শক্তির ভারসাম্যই কি এখন একমাত্র পথ?

ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী
৩০ মার্চ ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৪:০০

শান্তি একটি আপেক্ষিক বিষয়। শান্তিকে প্রধানত আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি— প্রথমটি পজিটিভ পিস (ইতিবাচক শান্তি) এবং দ্বিতীয়টি নেগেটিভ পিস (নেতিবাচক শান্তি)। সাধারণ অর্থে, যুদ্ধের সমাপ্তি কিংবা অনুপস্থিতিকে ‘নেতিবাচক শান্তি’ বলা হয়। অপরদিকে, যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপের  (যেমন- বৈষম্য দূরীকরণ) মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন আনা হয়— তাকে ‘পজিটিভ’, অর্থাৎ ইতিবাচক শান্তি বলে থাকি।

নেতিবাচক শান্তি অর্জন তথা যুদ্ধাবস্থা থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে দুটি। একটি হচ্ছে পিসফুল মেজার্স, অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, যা আলোচনা, মধ্যস্থতা এবং যোগাযোগের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। অপরদিকে, বল প্রয়োগ করে কিংবা যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহার করে শান্তি আনয়নের চেষ্টা—  যাকে আমরা কোয়ার্সিভ পিস বা জবরদস্তিমূলক শান্তি বলে থাকি।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে— যারা যুদ্ধবাজ, নিপীড়ক কিংবা সন্ত্রাসী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা বা বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়— তারা শান্তির নামে প্রায়শই এই জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার দোহাই দেয়। হিটলার, মুসোলিনি থেকে শুরু করে বর্তমানের ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পর্যন্ত অনেকেই নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং একে ‘শান্তি স্থাপন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে, ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের শীর্ষ নেতাদের ওপর ড্রোন হামলা, যা আন্তর্জাতিক আইন তথা জাতিসংঘ সনদ (ধারা ২) অনুযায়ী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আগ্রাসন। তথাকথিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পতনের চেষ্টা হিসেবে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে অপহরণ করে জোরপূর্বক নিজেদের ভূখণ্ডে নিয়ে গিয়ে, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলোকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সবকিছুই জবরদস্তিমূলক তথাকথিত শান্তি প্রতিষ্ঠারই নামান্তর। এমনকি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শান্তির কথা বলে ‘শান্তি কমিটি’ গঠন করেছিল। এভাবে ‘শান্তি’ শব্দটিকে বারবার জবরদস্তি কিংবা নিপীড়কের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রবণতা নতুন নয়। ক্রুসেড থেকে শুরু করে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ— সবখানেই শান্তির নামে নগ্ন হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যবাদের ইতিহাস রয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে দাবি করছে। অথচ তিনি স্বপ্রণোদিত হয়েই চাপিয়ে দিয়েছে ইরানের ওপর আজকের এই যুদ্ধ। ফলে মধ্য প্রাচ্যে আজ রক্ত ঝরছে। পাশ্চাত্যের ধর্ম নিরপেক্ষতা, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাকে আমরা প্রায়শই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও অনুকরণ করি অনেক ক্ষেত্রে। অথচ ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই আরোপিত যুদ্ধকে কেন্দ্র করেও দেখা যাচ্ছে— ধর্মীয় উন্মাদনা, আঁকা হচ্ছে এক মহাপ্রলযয়ের চিত্র।

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী (এঞ্জেলিকান) এবং ইহুদিদের একাংশ, যারা উগ্র জাতীয়তাবাদী জায়নিস্ট, যারা যথাক্রমে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ওপর এই বিশ্বাস রাখছে যে, এই দুইজন হয়ত আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে অন্য ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর ওপর তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘শান্তি’ স্থাপন করবেন।

চলমান দ্বিতীয় ইরান যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিমুখিতা এবং যুদ্ধের কারণের অস্পষ্টতা খুব আলোচনায় আসছে। যেমন, কয়দিন আগে তিনি একটি আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন—যদি ইরান যুদ্ধ শেষ না করে, তাহলে সেক্ষেত্রে তারা আরও কঠোর অবস্থানে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, তার বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হতে না হতেই তিনি বললেন যে, ইরানের সঙ্গে তাদের ফলপ্রসূ আলাপ-আলোচনা হয়েছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসবে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যকে ভিত্তিহীন আখ্যা দেয়। কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরও দেখা গেল, ইরানের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে এবং যুদ্ধ জাহাজ হরমুজমুখী হচ্ছে। এ ধরনের দ্বিমুখিতা এবং যুদ্ধের কারণের অস্পষ্টতা, এবং শান্তির কথা বলে আগ্রাসী আচরণ ক্রমশ মানবতাবিরোধী অপরাধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সব দিক বিবেচনায়, এই মার্কিন একক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সকল আগ্রাসনবিরোধী শক্তির ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের প্রয়োজন। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা যেখানে ‘কালেক্টিভ সিকিউরিটি’ বা সামষ্টিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাদের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ইউরো-সেন্ট্রিক আধিপত্যের কারণে আজ তা প্রশ্নবিদ্ধ। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিংবা জাতিসংঘের নীতিকে তোয়াক্কা না করার প্রবণতা, ক্রমশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগুলোর সামনে এখন একমাত্র পথ হলো ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ বা শক্তির ভারসাম্য নিশ্চিত করা। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার ‘লং পিস’ বা দীর্ঘস্থায়ী শান্তির মূলে ছিল দুটি পরাশক্তির মধ্যকার ক্ষমতার সমতা। আজ যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউনিপোলার সিস্টেম বা একপাক্ষিক আধিপত্যের মাধ্যমে বিশ্ব শাসন করতে চায়, তখন ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির উত্থান কেবল একটি ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক আবশ্যকতা। ইরান যদি এই সংকটে টিকে থাকতে পারে, তবেই তা মধ্যপ্রাচ্যে অবাঞ্ছিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ গঠনের উচ্চাভিলাষকে রুখে দিতে সক্ষম হবে।

ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের এই দ্বন্দ্ব প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির লড়াই। একক শক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে তা অনিবার্যভাবে আগ্রাসী হয়ে ওঠে। ৯/১১ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ আমরা দেখেছি, তাই বিশ্বশান্তির জন্য একটি ‘কাউন্টার-পাওয়ার’ বা পালটা শক্তির উপস্থিতি অপরিহার্য।

পরিশেষে বলা যায়, আদর্শবাদ আমাদের শান্তির স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু নৈরাজ্যের মধ্যে বাস করে বাস্তববাদ শেখায় যে— ক্ষমতা যখন বন্দুকের নল থেকে আসে, তখন ভারসাম্য রক্ষায় পালটা শক্তির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। চলমান এই অস্থিরতা ও ধ্বংসলীলার মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাবনা। যদি একটি টেকসই শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়, তবেই ক্ষুদ্র সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রগুলো তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারবে। আগুনের এই লেলিহান শিখার মধ্যেই আমরা এমন এক নতুন ভারসাম্যের প্রত্যাশা করি, যেখানে শান্তি কোনও করুণা বা বিলাসিতা নয়, বরং শক্তির ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে অর্জিত হবে এই অলঙ্গনিয় অধিকার। পরিবর্তিত বাস্তবতায়, জাতিসংঘকে কার্যকর করতে হবে। এর অর্থায়ন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সনদের ধারা অমান্যকারী রাষ্ট্রকে ‘গ্লোবাল বয়কট’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির আওতায় এনে বিশ্বে ‘লং পিস’ বা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে।

অধ্যাপক, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কিয়েভে রুশ হামলায় প্রাণ গেল ২৭ জনের
কিয়েভে রুশ হামলায় প্রাণ গেল ২৭ জনের
রিমান্ড থেকে পালানো সেই নারী কারাগারে
রিমান্ড থেকে পালানো সেই নারী কারাগারে
বিএনপি অনেক আশার বাণী শুনিয়েছিল, বাস্তবায়নের লক্ষণ নেই: চরমোনাই পীর
বিএনপি অনেক আশার বাণী শুনিয়েছিল, বাস্তবায়নের লক্ষণ নেই: চরমোনাই পীর
৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারীর স্বীকারোক্তি বাতিল করলেন মার্কিন বিচারক
৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারীর স্বীকারোক্তি বাতিল করলেন মার্কিন বিচারক
সর্বশেষসর্বাধিক