X
সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪
৩০ আষাঢ় ১৪৩১

একাত্তরের উপহার আমরণ সঙ্গী ক্র্যাচ

মোস্তফা হোসেইন
২৭ মার্চ ২০২৪, ০০:১৭আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৪, ২০:৩৪

কসবা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-সিলেট রেল যোগাযোগের কেন্দ্র এটা। বহু পুরনো বাজারটি কয়েক থানার মধ্যে বিখ্যাত। শিক্ষা সংস্কৃতিতে কসবার ঐতিহ্য স্বীকৃত। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনে কসবা ছিল অগ্রণী।

বিশেষ করে রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটিতেই কসবার মানুষের ভূমিকা ছিল ইতিহাস স্বীকৃত।

এমন একটি এলাকায় সম্ভ্রান্ত রায় পরিবারের ছেলে দিলীপ রায়। একাত্তরে তিনি পা হারিয়েছেন মাইন বিস্ফোরণে। সংগত কারণেই দিলীপ রায়ের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং একাত্তর পূর্ব তার অবস্থান সম্পর্কে বলতে হয়। একাত্তরের আগে ছিলেন কসবা বাইলেটারেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ওই যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এই এলাকার পরিবেশ ছিল অন্য এলাকার চেয়ে অগ্রসর। আর গত শতকের ষাটের দশকে বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনে এই এলাকার সব বয়সী শ্রেণি-পেশার মানুষকে জড়িয়ে নেয়। সেই সুবাদে দিলীপ রায়ও নীরব থাকতে পারেননি। স্কুলে পড়ুয়া কিশোর হওয়ার পরও যুক্ত হলেন রাজনীতিতে। তখন স্কুলের শিক্ষার্থীরাও রাজনৈতিক সংগঠন করতে পারতো। এমনকি স্কুলে ছাত্র সংসদের নির্বাচনও হতো।

দিলীপ রায় যুক্ত হয়ে পড়েন স্কুল ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল বেশ উত্তপ্ত। কসবা ছিল বৃহত্তর কুমিল্লার মধ্যে অসাধারণ এক রাজনৈতিক উত্তাপের জায়গা। কারণ বুড়িচং ও কসবা মিলে যে নির্বাচনি এলাকা গঠিত হয় সেই নির্বাচনি এলাকার তিন মূল প্রার্থী সবাই ছিলেন কসবার। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্লাসফ্রেন্ড ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফাজ্জল আলী প্রার্থী ছিলেন কসবা সদরের। আড়াইবাড়ির মাওলানা গোলাম হাক্কানী ছিলেন জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী। তিন জনের বাড়ির দূরত্ব বড় জোর ২ /৩ কিলোমিটার। তিন প্রার্থীরই অনুসারী ছিল। কম হোক বেশি হোক একটি কেন্দ্রে যখন মূল তিন প্রার্থীর কর্মীরা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক উত্তাপটা বেশ বেড়ে যায়।

আগেই বলেছি সেই রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয় কসবার সব বয়সের মানুষের মাধ্যমে। তবে অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর প্রার্থী সিরাজুল হকের সমর্থন ও কর্মীদের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। দিলীপ রায় সেই কর্মী বাহিনীর এক দুরন্ত কিশোর ছিলেন। কিন্তু সিনিয়র ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠতা। তাদের নির্দেশে আন্দোলন করেছেন। মূল দল আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গেও জানাশোনা এমনকি অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও ছিল। কিন্তু তার পরিমণ্ডল ছিল ছাত্রলীগকে ঘিরে।

কসবায় আওয়ামী লীগের তুলনায় ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড জোরালো ছিল না। এটা বলতে দ্বিধা নেই। এই প্রসঙ্গে একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম এইচ শাহ আলমের স্মৃতিচারণের সঙ্গে তিনি নিজের স্মৃতি ঝালাই করে নিয়ে বলেছেন। এম এইচ শাহ আলমের একটি স্মৃতিচারণের হুবহু অংশকেই সমর্থন করেন। যা ছিল এরকম-

ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে তাকে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। কসবা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সানাউল্লাহ নিজে ছাত্রলীগ করলেও পারিবারিক কারণে তিনি ছাত্রলীগের নীতি আদর্শকে ওইভাবে ধারণ করতে পারতেন না। কারণ তিনি ছিলেন মুসলিম লীগ পরিবারের সন্তান। যে কারণে জেলা কেন্দ্রে ছাত্রলীগের বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থানা কসবা এলাকায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারছিল না।

৭ মার্চের পরই এই এলাকায় যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হয়। ছাত্রলীগও অংশ নেয় কিন্তু যতটা সক্রিয় হওয়ার কথা ছিল ততটা হতে পারেনি। ২৫ মার্চ সারা দেশে পাকিস্তানিরা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানোর পর কসবা থানা ছাত্রলীগের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এর কারণও আছে। ওই সময় কসবা আসেন কুমিল্লা জেলার অন্যতম ছাত্রনেতা সৈয়দ রেজাউর রহমান। একই সময় আসেন নেত্রী মমতাজ বেগমও (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনোনীত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের এমএনএ)।

সৈয়দ রেজাউর রহমানের সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কোষাধ্যক্ষ আব্দুর রশিদও। তারা কসবা ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড দেখে খুব একটা খুশি হতে পারলেন না। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সৈয়দ রেজাউর রহমানের নির্দেশনায় সেখানে প্রথম ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেই কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয় কসবা ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল কাইউমকে। আর সদস্য সচিব করা হয় এম এইচ শাহ আলমকে। সম্ভবত ৩১ সদস্যবিশিষ্ট ছিল ওই কমিটি। কমিটির সদস্যদের কয়েকজনের নাম মনে আছে তার। তারা হলেন– তেতুইয়ার মোহাম্মদ হোসেন, স্টেশন রোডের এম এ কুদ্দুস, শামসুল আলম (পরে সুবেদারও বীর মুক্তিযোদ্ধা), গুরুহিত গ্রামের আমির হোসেন দারু মিয়া, তালতলা গ্রামের আনিসুল হক (পরে কর্নেল), আকসিনা গ্রামের জহিরুল হক, কসবার শমসের আজাদ চৌধুরী খোকন (পরে মুক্তিযোদ্ধা), স্টেশন রোডের একেএম আজিজুর রহমান (পরে অ্যাডভোকেট) ও অন্যরা।

সংগ্রাম পরিষদ গঠন হওয়ার পর তারা বিভিন্ন স্থানে মিটিং-সমাবেশ করতে থাকেন। মানুষকে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য মানসিকভাবে তৈরি করতে থাকেন। দেশের টালমাটাল অবস্থায় যাতে তারা আস্থাহীন না হয় উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। একইসঙ্গে কিশোর যুবকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ চালু করেন। এই সময় আব্দুল কাইউম সাহেব স্থানীয় অভিজ্ঞ আনসার কমান্ডার মোহাম্মদ হোসেন ও মুজাহিদ কমান্ডার চরনাল গ্রামের আব্দুর নূরকে প্রশিক্ষণ প্রদানের দায়িত্ব প্রদান করেন। কসবা হাইস্কুল মাঠে আশপাশের অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তরুণরা এসে যোগ দেয় প্রশিক্ষণে। মূলত আত্মরক্ষা এবং সাধারণ অস্ত্র চালনা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে। এখানে যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাদের প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।

প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের সেই ঘোষণা- রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর যাতায়াত ব্যবস্থা ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত হন তারা। ব্রিজ ভাঙার কাজটি শুরু করেন কসবা টি আলীর বাড়ির সামনে থেকে। এখানে একটি ব্রিজ ভাঙার পর শাহপুরের একটি ব্রিজও ভেঙে দেন। তারপর তারা গেলেন কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কাঠের পুলখ্যাত ব্রিজটি ভাঙার জন্য। কিন্তু ওখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যেই দ্বিমত তৈরি হয়। কুটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বললেন, এখানে ব্রিজ ভাঙলে পাকিস্তানিরা এসে গ্রামে আক্রমণ করবে, মানুষকে নির্যাতন করবে। সুতরাং এই ব্রিজ ভাঙা যাবে না।

আব্দুল কাইউম ছিলেন দৃঢ়চেতা মানুষ। তিনি যে কোনোভাবেই ব্রিজটা ভাঙবেনই। কিন্তু এই সেতু ভাঙা সহজ ছিল না। আর তখন তো বিস্ফোরক জাতীয় কিছুই তাদের হাতে ছিল না। যাই করতে হয় তা হাতেই করতে হবে। অন্যদিকে এই ব্রিজ ভাঙলে কুটির মানুষের সহযোগিতা সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়। আব্দুল কাইউম অনেক বুঝিয়েও রাজি করাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ইউনিয়ন সভাপতিকে বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নেওয়ার চিন্তা করেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী শাহ আলম, আব্দুল কাইউম, সৈয়দাবাদের শহিদুল্লাহ মাস্টার (পরবর্তীতে ডেপুটি সেক্রেটারি) কুটিতে মাখন শাহর দোকানে মিটিং করেন। সেই অনুযায়ী আশপাশের মানুষদের আহ্বান জানানো হয় ব্রিজ ভাঙায় সহযোগিতা করার জন্য। শত শত মানুষ চলে আসে ব্রিজ ভাঙার জন্য। কিন্তু এত শক্ত ব্রিজ ভাঙা সম্ভব নয়– কুড়াল খুন্তি জাতীয় অস্ত্র দিয়ে। তাৎক্ষণিক বুদ্ধি করা হয় ঠিক আছে, ব্রিজ যখন ভাঙা যাচ্ছেই না একটা কাজ করতে হবে। ব্রিজের পাশে রাস্তা কেটে ফেলা হোক। সঙ্গে সঙ্গে শত শত মানুষ লেগে যায় রাস্তা কাটার কাজে। একসময় ব্রিজের দক্ষিণ দিকে রাস্তার বেশ কিছু অংশ কেটে ব্রিজকে মূল সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এদিকে কসবা হাইস্কুল মাঠে প্রশিক্ষণের খবর বিভিন্ন জায়গায় জানাজানি হয়ে যায়। নিরাপত্তার কারণে তাদের প্রশিক্ষণের স্থান পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে তা সম্ভব ছিল না। কাছেই ভারতীয় পাহাড় অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু ভিন্ন দেশে তাদের অবস্থান সম্ভব কিনা সেই সন্দেহ থেকে যায়। কিন্তু যে মুহূর্তে তারা কমলাসাগর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে, তখন ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা তাদের বাধা প্রদান করেনি। এখানে বলে নেওয়া ভালো, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ইতোমধ্যে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাদের থাকার জায়গার অনুমতি নিয়ে নিয়েছিলেন।

দিলীপ রায় (ছবি: গাজী আবু হানিফ)

কমলাসাগরের দক্ষিণে কালিবাড়ির পাশে ছোট একটি পাহাড়ে তারা চলে যান। তাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। খাবারদাবার তাদের বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হতে থাকে। আস্তে আস্তে সেখানে থাকার মতো জায়গাও করে নেওয়া হয়। তারা বুঝতে পারছিলেন, একসময় তাদের বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে চলে যেতে হবে। পাকিস্তানিরা পুরো কসবাই দখল করে নিতে পারে। কারণ, পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিহত করার মতো তাদের সেরকম অস্ত্রশস্ত্র কিংবা জনবলও নেই। আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি লড়াই করার মতো প্রশিক্ষণও তাদের ছিল না।

এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। সবারই নজর তখন ইপিআর ক্যাম্পের দিকে। ওখানে ৩ জন ইপিআর আছে পাকিস্তানি। সবারই লক্ষ্য পাকিস্তানি বাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে উচ্ছেদ করা। সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পাকিস্তানিদের পরাস্ত করতেই হবে। সেই অনুযায়ী ইপিআর ক্যাম্পের লাগুয়া বাড়ির গাউসুল আজমের সঙ্গে কথা হয়, তাকে অনুরোধ করা হয় ইপিআর ক্যাম্পের বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি বাঙালি সৈনিকদের বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ জানান।

২৭ মার্চ রাতে শাহ আলম, সিদ্দিকুর রহমান দাদুল ও আব্দুল কুদ্দুস গার্লস স্কুলে বাঙালি ইপিআর সৈন্যদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ইপিআরও ছিলেন ৩ জন। কথা হয় পরদিন ইপিআর ক্যাম্প আক্রমণ করা হবে। বাঙালি ইপিআর সদস্যরা যেন সহযোগিতা করে। কিন্তু কাজটা খুব সহজ ছিল না। ইপিআর ক্যাম্পের চারদিকে ছিল শক্ত দেয়াল। এটা ছিল প্রাচীন একটি হিন্দু বাড়ি। ওই ক্যাম্পে পাকিস্তানি একজন সুবেদার, একজন ল্যান্স নায়েক ও একজন সিপাহী ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী দুপুরের দিকে আক্রমণ করা হলো। এর মধ্যে আশপাশের গ্রামগুলোতে যেসব পুলিশ ইপিআর সদস্য ছুটিতে কিংবা ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছিল তারাও এসে যোগ দেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানিরা সংখ্যায় কম হলেও তাদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র ছিল বেশি। আক্রমণকারীদের মনোবলের কাছে শেষ পর্যন্ত তারা হার মানতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত মানুষ চলে আসে। পাকিস্তানিরা পরাজিত হওয়ার পর শত শত মানুষ ঢুকে পড়ে ক্যাম্পের ভিতর। কিন্তু বাঙালি ইপিআরদের সহযোগিতায় অস্ত্রশস্ত্রগুলো তাদের হাতে চলে আসে।

তিন জন পাকিস্তানিই সেখানে মারা পড়ে। তাদের লাশগুলো টেনে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতীয় সীমান্তে। ওখানে ফেলে রাখা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের কয়েকজন চলে আসে কসবায়। তারা এসে যুবকদের বকাঝকা করে। বলে এই লাশগুলো থেকে গন্ধ হবে। তাছাড়া পাকিস্তানি সৈন্য ভারতের অভ্যন্তরে পাওয়া যাওয়াটা বেআইনি বলেও চিহ্নিত হবে ( মুক্তিযুদ্ধে কসবা, মন্দবাগ ও সালদানদী সাবসেক্টর, মোস্তফা হোসেইন)।

এম এইচ শাহলাম উদ্ধৃত প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করা ছাড়াও তরুণদের মধ্যে উদ্দীপনা তৈরির জন্য দিলীপ রায় ভূমিকা রাখেন। যখন শরণার্থীর ঢল নামে তাদের সহযোগিতা করেন। তাদের খাবার-দাবার ও আশ্রয়ের বিষয়ে উদ্যোগী হন।  সেখানে কসবার আওয়ামী লীগ নেতারাও তাদের সহযোগিতা এবং দিকনির্দেশনা দিতেন। যতদূর মনে পড়ে ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক এমএনএ সাহেব কসবা আসেন। তিনি আসার পর স্বাভাবিক কারণেই কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। তার কাছে যান নির্দেশনার জন্য। অসহযোগ আন্দোলন আগেই চলছিল। তিনি এসে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও চাঙা করলেন। ইয়ুথ ক্লাবের সামনে (বর্তমান আদর্শ স্কুল) মাঠে প্রশিক্ষণ চলছিলো। দুইজন আনসার সদস্য আব্দুন নূর ও মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন প্রশিক্ষক। দিলীপ রায়দের সঙ্গে ৫০ জন কিশোর যুবক প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। যার যার বাড়ি থেকে সকালের খাওয়া-দাওয়া সেরে প্রশিক্ষণে যোগ দিত সবাই। বিশ্রামসহ একটানা চলতো দুপুরের পর পর্যন্ত। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত একটানা। ট্রেনিং হতো বিভিন্ন গ্রুপে। আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু হলেও একসময় থ্রি নট থ্রি চালানো ইত্যাদি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

ইতোমধ্যে কসবায় ভলান্টিয়ার ফোর্স গঠিত হয়। ভলান্টিয়ার ফোর্স-এ যোগদান করে তরুণ-কিশোররা। তারপর শুরু হয় যুদ্ধ। যুদ্ধকালে কসবা পরিণত হয় বিরান ভূমিতে। পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা তোফাজ্জল আলী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম হাক্কানীর সঙ্গে যোগ দেয় তাদের অনেক অনুসারী। কসবা পরিণত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর অভয়ারণ্যে। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের ক্যাম্প করা হয় কসবায়।

সাধারণ মানুষ জীবনের ভয়ে ভারতে শরণার্থী হয়। কিছু নিরীহ মানুষ থেকে যায় দেশে। তাদের নৃশংসভাবে খুন করে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনী রাজাকাররা।

দিলীপ রায়দের পরিবারও চলে যায় ভারতে। তার বক্তব্য অনুযায়ী তিনি দেবীপুরে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ গ্রহণ মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লড়াইয়ে যুক্ত হন। তিনি মূলত প্রতিরক্ষা যুদ্ধ করেছেন। সীমান্তেই বেশিরভাগ লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন। কখনও কখনও বাড়ির কাছাকাছি আসার পরও নিজের বাড়িটা দেখার সুযোগ পাননি। সেই সুযোগ আসে ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সাহাপাড়া ও কসবা বাজার রেকি করার জন্য। তিনি ভারতের পাহাড় থেকে নেমে সাহাপাড়ার দিকে আসতে থাকেন। সঙ্গী ছিলেন সহযোদ্ধা  আকবপুরের হারিস মিয়া ও আব্দুল হাই। কসবা রেল স্টেশনের পাশ দিয়ে বাজারের রাস্তায় তারা ঢুকে দেখেন আশপাশে কোথাও পাকিস্তানি সৈন্যরা নেই। তখনও ভোর হয়নি। বিএডিসি গুদামের উত্তরে তখনও বাংকার ছিল। সেগুলো ছিল ফাঁকা। এতদিনের না দেখা গ্রামটা দেখতে পেয়ে আনন্দের ঢেউ খেলে তাদের। ভুলে যান পাকিস্তানি বাহিনী যাওয়ার সময় মাইন পুঁতে যেতে পারে। মুক্ত এলাকার বাতাস গ্রহণ করতে করতে এগিয়ে যান দিলীপ রায়। কিছু দূর যেতেই ধ্রিম করে বিস্ফোরণ ঘটে মাইনের। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পরে যান দিলীপ। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারেননি জীবনের জন্য তার একটি পা হারিয়ে ফেলছেন তিনি। সহযোদ্ধার আকস্মিক ঘটনায় বিমূঢ় হয়ে যান। তারা তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন চিকিৎসার জন্য। পাশের একটা বাড়ি থেকে দরজার পাল্লা খুলে আনে সহযোদ্ধারা। সেই পাল্লায় শুইয়ে কাঁধে করে তারা তাকে নিয়ে যান ভারতে। হারিস মিয়া ও আব্দুল হাই কাঁধে করি নিয়ে যান। তাদের সঙ্গে আর কেউ ছিলেন কিনা মনে নেই দিলীপ  রায়ের। তাকে ভর্তি করা হয় দেবীপুরে।

সেখান থেকে তাকে জিপে করে নিয়ে যাওয়া হয় আগরতলা জিবি হাসপাতালে। ডাক্তাররা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন দিলীপ রায়কে দ্রুত সুস্থ করে তোলার জন্য। কিন্তু সুস্থতা আর কী। দুইবার তার পা কেটে ফেলতে হয়। হাঁটুর নিচে কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত রেখে নিচের অংশ পুরোটাই ফেলে দিতে হয়।

যখন দেশ পরিপূর্ণভাবে হানাদার মুক্ত হয়, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকার বাহিনী রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করে, দিলীপ রায় উল্লাস করতে পারেননি মন ভরে। তারপরও অন্যদের সহযোগিতায় চলে যান হাসপাতালের ছাদে। দেশের দিকে মুখ ঘুরিয়ে প্রাণভরে নিশ্বাস নেন। ভাবেন, গেলোই বা আমার একটি পা। আমি এখন মুক্ত। এক পা নিয়েই নিজের মাটিতে চলবো ফিরবো।

স্বাধীনতা লাভেরও বেশ পরে তিনি দেশে ফিরেন। ডাক্তাররা রিলিজ করছিলেন না। কিন্তু তিনি অস্থির হয়ে পড়েন দেশে যাওয়ার জন্য। গ্রাম থেকে তাদের পরিবারের সদস্যরাও তাকে দেখতে গেছেন। কিন্তু মুক্ত মানুষগুলো দেখার পরও অতৃপ্তিতে  ভুগছিলেন। অবশেষে ১৯৭২ সালের ১১ মার্চ তাকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হয়।

ভারতীয় এলাকার কমলাসাগর থেকে তাদের বাড়ি ১ কিলোমিটার। রেলওয়ে স্টেশন থেকে এক দেড়শ ফুট কমলাসাগর। আগরতলা থেকে গাড়িতে এলেও কমলাসাগর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার যাওয়া ছিল তার জন্য খুবই কষ্টকর। একটা রিকশা জোগাড় করে আনেন পরিবারের সদস্যরা। রিক্সায় চেপে চারদিকে তাকাতে থাকেন। সবুজে ঢাকা আমার প্রাণের দেশ বাংলাদেশ। তোমার জন্যই আমি বেঁচে আছি।

১৯৭২ সালে নভেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করলেন। ভর্তি হলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। ক্র্যাচ ভর দিয়ে কসবা থেকে ট্রেনে করে যান কুমিল্লা। সন্ধ্যায় আবার ফিরেন। এত কষ্ট! উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সঙ্গতি থাকার পরও সেটুকু আর হয়ে উঠেনি। যোগ দেন কসবা বাজারে পৈতৃক ব্যবসা কাপড়ের দোকানে। ৫৩ বছর ধরে লক্ষ্মী বস্ত্রালয় পরিচালনা করছেন। দিলীপ রায়ের জীবন চলছে ক্র্যাচে ভর করে। আমরণ সঙ্গী এই ক্র্যাচ। 

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে প্রকম্পিত ঢাবি
‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগানে প্রকম্পিত ঢাবি
সেলেনিয়াম আমাদের কেন প্রয়োজন জানেন?
সেলেনিয়াম আমাদের কেন প্রয়োজন জানেন?
কে এই ৪০০ কোটি টাকার পিয়ন?
কে এই ৪০০ কোটি টাকার পিয়ন?
ট্রাম্পের ওপর হামলা: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
ট্রাম্পের ওপর হামলা: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
সর্বশেষসর্বাধিক