করের টাকায় কতদিন মূলধন জোগানো সম্ভব?

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:৪৩, জুন ০১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫০, জুন ০১, ২০১৭

সারওয়ার-উল-ইসলামযদি আমরা ভাবি দেশ হচ্ছে অভিভাবক এবং ব্যাংক হচ্ছে তার সন্তান! ব্যাংকে দেশের সঞ্চয়মনা মানুষ তাদের আয়ের একটা অংশ গচ্ছিত রাখবে, নিশ্চিন্ত মনে। আমরা জানি সাধারণ মানুষ তার উপার্জিত অর্থ ব্যাংকে রাখছে বিভিন্ন মেয়াদে। মেয়াদোত্তীর্ণ হলে যা রেখেছিলেন তার চেয়ে কোনও কোনও ক্ষেত্রে দ্বিগুণ কিংবা  দেড় গুণ অর্থও পাবে। এটা গেলো সাধারণ মানুষের লাভ। দেশের লাভ কোন দিক থেকে?
মানুষের অর্থ জমতে জমতে যখন অনেক হয়ে যায় ব্যাংকে, তখন ব্যাংক সেই অর্থই মানুষকে ঋণ দেয়। কাদেরকে ঋণ দেয়? যারা ব্যবসা বাণিজ্য করে তাদেরকে। ব্যাংক তখন সাধারণ গ্রাহকদের কাছে যে সুদের বিনিময়ে অর্থ সংগ্রহ করে তার চেয়ে বেশি সুদে ব্যবসায়ীদের সেই অর্থ ঋণ হিসেবে দেয়। এর বিনিময়ে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ক্ষেত্রবিশেষে দলিল দস্তাবেজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়ে রাখে। ব্যাংক সাধারণ মানুষের অর্থ ব্যবসায়ীদের ঋণ হিসেবে দিয়ে লাভ করে সেই অর্থ আবার সাধারণ মানুষকে তাদের শর্ত মোতাবেক লাভসহ ফিরিয়ে দিচ্ছে। মাঝখান থেকে ব্যাংক লাভবান হচ্ছে। পক্ষান্তরে দেশ বা রাষ্ট্র লাভবান হচ্ছে। দেশ অভিভাবক হিসেবে সন্তান বা ব্যাংক গড়ে তুলে লাভবান হচ্ছে। এটাই হওয়া স্বাভাবিক ছিল।
যদি ব্যাংক তার কাছে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত অর্থ পরিকল্পনা মতো না পরিচালনা করে কোনও অশুভ চক্রের পাল্লায় পড়ে যত্রতত্র ঋণ দিয়ে দেয়, সেই ঋণ আদৌ কোনোদিন ওঠানো সম্ভব হবে কিনা, সেটা না ভেবে নিজের লাভের কথায় মত্ত হয় তা হলে? তা হলে ওই ইয়াবা আসক্ত সন্তানের পরিবারের মতো ব্যাংক একসময় মুখ থুবড়ে পড়বে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা জানবো, সোনালী ব্যাংক হলমার্ক গ্রুপকে ২০০৯-২০১০ সালে হোটেল রূপসী বাংলা শাখা থেকে দুই হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। নানা ফন্দিফিকির আর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া সেই অর্থের কথা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মুখে উচ্চারিত হতে শুনি, বেসিক ব্যাংকে হয়েছে দুর্নীতি আর সোনালী ব্যাংকে হয়েছে ডাকাতি। পাশাপাশি পত্রপত্রিকায় আমরা জানতে পারি সোনালী ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ২ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ২০০ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ২৮৬ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৭৩৭ কোটি টাকা, কৃষি ব্যাংকের ৭ হাজার ৪৮৫ কোটি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৭০৫ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে।

এই ঘাটতির কারণ কী? অশুভ চক্র কারা? প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ী, কেউ বাদ নেই। ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয় না। ছোট ছোট ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকেরা শুধু বলেছেন, ওপরের চাপে ঋণ দিতে বাধ্য হয়েছি। নইলে চাকরি থাকবে না। আবার কোথাও এমনও শোনা গেছে, অনুমোদন ছাড়াই ঋণ দেওয়া হয়েছে।

যেমন রূপালী ব্যাংকের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা যেটা। ফেনীর স্বর্ণ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন। তাকে কোনও প্রকার বিবেচনা ছাড়াই ১৫৩ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। এর মধ্যে ৬০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দিয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। বাকি ৭৩ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে কোনও ধরনের অনুমোদন ছাড়াই। এর কোনও নথিও নাকি পাওয়া যায়নি।

এত বিপুল পরিমাণে ঋণ সুবিধা পাওয়ায় এলাকায় তার নাম হয়েছে ‘গোল্ড আনোয়ার’। রূপালী ব্যাংকের নথি ঘেঁটে জানা গিয়েছিল, ঋণের পুরো টাকা স্বর্ণ ব্যবসার কথা বলে নিলেও এ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে দেড় হাজার শতক জমি।

দেশ বা রাষ্ট্র ব্যাংককে গড়ে তোলেন সন্তানের মতো। সন্তান ভালো হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে দেখবে। আর সন্তান বিপথে গেলে? তখন অভিভাবকদের উল্টো অর্থ দিয়ে আবার সাহস সঞ্চয় করার জোগান দিতে হয়। যাতে ব্যাংক আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। ঠিক সেই ভূমিকাই নেয় সরকার, রাষ্ট্রের হয়ে। একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে আছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে বাজেট বরাদ্দ দিয়ে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে, এ টাকা কোথা থেকে দেওয়া হয়? খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। এ টাকা দেওয়া হবে আপনার আমার করের টাকা থেকে। যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়ে ‘চুরি-চামারি’ করে কোটিপতি হয়েছেন, আর ব্যাংকে দেউলিয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, আপনার আমার করের টাকা দিয়ে সেই সব ব্যাংকের চিকিৎসা করানো হবে। যেমন চিকিৎসা করান মাদকাসক্ত সন্তানকে তার অভিভাবকেরা। যদি একটু আবার প্রাণ ফিরে আসে। শুধু সেই আশায়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে গত অর্থ বছর পর্যন্ত ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা মূলধন বাবদ ব্যাংকগুলোকে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, দুর্নীতিপরায়ণ চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগ দেওয়ার কারণেই ব্যাংকগুলোকে প্রতিবছর মূলধন জোগান দিতে হচ্ছে।

এ অর্থে বলা যায়, সরকার দুর্নীতিকে পোষণ করছে। অথচ ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারকে এসব ব্যাংক মুনাফা দেওয়ার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের অপসারণ করতে পারলেও সরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের পারে না- এ নিয়ম তুলে দিলে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ