X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

করোনাকালীন ভর্তি পরীক্ষা: উৎসাহ ও উৎকণ্ঠা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২১, ১৬:২৫
ড. প্রণব কুমার পান্ডে করোনাকালে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও করোনার তৃতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি মেডিক্যাল ও বিডিএস পরীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে এবং ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। ১লা অক্টোবর, ২০২১ তারিখ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীরা প্রায় এক বছরের ওপর সময়কাল যে উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে, তারই পরিসমাপ্তি  হয়েছে এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় খোলা না খোলা কিংবা ভর্তি পরীক্ষার নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে অনেক সমালোচনা করেছেন।  

অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এসব সমালোচনার বাস্তবভিত্তিক কিছু কারণ রয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থী এবং আমাদের ছেলেমেয়েদের সুরক্ষা সবকিছুর ওপরে। এক বছর পরে ভর্তি হলে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে হয়তো একটা বছর নষ্ট হবে, কিন্তু এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে যদি একজন শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে তাহলে একদিকে যেমন তার জীবনটা শেষ হয়ে যাবে, তেমনি একটি পরিবারে নেমে আসবে ঘোর অমানিশা। এই বাস্তবতায় যদি আমরা বিচার করি তাহলে দেখবো, সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি যথেষ্ট সহমর্মিতা প্রদর্শন করে সঠিক সময়ে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে শিক্ষার্থীদের কাছে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়া রীতিমতো যুদ্ধে অংশগ্রহণের মতো। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১টি আসনের বিপরীতে ২০০ থেকে ৩০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। অতএব, এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার জন্য একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা আকুল হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি অভিভাবকদের মধ্যে থাকে এক ধরনের উৎকণ্ঠা। আজকে আমি অত্যন্ত খুশি এই ভেবে যে সেই উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা শুরুর মধ্য দিয়ে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা বিভাগীয় শহরগুলোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরপরই রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং তারপরে ধারাবাহিকভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া নিয়ে কয়েক বছর ধরেই সমালোচনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের অনেক বেশি চলাচলের ওপর থাকতে হয়। আর ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ও সময় এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে খুব পাশাপাশি সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের দুর্দশার শেষ থাকে না। এ বিষয় নিয়ে আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন সময় কথা বলতে দেখেছি।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশনা প্রদান করতে দেখেছি তারা যেন সমজাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা গুচ্ছ পদ্ধতিতে গ্রহণ করেন। এতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় কমবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও দুর্দশা অনেকাংশে লাঘব হবে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শুধু যে যাতায়াত সমস্যা বা থাকা-খাওয়ার সমস্যা সেটিই নয়, প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষার ফি জমা দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন কাজ। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। এই দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করেন, যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফরম পূরণের অর্থ জোগাড় করা অনেক কষ্টসাধ্য। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেও গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের কষ্ট লাঘব করা সম্ভব হবে।  আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে এবং শিক্ষার্থীদের চলাচলে সমস্যা হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এটি সত্যিই একটি প্রণিধানযোগ্য সিদ্ধান্ত। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এতে শিক্ষার্থীদের কষ্ট যেমন কমবে, তেমনি করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেকটা হ্রাস পাবে।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা দুরূহ কাজ। এই পরীক্ষার সঙ্গে গোপনীয়তার বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত। যেকোনও ধরনের অসতর্ক সিদ্ধান্ত ভর্তি পরীক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তারপরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বলে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি গুচ্ছ পদ্ধতিতে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে, সেখানেও শিক্ষার্থীদের বাড়ির কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রেখে বিধান করা হয়েছে। এটিও শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত। কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে যে কয়েকটি বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তারা সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো নিজ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সুরক্ষাবিধি মেনে কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায় তা নিশ্চিত করতে। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে হল খুলে দেওয়ার একটি দাবি ছিল। ভর্তি পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা আত্মীয়তা বা গ্রামের সম্পর্কের জেরে অনেকের কাছে হলে অবস্থান করে। এতে তাদের দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হতো হয়তো। এ কথা ঠিক, হল না খোলায় হয়তো শিক্ষার্থীদের কিছুটা সমস্যা হবে, তবে হল খুলে দেওয়ার পর পরিস্থিতি খারাপ হলে অনেকেই সমালোচনা শুরু করতেন। রাজশাহীর  মেয়রের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মেস মালিকদের সঙ্গে আলোচনায় যে সিদ্ধান্তটি হয়েছে, তা হলো ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে শহরের বিভিন্ন মেসে অবস্থান করতে পারবেন। এ বিষয়টি সমর্থনযোগ্য এবং এতে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মহিলা শিক্ষার্থীদের জন্য ৬টি ছাত্রী হলের উন্মুক্ত স্থানে থাকার ব্যবস্থা করেছেন। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাই।

আশা করি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই করোনা পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। আক্রান্তের হার প্রায় ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, ভর্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ব্যাপক জনসমাগম হবে। এতে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে। এ কারণে প্রশাসনের প্রতি আবেদন, সুরক্ষাবিধি মানার ক্ষেত্রে তারা যেন কোনও শৈথিল্য না দেখায়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এতে সহায়তা করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবক আক্রান্ত  হওয়ার অর্থ এই নয় যে শুধু সেই পরিবারে সংক্রমণ সীমাবদ্ধ থাকবে। এটি অন্য পরিবারে বা সার্বিকভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে  ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব ডব্লিউএইচও এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রদত্ত করোনা সুরক্ষাবিধি সঠিকভাবে মেনে চলা।

পরিশেষে বলবো, মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনেক আগেই শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। দুই তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা এখন সময়ের দাবি। আমরা যদি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্দশার কথা চিন্তা করি তাহলে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই।

সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন, আসুন সবাই মিলে একটি সর্বজনগৃহীত পদ্ধতি বের করি, যা হবে দুর্নীতিমুক্ত এবং সহজ। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির দায়িত্ব রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি ইউজিসি বারবার চেষ্টা করেও সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একসাথে আনতে ব্যর্থ হয়েছে।  আমরা অনেক সময়ই বলার চেষ্টা করি ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের নির্দেশনা মানতে বাধ্য নয়। তবে সময় এসেছে সবকিছু নিয়ে নতুনভাবে ভাবার।  শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমানোর জন্য যদি গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই সেটি  স্বায়ত্তশাসনের জন্য হুমকি হবে না। বরং, আমরা নিজেরা যখন নিজেদের সুবিধার্থে স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করি তখন কিন্তু অনেক বেশি অপরাধ করি। সবার প্রচেষ্টায় গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবেন।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শস্য সরবরাহে ভয়ঙ্কর ঘাটতি দেখা দেবে’
‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শস্য সরবরাহে ভয়ঙ্কর ঘাটতি দেখা দেবে’
র‌্যাব অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক রনি
র‌্যাব অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক রনি
আমিরাতে ঈদুল আজহা ৯ জুলাই?
আমিরাতে ঈদুল আজহা ৯ জুলাই?
গাজীপুরে দুই কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে, ১০ শ্রমিক আহত
গাজীপুরে দুই কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে, ১০ শ্রমিক আহত
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ