X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

রায়হান হত্যা: এক সাক্ষীর আত্মহত্যা, আরেকজনকে হুমকি; নেপথ্যে কী?

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:৩৩

আমীন আল রশীদ সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে হেফাজতে থাকা অবস্থায় রায়হান আহমদ নামে এক যুবকের হত্যা মামলার ঘটনার অন্যতম সাক্ষী চুলাই লাল ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই খবরটি নির্দ্বিধায় মেনে নিতে কষ্ট হয় যখন সংবাদের পরের লাইনেই লেখা হয়, এই মামলার আরেক সাক্ষী হাসানকে সাক্ষ্য না দিতে ‘হুমকি’ দেওয়া হচ্ছে। একজন সাক্ষীকে সাক্ষ্য না দিতে হুমকি দেওয়ার সময়ে যদি আরেকজন সাক্ষী আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়, তখন ওই আত্মহত্যার রহস্য উন্মোচন করা জরুরি। রহস্য উন্মোচিত না হলেও অন্তত এই আত্মহত্যাটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার।

পাঠকের মনে থাকার কথা, গত বছরের ১১ অক্টোবর ভোরে সিলেট শহরের আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি সেখানে মারা যান। পরদিন তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তে প্রথমে পুলিশ ছিল। পরে সে বছরের ১৩ অক্টোবর মামলাটি স্থানান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। গত ৫ মে আদালতে ১ হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। মূল অভিযুক্ত এসআই আকবরসহ যে ছয় জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়, তাদের মধ্যে পাঁচ জনই পুলিশ সদস্য। অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্য কারাগারে থাকলেও নোমান নামে একজন এখনও পলাতক।

সবশেষ গত ৫ ডিসেম্বর এই হত্যা মামলার শুনানিতে আদালতে উপস্থিত হন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম। সেখানে সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী চুনাই লাল আত্মহত্যা করেছেন। আরেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হাসানকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে যাতে তিনি সাক্ষ্য না দেন। চুনাই লালের বাসা থেকে রায়হানকে ধরে নেওয়া হয়েছিল এবং ফাঁড়িতে নেওয়ার পর তাকে রাতভর নির্যাতনের সময় আর্তনাদের সাক্ষী হাসান। সুতরাং চুনাই লালের আত্মহত্যাটি প্রশ্নাতীত নয় এবং তাকে সাক্ষ্য না দিতে কারা হুমকি দিচ্ছে, সেটি জানাও তদন্তকারীদের জন্য কঠিন কোনও কাজ নয়।

মনে রাখা দরকার, নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগগুলো খুবই গুরুতর। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন বা দু’জন বা কয়েকজন সদস্যের ব্যক্তিগত অপরাধ এবং তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার ইস্যু নয়। বরং এর সঙ্গে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রশ্ন জড়িত। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো কীভাবে চলছে—এসব মৃত্যু, হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনায় সেই প্রশ্নটি বারবারই ঘুরেফিরে সামনে আসে, যা রাষ্ট্রকে বিব্রত করে। সুতরাং, রাষ্ট্র বিব্রত হয়, এমন কোনও ঘটনা ঘটলে সেটি ধামাচাপা দেওয়া কিংবা অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত করা কিংবা ঘটনার সত্যতা প্রমাণের পথে বিবিধ অন্তরায় সৃষ্টির প্রচেষ্টা যে চলবে—সেটি অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং, চুনাই লালের মৃত্যুটিও সম্ভবত স্বাভাবিক নয়। বরং এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কিনা—সেটি অনুসন্ধানের দাবি রাখে। পুলিশি নির্যাতনে নিহত রায়হানের মা বলেন, দুই সাক্ষীরই যেখানে এমন অবস্থা, সেখানে তিনিসহ পরিবার অন্যরাও এখন আর নিরাপদ বোধ করছেন না। কারণ, আসামিরা জেলে থাকলেও পুলিশের প্রভাবশালী লোক। জেলে থাকলেও তারা নানাভাবে তাদের প্রভাব খাটাচ্ছে। তারা জেল থেকে বের হলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে বলেও মনে করেন সালমা বেগম। সুতরাং, শুধু চুনাই লালের ‘আত্মহত্যা’র রহস্য উদ্ঘাটন এবং আরেক সাক্ষী হাসানকে ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তই নয়, বরং নিহত রায়হানের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সতর্কভাবে এটি খেয়াল করা দরকার যে, রায়হানকে নির্যাতনে হত্যা করার এই ঘটনাটি ঘটে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইন পাসের সাত বছর পরে, দেশের ইতিহাসে প্রথম এই আইনে দায়ের করা একটি মামলার রায় হওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায়। তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার বেড়তলা বগইর গ্রামে অভিযুক্ত এসআই আকবরের একটি বিলাসবহুল বাড়ির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, ২০০৭ সালে কনস্টেবল পদে চাকরিতে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে এসআই হওয়া একজন পুলিশ অফিসার কী করে এরকম একটি বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করলেন?

এই ঘটনায় আরও কিছু সামনে আসে, যেমন কারও অপরাধের খবর জানাজানি হওয়ার পরেই তার সম্পদের বিবরণী বেরিয়ে আসে কেন? অপরাধ ধরা পড়ার আগে কেন এসব জানা যায় না? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করে? শুধু কি একজন এসআইর এরকম বিলাসবহুল বাড়ি? সারা দেশে এরকম কতজন এসআই বা ওসির বিলাসবহুল বাড়ি আছে—সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলো কি আদৌ এই অনুসন্ধান চালাতে আগ্রহী? অবস্থাটা এখন এমন হয়েছে যে, যতক্ষণ কেউ ধরা না পড়বে ততক্ষণ সে ‘ফেরেশতা’, আর ধরা পড়লেই ‘শয়তান’। ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত দলের ত্যাগী কর্মী, আদর্শের সৈনিক। কিন্তু ধরা পড়লেই অনুপ্রবেশকারী। মূলত এই প্রবণতাই অপরাধীদের অপরাধে উৎসাহিত করে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয় নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন। কিন্তু এরপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু বন্ধ হয়নি। গত বছরের ৯ জানুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আইনে এখন পর্যন্ত কতগুলো মামলার বিচার হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই আইনে মামলা হয়েছে মাত্র ১৭টি। অথচ মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২০ সালের প্রথম আট মাসেই জেল কাস্টডিতে মারা গেছেন ৫৩ জন।

মুশকিল হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তো বটেই, রাষ্ট্রের সব আইন এমনভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সুরক্ষা দেওয়া যে কোনও একটি আইন জনবান্ধব হলেও ওই আইনের আওতায় অপরাধসমূহ বন্ধ হয়ে যায় না। হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু বন্ধ না হওয়ার পেছনে এটিই মূল কারণ। কারণ, কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হলেও হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবার সাধারণত আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। রাষ্ট্র তাকে সেই সুরক্ষাও দিতে পারে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কোনও বাহিনীর কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে সেই ব্যক্তি বা পরিবারকে যে আরও কত ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও পক্ষে ধারণা করাও অসম্ভব।

বিচার তো দূরে থাক, উল্টো নিত্য নতুন মামলা অথবা ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়। ফলে খুব সাহসী এবং প্রভাবশালী না হলে কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘাটাতে চায় না। বরং অধিকাংশই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হয়। সবশেষ কার্টুনিস্ট কিশোরও র‌্যাবের বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতনের মামলা করেছিলেন। কিন্তু আদালতে দেওয়া পিবিআইর রিপোর্টে বলা হয়েছে, কিশোরকে নির্যাতনের কোনও প্রমাণ মেলেনি।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই শুধু নয়, যেকোনও সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন—যদি না নিরপেক্ষ তদন্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত বা উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করেন তাদের সহকর্মীরাই। যে কারণে বড় ঘটনার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা অন্য কোনও বাহিনী বা সংস্থার মাধ্যমের তদন্তের দাবি জানানো হয়।

তবে আশার কথা, পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পিবিআই এরইমধ্যে অনেক চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করেছে। সিলেটের রায়হান হত্যা মামলায়ও তারা পুলিশের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পেয়ে চার্জশিট দিয়েছে। সুতরাং, এই হত্যা মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর আত্মহত্যা এবং আরেকজনকে ভয়ভীতি দেখানোর রহস্যও তারা উন্মোচন করবে—এটিই প্রত্যাশা।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের র‌্যাবের ঈদ উপহার
আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের র‌্যাবের ঈদ উপহার
সেই ঘের থেকে ওঠা গ্যাস দিয়ে রান্না বন্ধের নির্দেশ
সেই ঘের থেকে ওঠা গ্যাস দিয়ে রান্না বন্ধের নির্দেশ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ