X
সোমবার, ০৮ আগস্ট ২০২২
২৪ শ্রাবণ ১৪২৯

সময়টা চরম লজ্জার

আবদুল মান্নান
০৫ জুলাই ২০২২, ১৭:১৪আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২২, ১৭:১৪
সপ্তাহ খানেক ধরে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে দেশের বাইরে। সবকিছু ঠিক থাকলে সামনের আগস্ট মাসে আমার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা জীবনের ঊনপঞ্চাশ বছর পূর্ণ করে পঞ্চাশে পা দেওয়ার কথা রয়েছে। চিন্তা করছিলাম যাপিত জীবন সম্পর্কে কিছু একটা লিখবো। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশে শিক্ষকদের যে অবস্থা দেখছি তারপর নিজের ওপর কেমন জানি একটা চরম ঘেন্না ধরে গেছে। কারণ, যাদের সম্পর্কে বলবো তারা সকলে আমার সহকর্মী, যাদের একসময় বলা হতো মানুষ গড়ার কারিগর।

১৯৭৩ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন যখন শুরু করি তখন বেতন ছিল ৪৫০ টাকা। উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজল বঙ্গবন্ধুকে বলে শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। দুই সপ্তাহ অন্তর দুই কেজি গম আর আধ কেজি চিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা হাজার পাঁচেক হবে। শিক্ষক একশ’র মতো। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও শিক্ষকদের যে সম্মান করতো তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অচিন্তনীয়। ১৯৯৬ সালে যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের আচার্য, যখন আমাকে উপাচার্যের দায়িত্ব দিলেন, তখন আমি ক্যাম্পাসে ছিলাম। তখন ক্যাম্পাসে যে ক’জন সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন তাঁদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সন্ধ্যার পর সালাম করে দোয়া নিয়ে এসেছি। পরদিন নতুন পদে যোগ দিলাম। এর ক’দিন পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে এক সভা। তখন দেশে সর্বমোট উপাচার্যের সংখ্যা মোট ছয় জন। কমিশনের বর্তমান অফিসে গিয়ে দেখি আমার শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ হাবিবুল্লাহ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছেন। তাঁকে দেখেই পা ছুঁয়ে সালাম করতে তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর তিনি তাঁর ক্লাসে সুযোগ পেলেই এই কথা ছাত্রদের বলতেন। বলতেন– ‘আমার ছাত্রদের নিয়ে গর্বিত’। তেমন কথা বলার সুযোগ শিক্ষকদের জন্য  দ্রুত সীমিত হয়ে আসছে। এরপর আমি আমার যে ক’জন স্কুলশিক্ষক তখনও বেঁচে ছিলেন তাঁদের দোয়া নিয়ে এসেছি।

উপরের ব্যক্তিগত কিছু কথা বলতে হলো গত কয়েক সপ্তাহে দেশে ঘটে যাওয়া কিছু মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে। শুরুটা সম্ভবত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে যখন একজন তথাকথিত জনপ্রতিনিধি একজন স্কুল শিক্ষককে সকলের সামনে কান ধরে ওঠ-বস করালেন। এখনও ওই ঘটনার কথা মনে হলে মনটা অসম্ভব বিষিয়ে  ওঠে। তখন কবি কাজী কাদের নেওয়াজের বিখ্যাত কবিতা ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে যায়। কবি কাজী নেওয়াজ ১৯০৯ সালে বর্তমান ভারতের বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৮৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জীবনে কবিতা লিখেছেন অনেক, তবে তাঁর উপদেশমূলক কবিতাগুলো এখনও তাঁর সেরা কবিতা বলে গণ্য হয়। যদিও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এসব কবিতার আবেদন বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রায় হারিয়ে গেছে। তাঁর ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটির প্রেক্ষাপট মোগল বাদশাহ আলমগীরকে কেন্দ্র করে । বাদশাহর ছেলেকে দিল্লির এক মৌলভী পড়াতেন। একদিন বাদশাহ দেখেন তাঁর পুত্র মৌলভীর পায়ে একটি পাত্র হতে পানি ঢালছে আর মৌলভী ওজু করছেন। বাদশাহ যে এই দৃশ্য দেখেছেন তা মৌলভীর চোখ এড়ায়নি। তিনি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বাদশাহ নামদার এই দৃশ্য দেখে কি না মনে করেন। তাঁর শাহজাদা একজন মৌলভীর পায়ে পানি ঢালছে। তারপর মনে মনে তিনি চিন্তা করেন ‘আমি ভয় করি  না’ক, যায় যাবে শির টুটি, শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার, দিল্লিপতি সে তো কোন ছার।’ পরদিন সকালে মৌলভীর ডাক পড়লো বাদশাহর দরবারে। বাদশাহ মৌলভীকে তাঁর খাস কামরায় ডেকে নিয়ে বলেন ‘শুনুন জনাব তবে, পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে? বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনদের অবহেলা, নহিলে সেদিন দেখিলাম সকাল বেলা। ... সেদিন আমি প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন, পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ। নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা মনে।’ মৌলভী দাঁড়িয়ে বাদশাহকে সম্মান জানিয়ে বলেন ‘আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির, সত্যই তুমি মহান বাদশাহ আলমগীর’। সেটি এখন অনেকের জন্য হয়তো একটা কল্পকাহিনি।

গত কিছু দিন ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে সমাজে শিক্ষকদের যে মর্যাদা একসময় ছিল তা এখন পুরোপুরি বিতাড়িত। শিক্ষকরা এখন অনেকের অনুগ্রহে কোনও রকমে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে বর্তে আছেন। সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি সমাদৃত কালো টাকার মালিক, বড় রকমের বাটপার, ব্যাংক ডাকাত, অসৎ রাজনীতিবিদ, মাফিয়া চক্র, দলীয় মাস্তান আর সকলের ওপর সরকারি সাবেক বা বর্তমান আমলা। আমলারা তো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন। উপ-উপাচার্য পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে থাকতে কমিশনকে যুগোপযোগী করতে আইন বদল করে তাকে হায়ার এডুকেশন কমিশনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রীরও খুব আগ্রহ ছিল। মন্ত্রী পরিষদ হয়ে তা সচিব কমিটিতে গেলে তা যে রূপ পেলো তা হচ্ছে শেষতক কমিশন হবে, তবে তা হবে অনেকটা সচিব পুনর্বাসন কেন্দ্র। অনেক দেনদরবার করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গিয়ে তা থামিয়েছি।

একসময় পাড়ায় মহল্লায় বা স্কুলে কোনও অনুষ্ঠান হলে সেখানে প্রধান অতিথি হতেন স্থানীয় কোনও অবসরপ্রাপ্ত বা কর্মরত শিক্ষক। এখন রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রধান অতিথি না করলে অনুষ্ঠানই ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। আয়োজকদের নিগৃহীত হতে হয় দলের মাস্তানদের হাতে। কোনও কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় থানার বড় দারোগাও এখন প্রধান অতিথি হয়ে আসেন। একসময় সরকারি ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের অবস্থান ছিল দুই কী তিন নম্বরে। এখন তাদের কোনও অবস্থান আর কোথাও নেই। বিশ্বের অনেক দেশে এমনকি আফ্রিকার অনেক দেশেও সব স্তরের শিক্ষকদের যে মর্যাদা দেওয়া হয়, তার ধারে-কাছে বাংলাদেশ নেই। ফিনল্যান্ডে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সর্বোচ্চ বেতন দেওয়া হয়।

শিক্ষকদের যে অমর্যাদা নারায়ণগঞ্জে কিছু দিন আগে  শুরু হয়েছিল তা এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ছাত্রদের দ্বারা এখন শিক্ষকদের পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে এই বাংলাদেশে। নড়াইলে একজন নিরপরাধ শিক্ষকের গলায় পুলিশের সামনে জুতার মালা গলায় দেওয়ার যে ঘটনা ঘটলো তা নজিরবিহীন, লজ্জার। এটিতে শুধু একজন শিক্ষকের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে তা বললে ভুল হবে, জুতার মালা পরানো হয়েছে সারা জাতির গলায়। আর যে পুলিশ নিয়ে গর্ব করার মতো অনেক কাজ এই বাংলাদেশে ঘটেছে তাদের একটা বড় অংশ তো এখন অনেকটা নপুংসকের ভূমিকা পালন করছে বলে মনে হয়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার মামলা হয়েছে ঘটনার নয় দিন পর। এর কি কোনও ব্যাখ্যা পুলিশ দিতে পারবে? এসব ঘটনার কিছু দিন আগে এক স্কুলে হিজাব পরা না পরা নিয়ে এক শিক্ষয়িত্রীকে অপদস্থ করা হয়েছে। ধর্ম আর বিজ্ঞান নিয়ে বিতর্ক তুলে আর একজন শিক্ষককে হাজতে ঢুকানো হয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা বর্তমানে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি বললে কি ভুল বলা হবে ?

এবার আসি জাতীয় সংসদে, যাকে একসময় পবিত্র জাতীয় সংসদ বলা হতো। বর্তমান সংসদের প্রায় আশিভাগই ব্যবসায়ী। ব্যারিস্টার আছেন কয়েক গণ্ডা। যেদিন বেগম জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি আবদুর রশিদকে সংসদে ঢুকিয়েছেন  সেদিন হতে সংসদের পবিত্রতা নষ্ট হয়েছে।  এই সংসদে দাঁড়িয়ে মাঝে মধ্যে কতিপয় ‘সম্মানিত’ সংসদ সদস্য যে ধরনের অসত্য কথা বলেন বা কোনও একটি বিষয়ের খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরে দেশের মানুষকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন, তা শুনলে বা দেখলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। পদ্মা সেতু নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অসত্য কথা বলা হয়েছে এই জাতীয় সংসদে। বাইরে বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের কথা বাদই দিলাম। সেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে একজন সংসদ সদস্য অবলীলাক্রমে বলে গেলেন সরকার স্কুল পাঠ্যবই হতে ধর্ম শিক্ষা বাদ দিয়েছে। আর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগলো না। শিক্ষামন্ত্রী পুরো সত্যটা তুলে ধরে জানালেন, ধর্মীয় শিক্ষা তো তুলে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না; বরং সকল ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা আরও যুগোপযোগী করা হয়েছে। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দু’একটি দেশ ছাড়া আর কোনও দেশে হয় বলে জানা নেই।
 
তুরস্ক বিশ্বে মুসলমান প্রধান দেশ হিসেবে সর্ব ক্ষেত্রেই সব মুসলমান প্রধান দেশের চেয়ে সবদিক দিয়ে শক্তিশালী। কথা উঠলেই বলা হয় সেই দেশের প্রেসিডেন্ট কোরআনে হাফেজ। ভালো কথা। কিন্তু ক’জনে এই খবর রাখেন যে সেই দেশে যেখানে সেখানে মসজিদ বানানো যায় না বা চাইলেই যে কেউ মসজিদের ইমাম হতে পারেন না। তার জন্য পৃথক অনেক আইন-কানুন আছে, ইমাম যিনি হবেন ইসলাম সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান থাকতে হবে। ধর্ম সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকতে হবে ।  একবার ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত ব্লুমসকে (সুলতান আহমদ মসজিদ) নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম (নির্মাণ ১৬০৯-১৬১৬)। মসজিদের ভেতরে দেখি দেয়ালের গায়ে বেদ থেকে শুরু করে পবিত্র কোরআনে সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কী বলা  আছে তা বড় বড় হরফে ইংরেজি আর তুর্কি ভাষায় লেখা আছে। ভাবা যায় এমন একটি কাণ্ড বাংলাদেশে ঘটেছে? বাংলাদেশে যেমনভাবে মসজিদের সংখ্যা বেড়েছে ঠিক তেমনি বেড়েছে অর্ধশিক্ষিত কাটমোল্লাদের দৌড়। জুমার দিনে মসজিদের ভেতরে জায়গা না পেয়ে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নামাজ পড়েন। কিন্তু অন্য দিকে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে প্রতারক, ঘুষখোর, কালো টাকার মালিক আর বাটপার । তাহলে এ তো যে ধর্ম শিক্ষা নিয়ে হইচই তাতে ফল কী হলো ? সেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে একজন সংসদ সদস্য একজন সম্মানিত সাবেক উপাচার্যের শিক্ষকতার যোগ্যতা নিয়ে বেমালুম সব অসত্য কথা বলে গেলেন। এই বিষয়ে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন শিক্ষক সত্যটা তুলে ধরেছেন। সেই সংসদ সদস্য কি তাঁর অসত্য বক্তব্যের জন্য সেই শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইবেন?

আসলে সার্বিকভাবে শিক্ষকদের এই অমর্যাদা বা অসম্মান কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কোনও কোনও ক্ষেত্রে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন হয়েছে ঠিক কিন্তু সর্বনাশ হয়েছে আমাদের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে। সেটি এখন সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেন, একজন মানুষের প্রথম পাঠশালা হচ্ছে তার গৃহ। বাবা-মা তার প্রথম শিক্ষক। ক’জন বাবা-মা তাদের এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন? বেশিরভাগ বাবা-মা এখন মনে করেন সন্তান জন্ম দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ। কিন্তু তাঁদের জন্ম দেওয়া সেই সন্তান হয়তো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে ঠিক, কিন্তু সঠিক মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাটা কি সে পাচ্ছে? এখানে শিক্ষকদেরও একটি বড় ভূমিকা আছে। শিক্ষকদের কর্তব্য যদি শুধু ক্লাস আর পরীক্ষা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে চড়া মূল্য দিতে হবে, যার আলামত সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে। যারা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেন, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তারা পাঠ্যপুস্তকে কি কবি কাজী কাদের নেওয়াজের মতো কবিদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত করার কথা কখনও ভেবে দেখেছেন। বা নজরুলের সাম্যবাদের কবিতা বা রচনাগুলো? কিংবা কবি তারাপদ রায়ের ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’ কবিতাটি? ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য ইসলামের নবী কি বলেছেন সেসব বক্তব্য? নাকি যাদের এসব বই-পুস্তক রচনা করতে দেওয়া হয় তারা এসব বিষয় সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ?

এমনটি চলতে থাকলে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ তালেবানি আফগানিস্তান হতে বেশি সময় লাগবে না। সময় থাকতে সাবধান হওয়া ভালো। আর যে সকল শিক্ষক সম্প্রতি নানাভাবে ছাত্র বা সমাজের কাছে নিগৃহীত হয়েছেন তাদের সম্মান তো আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয় কিন্তু অপরাধীদের শাস্তি তো দিতে হবে। সেদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক শিক্ষক লিখেছেন তিনি ক্লাসে এখন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লাল সালু’ পড়াতে ভয় পান। এমন লক্ষণ অন্ধকার যুগে প্রবেশের পূর্বচিহ্ন।

সব শেষে শিক্ষক সম্পর্কে তিন জন বিখ্যাত ব্যক্তির বক্তব্য দিয়ে লেখাটি শেষ করি, যদি কারও কাজে লাগে। ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম একজন বিরাট মাপের পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁকে যখনই প্রশ্ন করা হতো তিনি কি হিসাবে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে চান? তিনি চোখের পলকেই বলতেন একজন শিক্ষক হিসেবে। তিনি আরও আক্ষেপ করে বলতেন, একজন ডাক্তার চান তাঁর ছেলে ডাক্তার হবেন, একজন প্রকৌশলী চান তাঁর সন্তান প্রকৌশলী হবেন, কিন্তু কোনও শিক্ষক চান না তাঁর ছেলে শিক্ষক হোক। যারা পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে ঘটনাচক্রে শিক্ষক হয়েছেন তাদের অনেকেই সুযোগ পেলেই চলে যেতে চান প্রশাসন ক্যাডার সার্ভিসে। কারণ, ওই সার্ভিসের ক্ষমতা অসীম । দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল। ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিলো তাঁকে স্যার খেতাবে ভূষিত করা হবে। তিনি বললেন এক শর্তে এই খেতাব নিতে পারেন। আগে তাঁর শিক্ষক মৌলভী মীর হাসানকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
 
ব্রিটিশ সরকার জানতে চাইলেন তিনি এমন কি করেছেন যে তাঁকে স্বীকৃতি দিতে হবে? ইকবাল উত্তর দিলেন– ‘তিনি আমাকে তৈরি করেছেন’। ব্রিটিশ সরকার মেনে নিলেন। ইকবাল জানালেন তাঁর শিক্ষক শিয়ালকোটে থাকেন এবং খুব অসুস্থ। তাঁকে স্বীকৃতি দিতে হলে শিয়ালকোটে গিয়ে তা  দিতে হবে। ব্রিটিশ সরকার তা-ই করেছিলেন। বিশ্ব ইকবালকে চিনেছিল তাঁর কর্ম দিয়ে আর তিনি তাঁর শিক্ষক মৌলভী মীর হাসানকে চিনিয়েছিলেন বিশ্বকে। সব শেষে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়া ড. আবদুস সালাম। খবরটা যখন তাঁকে দেওয়া হলো, জানালেন তিনি তাঁর স্কুল শিক্ষক অনীলন্দ্র গাঙ্গুলীর সাথে প্রথম দেখা করবেন। তারপর তিনি তাঁর পুরস্কার নিতে যাবেন। ভারত সরকারকে অনুরোধ করা হলো সেই শিক্ষককে খুঁজে বের করতে। তাই করলো  ভারত সরকার। অনীলন্দ্র গাঙ্গুলী তখন শয্যাশায়ী। ড. সালাম তাঁর শিক্ষকের ফোনে কুশলাদি জানতে চাইলেন। পরে ড. সালাম তাঁর শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাত মাথায় নিয়ে আশীর্বাদ নিলেন এবং তাঁকে নোবেল পাওয়ার সংবাদটি দিলেন এবং বললেন, আজ তিনি যে পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর সকল কৃতিত্ব তাঁর। বাংলাদেশ কি এমন ঘটনার জন্ম দিতে পারবে আগামীতে?

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পীরগজ্ঞে তাণ্ডবের মামলায় ৫১ আসামির আত্মসমর্পণ
পীরগজ্ঞে তাণ্ডবের মামলায় ৫১ আসামির আত্মসমর্পণ
হিরো আলমকে আটকের তথ্য ঠিক নয়: পুলিশ
হিরো আলমকে আটকের তথ্য ঠিক নয়: পুলিশ
৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে স্টার্টআপ বাংলাদেশ
৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে স্টার্টআপ বাংলাদেশ
জার্মান নাগরিক কাউসমান আত্মহত্যা করেছেন, ধারণা পুলিশের
জার্মান নাগরিক কাউসমান আত্মহত্যা করেছেন, ধারণা পুলিশের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ