মাদকনির্মূল ও হত্যা: বিচার রাষ্ট্রকেই করতে হবে

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৩:২৯, জুন ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪২, জুন ০২, ২০১৮

মাসুদা ভাট্টিদেশের মানুষের দৃষ্টি এখন কক্সবাজারের দিকে। যেখানে চলমান মাদক দমন অভিযানে কাউন্সিলর একরাম নিহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। যদিও ‘নিহত’ লেখার চেয়ে ‘হত্যা’ শব্দটিই এখানে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। একটি অডিও ক্লিপ একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। যেখানে একরামের স্ত্রী ও কিশোরী কন্যাদের সঙ্গে কথা বলা অবস্থায় গুলি করে তাকে হত্যা করা হয় বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এতদিন যারা সরকারের মাদকবিরোধী চলমান অভিযানকে প্রশংসা করেছে এবং সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে তারাও একরাম হত্যাকাণ্ডকে মেনে নিতে পারছে না। তাদের যুক্তি হলো, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কেন একজন নিরীহ ব্যক্তিকে তার পরিবারের কাছ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হলো? এই প্রশ্ন নিয়ে কেবলমাত্র দেশেই নয়, দেশের বাইরেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে দেশ ও সরকারের ভবিষ্যতের জন্যও সুফল বয়ে আনবে না।

দেশে মাদক আসক্তি, ব্যবসা ও মাদকের কারণে সৃষ্ট সন্ত্রাস, খুন, রাহাজানি ভয়ঙ্কর এক অবস্থা তৈরি করেছে। মানুষ এর থেকে মুক্তি চায়- তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। নির্বাচনের বছরে সরকার এরকম মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অভিযান পরিচালনা করছে, যেমনটি শুরু হয়েছে দেশের ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধেও, গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ স্বাভাবিকভাবেই একে ভালো চোখে দেখছে। কিন্তু কিছু পোড় খাওয়া মানুষ শুরু থেকেই এই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে যে, মাদক নিয়ন্ত্রণের মতো একটি কঠিন কাজ কোনোভাবেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ একথা বলার চেষ্টা করছেন যে, মেক্সিকো-থাইল্যান্ড-কলাম্বিয়া বা ফিলিপাইনের মতো দেশেও মাদকবিরোধী অভিযান সফলতার মুখ দেখেনি, যদিও সেখানে এইসব অভিযানে হাজারে হাজারে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এসব অভিযানে প্রায়ই নিরীহ ব্যক্তির নিহত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং বাংলাদেশে সেটাই হয়তো তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারে নিহত একরাম নিরীহ বা নির্দোষ এরকম দাবি করা হচ্ছে না, কিন্তু তার হত্যাকাণ্ড যে মাদক দমন অভিযানকে সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করে তুলেছে এবং সেই সঙ্গে সব দায় সরকারের ওপরই চাপানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে সেটা অস্বীকার করার কোনোই উপায় নেই।

দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ভঙ্গুর, একথা আমরা সকলেই জানি। একথাও প্রকাশ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে যে, সরকার পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর। ফলে তারা ন্যায্য-অন্যায্য অনেক সুবিধা নিতে শুরু করেছে সরকারের কাছ থেকে। এমনিতেই এদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভেতর এরকম প্রবণতা অত্যন্ত দৃশ্যমান যে, তারা নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে জনগণকে ‘পীড়া’ দেওয়াতেই বেশি অভ্যস্ত। ফলে মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভয়ের চোখে দেখে, অথচ ভয় পাওয়া উচিত আইনকে, বাহিনীকে নয়। কিন্তু এদেশের এই বাস্তবতা এতটাই উদগ্র হয়ে উঠেছে যে, যাদের দ্বারা মানুষের জান-মাল রক্ষা হবে তাদের হাতেই মানুষের জান-মাল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটাকে অনেকেই ঢালাও মন্তব্য বলতে পারেন কিন্তু তাতে সত্য খুব বেশি বদলাবে না।

চার দলীয় জোট সরকার যখন এলিট ফোর্স র‌্যাব গঠন করে এবং অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে দেশে দেদারছে হত্যাকাণ্ড শুরু করে তখন তৎকালীন বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কারণ এমন কোনও এলাকা ছিল না যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়নি। দেশে-বিদেশে তখন বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে তাই দলটি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে এই ঘোষণা দেয় যে, ক্ষমতায় গিয়ে তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকেও এদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জারি ছিল এবং সরকার এ বিষয়টিকে তেমন একটা পাত্তা দেয়নি। মানুষের প্রতিবাদকেও তেমন একটা আমলে নেয়নি। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে যখন সাত খুনের ঘটনা ঘটলো র‌্যাব সদস্যদের হাতে তখন সরকারের টনক নড়লো এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টিকে ‘সিরিয়াসলি’ গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে সাত খুন মামলার বিচার সম্পন্ন করা হলো এবং দোষীদের শাস্তি দেওয়া হলো। অনেকেই ভেবেছিল যে, এরপর র‌্যাবের মতো একটি সুশৃঙ্খল বা এলিট বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিজে থেকেই সচেতন হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে বাহিনীটি এরকম আর কোনও ‘আন্তর্জাতিক স্ক্যান্ডাল’ ঘটাবে না।

বাংলাদেশ এমনিতেই আন্তর্জাতিক ভাবে নানা কারণে কোণঠাসা হয়ে আছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক ও অ-রাজনৈতিক বহুপাক্ষিক অপপ্রচারকারীরা সোচ্চার। সে কারণেই অন্য যে কোনও সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারকে আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে চলতে হয়। কিন্তু সরকারের শেষ বছরে অর্থাৎ নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য ভেজাল ও মাদক-বিরোধী অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে সরকারের অবশ্যই আরো বেশি সতর্ক ও সজাগ থাকা প্রয়োজন ছিল। কোনোভাবেই বিভিন্ন বাহিনীর ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সরকার-বিরোধী কোনও কোনও শক্তিকে এই সুযোগটি দেওয়া উচিত হয়নি যাতে গোটা সরকার ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পড়ে, যেমনটি হয়েছে কক্সবাজারে একরাম হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে।

আজকে বিএনপি’র মতো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেত্রী দুর্নীতির দায়ে কারাগারে। জেনারেল জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে বিদেশে পলাতক জীবন যাপন করছে। কিন্তু এদেশের মানুষ তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে কিন্তু রাস্তায় নামেনি কারণ এদেশের মানুষ মূলত দুর্নীতি-বিরোধী এবং আইনের শাসন প্রণয়নের পক্ষপাতি। শেখ হাসিনা যতোবার এই কথাটি বলেন যে, তিনি এদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান ততোবার মানুষ তাকে বিশ্বাস করতে চায়। কিন্তু এখন মানুষ দেখতে পাচ্ছে যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই আইন ভঙ্গ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি এবং মানুষকে কোনোরকম আত্মপক্ষ সমর্থন বা আইনি সুরক্ষা না দিয়েই তাকে হত্যা করা হচ্ছে। পরিবারের কাছ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ডকে সমর্থন দেওয়ার মতো মানুষ এখন আর এদেশে নেই আর সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এটা প্রমাণও করতে পারেনি যে, তারা জনগণের জীবনকে নিরাপদ বা মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যেই এরকমটি করছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোনও পরিস্থিতিতেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে মেনে নেওয়া যায় না, উচিতও নয়। তার চেয়ে মাদকবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন করা অতীব জরুরি এবং যা দিয়ে দেশের আপামর মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া যায় সেই পদক্ষেপ কাম্য। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযানের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানাবিধ বাণিজ্য করবে এবং কাউকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করবে সেটা কেবল যে বে-আইনি তাই-ই নয়, বরং গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে একটি সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিস্থাপিত করে এবং এর ফলে মানুষ সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারায়। দেশে দেশে এই সত্য বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, দুঃখজনক হলো আমরা সেই সত্য থেকে এখনও কোনও শিক্ষা নেইনি।

২০০৪-৫ সালে ঘটানো অপারেশন ক্লিনহার্ট পরিচালিত হয়েছিল মানুষকে সন্ত্রাসের হাত থেকে রক্ষার জন্য। কিন্তু যখন মানুষ দেখতে পেলো যে, এই অপারেশনের নামে হাজার হাজার মায়ের বুক খালি হচ্ছে তখন মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবং প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল। যে কারণে ২০০৬ সালে এসে চার দলীয় জোট সরকারের অনৈতিক রাজনৈতিক পদক্ষেপকে তারা মোটেও মেনে নিতে পারেনি। শেষ রক্ষা হয়নি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের। আমরা আবার সেরকম একটি পরিস্থিতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসেও। সারা দেশে ভেজাল ও মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু কেন মানুষ প্রাথমিক স্বস্তি  প্রকাশের পর পরই ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামকে হত্যাকে কেন্দ্র করে গোটা অভিযান নিয়েই প্রশ্নের সুযোগ পেলো সেটি অবিলম্বে খতিয়ে দেখা জরুরি। নারায়ণগঞ্জে যেমন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দিয়ে বিষয়টিকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল কক্সবাজারের ঘটনাটিও ঠিক সেভাবে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি রাখে। নাহলে সামনে সত্যিই সত্যিই মানুষকে বোঝানো দায় হয়ে যাবে যে, সরকার সত্যিই মাদকনির্মূল করতে চাইছে নাকি এর পেছনে সরকারের অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে?

দুঃখজনক সত্য হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন ঢালাও হত্যার লাইসেন্স পেয়ে যায় তখন তার পুরো দায় ও দায়িত্ব গিয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কাঁধে। কারণ রাষ্ট্রই তাদের পরিচালিত করে, অন্য কেউ নয়। এখন এই অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে বাহিনীগুলো যদি নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন বা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে তার দায়ও তখন রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। তার চেয়েও বড় কথা হলো, সরকারের শত্রুরাতো বসে নেই, তারাও এই সুযোগে যদি ‘জনহত্যা’ শুরু করে সে দায় বাহনীগুলোর ওপর চাপায় তাহলে সেটা প্রমাণে সরকারের হাতে যে কোনোই সুযোগ থাকবে না তাতো বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে এর আগে আমরা দেখেছি যে, নিজেরাই নিখোঁজ হয়ে কিংবা সিরিয়ায় গিয়ে আইএস-এ যোগ দিলেও তাদেরকে পরিবারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ‘গুম’ বলে প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা এই মুহূর্তে যতোটা ঘোলাটে তা সরকারের জন্য, দেশের জন্য, জনগণের জন্য– কারো জন্যই মঙ্গলের নয়। এই মুহূর্তে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার দাবিটি সর্বোচ্চ উচ্চারিত। কিন্তু সরকার কি সেটা শুনতে পাচ্ছে? নাকি শুনবে? যদি শোনে তাহলে ভালো, আর না শুনলে এর জন্য চরম মূল্য দেওয়ার প্রস্তুতিও সরকার নিয়ে রাখতে পারে। গণ-মানুষের প্রতিবাদ যে ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে সে তথ্যওতো আমাদের কারো অজানা নয়, তাই না?

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

[email protected]

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ