X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ হলে ‘স্মার্ট রাজনীতি’ কেন নয়!

নাদীম কাদির
১৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১৬:১৬আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১৮:০৫

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কথা রেখেছেন। আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। এ কারণে দেশ অনেক এগিয়েছে, প্রচুর কর্মসংস্থান হয়েছে। আইটিতে আমূল উন্নয়ন হয়েছে এবং আমরা এখন আউটসোর্সিং করছি যা, সত্যিই বড় অর্জন। আমি মনে করি, শেখ হাসিনাকে আমরা ‘আধুনিক বাংলাদেশের কারিগর’ বলতে পারি। অনেক উন্নয়ন হচ্ছে আমাদের অবকাঠামো সেক্টরে। অনেক মেগা প্রজেক্টের কাজ এখনও চলছে। লক্ষণীয় যে—এগুলোর স্থাপত্য নকশা খুবই রুচিশীল এবং পশ্চিমা দেশের সাথে তুলনীয়। এসব রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যেমন সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর, তেমনি আমাদের নাগরিকদের। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দেখা যায় নাগরিকদের দেশপ্রেম অতি গভীর, তাই সেখানকার মানুষ ভীষণ যত্ন করে সকল কিছু ব্যবহার করে। খুবই শিক্ষণীয় একটা ব্যাপার। এই যে, ভারতে কোথাও রাজনীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে সময় নষ্ট করতে দেখা যায় না। সবাই ব্যস্ত নিজের নিজের কাজে। পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের উন্নয়নকে অভিনন্দন জানিয়ে নিজেদের করুণ অবস্থা কেন হলো তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি তার জন্য গর্বিত। আজ যখন দেশের রাজনীতি দিন দিন উত্তপ্ত হচ্ছে, তখন নিশ্চয় আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশের সাথে জরুরি প্রয়োজন স্মার্ট রাজনীতির। এর প্রথম ইঙ্গিত ছিল যখন বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর অফিস ঘেরাওয়ের হুমকি দেয় তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদীদেরকে চায়ের আমন্ত্রণ জানান। এটি ছিল স্মার্ট রাজনীতি। কিন্তু বিএনপি তাতে কান দেয়নি এবং এটি আনস্মার্ট রাজনীতি। কারণ তারা ২৪ দফা দাবি প্রকাশ করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। পড়তে  ভালো লাগলো ২৪ দফা, আর ভালো লাগলো তারা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য কিছু করার একটা রোড ম্যাপ জনগণকে উপহার দিয়েছে।

রাজনীতির ক্ষেত্রে, দুই মেয়াদের বেশি একজন প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না যা আমি মনে করি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দফা। তার সাথে পরিবারতন্ত্র থাকলেও যোগ্য ব্যক্তি যেন সেই সুবিধা পায় তাও রাখতে হবে।

এতে বড় ব্যাপার হলো নির্বাচন এলে যে উত্তেজনা দেখা যায়, তা কিছুটা কমবে বলে আমি মনে করি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে টেবিলে আনতে পারে যদি ২৪ দফার কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করে। হতে পারে বিএনপি আগের মতো কিছুই করবে না দেশের জন্য ক্ষমতায় আসতে পারলে, তারপরও রক্তক্ষয়ী রাজনীতি থেকে আমরা শান্তিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় চলে আসতে পারব।

এতে আওয়ামী লীগ তাদের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ নিয়ে সামনে এগোতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, বেশকিছু মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না তাদেরকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ  দায়িত্ব দিয়েছেন কেন। শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ছিল এমন, ‘আমরা ক্ষমতায় বেশিদিন ছিলাম না তাই ওরা কী বিশ্বাস করে সেটা বড় না। কম্বল বাছতে গেলে আমাদের কিছুই থাকবে না। আমি সবাইকে সুযোগ দিবো কারণ সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। যারা সেই সুযোগ গ্রহণ করবে না তাদের সরে যেতে হবে। দেশকে সবাই ভালোবাসলে সমস্যা হবে না”।

ওনার এই বক্তব্য মনে করেই আজকের এই লেখা। ধন্যবাদ আপনাকে কিন্তু এখনই আওয়ামী লীগের সাবধান হওয়া উচিত রাজনীতি ধরে রাখার জন্য তা না হলে কিছু বিষয় হারিয়ে যাবে। যেমন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে হলো মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলো। বিএনপি’র ২৪ দফার মধ্যে “ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন” গঠনের প্রস্তাব খুবই কৌতূহল উদ্দীপক। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা বিরোধীদের এবং যুদ্ধাপরাধীদের গ্রহণ করবে না কখনও। বিএনপির পাকিস্তানপ্রীতি আর ওইসব অপরাধীদের সাথে সংঘবিচ্ছেদ স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। আরেকটি হলো মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নতুন তালিকা করা। এর প্রয়োজন কী? আওয়ামী লীগ সরকার একটি তালিকা করছেন তা নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করা কি প্রয়োজন? যদি তালিকায় কোনও ভুল থাকে শুধু সেটুকু আলোচনা করে সংশোধন করা যেতে পারে।

একটা বিষয় মনে হলো—বিএনপি প্রতিশোধ নিতে চায়। তা হলো যখন দেখলাম বিদ্যুৎ খাতে যে দায়মুক্তি আইন করে রেখেছে সরকার, তারা তা বাতিলের তাগিদ দিয়েছে। এটি একেবারে অগ্রহণযোগ্য। কারণ আমরা ভুলে গেছি অন্ধকারে থাকতে এবং আমরা লেখা-পড়া এবং ব্যবসা বাণিজ্য ও কল-কারখানা চালু রাখতে পারছি, এই বিদ্যুতের কারণেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পাল্টে গেছে।

বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে রাখতে পারলে এই উপকারী কাজের ব্যাপারে কেন দায়মুক্তি থাকতে পারবে না! সেখানে অনেক দুর্নীতি হতে পারে কিন্তু জনগণের যে উপকার হয়েছে তা আগে দেখতে হবে। আমি সাধুবাদ জানাবো মিডিয়া কমিশন গঠন করার যে দফা আছে। আমার বইতে (মিডিয়া: অ্যা সাইলেন্ট ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ, ডিসেম্বর ২০২২, পাঞ্জেরী প্রকাশনী) মিডিয়া নিয়ে আলোচনা করেছি। অনেক কাজ আছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার জন্য। তবে বিএনপি আমলে আমাদের মিডিয়া রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং আমাদের বস্তুনিষ্ঠটা নষ্ট হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

প্রধানমন্ত্রীর স্মার্ট বাংলাদেশ অর্জন করতে হলে তার মন্ত্রীসভা এবং আমলাদেরকেও স্মার্ট হতে হবে কাজে-কর্মে। কিছু মন্ত্রীর বক্তব্য আনস্মার্ট যা প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করছে। বেসামরিক আমলারা যেন দুর্নীতি না করতে পারে ও তাদের টার্গেট অর্জন করতে না পারলে শাস্তি দিতে হবে। অনেকই আছেন যারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেন।

রাজনীতিবিদদের বেফাঁস বক্তব্য সরকারকে বিপদে ফেলছে কারণ কূটনৈতিক বক্তব্য ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলার প্রয়োজন, কিন্তু তাদের কিছু কিছু বক্তব্য নির্বাচনের আগমুহূর্তে পরিস্থিতি কঠিন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে মায়ের কান্নার যে ঘটনা ঘটে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে যে মানববন্ধন হয় তা ওয়াশিংটন মোটেও ভালো চোখে দেখেনি। তাদের বক্তব্য ও গতিবিধি সকলের নজর কাড়ছে।

বিদেশিরা রাজনৈতিক যেকোনও বক্তব্য যা বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো মনে হয় তা তারা গ্রহণ কারতে পারছে না। তাদের মনে বিরূপ ধারণা বাসা বেঁধেছে। যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো রাজনীতিবিদের অভাব নেই। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা বিরোধীদের বক্তব্য খণ্ডন করতে পারে এমন বক্তা হাতেগোনা। দেশের মানুষ আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন রাজনৈতিকভাবে বেশি সচেতন। তারা হিসেব-নিকেশ করছে এবং সবার অপছন্দ পুরানো ইতিহাস নিয়ে বারবার টেনে আনা। জনগণ এখন শুধু প্রতীক ও নেতা দেখে ভোট দিতে আগ্রহী না। তারা মনে করে বিএনপি যা খারাপ করেছে তা না বলে সরকারি দল ভালো কথা ও কাজ উপহার দিবে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে। উন্নয়ন তো আছেই, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার জন্য যা চাওয়া তাই গুরুত্ব পাচ্ছে এখন তাদের বিবেচনায়। আমি প্রায় ১০০ জনের মতামতের ভিত্তিতে এই কথাগুলো বললাম।

বিএনপিকে তাদের ভুল স্বীকার করতেই হবে, যেমন বিদ্যুৎ না দিয়ে শুধু খাম্বা বসিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা যা মানুষের কাছে একেবারে গ্রহণযোগ্য না। এতো গভীর শত্রুতা দুই বৃহৎ দলের যা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে যে কীভাবে রাজনীতিতে শান্তি আসবে এবং জাতীয় ঐক্য স্থাপিত হবে।

চাই স্মার্ট রাজনীতি। বিএনপিকে ঐতিহাসিক সত্য মানতে হবে যেমন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে শ্রদ্ধা জানাতে হবে কারণ এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। এটা ঐতিহাসিক সত্য। আওয়ামী লীগকে মানতে হবে প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমানকে প্রাপ্য সম্মান জানানো। এই উদ্যোগগুলো সরকারি দলের নেতাদের নিতে হবে কারণ তাতে স্মার্ট রাজনীতি অনেক ধাপ এগোবে। আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে বিএনপি থাকবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং বিএনপিকে বুঝতে হবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দল। যাদের রাজনীতি অনেক ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু এবং জয় বাংলা স্লোগান শুধু আওয়ামী লীগের না বরং পুরো জাতির। কথাগুলো তাদের ভালো লাগুক আর না লাগুক তাদের মানতে হবে কারণ জনগণ এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রাজনীতিতে রক্ত ঝরুক তা চায় না।

দেশ রাজনীতিবিদদের হাতে এবং এখনই সময় বাস্তবতা মেনে আর ক্ষমতার লড়াই ছেড়ে আমাদের লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে সম্মানের সাথে এগিয়ে নেওয়ার।

দুই পক্ষকে মনে রাখতে হবে অন্যায় করলে জনগণ বেশি দিন তা মেনে নেয় না। প্রধানমন্ত্রীর এতো কষ্টের অর্জন যেন বৃথা না যায়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তা মনে রেখে কাজ করতে হবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সভাপতি, ‘রক্ত ধারা ৭১’

 

/এসএএস/এমএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইরানে ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড
ইরানে ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড
চিকিৎসকদের সুবিধা দেবো, রোগীদের সেবা দিতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
চিকিৎসকদের সুবিধা দেবো, রোগীদের সেবা দিতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
২৪ ঘণ্টায়ও নেভেনি এস আলমের চিনির কারখানায় লাগা আগুন
২৪ ঘণ্টায়ও নেভেনি এস আলমের চিনির কারখানায় লাগা আগুন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষ: পুলিশসহ আহত ৩০, বাড়িঘর লুট-আগুন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষ: পুলিশসহ আহত ৩০, বাড়িঘর লুট-আগুন
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ