ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন একটি ছড়া মুখে মুখে ঘুরছে, ‘৫৬ ইঞ্চি কা ছোটা বান্দর’। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদির ‘৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি’ কথাটি দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। একযুগ পরে সেই প্রতীককেই উল্টে দিয়েছে তরুণেরা। মিম, রিল আর গানের হাত ধরে লাইনটি এতটাই ছড়িয়েছে যে ১৩ আগস্ট সংসদ চত্বরে কংগ্রেস নেতা পবন খেরার নেতৃত্বে একদল বিরোধী সংসদ সদস্য খেলনা বানর হাতে একই স্লোগান দিয়েছেন। রাস্তার ঠাট্টা সংসদে ঢুকে পড়লে তাকে আর নিছক ঠাট্টা বলা যায় না।
একটা মিম দিয়ে সরকারকে ফেলে দেওয়া যায় না। তবে মানুষ যখন কোনও সরকারকে নিয়ে হাসতে শুরু করে, তখন সেই হাসির পেছনে কী ক্ষোভ জমেছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ভেতরের জিনিসটা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় মে মাসে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি একটি শুনানিতে কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ বলে তুলনা করার পরই জন্ম নেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তরুণেরা অপমান গায়ে মাখেনি, নামটাকেই পরিচয় বানিয়ে নিয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার, আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে বহু লাখ শিক্ষার্থীকে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। প্রধান বিচারপতি পরে বলেছেন, তাঁর মন্তব্য ভুয়া ডিগ্রিধারীদের নিয়ে ছিল। কিন্তু কথা একবার বেরিয়ে গেলে ফেরানো যায় না, বিশেষ করে যখন শ্রোতারা নিজেরাই সেই বেকারদের দলে।
ব্যাংকে কাজ করার সুবাদে আমি ব্যাপারটা এভাবে দেখি। ঋণব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের ওপর। রাষ্ট্র আর তরুণ প্রজন্মের সম্পর্কও তেমন, তবে চুক্তিটা অলিখিত। ব্যাংকে আমরা জানি, একবার গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হলে শুধু আশ্বাস দিয়ে তা ফেরানো যায় না। সময় লাগে, কাজের প্রমাণ লাগে। তরুণদের ক্ষেত্রেও তাই। সরকার চাকরির প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ হলো, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হলো কিনা, সেসবের উত্তর দিতে হবে।
তরুণ পড়বে, পরীক্ষা দেবে, আর রাষ্ট্র তাকে ন্যায্য সুযোগ দেবে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে পরীক্ষার ওপর আস্থা ভাঙে, বেকারত্ব বাড়লে ডিগ্রির মূল্যে আস্থা ভাঙে, আর প্রধান বিচারপতি ‘তেলাপোকা’ বললে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ভাঙে। চাকরি, পরীক্ষা আর বিচারব্যবস্থা নিয়ে হতাশা যখন একসঙ্গে বাড়ে, তখন তরুণেরা শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। তারা ভাবতে শুরু করে, এই ব্যবস্থায় তাদের জন্য আদৌ জায়গা আছে কিনা। সিজেপি সেই ক্ষোভ প্রকাশের একটা পরিচিত মঞ্চ তৈরি করেছে।
জুলাইয়ে যন্তর-মন্তরের আন্দোলন সেই ক্ষোভকে রাজনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসে। এনপিআরের প্রতিবেদন বলছে, সংসদের দিকে মিছিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস আর লাঠি ব্যবহার করেছিল, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় জনরোষ বেড়েছিল, কিন্তু আন্দোলনকারীরা ঘটনাস্থল ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।
দুই মাস আগে অনলাইনে জন্ম নেওয়া একটি সংগঠন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সরিয়ে দিলো, এটা সহজ ঘটনা নয়। এর পেছনে কৌশলগত কারণও ছিল। দাবিটা ছিল নির্দিষ্ট, একজন মন্ত্রীর দায়িত্ব। আন্দোলনের দাবি যখন অনেক বড় আর অস্পষ্ট হয়, তখন মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে রাখা কঠিন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট দাবিকে সামনে রাখলে সমর্থকেরা বুঝতে পারেন, কী অর্জন করতে হবে এবং সাফল্য এসেছে কিনা।
প্রথম জয়ের পর আন্দোলন বড় লক্ষ্য খুঁজেছে। এখন দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ২ অক্টোবর মুম্বাই থেকে দেশজুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে আরও এসেছে, দুজন নির্বাচন কমিশনার ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি লিখে রেখেছেন, বেশির ভাগই এসআইআর নিয়ে। প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে প্রশ্ন উঠলে অভিযোগটা আর কেবল বিরোধীদের প্রচারণা থাকে না।
ভোটার তালিকার প্রশ্নটা এত স্পর্শকাতর কেন? ভোট দেওয়ার অধিকার মানুষকে সরকার বদলানোর সুযোগ দেয়। তাই ভোটার তালিকায় নিজের নাম থাকবে কিনা—এই অনিশ্চয়তা অনেকের কাছে শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, রাজনৈতিক অধিকার হারানোর আশঙ্কাও। কাজের সুযোগ কম থাকলে, পরীক্ষায় অনিয়ম হলে মানুষ দীর্ঘদিন সহ্য করে, যদি জানে ভোটের দিন হিসাব চুকিয়ে নেওয়া যাবে। সেই চাবিতেই টান পড়লে ক্ষোভ বেরোনোর শেষ পথটাও বন্ধ হওয়ার ভয় তৈরি হয়। আমার মতে এ কারণেই এই ধাপ সরকারের জন্য আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকির। একজন শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতা মেনে নিয়ে সরকার পার পেতে পারে, কিন্তু নির্বাচনের সততা নিয়ে প্রশ্ন মানা মানে নিজের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন মানা।
১০ অক্টোবর দিল্লিতে যা ঘটলো, তাতে শহরটাকে দুর্গ মনে হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে জানা যায়, সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত প্রায় ছয় হাজার মানুষ আটক হয়েছেন। ৫৭টি মেট্রো স্টেশনে বিধিনিষেধ ছিল। সিজেপির তিন শীর্ষ নেতাকে বিমান থেকে নামতেই আটক করা হয়, পরদিন সকালে এক বছর শান্তি বিঘ্নিত না করার শর্তে তারা ছাড়া পান, লিখেছে দ্য হিন্দু। রবিবার (১১ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, বিক্ষোভের অধিকার আছে, তবে পুলিশ আইন মানতে হবে। একইসঙ্গে আদালত মেট্রো ও রেল স্বাভাবিক রাখা, ইন্টারনেট বিঘ্নিত না করা আর আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক না করার নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারের কঠোরতা কি পুরোপুরি অযৌক্তিক? তা বলা যাবে না। দিল্লি পুলিশ নিরাপত্তা-ঝুঁকি আর আগাম নোটিশের অভাবের কথা তুলে অনুমতি দেয়নি। জনশৃঙ্খলা রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর শনিবার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে চারজন গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা দেখায় রাস্তায় উত্তেজনা বাস্তব। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা আর শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ঠেকাতে গণপরিবহন বন্ধ করা এক জিনিস নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশই বলছে, রেখাটা কোথাও পেরিয়ে গিয়েছিল। আমার মতে, দমন সাময়িকভাবে ভিড় কমাতে পারে, কিন্তু আমার ভোটের অধিকার থাকবে তো?’ প্রশ্নের জবাব দেয় না। সেই জবাব দিতে পারে কেবল তথ্য: কতজনের নাম বাদ পড়েছে, কেন পড়েছে, আর সংশোধনের পথ কতটা সহজ।
এত কিছুর পরও মোদি সরকারের ক্ষমতা এখনই বিপদে পড়েছে, এমনটা বলা যাবে না। সংসদের সংখ্যার হিসাব এখনও সরকারের পক্ষেই আছে। ২০২৪ সালে বিজেপি পেয়েছিল ২৪০ আসন, এনডিএ ২৯৩, সরকার গড়তে লাগে ২৭২। তেলুগু দেশম আর জেডিইউ সরে গেলেও বিরোধী জোটের আসন সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিচে থাকে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরাতেও সংসদে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, যা বিরোধীদের নেই।
ইতিহাসও একই কথা বলে। সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে সরকার এনআরসি থেকে সরে এসেছে, কৃষক আন্দোলনে কৃষি আইন ফিরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতা ছাড়েনি। ভারতে বড় আন্দোলন সাধারণত নীতি বদলায়, ভোটের হিসাব ধীরে ধীরে সরায়, এক ধাক্কায় প্রধানমন্ত্রীকে নামায় না। এই আন্দোলনে মোদি সরকারের পতন হবে, এমনটা এখনই বলা যায় না। তবে তরুণদের ক্ষোভ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অন্য শ্রেণির মানুষের মধ্যেও ছড়ায়, তাহলে ২০২৯ সালের নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তে পারে। হিসাব বদলাচ্ছে কিনা, তা বোঝার চারটি লক্ষণ আছে—মিত্র দলগুলো প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছে কিনা, সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর নিয়ে কড়া অবস্থান নিচ্ছে কিনা, প্রশাসনে দ্বিধা দেখা দিচ্ছে কিনা, আর শহুরে মধ্যবিত্ত ও বাজারের আস্থা কমছে কিনা।
আন্দোলনের নিজের জন্যও দুটি সতর্কতা আছে। প্রথমত, দলনিরপেক্ষ চেহারাই সিজেপির সবচেয়ে বড় শক্তি। বিরোধী জোট মঞ্চ দখল করে নিলে তরুণদের আস্থা কমবে, তাই পেছন থেকে সমর্থন দেওয়াই তাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। দ্বিতীয়ত, ভাষার প্রশ্ন। ব্যঙ্গ ক্ষমতাহীনের পুরনো অস্ত্র, তাতে আপত্তি নেই। তবে মানুষকে পশুর উপমায় ডাকলে বিতর্কের মান নামে। ‘তেলাপোকা’ নামটা তরুণেরা নিজেরা বেছে নিয়েছে, ‘বানর’ নামটা অন্যের ঘাড়ে চাপানো। এই তফাত মনে রাখলে আন্দোলনের নৈতিক জোর টিকে থাকবে। আর মিমের নিজের একটা সীমা আছে। সে দ্রুত ছড়ায়, দ্রুতই পুরোনো হয়। শুধু স্লোগান দিয়ে দীর্ঘদিন আন্দোলন চালানো যায় না। শেষ পর্যন্ত মানুষ দেখতে চায়, তাদের দাবির পক্ষে কী কাজ হয়েছে এবং তাতে বাস্তবে কোনও পরিবর্তন এসেছে কিনা।
বাংলাদেশের জন্য এর মানে কী? প্রথম কথা পানি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গাচুক্তি এই ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। রাজশাহীর মানুষ জানে, শুকনো মৌসুমে পদ্মা কতটা শীর্ণ হয়ে যায়, আর সেচের পানির টান কী জিনিস। ঘরে চাপে থাকা দিল্লির পক্ষে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের রাজনীতি জড়ানো পানিবণ্টনে ছাড় দেওয়া কঠিন। আবার দুর্বল সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির জায়গাও সংকুচিত হয়। দ্বিতীয় কথা সীমান্ত ও পরিচয়ের রাজনীতি। এসআইআরে সংখ্যালঘু ও বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়ার প্রবণতা বাড়লে তার চাপ সীমান্তে এসে পড়বে। তাই ভারতের ঘরোয়া বিষয়ে সরকারি মন্তব্য না করে প্রাতিষ্ঠানিক পথে ধৈর্য ধরে কথা বলাই ঢাকার জন্য সঠিক।
নিজেদের জন্য শিক্ষাও আছে। আমাদের জুলাই ২০২৪ দেখিয়েছে, তরুণেরা রাস্তায় নামলে আর নিরাপত্তা বাহিনীর ইচ্ছাশক্তি ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি কত দ্রুত বদলে যায়। দিল্লিতে আপাতত পুলিশ দৃঢ়ভাবেই কাজ করছে, তাই সরাসরি তুলনা টানা ঠিক হবে না। তবে ডিগ্রি আছে অথচ কাজ নেই, এমন সমাজে ক্ষোভ জমতে সময় লাগে না। সেই ক্ষোভ কোনও দিন অপ্রত্যাশিত নাম ধরে বেরিয়ে আসতে পারে।
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল কিংবা ভারতের দিকে তাকালে তরুণদের ক্ষোভের জায়গাগুলো খুব আলাদা মনে হয় না। কোথাও চাকরি নেই, কোথাও পরীক্ষায় অনিয়ম, কোথাও ভোটের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন। এই ক্ষোভ কখন, কোন ভাষায় প্রকাশ পাবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। তবে সরকারগুলোর বোঝা উচিত—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঠাট্টাকে সব সময় হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
একটা মিম সরকার ফেলে দিতে পারে না। কিন্তু মানুষ কেন সেই মিম ছড়িয়ে দিচ্ছে, সেটি বুঝতে পারলে অনেক কিছুই বোঝা যায়। মানুষ যখন ক্ষমতাবানকে নিয়ে হাসতে শুরু করে, তখন শুধু সেই হাসি থামানোর চেষ্টা না করে ক্ষোভের কারণটাও খুঁজতে হয়। কারণ চাকরি, শিক্ষা ও ভোটের অধিকার নিয়ে মানুষের প্রশ্নের উত্তর মিম মুছে দিতে পারে না। সেই উত্তর দিতে হয় রাষ্ট্রকেই।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক