X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন জরুরি

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২২, ১৯:২০

ড. প্রণব কুমার পান্ডে গত বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে।  শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন থামতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তবে উপাচার্য মহোদয়ের শিক্ষার্থী বান্ধব মানসিকতার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়।  অতি সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে ধর্ষকের বিচারের দাবিতে। কয়েকদিন আগে একজন ছাত্রী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক তাকে একটি অটোরিকশায় তুলে নিয়ে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে ধর্ষকদের অতি দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে।  শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উপাচার্য মহোদয় একাত্মতা ঘোষণা করায় বিষয়টি অন্য মাত্রা পেয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন রাস্তায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু দিন ধরে। বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার স্থান। এটি স্কুল বা কলেজ নয় যে নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষার্থীরা আসবে এবং চলে যাবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের বিচরণ হবে সব সময়। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পরে বাসায় কিংবা হলে ফেরার সময় যদি এ ধরনের ঘটনার শিকার হয় তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট এবং তার আশেপাশে অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। 

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এক শ্রেণির বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ আছে যারা মেয়েদের এবং শিক্ষার্থীদের সব সময় উত্যক্ত করে এবং সুযোগ পেলেই তাদের ওপরে পৈচাশিক নির্যাতন চালায়। সরকারের বিভিন্ন ধরনের আইনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পরেও এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা একেবারে বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে মানুষের বিকৃত মস্তিষ্ক। এই ধরনের পৈশাচিকতার শিকার হয়ে অনেক নারী সমাজ থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করেছে। আবার অনেকেই নিজের জীবন নষ্ট করবার প্রচেষ্টা চালিয়েছে অনেক বার। কেউ কেউ আবার আত্মহত্যা করেছে।  এই সামাজিক অসুস্থতা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে একদিকে যেমন প্রয়োজন কঠোর আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন,  ঠিক তেমনিভাবে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। 

একথা ঠিক যে এই ধরনের বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। তবে তাদের সংখ্যা যে একেবারেই কম বিষয়টি সেই রকমও নয়। সংখ্যা যাইহোক না কেন এদের সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।  তাছাড়া সব সময় সব জায়গাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচরণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা সকলেই জানি যে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্মভূমি। সেই জায়গায় এই ধরনের ঘটনা ঘটাবার সাহস যারা দেখিয়েছে তাদেরকে অতি দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি যে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ানের সদস্যরা ৬ জন দুর্বৃত্তকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করেছে। র‍্যাবের এই তৎপরতার কারণে তাদেরকে সাধুবাদ জানানো যেতেই পারে। 

আমরা এর আগে সিলেটের এমসি কলেজে এরকম একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একজন স্বামী তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে গেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছিল বছর দুয়েক আগে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় উভয় ক্ষেত্রেই ধর্ষকদের চিহ্নিত, গ্রেফতার এবং অতি দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছিল।  তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতা অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপকর্মকে উৎসাহিত করে।  যদিও এখন সরকার ধর্ষণের মামলার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন পাস করেছে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ধর্ষণের শিকার নারী কিংবা তার পরিবার মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে অনেক সময় ধর্ষকরা মুক্ত হয়ে পুনরায় সেই কাজে লিপ্ত হয় অথবা গুরুদণ্ড করেও লঘু শাস্তি পায়। এই অবস্থা থেকে আমাদের সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারকে বিচার প্রক্রিয়া অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

ধর্ষণের মতো অপরাধ বাংলাদেশের সমাজে একটি ক্যানসার হিসাবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশের এবং মিডিয়ার ব্যাপক উন্নয়নের ফলে এই বিষয়গুলো অতি দ্রুত আমাদের নজরে আসছে। এর বাইরেও অনেক ঘটনা গ্রাম অঞ্চলে ঘটে যাচ্ছে যেগুলো আমাদের নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবার জন্য। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবার জন্য কাজ করছে। এত কিছুর পরেও কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের আচরণে পরিবর্তন আসছে না যা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। 

ধর্ষণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে না ওঠার মূল কারণ হচ্ছে ধর্ষণকে সামগ্রিকভাবে সামাজিক সমস্যা হিসেবে সকলে বিবেচনা করে না। যে পরিবারের সন্তান ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, ভয়ঙ্কর ঘটনাটি সেই পরিবারের বিষয় হিসেবেই সমাজে বিবেচিত হয়। অনেকে আবার ভয়ে নিজেদের এই ধরনের ঘটনা থেকে দূরে রাখতে পছন্দ করে বিধায় এই বিষয়ে নাক গলাতে চায় না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে একজন নারী বা একজন সন্তান ধর্ষণের শিকার হলে সামাজিকভাবে এবং মানসিকভাবে সে নিজে এবং তার পরিবার যে পরিমাণ মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করে সেটি অত্যন্ত কঠিন। ফলে এই বিষয়টিকে কোনও ব্যক্তি বা কোনও পরিবারের বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিকভাবে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হলে ধর্ষকরা ভয় পাবে এবং এ ধরনের ঘটনা ঘটাবার আগে বারবার চিন্তা করবে। 

ব্যক্তি পর্যায়ে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের যেমন দায়িত্ব আছে, ঠিক তেমনি সরকারের দায়িত্ব রয়েছে ধর্ষকদের আইনের আওতায় এনে অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের। এই ধরনের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অন্যরা এই ধরনের অপরাধ করার ক্ষেত্রে বারবার চিন্তা করবে। আমাদের আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ। তাছাড়া দ্রুত ট্রাইব্যুনালে কোনও ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তি হলেও মামলার আসামি পুনরায় রিভিউ আবেদন দাখিল করতে পারে। সেখানেও বেশ সময় লাগে  রিভিউ নিষ্পত্তি হতে। এরপরে রিভিউ আবেদন খারিজ হয়ে গেলেও রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন পেশ করতে পারে সাজা মওকুফের জন্য। সামগ্রিকভাবে এই আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে অনেক সময় লেগে যায়।  ফলে যারা এই ধরনের অপরাধ ঘটায় তাদের মধ্যে ভয় কমে যায়।

যৌনতা আমাদের সমাজে একটি গোপনীয়  বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। উন্নত বিশ্বে শিশুরা যখন বেড়ে ওঠা শুরু করে তখন তাদেরকে এই বিষয়ে জ্ঞান দান করা হয়। ফলে সময়ের সাথে সাথে তারা এটিকে একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এ বিষয়টি একটি গোপনীয় বিষয় হিসেবে রয়ে যাওয়ার কারণে কিছু মানুষ সবসময় এই বিষয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যায়। ফলে মাধ্যমিক স্তর থেকে পাঠক্রমে যৌনতাকে অন্তর্ভুক্ত করে আমাদের সন্তানদের এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হলে এই বিষয়টিও খুব দ্রুত উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হবে। তখন আচরণগত পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর সংখ্যা কমে যাবে। 

আমরা সবাই জানি যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। তিনি ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিতের জন্য যে ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তা সবই নিয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরে সব সময় কড়া নির্দেশনা রয়েছে ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু তারপরেও কিছু ঘটনা ঘটছে যা মানুষের মনে দাগ কাটছে।  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাথায় রাখতে হবে যে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য। তাদের প্রত্যাশা থাকে যে তাদের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে একদিন বিভিন্ন পর্যায়ে দেশকে নেতৃত্ব দেবে।  কিন্তু একজন সন্তানকে শিক্ষা গ্রহণ করতে এসে এই ধরনের ঘটনার শিকার হতে দেখলে অনেক বাবা-মা আছে তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা কেন্দ্রে প্রেরণ করতে দ্বিধা বোধ করতে পারে।  ফলে, এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে কোথাও যেন না ঘটে সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সরকার এবং সর্বোপরি জনগণকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আসুন আমরা সকলে ধর্ষকদের না বলি এবং ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। 

লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বাদপড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিও আবেদন ২১ জুলাইয়ের মধ্যে
বাদপড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিও আবেদন ২১ জুলাইয়ের মধ্যে
৯ ও ১১ জুলাই বন্ধ থাকবে রংপুর এক্সপ্রেস
৯ ও ১১ জুলাই বন্ধ থাকবে রংপুর এক্সপ্রেস
জনসনের পতনে উচ্ছ্বসিত রাশিয়া
জনসনের পতনে উচ্ছ্বসিত রাশিয়া
ট্রাক-পিকআপে বাড়ির পথে
ট্রাক-পিকআপে বাড়ির পথে
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ