X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

প্রগতিশীল ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’

রাশেদা রওনক খান
০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:১৯আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৩৩

রাশেদা রওনক খান একটা ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে–কিছু তরুণ, যারা শোকরানা মাহফিলে এসেছিলো, তারা ঢাকার একটি ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি কিংবা ছবি তুলছে। এই ছবিটায় অনেক গল্প আছে। সব গল্প যে পড়া যায়,তা নয়। কিছু গল্প থাকে, পাঠ করা কঠিন। আর কিছু গল্প পাঠ করা যায় সহজেই।
কাউকে কাউকে  দেখলাম, এই ছবির মানুষজনকে ‘আমাদের’ বিপরীতে ‘ওরা’ কিংবা ‘তারা’ বলছে।  কিন্তু কেন এই বিভাজন? জানি, উত্তর সহজ, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতি তাণ্ডব।  এছাড়া, বিভিন্ন সময়ে কোনও কোনও ‘ধর্মান্ধ বক্তা’কে দেখা যায় নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দিতে। দেখা যায় নারীশাসনের বিরুদ্ধেও।  ইউটিউবেও অনেক ওয়াজ ঘুরে বেড়ায়। অনেকের ওয়াজ শুনলে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায় রাগে, দুঃখে, কষ্টে। ‘তারা’ এসব ‘রসালো’,নারীবিদ্বেষী ওয়াজ করেন,তা নিয়ে ‘আমরা’ চিন্তিত ও ক্ষুব্ধ হই। কিন্তু কীভাবে এই ধরনের সংকট থেকে আমরা বের হতে পারি? তাদের বাদ দেওয়া, দূরে সরিয়ে রাখার বিষয়টি নিয়ে আমরা ভেবেছি কখনও?  

এই যে তারা গ্রামে গ্রামে ওয়াজ করছেন। অনেকে ভালো ওয়াজও করেন। কিন্তু কারও কারও ওয়াজে থাকে নারীবিদ্বেষী মনোভাব। যার কারণে নারী-পুরুষের বিভাজন বাড়ছে, ফলে পিছিয়ে পড়ছে তো গোটা সমাজটাই। তা থেকে উত্তরণের উপায় কী? কীভাবে এই বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের হতে পারি?

‘তারা’ তো আমাদেরই লোক। আমাদের গ্রামের বাড়ির, পাশের বাসার, আত্মীয়, কিংবা গ্রামের যে ছেলেটির বাবা-মা নেই, সেই ছেলেটি। আমরা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি বলে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে এতিম খানায়, মাদ্রাসায়। সেখানে তারা বড় হচ্ছে, বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে। ‘আমরা’ তাদের জন্য কিছুই করছি না, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধেই আমরা অভিযোগ করি– কীভাবে ‘ধর্মান্ধ’ বানানো হচ্ছে। আমাদের চেয়ে বড় ‘বক্তা’ আর কারা আছে?  

তাদের অনেকের ওয়াজে নারীবিদ্বেষী ডিসকোর্স উৎপাদন হচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামে গঞ্জে সাধারণের মনস্তত্ত্বে, ওয়াজ শেষে ঘরে ফিরেই চলছে নারীর ওপর পুরুষতান্ত্রিক চর্চা।

বিষয়টা এমন, যে যত ‘রসালো’ এবং ‘নারীবিদ্বেষী’ ওয়াজ করবেন, তিনি তত জনপ্রিয় হবেন। তাকে ততই ওয়াজে ডাকা হবে, তিনি ততই ‘জনপ্রিয় বক্তা’ হয়ে উঠবেন। সামনে উদাহরণ হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম বলা যেতে পারে। কিন্তু এই জায়গায় তাদের ছেড়ে দিলে সমস্যা আরও প্রকট হবে। মানুষকে তো ধর্মের আসল শিক্ষাটা পৌঁছে দিতে হবে।  তাই ‘তাদের’ জন্য  ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক-বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। সেই দুয়ার দিয়ে প্রকৃত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আমরা কেবল উদ্বিগ্ন ‘তাদের’ অতীতের কার্যকলাপ নিয়ে। কিন্তু ভবিষ্যৎ কী,তা নিয়ে আমরা ভাবছি না। কিন্তু বলছি, আমরা প্রগতিশীল ও চিন্তক। কখনও কি ভেবেছি, এই ধরনের নারীবিদ্বেষী চিন্তাভাবনা কারা, কেন, কীভাবে ‘তাদের’ অনেকের মগজে প্রবেশ করিয়েছে? ‘প্রগতিশীল’-এর তকমা গায়ে নিয়ে ‘আমি/আমরা’ বসে থাকলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে? নাকি ‘তাদের’ মাঝে সঠিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া হবে সত্যিকারের প্রগতিশীলদের কাজ?

তাসলিমা নাসরিন বা জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে যখন হুলিয়া দেওয়া হয়,ক’জন প্রগতিশীল লড়াকু হয়ে ওঠেন? কওমি মাদ্রাসার মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঝে কীভাবে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া যায়,তার জন্য ক’জন প্রগতিশীল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রী কিংবা শিক্ষা সচিবের সঙ্গে দেন-দরবার করেছি? এই প্রগতিশীল ‘আমরা’ কেবল বাইরেরটা দেখি। ওই যে বললাম, ছবির দেখা জায়গাগুলো দেখি,অদেখা জায়গাগুলো দেখার কিংবা বোঝার চেষ্টা করি না।

সারা বিশ্বেই সব ধর্ম নিয়েই রয়েছে অতি মাত্রায় বাড়াবাড়ি। থাইল্যান্ডের পথে পথে, প্রতি বাড়িতে কিংবা অফিসের প্রবেশ পথেই,এমনকি রাস্তায়ও তাদের ছোট ছোট উপসনালয় রয়েছে একটু পর পর। স্যুটেড-বুটেড নারী-পুরুষকে হঠাৎ করেই দেখি হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েন রাস্তায় মাথা নত করে। ফুল কিংবা খাবার দিয়ে যান দেবতার উদ্দেশে! এই নিয়ে ‘প্রগতিশীল ট্যুরিস্ট আমরা’ মোটেই আতঙ্কিত হই না। বরং পুলকিত হই। কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্র দেখলে ‘আমাদের’ চোখে তা হয়ে যায় ‘ধর্মান্ধতা’! 

আমেরিকায় আমার ক্লাসে এক বন্ধু (প্রচণ্ড ‘আধুনিক’ একটি মেয়ে) এতটাই ধর্মান্ধ যে,সে আমাদের কনফারেন্সগুলোতে শুকনো খাবার ছাড়া কোনও রান্না করা খাবার খেতো না। একদিন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জানালো,ওর ধর্মীয় বিধি-নিষেধের  কথা। নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে আসা এক শিক্ষার্থীর ভেতর এই ধরনের ধর্মান্ধতা দেখে আমি কিছুটা ‘কালচারাল শকড’ হয়েছিলাম। কিন্তু ধর্ম কিংবা সংস্কৃতি বিষয়টা এমনই যে, কোনটা সত্য আর সঠিক এবং কোনটা আধা সত্য কিংবা কোনটা মিথ্যা, তা যাচাইয়ের ‘আমি/আমরা/প্রগতিশীলরা’ কেউ নই।

যদি এমনই হতো হলো তাহলে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছাত্ররা কেন হলি আর্টিজানে ভয়ানক জঙ্গি হামলা করলো? অন্যদিকে আমেরিকায়ও ধর্মের নামে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করে বন্দুকের গুলিতে একসঙ্গে কত শিশু মেরে ফেলার ঘটনা আছে। সেটাও কেন ঘটে? 

আমাদের দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইংরেজি মাধ্যমে পড়া বিপথে যাওয়া কিছু ছাত্রদের তাণ্ডব দেখার পরেও কি ‘আমরা’ প্রগতিশীলেরা নিজেদের বাচ্চাদের ‘ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে’ ভর্তি করানোর জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি না?  

তাই এই বিভাজন কেবলই দায়িত্ব থেকে পালানোর, বিভাজন জিইয়ে রাখলে আমাদের দেশ পেছাবে, সমাজের  কুসংস্কারচ্ছন্নতা আরও জেঁকে বসবে। ‘তারা’ কিংবা ‘আমরা’ প্রত্যেকেই এই রাষ্ট্রের নাগরিক। প্রত্যেকেরই অধিকার আছে এই রাষ্ট্রে, প্রত্যেকের অধিকার আছে তার মতো করে ধর্ম পালনের। কোনও ধর্মই মানুষকে উগ্র হতে শেখায় না। মানুষই তাদের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থে  উগ্র হয়ে ওঠে। আর তাতে প্রকাশ পায় তাদের ধর্মান্ধ রূপ।  বিষয়টি সবার ক্ষেত্রেই ঘটে, তা বলা যাবে না। সব গোষ্ঠী করে,তাও বলা যাবে না,একটি গোষ্ঠীর সবাই করেন, তাও বলা যাবে না। একটি ঘটনাকে দূর থেকে দেখলে হবে না। দেখতে হবে তার একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিবেচনায়। সময়ের সঙ্গে,পরিবেশের সঙ্গে বদলে যেতে পারে অনেক কিছুই। ‘আমরা’ প্রগতিশীলরা যদি কোটা আন্দোলন করতে পারি,তারা কেন তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন করতে পারবেন না? তারা তাদের শিক্ষার স্বীকৃতি চেয়ে আন্দোলন করেছেন। দাবি জানিয়েছিলেন, সেটা এখন পেয়েছেন।

তাদের জন্য রইলো অভিনন্দন। আর কওমি শিক্ষার মাঝে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার ঘটুক। এটুকুই প্রত্যাশা রইলো। আমরা নৃবিজ্ঞানীরা ‘ব্যাপ্তিবাদে’ বিশ্বাসী। তাই বিশ্বাস করি, আধিপত্যবাদী আমাদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা পারবে মাদ্রাসা শিক্ষার মাঝে ব্যাপৃত হতে। আর তার জন্য প্রয়োজন ‘প্রগতিশীলদের’ এগিয়ে আসা, ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’র বিভাজন নয়, চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার। প্রয়োজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জোর তৎপরতায় মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও আধুনিক-বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার। শিক্ষার দরজা উন্মুক্ত হলেই সবার শিক্ষা নিশ্চিত হবে। এটাই শেষ কথা!

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ