X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের আর্থিক নীতি ও কৌশল

রাশেক রহমান
৩১ জুলাই ২০২২, ২০:২০আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২২, ২০:২০
সাদা চোখে আমরা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেখছি সত্যি, তবে গভীর বিশ্লেষণে বা অন্তরের দৃষ্টিতে দেখলে দেখা যায় এটি মূলত রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। বিতর্ক হতে পারে এ যুদ্ধ আরও আগেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে বিতর্কে না গিয়ে এই যুদ্ধের যে ভয়াবহতা ও ফলাফল সেসব থেকে নিজেকে রক্ষা করাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত ও সঙ্গত বলে মনে করছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রতিটি উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। অর্থনীতিতে কনজামশন বান্ডেল (Consumption Bundle) নামে একটি তত্ত্ব আছে। এটির মূলভাব হচ্ছে, একটি দেশ যত উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে, সেই দেশের নাগরিকদের ভোগের চাহিদা ও সক্ষমতাসীমা বৃদ্ধি পাবে। স্বাভাবিকভাবে আশির দশকের সংকুচিত কর্মপরিধি ও পরিবেশে একজন ব্যক্তির ভোগের চাহিদা ও সক্ষমতাসীমা নিম্নমুখী। সে-সময়ের তুলনায় বর্তমানে এটির জ্যামিতিক সূচক ঊর্ধ্বমুখী। ব্যক্তির ভোগের চাহিদা ও সক্ষমতাসীমার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে দেশের রফতানি ও আমদানি বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই অগ্রযাত্রায় ছন্দপতন ঘটিয়েছে কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।  

করোনার অতি প্রবল আঘাত-পরবর্তী বিশ্বে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটকে আরও প্রগাঢ় করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরে অত বেশি প্রভাব না পড়লেও সে দেশে ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে, যেটি বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচকে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এখন বিশ্ব চলে মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ডলারের মান শক্তিশালী হওয়ায় যেসব দেশ জ্বালানি তেল, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য এবং ধাতব পণ্য রফতানি করে, তাদের পণ্যের দাম ও রফতানির মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে আছে। বিপরীত চিত্রে আমদানি নির্ভর দেশগুলোর ব্যয় বাড়ছে, রিজার্ভ কমছে। গত দুই মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৮৬.৫০ থেকে ১০২.০০-এ নেমেছে। অর্থাৎ টাকার মানের ১৫.৫০ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। যদিও দ্য ইউএস ডলার ইনডেক্স অনুযায়ী, ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড ও ইউরো, সুইস ফ্রাঁ, চীনের ইউয়ানেরও অবমূল্যায়ন ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যারা শিল্পের কাঁচামাল অথবা সরাসরি ভোগ্যপণ্য আমদানি নির্ভর বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের সবার মূল পুঁজি থেকে ১৫.৫০ শতাংশ হারিয়ে গেছে বা হ্রাস পেয়েছে। এই ১৫.৫০ শতাংশ পুঁজি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে পুঁজির যে সংজ্ঞা বা গাইডলাইন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংকগুলোতে বিদ্যমান তাকে নতুন করে পুনর্সংজ্ঞায়িত করতে হবে। ঋণ দেওয়া বা ঋণের টাকা পুনরুদ্ধারে গ্রাহক ও ব্যাংক উভয় পক্ষের ক্ষেত্রে যেন কোনও খারাপ অভিজ্ঞতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য নতুন নীতি ও কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে টাকার মান ১৫.৫০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে যিনি ১০ লাখ ডলারে পণ্য আমদানি করতে চেয়েছিলেন, তার পণ্যের মূল্য ১৫.৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।

ফলশ্রুতিতে হয় তাকে বেশি দামে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে অথবা প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে আমদানি করতে হচ্ছে। জাতীয়ভাবে এই ১৫.৫০ শতাংশের অ্যাডজাস্টমেন্টের মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কৃচ্ছ্রসাধন তথা মিতব্যয়ী হওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছে সেটি শুধু বিদ্যুৎ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করা প্রয়োজন। একজন সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক এবং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সবার কাছে আমার অনুরোধ, বিশ্ব-সংকটে রাজনীতি নয়, এখন সময় জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বাংলাদেশটা আমাদের সবার। নিছক রাজনৈতিক বিরোধপ্রবণতা ও  দীর্ঘদিনের অভ্যাস এবং চর্চা থেকে বিএনপি দলীয় রাজনীতিবিদদের দেখা যাচ্ছে টিভি টকশো ও জনসভায় বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনীতি করতে, তির্যক মন্তব্য করতে। এ-যেন বাজারে আগুন লাগলে একশ্রেণির মানুষের জন্য আলুপোড়া খাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনা। কিন্তু ওনারা একটি বিষয়কে হয়তো অনুভব করতে পারছেন না অথবা পারলেও শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত স্বীকার করছেন না। বিষয়টি হচ্ছে, অর্জনের জায়গায় আমাদের রেটিং অনেক ওপরে। প্রাসঙ্গিক কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে সত্য। তবু বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৪৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে শুধু ভারত। এ ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশ। গ্লোবাল ইকোনমিক ইনডেক্স বলছে, নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়ামের মতো অনেক উন্নত দেশের চেয়েও আমাদের রিজার্ভ বেশি। কিন্তু অনেক অর্জনের মধ্যেও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের মতো পরাক্রমশালী তো আমরা নই। সুতরাং যখন আমরা পৃথিবীর আর দশটা দেশের ওপর নির্ভরশীল, তখন এই বৈশ্বিক সংঘাত ও সংকটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আসা জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পরামর্শ খুবই প্রাসঙ্গিক ও মাঙ্গলিক। এই নীতির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ না করে বিরোধিতামূলক তির্যক মন্তব্য ও হাস্যরস করা দেশদ্রোহিতার শামিল। কেননা, বিএনপির ওই নেতারা দেশের সার্বিক মঙ্গলের কথা ভাবছেন না, তারা ভাবছেন কীভাবে ধোঁয়াশা তৈরি করে ক্ষমতা দখল করা যায়।

আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে অদম্য স্পৃহা রয়েছে। সংকট মোকাবিলা করে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সাহস রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করার মতো সচেতনতা বোধ রয়েছে। দেশ ও দেশের মানুষকে ধারণ করার মতো দেশপ্রেম রয়েছে। সুতরাং আমরা পরাভূত হবো না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবোই বাঙালি-বিজয়-কেতন নিয়ে। তবে রাজনৈতিকভাবে আরেকবার বিএনপি-জামায়াত নিজেদের প্রমাণ করলো যে বাংলাদেশের অংশ নয়। বাংলাদেশ সৃজনের সঙ্গে তাদের যেমন ইতিবাচক সম্পর্ক নেই, বাংলাদেশের সমৃদ্ধির সঙ্গেও তাদের কোনও ইতিবাচক সম্পর্ক নেই। তারা বিচ্ছিন্ন। তারা সুবিধাবাদী। তারা নিকট ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিণতি বরণ করবে। তাদের নীতি, আদর্শ ও কর্মকাণ্ড সেই বার্তাই দেয়।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ