X

সেকশনস

করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স: সঠিক পরিকল্পনায় এগোচ্ছে তো?

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ১৩:২৪

ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব ২১ জুন, ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট ৮১টি করোনাভাইরাসের পূর্ণ জিনোম তথ্য আন্তর্জাতিক ডেটাবেজে জমা পড়েছে। সিকোয়েন্সগুলোকে মোটাদাগে দুটো ধরনে ভাগ করা যায়। সিংহভাগ ভাইরাসে দেখা যাচ্ছে ইউরোপীয় ঘরানার পরিবর্তন। ইতালি, ব্রিটেন, বেলজিয়াম এসব দেশে এই ধরনগুলো শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছিল। বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত পাওয়া সিকোয়েন্সে ওই ধারার পরিবর্তনটিই বেশি পরিদৃষ্ট হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম থেকে পাঁচটি  ভাইরাসের পরিবর্তন চীনের ভাইরাসের সঙ্গে তুলনীয়। এর বাইরে একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, চারটি ভাইরাসের জিনোমে বড় কিছু অংশ কেটে বাদ পড়ে যাওয়ার বিষয়টি। একে ডিলিশন মিউটেশন বলা হয়। এ ধরনের ডিলিশন সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকেও বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছেন।
এই হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে সম্পন্ন করা ৮১টি সম্পূর্ণ ভাইরাসের জিনোম সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিসিএসআইআর থেকে এসেছে পঞ্চাশটি সিকোয়েন্স, চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দশটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচটি, বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং চিটাগাং ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে সাতটি, ডিনএনএ সলিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাঁচটি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি’র পক্ষ থেকে দুটি, একেএমবায়োমেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে একটি এবং আইসিডিডিআরবি থেকে একটি। কিছু সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, সব মিলিয়ে দেশের প্রায় এক হাজার ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স হতে পারে শেষ পর্যন্ত। বিশেষ করে বিসিএসআইআর এ ব্যাপারে সরকারি আনুকূল্য পাচ্ছে বলেও পত্রিকায় প্রকাশ। 

দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে নতুন করোনাভাইরাসের পূর্ণ জিনোম তথ্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এখন পর্যন্ত ভারত থেকে জমা পড়েছে ৮৯৫টি জিনোম তথ্য। পাকিস্তান থেকে ১০টি, শ্রীলঙ্কা থেকে ৬টি। জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি আশান্বিত হওয়ার মতো ব্যাপার। এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে, বাংলাদেশ আধুনিক মলিক্যুলার বায়োলজির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেছে। এর ফলে এই নতুন করোনাভাইরাসের গতি প্রকৃতি বুঝতে সুবিধা হবে।

এই ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আগেও লিখেছি। কিন্তু আজকের লেখায় কিছু আশঙ্কা ব্যক্ত করতে চাই। এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে জমা পড়া ৮১টি জিনোম তথ্য বিশ্লেষণ করে। সবচেয়ে বড় যে শঙ্কাটি দানা বেঁধেছে তা হলো, এখন যে ধারায় জিনোম সিকোয়েন্স হচ্ছে তাতে হয়তো প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে, হাজারখানেক ভাইরাসের জিনোম তথ্যও জানা যাবে, কিন্তু এই তথ্য কি যথেষ্ট অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহার করা যাবে?

জিনোম সিকোয়েন্সের ব্যাপারে আমরা যারা শুরু থেকে কথা বলেছি, তাদের প্রায় সবার অভিমত ছিল এ সংক্রান্ত প্রকল্পটি সমন্বিতভাবে করার ব্যাপারে। যেহেতু আমাদের সম্পদ সীমিত, তাই আলাদা আলাদা উদ্যোগ না নিয়ে একটি জাতীয় মনিটরিং কমিটির অধীনে সিকোয়েন্সিং হলে অনেক যৌক্তিকভাবে এই প্রজেক্ট সঞ্চালনা করা যেতো, এবং যে তথ্য পাওয়া যেতো তা অনেক বেশি কাজে লাগতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা হয়নি। আলাদাভাবে বিভিন্ন গবেষক দল জিনোম সিকোয়েন্স করছে। এসব সিকোয়েন্স এবং আনুষঙ্গিক তথ্যের দিকে তাকালে বেশ কয়েকটি অপূর্ণতা চোখে পড়বে। ধারাবাহিকভাবে বিষয়গুলো উল্লেখ করছি।

প্রথমত বিষয়টি দাঁড়িয়েছে এমন, যারা ফান্ড জোগাড় করতে পারছে, তারাই নিজেদের ইচ্ছামতো সিকোয়েন্স করছে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমন্বিতভাবে নমুনা সংগ্রহ করার সম্ভাবনা কমে গেছে। এতে করে দেশের সামগ্রিক চিত্র পাওয়ার ব্যাপারটি সফলভাবে ঘটবে না। হয়তো ঢাকা থেকে অনেক বেশি নমুনা সিকোয়েন্স হবে, রাজশাহী কিংবা বরিশাল থেকে অল্প হবে। অধিক আক্রান্ত মফস্বল অঞ্চলগুলো হয়তো বাদ পড়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, এসব প্রজেক্টে যেসব রোগীর কাছ থেকে নমুনা নেওয়া হচ্ছে তাদের সম্পূর্ণ রোগতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করার বিষয়টি কতটা বিস্তারিতভাবে হচ্ছে তা প্রকাশিত ডেটা থেকে এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষত বিসিএসআইআর যেসব জিনোম সিকোয়েন্স জমা দিয়েছে তার একটিতেও কোনও রোগীর অবস্থা সম্পর্কিত কোনও তথ্য জানা যাচ্ছে না। এসব রোগীর কতজন মারা গেছে বা বেঁচে আছে তা ডেটাবেজে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ নেই। অন্তত আমরা আশা করবো, পাবলিক ডেটাবেজে বিষয়টি প্রকাশিত না হলেও গবেষণার স্বার্থে রোগীর তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের ফলোআপ করার বিষয়টি তারা চালিয়ে যাবেন। কারণ, ভাইরাসের বিশেষ কোনও ধরন বিশেষ কোনও উপসর্গ তৈরি করছে কিনা তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে রোগীকে ফলোআপ করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে যেহেতু এই ভাইরাসের কালচার ও সে সম্পর্কিত গবেষণা খুব বেশি হচ্ছে না, সুতরাং রোগীর কাছ থেকে যত বেশি তথ্য নেওয়া যাবে, ততই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে। তৃতীয়ত, এখন পর্যন্ত যে ৮১ রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, তাদের গড় বয়স হচ্ছে ৩৮-এর নিচে। অথচ আমরা জানি, সারা পৃথিবীতেই বয়স্ক রোগীদের ভেতরে ভাইরাস সংক্রমণ বেশি জটিলতা তৈরি করেছে। প্রাণহানিও হয়েছে বয়স্কদের মধ্যেই বেশি। তাই বাংলাদেশ থেকেও যেসব রোগীর কাছ থেকে ভাইরাস নমুনা সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য নেওয়া হবে, তাদের মধ্যে সব বয়সী মানুষেরই প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। কিন্তু সেটি এখন পর্যন্ত হয়নি বলেই ধরে নিতে হবে। এমতাবস্থায় বিভিন্ন বয়সী রোগীর কাছ থেকে ভাইরাস সংগ্রহের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে। হাতে যেসব সহজলভ্য নমুনা আসছে সেগুলো নয়, বরং পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নমুনা সংগ্রহ হতে হবে এই প্রকল্পগুলোর ভিত্তি।

আরও একটি বিষয় গুরুত্ব নিয়ে ভাবতে হবে, সেটি হচ্ছে সিকোয়েন্সিংয়ের টেকনিক্যাল দিকটি। আমাদের দেশে পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের অভিজ্ঞতা খুব বেশি মানুষের নেই। এটি একটি নতুন বিষয়। সুতরাং যারা কাজগুলো করছেন, তাদের পরস্পরের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে হবে। ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সিকোয়েন্সিংয়ের প্ল্যাটফরম ভেদে কিছু কিছু মিউটেশনের বায়াস বা পক্ষপাত দেখা যায়। সুতরাং একটি মিউটেশন সত্যি কিনা তা হয়তো আমরা একাধিক প্ল্যাটফরম ব্যবহার করলে নিশ্চিত হতে পারবো। সুতরাং পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার বিকল্প নেই। এ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য যারা সিকোয়েন্সিং প্রজেক্টগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের নিয়ে একটি কনসোর্টিয়াম বা সংঘ তৈরি করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এরকমটি হয়েছে। আমাদের জন্য বিষয়টা আরও বেশি জরুরি।

সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকল্পগুলোর সঙ্গে দেশের ডাক্তারদের যুক্ত করা। এটিকে শুধু একটি সিকোয়েন্সিং  প্রকল্প হিসেবে না দেখে গবেষণা প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত। ডিজাইনও সেভাবেই হতে হবে। সেজন্য কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত ডাক্তারদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। তারা দেশের কোভিড রোগীদের মধ্যে কী কী বৈচিত্র্য দেখছেন, বিশেষ কোনও বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ছে কিনা এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে তারপর সিকোয়েন্সিং-এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ হাজার হাজার ভাইরাসের সিকোয়েন্স করেছে। এখনকার প্রযুক্তি ব্যবহার করে সিকোয়েন্সিং করাটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কিন্তু একটা সুপরিকল্পিত গবেষণা প্রশ্নের উত্তরে ওই সিকোয়েন্স কোনও কাজে লাগবে কিনা সেটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। যদি সবকিছু শেষে দেখা যায় অনেক প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়ার মতো সহায়ক তথ্য আমাদের হাতে নেই, তাহলে সেটা অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। এ বিষয়ে তাই আগে থেকেই আরও যোগাযোগ হোক, আলোচনা হোক।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

সংক্রমণ কমছে, করোনা হটানোর এটাই সুযোগ!

সংক্রমণ কমছে, করোনা হটানোর এটাই সুযোগ!

৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক 

৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক 

১২৬ মাছে ভাগ্য খুলেছে রফিকুলের

১২৬ মাছে ভাগ্য খুলেছে রফিকুলের

বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ৬ লাখ ৮৫ হাজার

বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ৬ লাখ ৮৫ হাজার

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত দু'জনের  লাশ ভারতে উদ্ধার

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত দু'জনের লাশ ভারতে উদ্ধার

উপমহাদেশের স্বার্থে পাকিস্তানের স্বীকৃতি জরুরি

উপমহাদেশের স্বার্থে পাকিস্তানের স্বীকৃতি জরুরি

নতুন ঘর পেয়ে খুশি সুকজান বেগম

নতুন ঘর পেয়ে খুশি সুকজান বেগম

‘জীবনেও ভাবি নাই পাক্কা ঘরে ঘুমামু’

‘জীবনেও ভাবি নাই পাক্কা ঘরে ঘুমামু’

ঘর 'আপন' হওয়ার আগে আগলে রাখছেন তারা

ঘর 'আপন' হওয়ার আগে আগলে রাখছেন তারা

খুবির অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রসঙ্গে সাবেক ২৭৩ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ

খুবির অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রসঙ্গে সাবেক ২৭৩ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ

বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে ঘরে আগুন, প্রতিবন্ধী শিশুসহ নিহত ৪

বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে ঘরে আগুন, প্রতিবন্ধী শিশুসহ নিহত ৪

‘এত কাজ কেউ করতে পারেনি, জিতলে আরও করবো’

‘এত কাজ কেউ করতে পারেনি, জিতলে আরও করবো’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.