X
শনিবার, ২২ জুন ২০২৪
৭ আষাঢ় ১৪৩১

মিয়ানমারের ওপর কেন নজর রাখা জরুরি?

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:১৩আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:১৩

বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক তৎপরতাকে দেখে যে কারোরই মনে হতে পারে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমারের ‘যুদ্ধ’ সময়ের ব্যাপার মাত্র।  অনেকেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সামরিক সক্ষমতার তুলনাসহ নানা ধরনের সূচকও প্রকাশ করছেন। সাধারণত দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে এ ধরনের আলোচনা সামনে আসে। অবশ্য দুই দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বা তাদের কী পরিমাণ সাজোয়া যান, অস্ত্র ইত্যাদি আছে তার পরিসংখ্যানের ওপর যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ভর করে না। চলমান ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ তার প্রমাণ। বিশাল সামরিক শক্তির অধিকারী রাশিয়াকে ইউক্রেনের যোদ্ধারা নাকানি চুবানি খাওয়াচ্ছে। ইউক্রেনীয় সেনাদের চেয়ে রাশিয়ার সেনাদের উন্নত প্রশিক্ষণ অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার সেনাদের লড়তে নাকের জল চোখের জল এক হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ভেতরে মিয়ানমারের গোলা ও গুলি ছোড়ার ঘটনা কোনও কোনও গণমাধ্যমে উসকানি বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু আমার কাছে সবদিক বিবেচনা করে মিয়ানমার কর্তৃক উপর্যুক্ত ঘটনাগুলো দুর্ঘটনাক্রমে ঘটেছে বলে মনে হয়েছে। কারণ এই বিষয়টি পরিষ্কার যে মিয়ানমার সৈনাবাহিনী রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মির সঙ্গে যে যুদ্ধে লড়ছে তার পরিপ্রেক্ষিতে ওই গুলি ও গোলা ছোঁড়া হয়েছে। শান্তিকালীন সময়ে ওই ধরনের ঘটনা ঘটলে তা উসকানি হিসেবে বিবেচনা করা যেত। আর মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ সংকটে এতটা জর্জরিত যে তাদের পক্ষে বাংলাদেশকে উসকানি দিয়ে যুদ্ধে নামানোর মতো পরিস্থিতিতে তারা এই মূহূর্তে নেই।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তৎপরতাও বেশ দুর্বল। কারণ ওই এলাকাগুলো খুবই দুর্গম এবং তা মূলত আরাকান আর্মিসহ বিছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর অলিখিত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ওই এলাকায় তাদের প্রভাব বাড়াতে আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু ওই ক্ষেত্রে তারা খুব যে সফল তা বলা যাবে না।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরণে মিয়ানমারের গুলি ও গোলা ছোড়ার ঘটনা বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার যে তরিকা অনুসরণ করছে তা খুবই গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রক্তের মূল্যে কেনা। তাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও ছাড় নয়। মিয়ানমারের গোলা ও গুলি যতবার বাংলাদেশের ভেতরে পড়বে ততবারই বাংলাদেশের উচিত কড়া প্রতিবাদ করা। আন্তর্জাতিক ফোরামে ওই বিষয়টি নিয়ে কথাবর্তা বলা। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের চলমান সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে প্রতিমুহূর্তের খবর সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো। যত দুর্গমই হোক না কেন সীমান্ত এলাকায় টহল দেওয়ায় সচেষ্ট থাকা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ছোড়া মর্টার ও গুলি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পড়লেও একজন সামরিক ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে এই মুহূর্তে মিয়ানমারের বাংলাদেশ আক্রমণের কোনও সম্ভবনা নেই। বাংলাদেশের সাথে কোনও যুদ্ধে এখনই জড়াতে তারা আগ্রহী এমন ভাবারও কোনও কারণ নেই। তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার যুদ্ধে জড়াবে না– এমনটা বলাও কঠিন।

তাই সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মর্টার ও গোলা ছোঁড়ার বিষয়টির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেন্টমার্টিনসহ বঙ্গোপসাগর এলাকায় তাদের তৎপরতা এবং সেন্টমার্টিনকে তাদের মানচিত্রে মিয়ানমারের অংশ বলে প্রকাশ করার ঘটনা মনে রাখা। যদিও বাংলাদেশের প্রতিবাদের মুখে তারা সেন্টমার্টিনকে তাদের মানচিত্র থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু তারা গোপনে গোপনে সেন্টমার্টিনকে তাদের অধিকারে নেওয়ার প্রকল্প বাদ দিয়েছে এমনটি মনে হয় না।

আমার ইউরোপে উচ্চশিক্ষার সময় মিয়ানমারের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপকের সাথে তার গবেষণার বিষয় নিয়ে আলাপ হয়েছিল। তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে মিয়ানমারের ঐতিহাসিক মানচিত্র তৈরি করছেন বলে কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঐতিহাসিক মানচিত্র নিয়ে গবেষণা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য সুখকর হয় না। কারণ সীমান্ত রেখা ঐতিহাসিকভাবে বহুবার পরিবর্তন হয়ে আজকের এই পর্যায়ে এসেছে। কিন্তু প্রাচীন ডকুমেন্টস নির্ভর মানচিত্র তৈরি করা রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে প্রতিবেশীদের এলাকা নিজেদের বলে দাবি করা। তা দখলের খায়েস মনে মনে পোষণ করলেই রাষ্ট্র এমন উদ্যোগ নেয়।

চীনসহ অনেক রাষ্ট্র এক সময় ঐতিহাসিক মানচিত্র নিয়ে গবেষণায় অঢেল অর্থ ব্যয় করেছে। গবেষক নিয়োগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের দায়িত্ব দিয়েছে। মিয়ানমার ওই চীনা মডেল অনুসরণ করছে বলে মনে হয়। তাদের ওই গোপন প্রকল্পের অন্যতম টার্গেট যে বাংলাদেশ তা বলা যায়। সুতরাং বাংলাদেশের উচিত মিয়ানমারের দিকে আরো মনোযোগ দেওয়া। কারণ বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে অদূর ভবিষ্যতেও যুদ্ধের কোনও সম্ভবনা নেই।

আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। যদি আরাকান আর্মি রাখাইন এলাকা অধিকার করতে পারে তাহলে বাংলাদেশ খুব সহজে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে পারবে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য আরাকান আর্মির তখন বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন হবে। একদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে লড়ে অন্যদিকে বাংলাদেশের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে রাখাইনে তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। ফলে তারা বাংলাদেশ সরকারের দাবি মতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে। অথবা বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গাদের আরাকানে পুশব্যাক করে তাহলে তাদের পক্ষে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কঠিন হবে। তাই মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলাফল বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উচিত ওই যুদ্ধের ওপর পূর্ণ নজর রাখা। ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ভোলায় ৫ দিনে ১১টি রাসেলস ভাইপার উদ্ধার, আতঙ্কিত এলাকাবাসী
ভোলায় ৫ দিনে ১১টি রাসেলস ভাইপার উদ্ধার, আতঙ্কিত এলাকাবাসী
গ্রিয়েজম্যানের ব্যর্থতায় ভুগলো ফ্রান্স, অফসাইডে নেদার‌ল্যান্ডসের হতাশা
গ্রিয়েজম্যানের ব্যর্থতায় ভুগলো ফ্রান্স, অফসাইডে নেদার‌ল্যান্ডসের হতাশা
বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেলো স্বামীর, হাসপাতালে স্ত্রী
বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেলো স্বামীর, হাসপাতালে স্ত্রী
ঢাকা-দিল্লি সংলাপের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ঢাকা-দিল্লি সংলাপের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
সর্বশেষসর্বাধিক