X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

রাজনীতিতে ঠাট্টা: আগে ছিল এখন নেই

মাসুদা ভাট্টি
২৫ মে ২০২২, ২০:২৩আপডেট : ২৫ মে ২০২২, ২০:২৩

এক সময় পৃথিবীতে যখন রাজনীতি ছিল তখন রাজনীতিবিদদের ‘ঠাট্টা’ও বিখ্যাত ছিল। এখন পৃথিবীময় রাজনীতি হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং অন্যকে কোনও ছাড় না দেওয়া এক রেষারেষির জায়গা। ফলে আমরা আর আগের মতো ‘ঠাট্টাপ্রিয়’ রাজনীতিবিদদের দেখছি না কোথাও। এমনকি একথাতো জোর দিয়েই বলা যায় যে, স্নায়ুযুদ্ধোত্তর মোটা দাগের বাণিজ্যনির্ভর পৃথিবীতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ‘স্টেটসম্যান’ বা নেতাও তৈরি হচ্ছেন না, যাকে এক বাক্যে সকলেই মেনে নেবেন এবং মান্য করবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনকে গণতান্ত্রিক বিশ্বে গুরুতর মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। দুঃখজনক সত্য হলো, এই দু’টি দেশ থেকেও সত্তর দশকের পর এমন কোনও নেতা বেরিয়ে আসেননি যাকে বিশ্ব একবাক্যে মেনে নেবে বা মান্যতা দেখাতে পারে। এমনকি বারাক ওবামার মতো কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টও বিশ্বনেতা হয়ে উঠতে পারেননি, যদিও গোটা বিশ্ব তাকিয়েছিল তার এই নেতা হওয়ার দিকেই। সে যা হোক, আজকে আলোচনা করতে চাই বিশ্বনেতাদের ‘ঠাট্টা’ বিষয়ে।

পৃথিবীতে গণতন্ত্র আসার আগে রাজতান্ত্রিক পৃথিবীতে রাজারা রসিকতা পছন্দ করতেন বটে কিন্তু সেটা প্রায়ই সইতে পারতেন না। কথায় কথায় ‘শিরচ্ছেদের’ ঘোষণা আসতো রসিকতার জবাবে। কিন্তু পৃথিবী যতই গণতান্ত্রিক, উদার এবং সহনশীল হয়ে উঠেছে ততই রাজনীতিতে রসিকতা কিংবা ঠাট্টার একটা আলাদা মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে এবং রাজনীতিবিদদের রসিকতাকে গুণ হিসেবেই দেখার প্রবণতা বেড়েছে। জার্মান ইতিহাসবিদ জেন দেখিয়েছেন যে, রোমান সভ্যতার শুরুতেই রোমান রাজনীতিবিদ, দার্শনিক সিসেরো তার প্রতিদ্বন্দ্বী এক রাজনৈতিক নেতা ক্লডিয়াসের বিরুদ্ধে তার আপন বোন ও ভাইয়ের সঙ্গে যৌনমিলনের অভিযোগ আনলেন, যা ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উত্তরে ক্লডিয়াস বললেন যে, সিসেরো’র আচরণ একজন ‘রাজা’র মতো হয়ে উঠছে দিন দিন। রোমান রিপাবলিক-এ ‘রাজা’র কোনও স্থান ছিল না, ফলে ‘রাজা বা কিং’ শব্দটি একটি ভয়ংকর গালি হয়ে উঠছিল। ঐতিহাসিক জেন এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক রসিকতা’ বা ‘পলিটিক্যাল উইট’-এর বিশিষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আধুনিক গণতন্ত্রে ফিরি এবং শুরু করা যাক উইনস্টন চার্চিলকে দিয়েই। তিনি কে ছিলেন সেটা নতুন করে বলার কিছুই নেই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর বিশ্বে চার্চিলকে নেতাদের নেতা মনে করা হয়ে থাকে, যদিও তার সমালোচকরা বলে থাকেন যে, তিনি আসলে মনে-মননে-চরিত্রে একজন কট্টর সাম্রাজ্যবাদী নেতা ছিলেন এবং তিনি গান্ধীকে ‘উলঙ্গ ফকির’ বলা থেকে শুরু করে হেন কোনও অপবাদ নেই যে দেননি। যদিও তার পক্ষের লোকজন এসবকে রসিকতা হিসেবেই ধরে নেন। যেমন, ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সে প্রথম নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসা লেডি ন্যান্সি এ্যাস্টন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে চার্চিল বলেছিলেন, হাউস অব কমন্সে একজন নারী থাকা মানে হচ্ছে আপনার স্নানঘরে একজন অবাঞ্ছিত ব্যক্তির ঢুকে পড়া। এর উত্তরে লেডি এ্যাস্টন বলেছিলেন, আপনি এরকম ভয় পাওয়ার মতো সুদর্শন নন। চার্চিল-এর ‘চেহারা’ নিয়ে সে সময় ও পরবর্তীকালে আরও অনেক রসিকতা চালু ছিল। একবার লেডি এ্যাস্টন বলেছিলেন যে, আমি যদি এই ভদ্রলোকের স্ত্রী হতাম তাহলে তার চায়ের কাপে বিষ দিয়ে দিতাম। উত্তরে চার্চিল বলেছিলেন, আমি যদি আপনার স্বামী হতাম তাহলে আমি নিশ্চিন্তে সে বিষ পান করে নিতাম। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সে সময় লেডি এ্যাস্টনের বিরুদ্ধে চার্চিলকে হত্যাচেষ্টার কোনও অভিযোগ কোনও পক্ষ থেকে দায়ের করা হয়নি।

চার্চিলের রাজনৈতিক রসিকতা বিষয়ে আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং পরবর্তীতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার ক্লেমেন্ট এ্যাটলি সম্পর্কে চার্চিল একবার বলে বসলেন যে, এ্যাটলি আসলে ভেড়ার পোশাক পরা আরেকটি ভেড়া। স্যার এ্যাটলি এর উত্তরে কী বলেছিলেন তা ইতিহাসে বিশেষ উল্লেখ নেই। কিন্তু ব্রিটেনের আরেকজন বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন ডিজরেইলিকে একজন সংসদ সদস্য পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বললেন যে, স্যার আপনার মৃত্যু হবে হয় ফাঁসিকাষ্ঠে নয় ভয়ঙ্কর কোনও রোগে। উত্তরে ডিজরেইলি বলেন, স্যার সেটা নির্ভর করছে যদি আমি আপনার নীতি গ্রহণ করি অথবা আপনার প্রেমিকাকে আলিঙ্গন করি। রাজনীতিতে বিশেষ করে তখনকার রাজনীতিতে এরকম রসিকতাকে মানুষ শুধু সহজভাবেই নিয়েছিল তাই-ই নয়, বরং রাজনীতিবিদদের যোগ্যতার মাপকাঠিতে এই রসিকতার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করা হতো।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে অত্যন্ত মজাদার সব কৌতুক প্রচলিত রয়েছে। এমনিতেই রুশ ‘আনেকদোত’ ভূবনবিখ্যাত। ১৯৬০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান ভাষণ দিচ্ছিলেন তখন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ প্রচণ্ড জোরে হাসছিলেন এবং ডেস্কের সঙ্গে জুতো ঠুকে আনন্দ করছিলেন। মি. ম্যাকমিলান নিজেও নাকি ক্রুশ্চেভের এই কাণ্ডে হেসেছিলেন। ১৯৪০ সালে ব্রিটেনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ কেনেডি এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেথ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘রাণীর মাথায় তার দেশের মন্ত্রিসভার সকল সদস্যদের চেয়ে বেশি ঘিলু  (ব্রেইন) আছে’ এবং ব্রিটেনের গণতন্ত্র ‘ফিনিসড’ (শেষ) হয়ে গিয়েছে। অবশ্য এ কারণে তাকে চাকরি খোয়াতে হয়েছিল।

ইতিহাস থেকে ফিরে আসা যাক বর্তমানে। বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যখন ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন তখন হাউস অব কমন্সে বলেছিলেন যে, তিনি রসিকতা খুব ভালোবাসেন কারণ ঠাট্টাচ্ছলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রতিপক্ষ কিংবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তিনি নানারকম রসিকতা করে ‘ধরা খেয়েছেন’, তবে তিনি একবার এক কূটনৈতিক আসরে বললেন যে, আমরা আপনাদের আক্রমণ করেছি, জয় করেছি, আপনাদের শাসন করেছি কিন্তু আমরা আজকে সকলেই বন্ধু। আসরে উপস্থিত আরব ও আফ্রিকার কূটনীতিকদের বিষয়টি ভালো লাগার কথা নয়, লাগেওনি। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল তখন পত্রপত্রিকায়। ২০১৭ সালে বরিস জনসন হঠাৎ করেই উপুর্যুপরি বোমার আঘাত ক্ষতিগ্রস্ত লিবিয়ার সার্তে শহর নিয়ে রসিকতা করে বলেন যে, শহরটি চাইলেই দুবাই হয়ে উঠতে পারে তবে সে জন্য তাদেরকে আগে লাশের স্তুপ সরাতে হবে। ‘ব্যাড জোক’-তো বটেই, ‘ব্লযাক জোক’-ও বটে।

তবে বিশ্বময় রাজনীতির এই দূরবস্থায় সদ্য ক্ষমতা হারানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে ঠাট্টা বা রসিকতা তা লোক হাসিয়েছে বটে কিন্তু তা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। যদিও বেচারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পৃথিবী বিশেষ করে গণমাধ্যম যেন গ্রহণই করতে পারেনি, সমালোচনা ছাড়া তার ভাগ্যে তেমন কিছুই জোটেনি। তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনকে ‘লিটল রকেট ম্যান’ বলে ঠাট্টা করে বললেন যে, তার ‘নিউক্লিয়ার যন্ত্রটি’ এই ‘লিটল রকেট ম্যান’-এর তুলনায় বড়। কিমও কম যান না, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বললেন, অসমর্থ এক বৃদ্ধ। যদিও এই দুই নেতাই শেষ পর্যন্ত শান্তি আলোচনায় বসেন এবং পৃথিবীকে অসুস্থ পারমাণবিক  অস্ত্র প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষার চেষ্টা করেন। আর ট্রাম্পের আমলে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের পাঠানো ই-মেইল প্রকাশিত হয়ে পড়ায় সেখানে তার সম্পর্কে ভয়ঙ্কর সব কটাক্ষ থাকায় রাষ্ট্রদূতকে পদত্যাগে চাপ দেওয়া হয় এবং তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। রাষ্ট্রদূত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে টার্মিনেটর চলচ্চিত্রের নায়ক আর্নল্ড সোয়ার্জনেগারের সঙ্গে তুলনা করেন এবং বলেন যে, প্রেসিডেন্ট বিশ্বময় আগুন জ্বালিয়ে তার ভেতর দিয়ে সোয়ার্জনেগারের মতো বীরদর্পে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। দুঃখজনক হলো, এ কথা কেবল ট্রাম্পের ক্ষেত্রে নয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী সকল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

রাজনীতিতে ঠাট্টা বা রসিকতা বিষয়ে এত তথ্য কোথায় পেলাম? আর কেন তুলে ধরলাম?

বাংলাদেশে এক সময় রাজনীতিতে ঠাট্টা বা রসিকতা ছিল। সামরিক শাসনামল থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক রসিকতা নির্বাসনে যেতে যেতে এখন সেটা দুর্লভ হয়ে উঠেছে। এখন সরকারও ঠাট্টা নিতে পারে না, রাজনৈতিক কার্টুন বন্ধ হয়েছে বহুদিন হয়। এবং সরকার-বিরোধীরাও আর ঠাট্টা নিতে পারেন না আজকাল। বাংলাদেশে গেলো কিছুদিন ধরে কিছু বক্তব্য ও তার পাল্টা বক্তব্য হিসেবে হাস্যকর ‘হত্যাচেষ্টা’র অভিযোগ দেখে এ বিষয়ে একটু পড়ালেখা করার চেষ্টা করেছি এবং দেখতে পেলাম যে, হাস্যরস এবং ঠাট্টা পৃথিবীর সর্বত্রই রাজনীতিতে সিদ্ধ শুধু নয়, জনগণও এই ঠাট্টায় সমানভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশেই কেবল এ নিয়ে বিরাট সব আলোচনার সৃষ্টি হয় এবং তাতে দেশের বিরাট বুদ্ধিজীবীগণও অংশগ্রহণ করেন। যদিও যখন গ্রেনেড হামলা করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে, একের পর এক বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যা করা হয় তখন তারা বিবেক বন্ধক দিয়ে দেন কোথাও না কোথাও। রাজনীতিকে এরা দমবদ্ধ পানাপুকুরে পরিণত করতে চান, যে পুকুরে মাছেরাও বেঁচে থাকতে পারবে না ‘কুতঃ মনুষ্য’।

লেখক: এডিটর ইনচার্জ, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

 

[email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তেলের উৎপাদন কমাচ্ছে ওপেকপ্লাস, দাম বাড়ার আশঙ্কা
তেলের উৎপাদন কমাচ্ছে ওপেকপ্লাস, দাম বাড়ার আশঙ্কা
গাজীপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ী ও কলেজছাত্র নিহত
গাজীপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ী ও কলেজছাত্র নিহত
মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব জামিনে মুক্ত
মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব জামিনে মুক্ত
রাতে ভক্তদের ভিড় পূজামণ্ডপে
রাতে ভক্তদের ভিড় পূজামণ্ডপে
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ