X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:৩৭

প্রভাষ আমিন জীবন বাঁচাতে বাবা মেয়েকে কোলে নিয়েই লাফ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রবল স্রোতে মেয়েকে ধরে রাখতে পারেননি। একসময় মেয়ে ভেসে যায়। সেই বাবা বেঁচে আছেন। কিন্তু তার বেঁচে থাকাটা কতটা বেদনার সেটা হয়তো আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারবো না। বছরের শেষে এসে এমন অসংখ্য বেদনার গল্প ভেসে বেড়াচ্ছে সুগন্ধা নদীর পানিতে।

চারপাশে অথৈ পানি, তবু পুড়ে মরেছে অন্তত ৪২টি প্রাণ। এখনও নিখোঁজ অনেকে। অভিযান-১০ লঞ্চের ভয়াবহ আগুন আবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে আমাদের দেশে মানুষের জীবন কত মূল্যহীন। বছর বছর লঞ্চ ডুবে অনেক মানুষ মারা যায়। তবে লঞ্চে আগুন লেগে এত মানুষের মৃত্যু এই প্রথম। প্রথম হলেও এটিই শেষ সেটা বলার সুযোগ নেই। আরো আগে যে হয়নি তা আমাদের ভাগ্য। নৌপথের এই নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন বুয়েটের সাবেক শিক্ষক নেভাল আর্কিটেক্ট খবিরুল হক চৌধুরী। একটি রাস্তায় একটি খোলা ম্যানহোল আছে। প্রতিদিনই মানুষ সেটি দেখছে। সাবধানে চলাফেরা করছে। এভাবে দেখতে দেখতে ৪০তম দিনে এসে একটি শিশু তাতে পড়ে গেলো। তা নিয়ে শুরু হলো হৈচৈ। কথা উঠলো, নিরাপত্তাহীন খোলা ম্যানহোল নিয়ে। সেই ম্যানহোলটি কিন্তু প্রথম দিন থেকেই নিরাপত্তাহীন ছিল। দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ৪০তম দিনে এসে আলোচনা হচ্ছে। ম্যানহোল খোলা থাকলে তাতে কেউ পড়ে যেতেই পারে। তাই খোলা ম্যানহোলে কারো পড়ে যাওয়াটাকে আমরা দুর্ঘটনা বললেও পুরোপুরি দুর্ঘটনা বলা যায় না। বলা ভালো, ক্ষেত্র তৈরি করে দুর্ঘটনার জন্য অপেক্ষা করা। লঞ্চে আগুনের ঘটনাটিও তেমনই। আমরা বলছি বটে দুর্ঘটনা। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা যে কোনও সময় ঘটতে পারে।

বাংলাদেশে ৬ হাজার নৌযান সার্ভে করার লোক আছে মাত্র ১২ জন। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কাগজে কলমে লঞ্চের সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে কিছুই ঠিক থাকে না। অভিযান-১০ লঞ্চটির ইঞ্জিন অবৈধভাবে বদলানো হয়েছিল। বেশি পাওয়ারের ইঞ্জিন জোরে চালানোতে গরম হয়ে আগুন লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইঞ্জিন রুমের পাশেই ছিল রান্নাঘর। সেখানে ছিল গ্যাস সিলিন্ডার। তাই আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। ঢাকা থেকেই ছাড়ার পরই ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দিচ্ছিল। কিন্তু কেউ তা আমলে নেয়নি। আগুন লাগার পর লঞ্চটি নিকটবর্তী তীরে না নিয়ে দ্রুতগতিতে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করে। লঞ্চে আগুন নেভানোর কার্যকর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। নদী থেকে পানি তোলার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। জীবন রক্ষাকারী বয়া বা লাইফ জ্যাকেট ছিল না। এমন অসংখ্য না থাকা নিয়েই দিনের পর দিন চলছিল লঞ্চটি। ভাবার কোনও কারণ নেই, এই ‘না থাকা’ শুধু অভিযান-১০ এই। বরং বাংলাদেশে সবগুলো লঞ্চই এই অসংখ্য ‘না থাকা’ নিয়ে বছরের পর বছর চলছে। সেই খোলা ম্যানহোলের মতো, কোনও শিশু তাতে না পড়া পর্যন্ত বিপদ নিয়ে আমরা কেউ সচেতন থাকি না। অভিযান-১০-এর আগুনের পর কি বাকি সব লঞ্চ ঠিক হয়ে গেছে? হয়নি। এভাবেই চলছে, এভাবেই চলবে। আবার কখনও আগুন লাগলে তা নিয়ে অনেক হৈচৈ হবে, তদন্ত কমিটি হবে, কিছুদিন ধরপাকড়ও হবে। কিন্তু লঞ্চ নিরাপদ হবে না। কখনও ডুববে, কখনও আগুন লাগবে। মানুষ মরবে। কারো টনক নড়বে না।

আমরা লঞ্চকে বিলাসবহুল করতে যত ব্যস্ত, নিরাপদ করতে তত নয়। আমাদের মানুষ বেশি, তাই বোধহয় জীবনের মূল্য কম। লঞ্চে থাকলে পুড়ে মরার ভয়, ঝাপ দিলে ডুবে মরার ভয়। এভাবে প্রাণ হাতে করেই আমাদের প্রতিদিন চলতে হয়। ৪২ জন মানুষের বেদনাদায়ক মৃত্যুর ভয়ঙ্কর স্মৃতি নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে আমাদের বছরটি।

শুধু নৌপথ নয়, অনিরাপদ আমাদের সড়কও। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর খবর আসে। সহপাঠীর মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীরা কিছুদিন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছে। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি। নিরাপত্তা নেই বেড়াতে গিয়েও। স্বামী-সন্তান নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই নিরাপত্তাহীনতা আমাদের পদে পদে।

আগের বছরের মতো বিদায়ী বছরটিও কেটেছে করোনা আতঙ্কে। মানতেই হবে, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছে। টিকা কার্যক্রমেও বাংলাদেশের কৌশলী ভূমিকা সাফল্য এনেছে। দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে ফিরেছে। গতি এসেছে অর্থনীতিতেও।  করোনার বিবেচনা করলে বছরের শেষটা স্বস্তিদায়কই বলতে হবে। তবে যেভাবে ওমিক্রন ধেয়ে আসছে, তাতে নতুন বছরে সেই স্বস্তি কতটা ধরে রাখা যাবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েই যায়।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে। ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু বিদায়ী বছরে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান আমাদের শঙ্কিত করেছে। বছরের শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফালন আমরা দেখেছি। আর শেষ দিকে কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্নস্থানে সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে বছরটা ভালো কাটেনি।

তবে ২০২১ সালটি আমাদের ইতিহাসে আলাদা করে লেখা থাকবে। স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তির পাশাপাশি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বছরটি পালিত হয়েছে মুজিববর্ষ হিসেবে। এ বছরই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি মিলেছে। করোনার অভিঘাত এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে আমাদের অর্থনীতি।

২০২২ আসছে অনেক সম্ভাবনা এবং অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে। ২০২২ সালে দেশে তিনটি মেগা প্রকল্প চালু হওয়ার কথা। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এবং কর্ণফুলি টানেল বাংলাদেশকে তুলে নেবে অন্য উচ্চতায়। এই তিন প্রকল্প আমাদের অর্থনীতিতে মোমেন্টাম সৃষ্টি করতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ যেমন গৌরবের, তেমনি চ্যালেঞ্জেরও। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় অনেক সুবিধা আমরা আর পাবো না। উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে তাই অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে হবে। তিনটি মেগা প্রকল্প আনতে পারে সেই গতি। সেই বাড়তি গতি উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের সহায়তা করবে। উন্নয়নের গতির সঙ্গে সঙ্গে কমিয়ে আনতে হবে বৈষম্য। উন্নয়নের সুফল যেন সবাই পায়। বৈষম্য যত কমবে, উন্নয়ন তত টেকসই হবে।

তবে উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের মাথায় রাখতে হবে মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ভোট দেওয়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, নিরাপত্তার ইস্যুগুলোও। শুধু অর্থনীতি নয়, উন্নয়ন হতে হবে সামগ্রিক এবং সবার জন্য। নতুন বছর যেন বয়ে আনে আরও সমৃদ্ধি, আরও গণতন্ত্র, আরও নিরাপত্তা। ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশ যেন নতুন বছরটি শুরু নতুন চ্যালেঞ্জ এবং নতুন সম্ভাবনা নিয়ে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

নদীতে অপরিকল্পিত ড্রেজিং করতে দেওয়া হবে না: নৌ প্রতিমন্ত্রী
নদীতে অপরিকল্পিত ড্রেজিং করতে দেওয়া হবে না: নৌ প্রতিমন্ত্রী
স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর প্রচারণায় হামলার অভিযোগ, আহত ১২
স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর প্রচারণায় হামলার অভিযোগ, আহত ১২
চা পাতার নির্যাসে আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী ‘দাগ’
চা পাতার নির্যাসে আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী ‘দাগ’
তিতাসের অভিযানে ১০০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন
তিতাসের অভিযানে ১০০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ