অভিবাসী কর্মীর অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রসঙ্গ

Send
ফরহাদ আল করিম
প্রকাশিত : ১৮:৪৬, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০২, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

ফরহাদ আল করিমবাংলাদেশ থেকে গত কয়েক বছর ধরে একদল অভিবাসী কর্মী বিভিন্ন পেশায় নিয়মিতভাবে চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন। পুরুষের পাশাপাশি শ্রম অভিবাসন প্রত্যাশী এই দলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীরাও রয়েছেন, যা ইতিবাচক। বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমাদের কর্মক্ষম জনশক্তির কাজের সুযোগ বাড়ছে, তেমনি তাদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে অবদান রাখছে। যদিও আমাদের অভিবাসী কর্মীরা বিশ্বের অনেক দেশে গিয়ে চাকরিরত আছেন, তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বেশিরভাগ অভিবাসন প্রত্যাশী কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। কারণ, নতুন নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত না হওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে কাজের চাহিদা অন্য দেশের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় আমাদের কর্মীরা এই সুযোগটি গ্রহণ করতে পারছেন।
সরকারিভাবে ১৯৭৬ সালে মাত্র ৬ হাজার ৮৭ জন কর্মী নিয়ে বিদেশে শ্রম অভিবাসনের যাত্রা শুরু হয়। সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়– সে সময়কাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের মতো কর্মী নানা পেশায় বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গেছেন। এ বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত যায় ৬ লাখ ১৪ হাজার, যেখানে নারী কর্মীরাও রয়েছেন। তবে ২০১৭ সালটি আমাদের শ্রম অভিবাসনের একটি রেকর্ড বছর ছিল। কারণ, এই বছরটিতে আগের বছরগুলোর তুলনায় শ্রম অভিবাসন অনেক বেশি পরিমাণে হয়। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ বিএমইটি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সাড়ে ৭ লাখ কর্মী বিদেশে গেলেও ২০১৭ সালে ১০ লাখের বেশি অভিবাসী কর্মী চাকরি নিয়ে বিদেশে যেতে সক্ষম হন। একই বছরের আরও একটি রেকর্ড হলো– নারী অভিবাসনও অতীতের চেয়ে বেশি ছিল। ২০১৭ সালে প্রায় ১ লাখ বিশ হাজারের অধিক নারীকর্মী বিদেশে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। তবে অভিবাসনে আমাদের রেকর্ড থাকলেও মানসম্মত শ্রম অভিবাসন এবং রেমিট্যান্স আনতে আমরা কতটুকু সফলতা দেখাতে পেরেছি তা বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি। এছাড়াও এও দেখতে হবে যারা সফল বা বিফল হয়ে দেশে ফিরে আসেন তাদের রিইন্ট্রিগেশনে আমরা কতটুকু অবদান রাখতে পেরেছি। 

যদিও ২০১৭ সালে রেকর্ড পরিমাণে কর্মী বিদেশে যায় যে তুলনায় রেমিট্যান্স আহরণের ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা তেমন চোখে পড়ে না। যেমন, ১০ লাখ অভিবাসী কর্মীর কাজের বিপরীতে ২০১৭ সালে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার রেমিট্যান্স বৈধ চ্যানেলে দেশে আসে। আবার ২০১৬ সালে সাড়ে ৭  লাখ জন অভিবাসী বিদেশে গিয়ে ১৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠান। অর্থাৎ বিষয়টি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়– অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান অর্জনে এখনও আমাদের ঘাটতি রয়েছে। যেমন চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত কাজ ও দক্ষকর্মী, ভালো বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কর্মী পাঠাতে আমরা কতটুকু সফল হয়েছি তা বিবেচনায় আনতে হবে। তাছাড়া অর্জিত রেমিট্যান্স সঠিক পথে দেশে আসছে কিনা দেখা জরুরি। সুতরাং অভিবাসনে সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপশি মানসম্মত শ্রম অভিবাসনে আমাদের মনোযোগ হওয়ার সময় এখন।

যদিও শ্রম অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কিন্তু আমাদের অভিবাসন ইস্যুতে দেশের ভেতরে সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, যা একটি সীমাবদ্ধতা। এছাড়াও অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই ইস্যু সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে বিদেশগামীর মধ্যে সঠিক তথ্যের অস্পষ্টতা ও বিদেশ যাওয়ার ধাপের মধ্যে বিরাজমান জটিলতা। আমাদের দেশ থেকে বিদেশে চাকরি আগ্রহীদের জন্য অধিক অভিবাসন ব্যয় যেমন অন্যরকম একটি বিশ্বরেকর্ড, তেমনি অধিক টাকা ব্যয় করার পরও বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নটি অনেক সময় অধরা হয়ে থেকে যাওয়া। কারণ সঠিক তথ্য প্রবাহ না থাকা ও ভিসা বাণিজ্যের কারণে দালালরা আগ্রহী অভিবাসন প্রত্যাশীদের রীতিমত নাকানিচুবানি খাওয়ান। তাছাড়া প্রতারিত অভিবাসী জানেন না কোথায় গেলে প্রতিকার পাবেন। আবার প্রতারিতরা আইনের সহযোগিতা নিতে এলেও মামলার খরচ এবং সাক্ষীর অভাবে মামলা করে লাভবান হতে পারেন না। সুতরাং এই ইস্যুতেও আমাদের নজর দেওয়া জরুরি।  

পুরুষদের অভিবাসন অনেক ব্যয় বেশি হলেও সরকারিভাবে বর্তমানে নারীরা কম খরচে বিদেশে যেতে পারছেন। সীমিত কয়েকটি পেশায় নারীরা বিদেশে যেতে পারলেও বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মীও ভিসায় বেশিরভাগ নারী কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু নির্ধারিত দেশে মূলত নারীকর্মীরা গৃহকর্মীর কাজের সুযোগ বেশি পাচ্ছেন। সরকারি উদ্যোগে গৃহকর্মের ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কোনও অভিবাসন ব্যয় না থাকলেও আগ্রহী বিদেশগামীদের বিভিন্ন সময়ে দালাল বা এজেন্সির প্রতিনিধিরা বিভ্রান্ত করে ভিসা ও অন্যান্য খরচ বাবদ টাকা নেন। ফলে নিরীহ গরিব অভিবাসীরা বিদেশে যাওয়ার শুরুতে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ বা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সুতরাং সরকারের যথাযথ বিভাগের মনোযোগী ও কার্যকর শাস্তি প্রয়োগ করা জরুরি, যাতে প্রতারণা বন্ধ হয়। 

বিদেশে কর্মী গেলে একদিকে যেমন দেশের বেকারত্ব যেমন কমে, তেমনি তাদের আয় করা রেমিট্যান্স দিয়ে অর্থনীতির ভিতকে মজবুত রাখতে সহায়তা করে। ফলে এই সেক্টরটির মাধ্যমে যদি আমরা উপকৃত হতে চাই তাহলে এই বিষয়ে সুনজর দিতে হবে। কারণ, প্রায় সময় বিদেশগামীদের দালালের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার করুণ কাহিনি শোনা গেলেও আইনের আলোকে শাস্তির বিধানের উদাহরণ কম দেখি। বিদেশে যারা যাচ্ছেন তাদের দেখভাল করার জন্য রাষ্ট্রের উদ্যোগে বিদেশের মিশনগুলোতে পর্যাপ্ত শ্রম শাখা বা লেবার উইংস কম, যা বাড়ানো দরকার। এছাড়াও কর্মীরা সমস্যায় পড়লে যথাযথ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সমস্যা সমাধান করতে বিলম্ব হওয়া বা কখনও কখনও কোনও উদ্যোগ গ্রহণে ঘাটতি দেখা যায়। 

তুলানমূলকভাবে নারী কর্মীদের ক্ষেত্রে নির্যাতন ও শোষণের ঘটনা বেশি শোনা যায়। অনেক সময় তারা এমন ধরনের নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে আসেন, যা অন্যদের বিদেশে যেতে নিরুৎসাহিত করে। সুতরাং সবাইকে অভিবাসীর প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে। বিশেষত নারী কর্মীদের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে ও নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে হবে। কারণ, নারী কর্মীদের নির্যাতনের গল্পটি ভয়াবহ ও অমানবিক হয়। এক্ষেত্রে সরকারে উচিত অভিবাসনগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে কর্মী প্রেরণের চুক্তির আগে অধিকার লঙ্ঘন ও ঝুঁকির সম্ভাব্য বিষয়সমূহ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে করণীয় নির্ধারণ করা। তা না হলে একবুক আশা নিয়ে কর্মীরা বিদেশে গেলেও অব্যবস্থাপনার কারণে  হতাশ হয়ে তারা দেশে ফিরে আসবেন, যা একটি ধারাবাহিক সংস্কৃতিকে পরিণত হবে। 

সুতরাং অভিবাসীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর দিনটিকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। মূলত অভিবাসন ও রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর মধ্যে দিবসটি নিয়ে আগ্রহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে একটু বেশি। বাংলাদেশে এই দিবসটি সরকারি বিভাগ,বিভিন্ন এনজিও, দাতা সংস্থা, মিডিয়া ও অভিবাসী পরিবারের প্রতিনিধির অংশগ্রহণে পালিত হয়। এই বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘অভিবাসীর অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার’। আমরা চাই যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগটি গ্রহণ করে স্ব-কর্মসংস্থান করা ছাড়াও রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের উপকার করছেন, তাদের অধিকার ও মর্যাদা যেন নিশ্চিত হয়। তারা যেন সকল অনিয়ম ও অভিযোগের বিপরীতে ন্যায়বিচার পান এবং অভিবাসনের মাধ্যমে সফলতা আনতে পারেন।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

ইমেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ