X
শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪
২৯ আষাঢ় ১৪৩১

ম্যাক্রোঁর প্রশংসা বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি

ড. প্রণব কুমার পান্ডে
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৯:৩০আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১৯:৩০

একটি ঐতিহাসিক সফরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে এসেছিলেন, যা দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। এই সফর শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ তৈরি করেনি, বরং প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার জন্য বাংলাদেশের অসাধারণ যাত্রার স্বীকৃতি দিয়েছেন।

"ইন্দো-প্যাসিফিক" অঞ্চলে ফ্রান্সের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পৃক্ততার প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশ সফর গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং বাণিজ্য গতিশীলতায় এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বে ফ্রান্সের স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ফ্রান্স আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তনশীল গতিশীলতার মধ্যে কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

এই সফরের মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যের দিগন্ত প্রসারিত করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে একে-অপরের অর্থনৈতিক শক্তি এবং পরিপূরকতা থেকে উপকৃত হতে পারে। তাছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন উভয়ই যে অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সেই রকম একটি ভূ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সফর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গঠনমূলক এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালনের অভিপ্রায়ের একটি স্পষ্ট সংকেত। এই পদক্ষেপটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখিতাকে উৎসাহিত করবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা এবং মানবাধিকারের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কেন্দ্র করে তাঁর সফরে রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। পারস্পরিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার লক্ষ্যে দুটি দেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের প্রশংসা করে ১৭০ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং বিশ্বের অষ্টম সর্বাধিক জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। তাঁর প্রশংসা যে বিষয়টি নিশ্চিত করে তা হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনসংখ্যাগত তাৎপর্যের দিক থেকে বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ম্যাক্রোঁর উচ্চতার একজন বিশ্বনেতার এই স্বীকৃতি শুধু বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার  গতিপথের স্বীকৃতিই নয়, বরং বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য উন্মোচিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখে জাতির সহনশীলতা এবং সংকল্পের একটি প্রমাণ হিসাবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে। ফ্রান্সের মর্যাদাসম্পন্ন একজন বিশ্বনেতার এই অনুমোদন বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।  

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক সূচকের উন্নতিতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশ স্বমহিমায় যেভাবে একটি বিশিষ্ট দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই জন্য বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেন।

তাছাড়া, উভয় নেতা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটি মোকাবিলায়  বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার জরুরি প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ হিসেবে টেকসই সমাধান ও প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য ফ্রান্সের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন, যেখানে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। "আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মান জানাতে চাই, একজন ব্যক্তি যিনি তাঁর  জাতির স্বাধীনতা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সংগ্রামে তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন," তিনি তার সফরের সময় ফরাসি ভাষায় ভিজিটরস বইয়ে নিজে হাতে এই কথাগুলো লেখার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এর উল্লেখযোগ্য অবদানেরও প্রশংসা করেন। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে যৌথ সাংস্কৃতিক সম্পর্কের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে, যা ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।

প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সফর শেষ হওয়ার সাথে সাথে উভয় নেতা ফ্রান্স-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এই সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলো  বিভিন্ন ক্ষেত্রে বর্ধিত সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সমৃদ্ধির নতুন পথ খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের এই প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে একটি নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক আগ্রহের প্রতিফলন হয়েছে। এই অঙ্গীকারের মধ্যে শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতাই অন্তর্ভুক্ত নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতিষ্ঠার একটি বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করা গেছে, যা ঋণ ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে অংশীদারিত্বের একটি নতুন পর্বের সূচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশ সফর বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

এই সফর একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং প্রভাবশালী নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার ক্ষমতা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই সফর বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বৈশ্বিক বিষয়গুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার ক্ষমতার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে পারে। তাছাড়া, এই সফরের সময় স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা বাংলাদেশের জন্য বৃহত্তর সুবিধা নিয়ে আসতে পারে, যা ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনি প্রচারে একটি কৌশলগত পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার করতে পারে।

তবে একথা ঠিক যে আগামী নির্বাচনের ওপর এই সফরের প্রভাব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সরকার কতটা কার্যকরভাবে এই কূটনৈতিক সাফল্যগুলো সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহার করতে পারে, যা নাগরিকদের জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, বিরোধীরা প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে এই মর্মে যে এই ধরনের সফর সত্যিই বাংলাদেশি জনগণের চাহিদা এবং অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। সামগ্রিকভাবে, যদিও এই সফরের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের লাভবান করতে পারে, তবে আসন্ন নির্বাচনে এর প্রকৃত প্রভাব আগামী মাসগুলোতে বোঝা যাবে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁর স্বীকৃতি গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের নীতির প্রতি সরকারের অটল প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসাবে কাজ করেছে। এই সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই শক্তিশালী করবে না, সবার জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য ফ্রান্স ও বাংলাদেশের যৌথ অঙ্গীকারকেও তুলে ধরবে।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
উজানে কমছে, ভাটিতে এখনও হাজারো পরিবার পানিবন্দি
উজানে কমছে, ভাটিতে এখনও হাজারো পরিবার পানিবন্দি
টিভিতে আজকের খেলা (১৩ জুলাই, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (১৩ জুলাই, ২০২৪)
পদ্মার পানি বিপদসীমার ওপরে, ফেরি চলছে ধীরে
পদ্মার পানি বিপদসীমার ওপরে, ফেরি চলছে ধীরে
কেয়ার হোম নিয়ে ব্রিটেনের আদালতে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য
কেয়ার হোম নিয়ে ব্রিটেনের আদালতে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য
সর্বশেষসর্বাধিক