাজার টন সার কিনছে সরকার

রাশিয়া ও কানাডা থেকে ৯০ হাজার টন সার কিনছে সরকার

রূপপুর প্রকল্পে যন্ত্রপাতি আসছে পরমাণু শক্তিচালিত জাহাজে

রূপপুর প্রকল্পে যন্ত্রপাতি আসছে পরমাণু শক্তিচালিত জাহাজে

রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রাশেদ, সম্পাদক রিয়াদ

রাবি রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি রাশেদ, সম্পাদক রিয়াদ

বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী: প্রধানমন্ত্রী

বেগম রোকেয়া ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন আধুনিক নারী: প্রধানমন্ত্রী

অত্যন্ত নিরাপদ কপ্টার ছিল রাশিয়ায় তৈরি এমআই-১৭-ভি-৫

অত্যন্ত নিরাপদ কপ্টার ছিল রাশিয়ায় তৈরি এমআই-১৭-ভি-৫

স্পিকারের সঙ্গে ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

স্পিকারের সঙ্গে ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ চট্টগ্রামে

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজ চট্টগ্রামে

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী: রাষ্ট্রপতি

বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী: রাষ্ট্রপতি

বিদ্যুৎ বিভাগের পাঁচটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন

বিদ্যুৎ বিভাগের পাঁচটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন

জীবনের নতুন অধ্যায়ে স্পর্শিয়া

জীবনের নতুন অধ্যায়ে স্পর্শিয়া

গভীর ব্যথিত: মোদি

গভীর ব্যথিত: মোদি

আবরার হত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে: আইনমন্ত্রী

আবরার হত্যা মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে: আইনমন্ত্রী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune