X
শনিবার, ২৫ মে ২০২৪
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মুজিবনগর সরকার ও মুক্তিযুদ্ধ

শেখ রফিকুন্নবি সাথী
১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:২৮আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ১৫:২৮

১০ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশবাসীর উদ্দেশে বেতারে ভাষণ দেন, যা আকাশবাণী থেকে ১১ এপ্রিল একাধিকবার প্রচারিত হয়। এই প্রথম দেশ ও বিদেশের মানুষ জানলো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে। এই ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ আরও বলেন, ‘পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদমসন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি অজেয় মনোবল ও সাহসের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার বাঙালি সন্তান রক্ত দিয়ে এই শিশুরাষ্ট্রকে লালিত-পালিত করছেন। দুনিয়ার কোনও জাতি এই নতুন শক্তিকে ধ্বংস করতে পারবে না।’ ওদিকে পাকিস্তান প্রচার চালাতে থাকে বাংলাদেশ বলে কিছু নেই। সব ভারতের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র। এর জবাবে বাংলাদেশের নেতারা সিদ্ধান্ত নেন, ১৭ এপ্রিল দেশের মাটিতেই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেবে। স্থান নির্ধারণ করা হয় কুষ্টিয়া জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন, যা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে মুজিবনগর নামে ঘোষিত হয়।

আজ ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালে যুদ্ধাবস্থার মধ্যেই গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এই দিনে। আমাদের আবেগ অনুভূতির মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল এই সরকারের নেতৃত্বে। স্বাধীনতাবিরোধীরা নানাভাবে চেষ্টা করেছে এবং করে থাকে এই প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে হেয় করার। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে নিরাপত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধে নির্বিঘ্ন নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলো মাথায় রেখেই এই সরকারের প্রধান কার্যালয় কলকাতায় স্থাপন করা হয়।

এক সাক্ষাৎকারে মুজিবনগর সরকারের ক্যাবিনেট সচিব প্রয়াত এইচ টি ইমাম বলেন– ‘যুদ্ধকালীন যে পরিস্থিতি তাতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ বা পরবর্তীকালেও যেসব প্রবাসী সরকার দেখেন তারা কিন্তু নিরাপত্তার কারণে, রাজনৈতিক কারণে ঠিক একটি জায়গায় কোনও সময় থেমে থাকেননি।’

বিশ্বের অন্যান্য স্থানে প্রবাসী সরকারের উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে কোটি কোটি ফরাসি, যারা জার্মান দখলদার বাহিনীর অত্যাচারী শাসনে ধুঁকে ধুঁকে মরছিল, তাদের কাছে স্বাধীনতার প্রতীক, ত্রাণকর্তাতুল্য বীরপুরুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শার্ল দ্য গল, যিনি পরবর্তীতে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি হন। জার্মানির দখলদার বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ না করে তিনি একাকী গোপনে পালিয়ে যান ইংল্যান্ডে। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সের স্বাধীনতা সংগ্রামকে জিইয়ে রাখা এবং দখলদার জার্মান বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়া। চার্চিল তাঁকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান এবং লন্ডনের বেতার মারফত দেশের স্বাধীনতার পক্ষে তাকে প্রচার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। এছাড়াও কম্বোডিয়ান জাতীয়তাবাদী এবং রাজনৈতিক নেতা প্রিন্স নরোদম সিহানুক যিনি ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে কম্বোডিয়ার স্বাধীনতা সুরক্ষিত করেছিলেন। তার নেতৃত্বাধীন স্বাধীন কম্বোডিয়ান সরকারের সদর দফতর স্থাপিত হয়েছিল বেইজিংয়ে। যার নামে বাংলাদেশে সড়ক রয়েছে বারিধারায়। ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনে একসময় ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছিল, যার নেতা ছিলেন ইয়াসির আরাফাত। সেই পিএলও সরকারের সদর দফতর স্থাপিত হয় প্রথমে বৈরুতে, পরবর্তীকালে আম্মানে এবং সর্বশেষে তিউনিশিয়ায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত আফগান সরকারের বিরুদ্ধে গঠিত আফগানিস্তানের মুজাহেদিনদের সদর দফতর ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম তার ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’- বইয়ে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন একটি আইনানুগ সরকার না থাকলে ভারত কিংবা অন্য কোনও দেশ আমাদের রাজনৈতিক এবং নৈতিক সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে অনিচ্ছুক না হলেও খুবই সতর্ক থাকতো। সেক্ষেত্রে আমাদের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন দেশগুলো ভারতের অস্ত্র সরবরাহের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবেও আখ্যায়িত করার সুযোগ নিতে পারতো অনেকে। ওই অবস্থায় যুদ্ধে লিপ্ত আমরা হয়ে পড়তাম পরিত্যক্ত এবং অসহায়! কেননা জনগণ আমাদের যতই প্রশংসা করুক না কেন, আন্তর্জাতিকভাবে আমরা সবাই বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিপন্ন হয়ে পড়তাম। ওই পরিস্থিতিতে আমাদের কার্যক্রমের কোনও বৈধতা থাকতো না।’

মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠা পরিকল্পিত বা পূর্ব নির্ধারিত ছিল না। তারপরও অসম প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে স্বাধীনতা অর্জন ইত্যাদি দিক বিবেচনায় মুজিবনগর সরকার ছিল সত্যিই অতুলনীয়। যদিও সরকার গঠনে, যুদ্ধে ভারতের সহায়তা ছিল কিন্তু মুজিবনগর সরকার নিজেদের আলাদা অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য সবসময় রক্ষা করার চেষ্টা করে। এই সরকারের প্রধান বিষয় ছিল রসদ সংগ্রহ, শরণার্থীদের ব্যবস্থা, যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বাধীন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করা। প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, সেনাবাহিনী, আমলা ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগ রক্ষার জন্য জোনাল কাউন্সিল (আঞ্চলিক কাউন্সিল) গঠন করেছিল সরকার।

১৯৭১ সালে সৈয়দ আব্দুস সামাদ ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পুনর্বাসন অফিসার। জোনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হিসেবে তিনি জোনাল কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। সাংবাদিক, গবেষক অধ্যাপক আফসান চৌধুরী সম্পাদিত ‘মুজিবনগর কাঠামো ও কার্যবিবরণ’ বইয়ের সাক্ষাৎকার অংশে সৈয়দ আব্দুস সামাদ বলেন,  ‘জোনাল কাউন্সিল স্বশাসিত ছিল এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আমরা লিয়াজোঁ মেনটেইন করতে পারতাম। সামগ্রিক যে যুদ্ধ পরিচালনার সমন্বয়, সেটাও এখানেই হতো। সেক্টর কমান্ডারও অনেক সময় অনেক ব্যাপারে দিকনির্দেশনার জন্য আসতেন।’

‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ নামটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাংবাদিক, চরমপত্রের রচয়িতা ও পাঠক এম.আর.আখতার মুকুল বলেন, ‘মুজিবনগর যাওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই দেখলাম যে সরকারের উচ্চ মহল থেকে একটা সিদ্ধান্ত হলো, একটা বেতার খুলতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেওয়ার জন্য, সাড়ে সাত কোটি জনগণকে মোরাল আপ করার জন্য একটা বেতারের দরকার। আমার এখনও মনে আছে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা রাখলেন। তাজউদ্দীন সাহেবের পক্ষে আমাদের সঙ্গে যিনি উঠাবসা করতেন তিনি আব্দুল মান্নান। এমএলএ ছিলেন।’ অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিচালনা, মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, তথ্য ও প্রচারসহ সরকারের বিবিধ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সরকারকে বিদেশি সহায়তাও নিতে হয়েছে। বিদেশিদের সমর্থন ও স্বীকৃতির বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার জন্য সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল শুরুতেই। ১৮ এপ্রিল কলকাতায় পাকিস্তানি দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী প্রথম বাংলাদেশের আনুগত্য স্বীকার করায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে বেড়ে যায়। এর ধারাবাহিকতায় এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে থাকেন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রবাসীদের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রবাসী বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করা, জনমত গঠন করা ছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা মুজিবনগর সরকারের অন্যতম সাফল্য।

মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের এইড অ্যান্ড অ্যাডভাইজার ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম। তিনি যুদ্ধদিনের সরকার পরিচালনার নানা কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন তার বিভিন্ন স্মৃতিচারণামূলক লেখায়ও। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতির আবেদন জানিয়ে সে সময়কার ১০৭টি দেশের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির সঙ্গে পাঠানো হয় তিনটি করে সংযুক্তি— বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং লস কন্টিনিউয়েন্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট অর্ডার।’

প্রশাসন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং সেসবের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা এক লেখায় তুলে ধরা ততটাই অসম্ভব যতটা অসম্ভব সাগরের সব পানিকে কলসিতে ভরতে চাওয়া।

মুজিবনগর সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হচ্ছে তাদের উপস্থিতি এবং নিয়মতান্ত্রিক অস্তিত্ব বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে ৭০-এর নির্বাচনে জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই সরকারই ছিল বাংলাদেশের প্রকৃত প্রতিনিধি।

মুজিবনগর সরকার হচ্ছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম কার্যকরী সরকার। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার দিবসটি বাঙালি জাতির জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। জাতির জন্য দিনটি একটি ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীনতার এত বছর পরও ইতিহাস নিয়ে অপপ্রচার চালায় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। তাদের এই অপপ্রচার কে পাশ কাটিয়ে নতুন প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানবে এবং ধারণ করবে এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ব্যক্তি পর্যায়ের কর হার বাড়বে
ব্যক্তি পর্যায়ের কর হার বাড়বে
লাইফ অ্যান্ড হেলথ ও পায়াথাই-২ হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবা
লাইফ অ্যান্ড হেলথ ও পায়াথাই-২ হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবা
তাসকিনকে নিয়ে সুখবর!
তাসকিনকে নিয়ে সুখবর!
নিম্নচাপের প্রভাবে টেকনাফে বাতাস শুরু, বেড়েছে সাগর-নদের পানি
নিম্নচাপের প্রভাবে টেকনাফে বাতাস শুরু, বেড়েছে সাগর-নদের পানি
সর্বশেষসর্বাধিক