আমাদের ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য

Send
আনিসুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:২৭, আগস্ট ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০০, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

আনিসুর রহমানএকটা বাস্তব গল্প দিয়ে শুরু করি। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা থেকে নবাগত এক প্রার্থী পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে প্রার্থী হয়েই জিতে যান। তার নির্বাচনি এলাকা গারো অধ্যুষিত। তিনি জিতে এসে ঢাকায় বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন। এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই, তুই জিতলি কেমনে? তোকে মানুষ ভোট দিল কেন?’ নতুন সংসদ সদস্যের জবাব, ‘ওখানে থাকে গারোরা। ওরা ভোটের আর কী বোঝে? গারোরা আমাকে ভোট দিয়েছে।’
অন্য উদাহরণ বলি। আমার যে এলাকা সেখানে ছোট সময়ে গারোদের জীবন, সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। একইসঙ্গে আমার বাবার কাছে তাদের সততা, সরলতা আর সংগ্রামী সুন্দর জীবনের অনেক গল্প শুনেছি। আমার বাবা কিশোর বয়সে নিজের হাত খরচ জোগানের জন্যে মধুপুর গড়া লের ভেতরে বিখ্যাত হালদা বিলে গারোদের জমি বর্গা চাষ করতেন। সেই জমির মালিক গারো কর্তা বাবাকে জমি চাষে সহযোগিতা করতেন।
বাবা একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘ওদের কখনোই অসম্মান করে কোনো কথা বলবে না, সরকার বলে সম্বোধন করবে। তাহলে ওরা খুশি হয়।’ এই শিক্ষাটা খুব অল্পবয়সে আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। তারপর আরও একটু বড় হয়ে জানতে পারি, ‘গারো’ বা ‘সরকার’দের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। আমার খুব আগ্রহ তাদের ভাষা সম্পর্কে জানার, বোঝার।

মধুপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক প্রধান শিক্ষক আমাদের আত্মীয় আবদুল হালিম। তিনি অবসরের পর ‘গারো’ ভাষা সংরক্ষণ করছিলেন। আমার উৎসাহ দেখে তিনি আগ্রহ দেখালেন, এই কাজে আমাকেও যুক্ত করবেন। এর কিছু দিনের মধ্যে তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। গারো ভাষা বিষয়ে আমার জানার সুযোগে ভাটা পড়ে গেলো। ঘটনাটা আজ থেকে পঁচিশ বছর আগের। আরও পরে জানতে পারি, বাংলাদেশে শুধু গারো ভাষা নয়, কমপক্ষে আরও ৩০টি ‘আদিবাসী’ ভাষা রয়েছে। বাংলাদেশে শুধু বাঙালি, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নামে পরিচিত মানুষই থাকে না, এদেশে ৭৫টি ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীরও বসবাস।

ওপরের তিনটি ঘটনা থেকে একটি  চিত্র পাওয়া যাবে, ‘আদিবাসীদের’ আমরা কীভাবে দেখি, কীভাবে চিনি, কীভাবে মূল্যায়ন করি। শহরের চোখে আমরা ‘গারো’, ‘চাকমা’, ‘পাহাড়ি’, ‘রাখাইন’ বলে নাক উঁচু একটা ভাব নেই। তাদের বিষয়ে গড়পড়তা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এমনটিই।

১৯৫২ সালে বাঙালির মাতৃভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবেসের স্বীকৃতির পর আমাদের নিজস্ব ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে লাগসই প্রাতিষ্ঠানিক কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নামের একটি নতুন প্রতিষ্ঠান রয়েছে বটে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আমাদের মাতৃভাষা সাহিত্যে নতুন কোনও সংযোজন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি ও বাংলা একাডেমির কাজের অনুকরণ বা অনুসরণ ছাড়া নতুন কিছু নয়। এর কর্মসূচি, প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কোনও কাজ খুঁজে পেলাম না। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ভাষা নিয়ে তাদের কোনও জবাব পাওয়া গেলো না। কার্যত এটি একটি লোক দেখানো প্রতিষ্ঠান। আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার নামে সভা সেমিনার করবো, অন্যদিকে নিজেদের ‘আদিবাসী’ ভাষাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে, সেদিকে নজর থাকবে না কেন?

কিন্তু বেসরকারি উদ্যোগ বা ব্যক্তিগত আগ্রহের কিছু নমুনা উল্লেখ করা যায়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পরের বছরই ২০০০ সালে ফেব্রুয়ারির আগে কবি মুহাম্মদ সামাদের উদ্যোগে জাতীয় কবিতা উৎসবে বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ভাষাভাষী কবিতার আলাদা পর্ব চালু করা হয়, যার ধারাবাহিকতা এখনও চলমান।

তথ্য প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার চাকমা বর্ণমালার লিখিত রূপের জন্যে উদ্যোগী হন। আশ্রয়ন নামের একটি এনজিও সাঁওতাল ভাষার বর্ণমালা নিয়ে কাজ শুরু করে। ‘আদিবাসী উন্নয়ন ও কল্যাণ সংস্থা’ আকুস-এর সভাপতি মং এখেন মংমং আমাকে জানালেন, রোমান হরফে গারো ভাষার লিখিত রূপ দেওয়ার কাজ বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হয়েছে। এর বিপরীতে আত্মঘাতী কাজ হয়েছে ২০১০ সালের একটি সরকারি সিদ্ধান্তে। এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের কেবল ৩০টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি রয়েছে:

চাকমা (৪ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪৮ জন), মারমা (২ লাখ ২ হাজার ৯৭৪ জন), ত্রিপুরা (১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৮ জন), গারো (৩৯ হাজার ৪ জন), তঞ্চঙ্গা (৪৪ হাজার ২৫৪ জন), বম (১২ হাজার ৪২৪ জন), পাঙ্খুয়া (দুই হাজার ২৭৪ জন), চাকমা (দুই হাজার ৮৩৫ জন), খেয়াং (তিন হাজার ৮৯৯ জন), খুমি (তিন হাজার ৩৬৯ জন), লুসাই (৯৫৯ জন), কোচ (১৬ হাজার ৯০৩ জন), সাঁওতাল (১ লাখ ৪৭ হাজার ১১২ জন), ডালু (৮০৬ জন) উসাই (৩৪৭ জন), রাখাইন (১৩ হাজার ২৫৪ জন), মণিপুরী (২৪ হাজার ৬৯৫ জন), গারো (৮৪ হাজার ৫৬৫ জন), হাজং (৯ হাজার ১৬২ জন), খাসিয়া বা খাসি (১১ হাজার ৬৯৭ জন), মং (২৬৩ জন), ওঁরাও (৮০ হাজার ৩৮৬ জন), বর্ম্মন (৫৩ হাজার ৭৯২ জন), পাহাড়ি ৫ হাজার ৯০৮ জন), মালপাহাড়ি (দুই হাজার ৮৪০ জন), মুণ্ডা (৩৮ হাজার ২১২ জন),  কোল (২ হাজার ৮৪৩ জন), কন্দ, পাংখো, পাংগোন, মুরং, রাজবংশী, পাত্র, গণ্ড এদের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। তাহলে মোট ৭৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাকিগুলোর অস্তিত্বের কী হবে?

লেখক ও গবেষক অধ্যাপক মেসবাহ কামাল তার ‘আদিবাসী জাতিসত্তার পরিচয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলাদেশে ৭৫টি ‘আদিবাসী’ জাতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন : ১. অধিকারী ২. অসম/অহমিয়া ৩. ওরাওঁ/ওরাং ৪. কন্দ/খন্দ/খণ্ড ৫. কর্নিদাস ৬. কর্মকার ৭. কড়া/করোয়া ৮. কাউর/কাউরা ৯. কোচ ১০. কোল ১১. খাড়িয়া ১২. খারওয়ার ১৩. খাসি ১৪. খিয়াং ১৫. খুমী ১৬. গড়াৎ ১৭. গন্ড ১৮. গারো/মান্দি ১৯. গৌড়/কন্দগৌড় ২০. গোর্খা ২১. চন্ডাল ২২. চাঁইমাল/চাঁই ২৩. চাক ২৪. চাকমা ২৫. ছত্রী ২৬. ডালু ২৭. ডোম ২৮. ত ঙ্গ্যা ২৯. তুরী ৩০. ত্রিপুরা ৩১. তেলী ৩২. নুনিয়া ৩৩. পল্ল/পলিয়া ৩৪. পাংখোয়া ৩৫. পাত্র/লালং ৩৬. পাহাড়িয়া/মালপাহাড়ি/সাওরিয়া পাহাড়ি ৩৭. পাহান ৩৮. পুন্ড্র/পোদ ৩৯. বম ৪০. বর্মন ৪১. বড়াইক/বাডাইক ৪২. বাউরি ৪৩. বাগদী ৪৪. বানাই ৪৫. বাদিয়া/বেদিয়া ৪৬. বীন/বিন্দ ৪৭. বোনাজ/বুনা ৪৮. ভর ৪৯. ভূঁইমালী ৫০. ভূঁইয়া ৫১. ভূমিজ ৫২. মণিপুরী ৫৩. মারমা/মগ/মং ৫৪. মালো ৫৫. মাহাতো/মারমি/মুরমি ৫৬. মাহালী ৫৭. র্মিধা ৫৮. মন্ডা ৫৯. মুরারী/মন্ডারী/মুন্ডাই/মুরিয়ারী ৬০. মুষহর ৬১. ¤্রাে/মুরং ৬২. রবিদাস ৬৩. রাই ৬৪. রাওতিয়া ৬৫. রাখাইন ৬৬. রাজবংশী ৬৭. রাজজোয়াড় ৬৮. রানা কর্মকার ৬৯. লুসাই ৭০. লোহার/লহরা ৭১. শবর ৭২. সাউ/সাউরা সাওড়া ৭৩. সাঁওতাল ৭৪. হদি এবং ৭৫. হাজং।

আবার একই বছর অধ্যাপক কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশন প্রণীত ‘শিক্ষানীতি ২০১০’-এ চমৎকারভাবে সব সুপারিশ করা আছে:

‘আদিবাসী’ ভাষা ও শিক্ষা সম্পর্কে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ ও বাস্তবায়ন অংশের পৃষ্ঠা ৭-এ ‘আদিবাসী শিশু’ উপশিরোনামে তিনটি ধারায় বলা হয়েছে–

ক) ‘আদিবাসী’ শিশু যেন নিজেদের ভাষা শিখতে পারে, সেই লক্ষ্যে তাদের জন্য ‘আদিবাসী’ শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা।

খ) ‘আদিবাসী’ প্রান্তিক শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা।

গ) ‘আদিবাসী’ অধ্যুষিত (পাহাড় কিংবা সমতল) যেসব এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, সেসব এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। যেহেতু কোনও কোনও এলাকায় ‘আদিবাসীদের’ বসতি হালকা, তাই একটি বিদ্যালয়ে পর্যন্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হলে সেদিকেও নজর দেওয়া হবে।

শিক্ষানীতি ২০১০ এর ধর্মশিক্ষা অংশের ২১ পৃষ্ঠায় অকাল ধর্ম উপশিরোনামে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী’সহ অন্যান্য সম্প্রদায়, যারা দেশে প্রচলিত মূল চারটি ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী তাদের জন্য নিজেদের ধর্মসহ নৈতিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা।

২০১৮ সালে এসে দেখি, শিক্ষানীতির এসব ভালো ভালো কথার ছিটেফোঁটাও বাস্তব রূপ নেয়নি। অন্যদিকে এই শিক্ষানীতির বিপরীতে কেবল ২৭টি ‘আদিবাসী’কে স্বীকৃতি দিয়ে বাকি ৪৮ ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীকে ‘বিলুপ্ত’ করে দিলো। এভাবে আমরা ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক উন্নতির বিপরীতে মানবিক অবনতি বা বিপর্যয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছি।

২০১২ সালে সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মৌখিক সাহিত্য’ নামে ১৪টি ‘আদিবাসীর’ ভাষার লোকসাহিত্য সংগ্রহ করে একটি সংখ্যা প্রকাশ করে।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিমেল বরকত ২৩টি ‘আদিবাসী’ ভাষার মোট ৯০ জন কবির কবিতা নিয়ে চমৎকার একটি সংকলন প্রকাশ করেন। এই সংকলনকে ভিত্তি করে ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য রক্ষায় প্রযোজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে বিদেশি অর্থায়নে নয়, স্বদেশি অর্থায়নে ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য পরিষদ বা অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। যেমনটা দিল্লি সাহিত্য অ্যাকাডেমি সেই আদলে। সরকারের যে প্রতিষ্ঠান ও যেসব ব্যক্তি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে ৪৮টি ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠীকে ‘বাতিল’ করার উদ্যোগ নিলেন, তারা সরকারের ভেতরে থেকে সরকার ও দেশের উভয়ের সমূহ সর্বনাশ করে চলেছে। বাংলাদেশে ৩০-এর বেশি ‘আদিবাসী’ ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে দশটি ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে।

বাংলাদেশ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছিটেফোঁটা দুই-একটা লোক দেখানো উদ্যোগ থাকলেও ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে কার্যত লাগসই কোনও উদ্যোগ নেই।

২০১৬ সালে আমাদের দেশের জাতীয় সংস্কৃতি নীতি গৃহীত হয়েছে। এটা নামকা ওয়াস্তে একটা কাগুজে দলিল। এই নীতির মাধ্যমে আমাদের বৈচিত্র্যময় বহুসংস্কৃতির কোনও প্রতিফলন ঘটেনি। এটিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচিতির একটা সংকলন বলা যায়। এই নীতি প্রণয়নের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা যদি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী প্রণীত ‘শিক্ষানীতি ২০১০’-এ একটু নজর দেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, জাতীয় সংস্কৃতি প্রণয়নের মাধ্যমে কত বড় অসঙ্গতিপূর্ণ একটা কাজ তারা করেছেন।

‘আদিবাসী’ ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও বিতর্ক হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ২০১০ সালের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২৭টি ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে ৭৫টি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া। তারপর ‘আদিবাসী’ ভাষার বিষয়ে জাতীয় শিক্ষানীতিতে যে ঘোষণা দেওয়া আছে, অবিলম্বে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা।

একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির পরিচয়ের ভিত্তি হলো তাদের মাতৃভাষা। যা বহুল ব্যবহার ও প্রয়োগের সুযোগ ও প্রেক্ষাপট অনুপস্থিত থাকলে সেই ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির অবলুপ্তি অনিবার্য। আর ভাষা অস্তিত্বের জন্যে তার কথন গঠন, পঠন ও লিখন জরুরি। সেই ভাষায় কথা বলা এক জনগোষ্ঠী এবং তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় অবশ্যম্ভাবী। তা না হলে সে ভাষার শব্দাবলি অভিধানে পাওয়া গেলেও বাস্তবে সে ভাষার অস্তিত্ব থাকে না। এ ক্ষেত্রে ল্যাটিন এবং সংস্কৃত বড় উদাহরণ। তাই এখনই সময় আমাদের ৩৫টি ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্যকে বাঁচার সুযোগ ব্যাহত না করা।

১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো বিপদাপন্ন ভাষা প্রকল্পের আওতায় বিলুপ্তপ্রায় ভাষার শেষ মানুষটি মারা যাওয়ার আগেই তার সেই ভাষার নমুনা সংরক্ষণের একটা কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু আমাদের ৩০ এর অধিক আদিবাসী ভাষা বিষয়ে খোদ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এবং ইউনেস্কো কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ কী, তা আমাদের জানা নেই।

বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য রক্ষায় করণীয় বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার আগে এশিয়া মহাদেশের জনবহুল দেশ চীন, ইউরোপের কম জনবহুল একটি দেশ সুইডেনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে চাই।

চীনা সরকার ৫৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমান চীনে সব সংখ্যালঘু আদিগোষ্ঠী মূর হান চাইনিজ জনগোষ্ঠীর মতো সমান সুযোগ, মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করে। সব জাতিসত্তা তাদের নিজ নিজ ভাষা ব্যবহার, উন্নয়ন ও লেখালেখি প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আর এই সুযোগ স্বীকৃত হয়েছে ১৯৫৪ সালে গৃহীত চীনের সংবিধানে। এই স্বীকৃতি শুধু কথার ঝারিঝুরি না, তা রাজনৈতিক বাছাই প্রক্রিয়ায় ও অংশীদারী প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়, আইন-আদালতে, শিক্ষায়, প্রকাশনা ও অনুবাদে নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। অধিকন্তু ১৯৭৮ সালে বেইজিং-এ সংখ্যালঘু ভাষা অনুবাদ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, সরকারি দলিল-দস্তাবেজ ও প্রজ্ঞাপন সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করা। চীনের ভাষানীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং তার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে।

এবার নজর দেব সুইডেনের ভাষানীতির দিকে। সুইডেনের ভাষানীতি চীনের মতোই অনেকটা জাতীয় আদিবাসী গোষ্ঠীর প্রত্যেকের নিজ নিজ মাতৃভাষা শেখার, সমৃদ্ধ ও ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

এ লক্ষ্যে ২০০৯ সালে সুইডেন ভাষা ও ফোকলোর প্রতিষ্ঠান নামে স্থাপনা চালু করে। সুইডেনের ভাষা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সুইডেনে ১৫০ এর অধিক ভাষাভাষী লোকের বাস হলেও এখানে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী ও ভাষা  কেবল পাঁচটি। বাকি ভাষাগুলো নবাগত অভিভাসীদের ভাষা। দেশটির পাঁচটি ‘আদিবাসী’ ভাষা হচ্ছে ফিনিশ, মিয়েনকিয়েলি রোমানি, সামি ও যিদ্দিশ। যেসব স্থানীয় সরকার ইউনিটের অধীনে এসব জনগোষ্ঠীর বসবাস সেসব স্থানীয় সরকার প্রশাসনের দাফতরিক ভাষা সুইডিশের পাশাপাশি ওইসব সংখ্যালঘু ‘আদিবাসী’ ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভাষা পরিষদের কাজের মধ্যে রয়েছে টেলিফোনও ই-মেইলে ভাষা প্রয়োগ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, সংখ্যালঘু ভাষায় ভাষা সংক্রান্ত বই প্রকাশ করা, সম্মেলন ও সেমিনার আয়োজন করা, শব্দ তালিকা প্রকাশ করা এবং আদিবাসী ভাষায় সংবাদ বিবরণী প্রকাশ করা। মাতৃভাষায় মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষালাভের সুযোগ নিশ্চিত করা।

সম্প্রতি সুইডিশ ইনস্টিটিউট সুইডেনের আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য এবং বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ও ভাষা সাহিত্যের পারস্পরিক অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে আমার কাছে সম্ভাব্য করণীয় জানতে চায়। তখন কবি মং এখেন মংমং, অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদের সঙ্গে কথা বলে আমি একটা সংক্ষিপ্ত সুপারিশ দাঁড় করিয়েছিলাম। সেই সুপারিশের সঙ্গে কিছুটা সঙ্গতি রেখে  আমি বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সাহিত্য রক্ষায় কতগুলো পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে চাই:

১) ‘আদিবাসী’ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে একটি তথ্যব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা,

২) ‘আদিবাসী’ ভাষার বর্ণমালা সংগ্রহ এবং তা ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা,
৩) ‘আদিবাসী’ ভাষার অভিধান প্রণয়ন ও প্রকাশ,

৪) ‘আদিবাসী’দের ধর্মান্তরকরণ ঠেকানো ও চিরতরে ধর্মান্তকরণ বন্ধ করা,
৫) ‘আদিবাসী’দের শিক্ষা ও জীবনযাপন উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা,
৬) ‘আদিবাসী’ ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় ছাত্রাবাস নির্মাণ, পৃথক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা,

৭) ‘আদিবাসী’দের নিজ নিজ ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে উভয় দেশের সাধারণ ‘আদিবাসী’ ভাষাগুলোর জন্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে ‘আদিবাসী’ ভাষার লেখকদের জন্য যোগাযোগ বলয় তৈরি করা, ‘আদিবাসী’ ভাষার লেখকদের অন্যান্য দেশের ‘আদিবাসী’ ভাষার লেখকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করা। সেই লক্ষ্যে সাহিত্য উৎসব সম্মেলেন, সেমিনার ও বইমেলার আয়োজন করা

৮) ‘আদিবাসী’ ভাষার সাহিত্য বাংলাসহ অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করা,

৯) তথ্যপ্রযুক্তিতে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি,
১০) গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় ‘আদিবাসী’দের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ,
১১) ব্লগ, গ্রাফিক্স, নকশা ও বিপণনে ‘আদিবাসী’দের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ গ্রহণ,

১২) ‘আদিবাসী’ লেখকদের জন্যে ব্লগ, সাময়িকী ও পঞ্জিকা চালু করা,
১৩) ‘আদিবাসী’দের আত্তীকরণের লক্ষ্যে এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রক্ষা ও সমৃদ্ধির জন্যে আন্তর্জাতিক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা,

১৪) ‘আদিবাসী’ ভাষার একটা স্বতন্ত্র বেতার চ্যানেল প্রতিষ্ঠা,
১৫) জাতীয় টেলিভিশনে ‘আদিবাসী’ ভাষায় নিয়মিত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা,
১৬) বাংলায় অনুবাদসহ ‘আদিবাসী’ ভাষায় নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণ,

১৭) একটি ভাষা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা,  যেখানে বাংলাসহ ৩৫টি ‘আদিবাসী’ ভাষার প্রতিনিধি থাকবে,

১৮) ‘আদিবাসী’ ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ/ মন্ত্রণালয়/বিভাগ চালু করা,
১৯) সুইডেনের সামি সংসদের আদলে বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’দের জন্যও স্বতন্ত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করা।

লেখক: কবি ও নাট্যকার, আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছেন

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ