স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মের আগে থেকেই এ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন একটি লড়াই ক্ষেত্র। এই লড়াই ঢাল-তলোওয়ার দিয়ে হয় না; এটা মূলত “ধর্ম বনাম সংস্কৃতি” বয়ান দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। এই ভূখণ্ডে বাঙালির আদি সংস্কৃতিই কি জাতি ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি হবে, যে সংস্কৃতিতে সনাতনী, বৌদ্ধ এবং ইসলাম ধর্মের প্রবল প্রভাব রয়েছে? নাকি, এই রাষ্ট্রের চরিত্র শুধু তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম নাগরিক গোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হবে, যেখানে আরব-পারস্য অঞ্চল থেকে আসা ভাষা-সংস্কৃতি বঙ্গদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে?
এই বিতর্ক, এই বিভাজনের ভেতরে যে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভাব লুকিয়ে আছে; যা আজকাল খুব একটা লুকিয়েও নেই—তা নিয়ে কোনও সন্দেহ থাকার কারণ নেই। এই বিতর্ক যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাও অনস্বীকার্য। সর্বোপরি, এই বিভাজন দিয়েই ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রতিহত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭০ এর নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের জন্ম হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে বোঝা যাচ্ছে, সেই সংকীর্ণ বিতর্কের মাধ্যমে দেশের জন্ম-পরিচয় এবং অস্তিত্বের ভিত্তি নিয়ে যে নাড়াচাড়া ২০২৪ সালের পট পরিবর্তনের পর থেকে শুরু হয়, তার রেশ এখনও কাটেনি। অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধ-বিদ্বেষী যে মানসিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, ইদানিং সেটা পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত শেখ মুজিব স্মৃতি জাদুঘর ধ্বংস করেছে, সারা দেশে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে, তারাই আবার নতুন পথে স্বাধীনতার মূল ভিত্তিতে আঘাত হানার চেষ্টা করছে।
ইতিহাস বিকৃতি
সম্প্রতি ঢাকার একটি রাস্তায় বাঙালি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষ স্থানীয় কিছু মানুষের প্রতিকৃতি এঁকে দেয়াল সাজানো হয়। শিল্পকলা একাডেমির পাশের দেয়ালে নগর কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগকে অনেকেই স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরই শুরু হয় সামাজিক মাধ্যমে একটি প্রচারণা, যার ভাষা, অন্তর্নিহিত বার্তা এবং উদ্দেশ্য ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে অতিপরিচিত হয়ে উঠেছে। প্রচারণার পদ্ধতি যতই অপরিপক্ব হোক, উদ্দেশ্য পরিষ্কারঃ দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে চিড় ধরানোর প্রচেষ্টা, ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি করা, দেশের জন্ম-লগ্ন ১৯৭১ থেকে সরিয়ে ১৯৪৭ এ নিয়ে বাংলাদেশকে ‘দ্বিজাতিতত্ত্বর’ ফসল হিসেবে উপস্থাপন করা।
ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা সব গণতান্ত্রিক সমাজেই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি যখন সেই ভিন্নমত ইতিহাস বিকৃতির পর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু বিগত দুই বছর ধরে বাংলাদেশে যা চলছে, সেটাকে শুধু স্বাধীন মত প্রকাশ বললে ভুল বলা হবে। এখানে দেশ-জাতির ইতিহাস নতুন করে লেখার সঙ্গে যেমন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বয়ানের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা ও হুমকি, এমনকি সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্যও যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের বরেণ্য শিল্পী জয়নুল আবেদিন বা অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদি বা জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের পাশে কেন সত্যজিৎ রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি দেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন কিছু লোক সামাজিক মাধ্যমে তুলেছেন। তাদের যুক্তি? রায় বা বিদ্যাসাগর ‘বাংলাদেশি’ নন। যারা এ কথা বলছেন, তারা নিশ্চয় খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন যে, এখানে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টা মুখ্য নয়; মনীষীদের বাছাই করা হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতিতে তাদের পর্বতসম অবদানের কারণে। তাদের সমস্যা সেখানেই। কিন্তু সেখানে সাম্প্রদায়িকতা দৃশ্যত একটি বড় ভূমিকা পালন করছে।
নজরুল এবং জাতি
যেমন, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের ছবি নিয়ে কোনও উচ্চ-বাচ্য নেই। থাকার কথাও না। ঠিক যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নিয়ে কোনও বিতর্ক থাকার কথা না, তেমনি নজরুল নিয়েও কোনও আপত্তি থাকার কথা না। কারণ দুজনই বাঙালি, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে দুজনের অবদান অসামান্য। বিদ্যাসাগরের মতো কাজি নজরুল ইসলামও একজন ভারতীয়। কিন্তু একজন নিয়ে আপত্তি কেন? কারণ তিনি হিন্দু বলে?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন, ধানমন্ডিতে পুরো পরিবারের ব্যবহারের জন্য বাড়ি বরাদ্দ করেন। কেননা, নজরুল শুধু বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে অন্যতম ব্যক্তিত্ব ছিলেন না; মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে তিনি ছিলেন দেশের মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস। নজরুলের কবিতা ও গান দেশের মানুষকে ১৯৭১-এ সাহস এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং স্বাধীনতার পর তাকে কাছে আনতে পেরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার যেমন সার্থক বোধ করেছে, দেশের মানুষ তাকে সচক্ষে দেখতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছে।
এখানে ট্রাজেডি ছিল যে ঢাকায় আসার বহু বছর আগেই নজরুল বোধশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়েছিলেন। তিনি যে নতুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অতিথি হিসেবে ঢাকায় গিয়েছেন, সে বিষয় নজরুল কতটুকু বুঝতে পেরেছিলেন, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তবে ঢাকায় তিনি যে রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেন, সম্ভবত তার জন্যই নজরুলের পরিবার বাংলাদেশেই রয়ে যায়।
নজরুল ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন, ভারতে সারাজীবন কাটিয়েছেন, তিনি ভারতীয়। তিনি তার জীবনের শেষ চার বছর ঢাকায় কাটিয়ে রাতারাতি বাংলাদেশি বনে যাননি; কিন্তু নজরুলকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা নিয়ে কোথাও কোন বিতর্ক বা প্রশ্ন নেই। থাকার কথা নয়। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গান জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা নিয়ে কোনও প্রশ্ন বা বিতর্ক থাকার কথা না। কিন্তু এখানেও ঠিক সেই সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকেই ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়।
নাটক ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া
শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি মোছার একটি নাটকও সম্প্রতি মঞ্চস্থ হয়ে গেলো। ঘটনাটিকে নাটকই বলতে হবে কারণ, একজন নারী যখন রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি কালি দিয়ে বিকৃত করতে যাচ্ছেন, তখন তার আশপাশে অসংখ্য মানুষকে দেখা গেলো মোবাইল হাতে ফিল্ম করতে, হয়তো দুই-একজন লাইভ স্ট্রিমিংও করছিলেন। সেই মুহূর্তে একজন পুলিশ দৌড়ে এসে বাধা দিলেন!
পুরো ঘটনাকে একটা পাবলিসিটি স্ট্যান্ড মনে হলো। কিন্তু পরে পুলিশ ওই নারীসহ তাদের সংগঠনের চার জনের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ মামলা দায়ের করে তাদের পাবলিসিটির আরও সুব্যবস্থা করে দিয়েছে। ভ্যান্ডালিজমের মাধ্যমে একটি নাম-সর্বস্ব সংগঠনের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশকে একটা উপদ্রব হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এটাকে একেবারে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ হিসেবে দেখা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
তবে এখানে কাল মেঘের আড়ালে আশার রুপালি রেখাও দেখা যাচ্ছে। একদিকে পুলিশের প্রতিক্রিয়াকে মাত্রাতিরিক্ত বলেই মনে হচ্ছে, বিশেষ করে কথিত ‘অপরাধ’ যখন মূলত রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; কিন্তু অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের দৃঢ়তা প্রশংসার দাবি রাখে। একই ঘটনা ইউনূস সরকারের আমলে ঘটলে শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালের অঙ্কন থেকে সত্যজিৎ রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি রাতারাতি মুছে ফেলার সম্ভাবনা থাকতো। হয়তো নগর কর্তৃপক্ষের হর্তা-কর্তাদের জবাবদিহি করতে হতো; হয়তো দু-একজনের চাকরি নিয়েও টানা-টানি পড়তো।
ঘটনা প্রবাহ যে এখানেই থেমে যাবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশের জনগণকে তাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে প্রক্রিয়া দুই বছর আগে শুরু হয়েছে, সেটা নিঃসন্দেহে চলমান থাকবে। সরকার এই প্রবণতাকে মোকাবেলা করবে, নাকি ইউনূস সরকারের মতো নির্লিপ্ত থেকে প্রকারন্তরে উৎসাহ দেয়ে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত বিএনপিকে নিতে হবে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনায় বিছিন্ন প্রতিক্রিয়া এবং ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলার মতো অতি-প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সরকারের একটা পরিষ্কার বার্তা দেওয়ার সময় হয়েছে। বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তি যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি—এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য তথা সার্বিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ধর্মের ভিত্তিতে অথবা কার জন্ম সীমান্তের কোন দিকে, সেই বিচারে কোনও বিভাজন করা গ্রহণযোগ্য নয়; সেই বার্তা সরকারকে পরিষ্কারভাবেই দিতে হবে। না হলে এই কৃত্রিম বিভাজন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েই যাবে।
লেখক একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার।
ইমেইল: [email protected]